Blog Archive

Monday, June 22, 2009

দিদা

পাপার পরেই যার কথা ভাবলে মনটা কৃতঞ্জতায় ভরে ওঠে সে হল-দিদা। ঠাকুমাকে আমরা দিদা বলি। ‘দিদা’ বলতেই লালপাড় সাদা শাড়ি পরা, উঁচু কপালে বড় লাল সিঁদুরের টিপ পরা, মাথায় ঘোমটা, ছোট্ট-খাট্ট চেহারার সাধারণ অথচ দরদী এক মানবীর ছবি ভেসে ওঠে।
আত্মীয়দের মুখে, কথা প্রসঙ্গে দিদার ছোটবেলার যে গল্প শুনি তা হল – দিদা ভবানীপুরের মিত্র বাড়ির মেজ মেয়ে। দিদার বাবার ছবি দেখেছি। খুব লম্বা, গোঁফওলা, রাগি মাস্টারমশাই ধরনের চেহারা। দিদারা চার বোন, দুই ভাই। ছোট ভাই হবার পর সম্ভবত দিদার মা মারা যান। ছোট ভায়ের দায়িত্ব দিদার ছিল। মামাদাদু এখনও দিদার প্রসঙ্গে স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠে। দিদা শান্ত, চুপচাপ ধরনের ছিল। ফলে অনেক ঝড়-ঝাপ্‌টা শান্ত ভাবে সহ্য করে গেছে। দাদুর মুখে শোনা- কোন কাজে দাদু দিদাদের পাড়ায় যায়, সে সময় দিদা সিঁড়ি পরিষ্কার করছিল। দাদুর দিদাকে পছন্দ হয়, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে দিদার বাবার কাছে যায়। দাদুকে সে সময় নিজের সংসার করার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। দিদা সব সময় দাদুর পাশে২ ছিল। আমার স্মৃতিতে দেখি, দাদু শুয়ে আছে, দিদা দাদুর পা টিপছে। দাদু যে বলেছে তা নয়, দিদার ওটা সখের মত ছিল। শেষে দাদু বেশ ভুগে মারা যান। যখন দাদু মারা গেছেন, তখনও দিদা দাদুর পায়ে হাত বুলাচ্ছিল। শুনেছি এখন আমরা যে বাড়িতে আছি এক সময় এখানে শিয়াল ঘুরত। দাদু সবে একটা ঘর তুলেছে, দরজায় মোটা চট ঝুলত। দিদা দিনেরবেলা একা এভাবেই বাচ্চাদের নিয়ে থাকত। একবার চোরও আসে। তবে শুরু থেকেই দাদু-দিদা কুকুর পুষত-দেশি কুকুর, তাই রক্ষা পায়। পিসির মুখে শুনি দিদার একটা কালো কুচ্‌কুচে কুকুর ছিল। শান্ত, কিন্তু প্রচন্ড রাগী। সারাক্ষণ দিদার সাথে২ থাকত। অনেক বয়সে দিদার পায়ের উপর মাথা রেখে মারা যায়। এর অনেক পরে জিমি আসে, তাকে আমরা দেখেছি।
দাদু-দিদার তিন ছেলে, এক মেয়ে। পাপা বড়। দাদু ভিষণ রাগী ছিলেন। সবার একটা করে ডাক্‌ নাম হলেও পাপাকে দাদু ‘বাবি’ আর দিদা ‘তোতন’ ডাকত, তাই মনে হয় পাপা একটু বেশি আদুরে ছিল।
