স্বামী বিবেকানন্দের "ভারতকে ভালোবাসো"
আলোচনা করছেন - স্বামী ঈশাত্মানন্দজী মহারাজ
মুক্তি আমাদের (ভারতবাসীর) লক্ষ্য, স্বর্গ নয়।
স্বর্গ থেকে আবার আমরা ফিরে আসি।
আমরা বিশ্বাস করি - ভালো কাজ করলে স্বর্গে যাই। খারাপ কাজ করলে নরকে যাই। খারাপ কাজ শেষ হয়ে গেলে আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসি। এই পৃথিবীতেই আমাদের থাকতে হবে।
এই ভারতবর্ষকে যখন আমরা ভালোবাসার জন্য বলছি, তখন এই philosophy দর্শনকে ভালোবাসার কথা বলতে চাইছি।
কিন্তু philosophy দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জিনিষ রয়েছে। সেটা হচ্ছে ভারতের অর্থনীতি।
যদি আমরা প্রত্যেকটি মানুষকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অর্থের দিক থেকে দাঁড় করাতে না পারি। তাহলে সে মানুষটি কখনোই আরো উচ্চ চিন্তা করতে পারবে না।
তার মনে থাকবে কি করে দুটো রুটি পাবো।
কি করে একটু টাকা রোজগার করবো।
আর সারাক্ষণ যখন ভোগের গল্প বলা হয়, তখন খুব ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে দেখা যায় একটা সিনেমা খুব নাম করেছে। প্রচুর টাকা রোজগার করছে। কিন্তু সেই সিনেমায় দেখা যাচ্ছে , সেখানে একজন খলনায়ক villain, সে গাছ কেটে কেটে বিক্রি করছে। প্রচুর মানুষকে মারছে ধরছে। তাকেই নায়ক করে দিয়েছে!
মাঝে মাঝে দেখা যায় একটা সিনেমা খুব নাম করেছে। প্রচুর টাকা রোজগার করছে। কিন্তু সেই সিনেমায় কি দেখাচ্ছে!
সেখানে একজন খলনায়ক villain, সে গাছ কেটে কেটে বিক্রি করছে। প্রচুর মানুষকে মারছে ধরছে। তাকেই নায়ক করে দিয়েছে!
আর যে পুলিশ অফিসার তার কর্তব্য পালন করছেন, তাকে ধরবার চেষ্টা করছেন, তাকে একেবারে bafun ভাঁড়/বিদূষক বানিয়ে দিল! সিনেমায় সে যেন একটা হাস্য কৌতুকের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অত বড় একজন পুলিশ অফিসার। তিনি কর্তব্য পালন করছেন। তিনি গিয়ে যারা চুরি করছে তাদের ধরার চেষ্টা করছেন। সেই law inforsmanent আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী লোকটিকে ভিলেন বানানো হচ্ছে।
আর যে সত্যিকারের ভিলেন গাছ কেটে, চুরি করে পয়সা রোজগার করছে, তাকে hero নায়ক করা হচ্ছে!
আর দেশ একদম হাততালি দিচ্ছে!
এই সমাজ!
কারো মাথায় এলো না, কি আমরা promote প্রচার করছি!!!
এই ভারতবর্ষের কথা কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ বলেন নি।
এত বোকা মানুষের কথা আমরা ভারতবর্ষে কেউ ভাবতে পারি না।
একটা লোক লিখলো না।
একটা লোক #প্রতিবাদ করলো না!
প্রত্যেকে হাততালি দিলো।
কিন্তু কি শিক্ষাটা পেলাম!
যে কোন জিনিস হোক।
কেউ একটা কবিতা লিখুক, একটা গল্প লিখুক, কেউ একটা সিনেমা তৈরি করুক।
প্রত্যেকটির পিছনে একটা #শিক্ষা তো থাকবে।
সে নিজে নিজে কবিতা লিখে, নিজেই পড়ে স্বপ্ন দেখছে, তাতে কোন আপত্তি নেই।
কিন্তু যখন সে, সেটাকে সমাজের কাছে দিচ্ছে। তখন সমাজের অল্প বয়সীরা তার থেকে কি শিখবে! খলনায়ক হতেই শিখবে। তারা আর পুলিশের চাকরিতে যাবে না।
বলবে এসবের কোন প্রয়োজন নেই। টাকা পয়সাটাই আসল।
এই ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি।
ভাবাই যায় না!
এই ভারতবর্ষের কথা স্বামীজি বলেন নি।
তাহলে কি আমরা হারিয়ে যাব!