আমার হস্টেল জীবনটাই প্রথম মধুর স্মৃতি। তার আগের স্মৃতি সব বিক্ষিপ্ত ও কিছু কঠোর। তবু সেখানে একমাত্র স্নিগ্ধ ছায়া হল-‘দিদা’। পাপা সারাদিন বাড়ি থাকত না। আমরা ঘুমালে আসত, উঠে দেখতাম কাজে বেরিয়ে গেছে। দাদু হয়ত ভালবাসত, কিন্তু কঠোরতা এত বেশি ছিল যে মধুর স্মৃতি তেমন নেই। দিদা ভোরবেলা খুঁরিয়ে২ আমাকে স্কুলে দিয়ে আসত, দিদার বাত ছিল। বাড়িতে যা থাকত তাই টিফিনে দিয়ে দিত। তখন স্কুলে টিফিনে বন্ধুদের সাথে তা ভাগ করে খেতে লজ্জা লাগত। দাদু বাড়িতে আমাদের পড়াত, আর খুব মারত। বাপ্পাতো বাড়িতে ছোট্ট২ কারণে সারাক্ষণ মার খেত। দাদুর হরেক রকমের লাঠি আর চাবুক পর্যন্ত ছিল! দিদাকে কখন দাদুর উপর কিছু বলতে দেখিনি। শুধু আমি-বাপ্পা প্রচুর মার খেলে দিদা কাঁদতে২ বাতরুমে নিয়ে যেত। কত বিলাপ করতে২ আমাদের তেল মাখাত, চান করাত। কোলের কাছে নিয়ে শুত।
এরপর আমি হস্টেল চলে যাই। শনি-রবি গার্জন ডেট থাকত। পাপা জলপাইগুড়ি চলে গেছে। আমার বাড়ি থেকে খুবই কম কেউ আসত। তবু আমি সেজেগুজে বসে থাকতাম। দূর থেকে দিদাকে খুঁরিয়ে২ আসতে দেখলে মনটা কানায়২ আনন্দে ভরে উঠত। দিদা চিড়ে-মুড়ি-মুরকি-বাতাসা-মিষ্টি এসব আনত। পাপা খুব কম আস্তে পারত। এলে এই বড় পুতুল, বড়২ চিপ্‌সের প্যাকেট, কেক, বিস্কুট এসব আনত। যেহেতু পাপার আসা সম্ভব হতনা, তাই হয়ত দিদা সব সময় আসার চেষ্টা করত। কিন্তু দিদা একা কখন দূরে কোথাও যেত না। তবু আমার জন্য মাঝে মাঝেই একা বাসে করে হস্টেলে চলে আসত। চোখে তেমন ভাল দেখত না। উঁচু করে শাড়ি পরত, বাসে উঠবে বলে। একবার মনে আছে উল্টো শাড়ি পরেই চলে আসে।
এরপর আমি জলপাইগুড়ি চলে যাই। দাদু-দিদা প্রতি বছর কিছু সময় ওখানে কাটাত। তখন দেখেছি দাদু অনেক শান্ত হয়ে গেছে। সে সময় দিদাকে মনে পরে আচার প্রসঙ্গে। দিদা এত্ত ভাল আচার মাখত, কি বলব! লিখতে২ জিভে জল আসছে। কত্‌বেলের আচার –সর্ষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, নুন দিয়ে মাখা, অসাধারণ! এছাড়া, কুল, তেঁতুল, লেবুর আচারও বানাত। কলকাতা থেকে শিশি করে নিয়েও যেত। জলপাইগুড়িতে রান্না করতে হত না। কিন্তু কোন কারণে একবার দিদা রান্না করে। কাঁচকলা আমি একদম পছন্দ করি না। কিন্তু দিদা সেই কাঁচকলার কোপ্তা এত সুন্দর রান্না করে যে কি বলব! ইস্‌! পাপার রান্না সম্পর্কে আগের লেখাতে জানানোই হয়নি! একবার পাপাকে মাংস রান্না করতে হয়। আমিই করতাম, কিন্তু খুব দরকারে বন্ধুর বাড়ি যেতে হয়। পাপা বল্ল তুই যা, আমি করব। ফেরার সময় ভাবছি পাপা কি কান্ডই না করে বসে থাকবে! কিন্তু এসে দেখি বড় সুন্দর পাত্রে অপুর্ব মাংস পাপা রান্না করে রেখেছে। আমি আর বাপ্পা সারাদিন তুলে২ খেলাম।
তো, দিদার কথা বলছিলাম। দিদা হয়ত পাপাকে একটূ বেশি প্রশ্রয় দিত। মনে আছে পাপা দিদার পিছু২ কিছু একটা চেয়ে ঘুর২ করে ফিরছে। পরে বাপ্পাটাও পাপার পিছু২ ওমন ঘুরত। দিদা কিন্তু খুব খিঁচ-খিঁচও করত। আবার ভালোও বাসত।
দাদু মারা যাবার পর দিদা খুব একা হয়ে যায়। দিদা আসলে দাদুর ছায়া হয়ে গেছিল। তের বছর বয়সে দিদার বিয়ে হয়। ফলে দাদু যেতে যেন দিদার অস্তিত্বই হারিয়ে যায়। আর জলপাইগুড়ি যেতে চাইত না। শেষে খবর পেতেম সিঁড়ি থেকে, চেয়ার থেকে পড়ে গেছে। পা দুটো বরাবর কম জোরি ছিল। বাততো ছিলই! শেষে কলকাতায় যখন এলাম তখন দিদা পুর শষ্যাশায়ী। শিশুর মত হয়ে যায়। সূপর্ণাদি দেখভাল করত। তার উপর তাও একটু বকাবকি করত। সে যেতে একদম শান্ত, চুপচাপ হয়ে যায়। খুব কম কথা বলত। অনেকদিন একভাবে শুয়ে ছিল। খুব কষ্ট হত দেখে। তখন বোকা ছিলাম, বরাবর ভাবতাম দাদু তেমন হয়ত দিদাকে ভালবাসত না। একদিন কথা প্রসঙ্গে জিঞ্জেসও করলাম। ফোগ্‌লা মুখে দিদা একগাল হেসে ফেলল। দেখে এত ভাল লাগল! নাঃ, দাদু অবশ্যই দিদাকে খুব ভালবাসত। দাদু যেতে দিদা তাই এত একা।
দিদা আমার বরাবর দাদুর আড়ালেই থেকেছে। আজও সবাই বেশি দাদুর কথাই বলে। তবু আমার সাদাসিধে, ছোট্টখাট্ট দিদার কথা খুব মনে পরে। বাপ্পাও দিদাকে খুব ভালবাসে। যখন আমরা শিশু তখন ভিন্ন পরিবেশে কেবল দিদাই আমাদের ডানা দিয়ে আগলেছিল, লুকিয়ে২ অনেক স্নেহ করেছিল। যে কারণে আজও দিদার প্রতি কৃতঞ্জতা বোধ করি।

Sunday, June 21, 2009

আমার পাপা



আজ father’s day – খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমার প্রিয় পাপাকে নিয়ে কিচ্ছু লিখি। প্রায় তিন বছর হতে চল্ল পাপা আমার সঙ্গে আর নেই। পাপাকে খুব miss করি। পাপা আমার – শুধু আমার নয় বাপ্পারও সব ছিল-মা-বাবা দু’ই।সুতরাং খুবই স্বাভাবিক আমরা দু’জনেই পাপার ভীষন অভাব বোধ করি। তবু মনে হয় পাপা যেখানে আছে নিশ্চয়ই খুব ভাল আছে।
আমার পাপা ভিষণ আমুদে ছিল। আমি বা বাপ্পা কেউ পাপার মত হইনি। পাপা থাকতে বাড়ি গম্ গম্ করত, সারাক্ষণ হই চই করত। ভোরবেলা উঠে, পূজো করে সারাবাড়ি ধুনো দিত। ধুন তৈরিও একটা উৎসব ছিল। কত রকম জিনিষ এনে হামানদিস্তেতে গুড়োনো হত। বড়২ কৌটতে রাখা হত। সেই ধুনোর গন্ধে তিনতলা পর্যন্ত ম্‌ ম্‌ করত।