না, হারাবো না। তার মূল কারণ হচ্ছে, স্বামী বিবেকানন্দের এই কথাটা -
"এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ।"
বিভিন্ন জায়গায় এখন খুব ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে, বেদান্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
কিছুটা মানুষ না বুঝেই করতে থাকে। কিন্তু একটু তো বুঝছে! জিজ্ঞাসা জেগেছে, এর মধ্যে কি আছে।
এজন্য এই বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে, ভারতবর্ষে "Love India"।
ভারতবর্ষের এখন যে ভৌগলিক অবস্থান, তাকে অবশ্যই আমরা ভালোবাসবো। ভারতবর্ষের সমাজ, প্রকৃতিকে ভালোবাসবো।
কিন্তু "ভারতবর্ষকে ভালোবাসো"র প্রকৃত অর্থ হচ্ছে - ভারতবর্ষের এই সনাতন চরিত্র।
এই সনাতন চরিত্র কি অদ্ভুত ভাবে শেখায় - স্বর্গ নয়, মুক্তিই হচ্ছে আমাদের আসল লক্ষ্য।
সেই মুক্তি আমাদের কি দিতে পারে!
সেই মুক্তি আমাদের আনন্দ দেয়।
কেন আনন্দ দেবে!
কারণ আনন্দই আমাদের লক্ষ্য।
আনন্দ থেকেই আমাদের সৃষ্টি হয়েছে।
"আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে,
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি,
আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি।”
[আনন্দ (ব্রহ্ম) থেকেই সমস্ত প্রাণী জন্মায়, আনন্দের দ্বারাই বাঁচে এবং অন্তিমে আনন্দেই লীন হয়।
এখানে “আনন্দ” বলতে সাধারণ সুখ না, বরং চিরন্তন, অসীম, পরম সত্য (ব্রহ্ম) বোঝানো হয়েছে। এটি সৃষ্টির মূল উৎস ও পরিণাম।]
এই সমস্ত প্রাণগুলো, প্রাণীগুলো আনন্দ থেকেই এসেছে।
সে জন্য আমরা আনন্দই খুঁজে বেড়াচ্ছি।
কিন্তু ভুল জায়গায় আনন্দ খুঁজছি।
ভাবছি খাবারের মধ্যে, ভালো থাকার মধ্যে, মনে করছি নানান এটা ওটার মধ্যে আনন্দ - কিন্তু ভুল হয়ে যাচ্ছে।
স্বামী বিবেকানন্দের পতাকা নিয়ে, স্বামী বিবেকানন্দের আলোটা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আমরা যে যেখানে আছি যতটুকু সাধ্য এটার মধ্য একটু চেষ্টা করতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ একটু ছড়িয়ে দিতে হবে।
আমাদের সকলের এক লক্ষ্য - আনন্দ। কিন্তু সেটা ভুল জায়গায় খুঁজছি।
স্বামী বিবেকানন্দ আদর্শ সকলে মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিবেকানন্দের পতাকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আমরা যে যেখানে আছি যতটুকু সাধ্য এটার মধ্য একটু চেষ্টা করতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে।
আমাদের মধ্যে তার শক্তি কাজ করবেই করবে।
বিবেকানন্দ বলেছেন -
যে আমার কাজ করবে, আমার শক্তি তার মধ্যে প্রবেশ করবে।
আর বিবেকানন্দের শক্তি মানে শিবের শক্তি।
এই শিবের শক্তি কি!
Auspiciousness, পবিত্রতা।
মঙ্গলময় কর্ম, শুভ কর্ম।
Auspiciousness, এই পবিত্রতা, সেটিই হচ্ছে শক্তি।
তাহলে আমরা কি করবো!
প্রথমে যেটি করতে হবে -
Niḥśreyasa (निःश्रेयस)
"সর্বোচ্চ কল্যাণ,"
"এর চেয়ে ভালো আর কিছু নেই” বা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট অবস্থা, মোক্ষ, মুক্তি, অথবা পরম সুখ।
-এটা আমাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান।
এর সাথে economy development অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকটাও দেখা।
আমরা যে যেখানে আছি, যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করতে হবে একত্রিত হয়ে
খানিকটা সাহায্য করা।
আমরা একটা গ্রামে গিয়ে, সেখানে যতগুলি স্কুল আছে সবকটা রং করে দিতে পারি।
সেখানে যদি ল্যাবরেটরি বানিয়ে দিই, ভালো লাইব্রেরি বানিয়ে দিই।
যদি সুন্দর করে টিচার্স কমনরুম বানিয়ে দিই, কারণ টিচার শিক্ষকদের উপর সব নির্ভর করছে।
সেই টিচার শিক্ষক যারা পড়াচ্ছেন, তাদের সাথে কথা বলে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস যদি জাগিয়ে তুলতে পারি,
- "আপনি একটা বিরাট কাজ করছেন। আপনি হয়তো জানেন না সেটা হচ্ছে মানুষ তৈরি করছেন।
যারা গাড়ি তৈরি করে, প্লেন তৈরি করে কারখানায়, বা অন্যান্য কিছু তৈরি করছে, তারা কেমন সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে থাকে। কিরকম আমি অমুক জায়গায় কাজ করি বলে গর্ব করে।
আর আপনারা মানুষ তৈরি করছেন! শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ তৈরির আসল যন্ত্র।
তাদের মধ্যে যদি আত্ববিশ্বাস না থাকে, সন্মান না থাকে, আত্মশ্রদ্ধা না থাকে তাহলে তিনি কি করে প্রকৃত মানুষ তৈরি করবেন!"