পাপা দাদু-দিদার প্রথম ও আদরের সন্তান ছিল। তাই কম বয়সে একটু বেশি দুষ্টু ছিল। প্রায়ই বাড়ি থেকে পালাত। খুব ছোট্টবেলা এক কনভেন্ট স্কুলে পড়ত, দুষ্টুমির জন্য ফাদার বেত দিয়ে মারলে, বেত কেড়ে ছুড়ে স্কুল থেকে পালায়। দাদু ভিষণ রাগি ছিল-ধরলেই আবার মার খাবার ভয়ে ট্রেনে উঠে পরে। পরে ট্রেনের এক ভাল লোকের সাহায্যে বাড়ি আসে। কিছুদিন আগেই মামাদাদু একটা গল্প বলছিল, পাপা যেহেতু প্রথম সন্তান আর ভিষণ দুরন্ত তাই সবাই পাপাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকত। ক্লাস এইট-নাইনে পাপা আবার মু্র্শিদাবাদ না কোথায় পালায়। মামাদাদু বলছিল এখন যেমন কম বয়সি ছেলেরা সিনেমা করবে বলে মুম্বাই যায়, পাপা তেমনি প্লাসটিকের ব্যবসা করবে বলে পালায়। পরে দাদু অনেক খোঁজাখুঁজি করে বাড়ি আনে।
পাপার খুব ব্যবসা করার ইছে ছিল। মনে পরে জলপাইগুড়িতে আমাদের পোলট্রি ছিল। প্রায় ১০০০ মুরগি, ধপ্‌ধপে সাদা, এই বড় বড়। ভুলো তখন ছোট্ট। একটা গুন্ডা মুরগি সারা বাড়ি পাহারা দিত আর ভুলোকে তাড়া করে বেরাত। ব্যবসা কেমন চলত মনে নেই-কিন্তু খুব ভাল লাগত, আমরা সবাই সবসময় ডবল ডিমের অমলেট খেতাম। যা রোজগার হত খেয়ে-খাইয়ে সব মনেহয় সমান সমান চলত। এরপর হল মাসরুম চাষ। আমাদের বাড়ি ছিল একতলা, কিন্তু মাসরুমের ঘর হল তিনতলার সমান। কি ঠান্ডা ঘর! কত্তো বেড! একটার উপর একটা, কুড়িটা করে। তখন আমার ক্লাস সেভেন-এইট হবে। এসময় আবার এই বড়২ সাদা ফুলের মত মাশরুম ভাজা করে, পায়েস করে খাওয়া হচ্ছে। ছাদে শুকনো হচ্ছে। হরেক রকম মেশিন এসেছে। প্যাকেট হচ্ছে। যারা আসছে তারা যেমন মাশরুমের পায়েস খাচ্ছে তেমনি প্যাকেটে করে ফ্রি স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছে। কলকাতা থেকে লোক আসছে। বাড়ি ভাড়া নিয়ে ল্যাব হচ্ছে। কিন্তু শেষে সে ব্যবসাও উঠে গেল। তবু জলপাইগুড়িতে পাপা বিভিন্ন experiment করে ভালোই ছিল। কিন্তু কলকাতার অতি আধুনিক, কিছু স্বার্থন্বেষি মানুষের চক্রে পাপা একদম শেষ হয়ে গেল। পাপার সরলতায় তারাও পাপাকে বোকা বানিয়ে হয়ত মজা পেত। কিন্তু পাপা হঠাৎ একদিনেই এমনভাবে চলে গেল যে তারাও ভিষণ অবাক ও চমকে উঠেছিল। পাপা মারা যেতে কত্তো লোক এলো-পাপা খুব সাধাসিধে ভাল মানুষ ছিল সবাই বলে গেল।