এই ভাব কি ভাবে সেই মানুষ তৈরির রূপকারদের মধ্যে বেশি করে জাগ্রত করা যায়, সেটা দেখতে হবে।
"Love India" - বলে স্বামীজি যখন ডাক দিলেন। তখন শুধু সে কথা যে তিনি ম্যাকলাউডকে বললেন তা নয়। তিনি আমাদের সবাইকে বললেন।
স্বামীজি যখন বললেন - Love India.
তখন লন্ডন থেকে একটি মেয়ে চলে এল ভারতবর্ষে।
আরেকটি মেয়ে তারই বয়সী, তিনি চলে এলেন আমেরিকার ডেট্রয়েট থেকে। তিনিও কলকাতায় চলে এলেন। সিস্টার ক্রিস্টিন।
সিস্টার নিবেদিতা ও সিস্টার ক্রিস্টিন - এরা দুজনে এক সাথে আমাদের মেয়েদের শিক্ষার জন্যে অসাধারণ কাজ করেছেন।
প্রথম পাথর ভাঙার কাজটি তারা করে গেছেন।
আমাদের এঁনাদের স্মরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদেরও এঁনাদের মত কিছু করতে হবে।
Individual আলাদা বা এককভাবে করতে গেলে, হয়ত সে ভাবে করতে পারবো না। তাই সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে করতে হবে।
স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে "ভারতবর্ষকে ভালোবাসো"র জন্য আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে এগোতে হবে।
আমরা সবাই মিলে আলোচনা করতে পারি। লক্ষ্য স্থির থেকে ধিরে ধিরে এগিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের চেষ্টা করতে হবে।
আর যে মূহুর্তে চেষ্টা করবো, আমাদের অতি সামান্য সামান্য কাজ যখন শ্রী রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ আশির্বাদ পুষ্ট হবে, তখন কারো সাধ্য নেই সেটাকে বন্ধ করার।
মানুষ এখন ধর্ম নিয়ে পাগল হচ্ছে। কিন্তু ভুল ভাবে চালিত হচ্ছে। ধর্ম মানে ভালোবাসা, উদারতা। কিন্তু ক্ষুদ্রতা নয়।
শুধু মাত্র 'আমার', 'আমার' করে যদি কেউ ভালোবাসে , তখন সেই ক্ষুদ্রতা কখনোই আমাদের শান্তি দিতে পারবে না। যে শান্তি আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।
যদি সত্যি সত্যি শান্তি চাই, তাহলে আমাদের এই ভারতবর্ষকে সত্যি ভালোবাসতে হবে।
এই ভারতবর্ষ সম্পর্কে দু তিনটি কথা জেনে রাখতে হবে।
এক, এই ভারতবর্ষ একটা চিরন্তন ভাবে চলেছে, কারণ এই ভারতবর্ষের উপর ভগবানের একটা কৃপা দৃষ্টি আছে।
যখন মুসলিম সম্রাটরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের আসতে লাগল, গজনীর সুলতান মাহমুদ যখন ভারতে এলেন, তিনি আমাদের নারকেল গাছ দেখে খুব অবাক হয়ে গেলেন।
তিনি তো মরুভূমির লোক। নারকেল গাছ কখন দেখেন নি।
শোনা যায় নারকেল গাছ দেখে তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহ , হিন্দুস্থান কে উপর ইতনাহি মেহেরবান হে, আসমানকে উপর এক লওটা পানি, অর দোঠো রোটি রাখ দিয়া।"
(अल्लाह हिंदुस्तान पर इतना मेहरबान है कि आसमान के ऊपर एक लोटा पानी और दो रोटी रख दिया है।)
এই ভারতবর্ষের উপর ভগবানের এমন কৃপা, যে দেখ লক্ষ্য করে আকাশের উপর এক ঘটি জল আর দুটি রুটি রেখে দিয়েছেন।
যখন আমরা নারকেল কাটি তখন দুটো নারকেল মালা বের হয়। তাই তাকে দোঠো রোটি বললেন। আর তার মধ্যে থেকে জলও পাওয়া যায়।
আর কি চাই মানুষের! সেই রুটি আর জল খেয়েই সে তৃপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
#swamilshatmananda
#Ishatmananda
https://youtu.be/hKkoNH9nqKY?si=2VQxOgzBtaScDqi1

No comments:
Post a Comment