জলপাইগুড়িতে পাপা ভোরবেলা উঠে ধুনো দিতে২ খালি আমার নাম ধরে ডেকেই যেত। আমি কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতাম না। পাপার কাছে যখন যা চেয়েছি পেয়েছি। পাপা কখন পড়তে বসতেও বলত না। তবু নিজের মত করে পড়তাম। প্রচুর গল্পের বই কিনে দিত। জলপাইগুড়িতে বড় বাড়ি, সামনে-পিছনে অনেক জায়গা, অনেক গাছ ছিল। কত বিড়ালের বাচ্চা তুলে এনেছি। প্রথমটা একটু বকলেও পাপা তাদের খবরও নিত। ভুলোতো পাপা অফিস থেকে এলেই দৌড়ে২ গেটে চলে যেত, আর বড় কাল ছাতাটা মুখে নিয়ে হেলতে-দুলতে আসত। ভুলোকে পাপা খুব ভালবাসত। আমি বুলবুলি পাখি কুরিয়ে আনলাম, পাপা তারও ফড়িং ধরার ব্যবস্থা করে দিল। কলেজ থেকে পরে যাওয়া দাঁড়কাকের বাচ্চা তুলে আনলাম, পাপা তার জন্য ছোট্ট মাছ-মাংস আনত। পাড়ার কালু ছিল মস্তান কুকুর। পাপা হাঁটতে বেরলেই কালু ঘাড় উঁচু করে পাপার পেছন২ হাঁটত।
পাপার প্রাণ ছিল ছোট্ট লুনা। সেই লুনায় করে পাপা আমায় টাউনে পড়াতে নিয়ে যেত। কত্তো দূর বন্ধুর বাড়িও ঘুরতে নিয়ে গেছে। কিন্তু ছোট্ট লুনা গ্রামের আলের উপর উল্টে গেল। সে কি কান্ড! ফেরার সময় আমি রিক্সায়, পাপা কিন্তু লুনা ঠিক-ঠাক করে আবার রাজার মত ফট্‌ ফট্‌ করতে২ বাড়ি এলো।
আমরা হঠাৎ কলকাতা চলে এলাম। ভুলোকে আনার জন্য পাপা বড় পাঞ্জাবী লড়ি নিল-সামনে ভুলোর থাকার ব্যবস্থা হল, পিছনে মালপত্র। সেই ভুলো যখন ১৫ বছর বয়সে কিছুদিন ভুগে মারা গেল, তখন পাপা যা করেছিল তা ভোলার নয়। আমার ১২ বছর বয়সে ভুলো এল-আমরা চিরদিন শহর থেকে দূরে থাকতাম। তার উপর আমি তেমন মিশুকে নই, শান্ত ধরনের। ভুলো, পাপা, বাপ্পাকে নিয়েই যেন আমার পৃথিবী। ভুলো যাবে যানতাম। ভুলো মারা যেতে আমি স্থির হয়ে যাই। কান্নাকাটিও করিনি। গুম মেরে গেছিলাম। পাপা এমনি এত্তো হৈ চৈ করে, কিন্তু সে দিন আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। কোথায় গাড়ির ব্যবস্থা করে এলো। এত্তো বড় ব্যাগ আর এই বড় সাদা ফুলের রিং নিয়ে এলো। ছোট্ট কাঁচের পশু চিকিৎসালয়ের গাড়ি, পিছনে ভুলো শুয়ে। সামনে ছোট্ট জায়গা-চালক, তার পাশে পাপা, বাড়ি থেকে আমার যাবার দরকার নেই বলা হল। কিন্তু আমি যেতামই, পাপাও বারণ করলনা। কত্তো দূরে, প্রায় ৩ ঘন্টা ওভাবে কষ্ট করে যাওয়া হল। যেখানে গেলাম, সেখানে গিয়ে মনটা শান্ত হল। কোনো এক গ্রাম-বিশাল এলাকা-কত্তো কুকুর সব ছাড়া। অনেক বিড়াল। এমন কি একটা অন্ধ বাঁদরও ছিল। সেখানে ভুলোকে শুইয়ে এলাম। ফেরার সময় আমি ভাবছিলাম, পাপা ভুলোকে আর অবশ্যই আমাকে কত্তো ভালবাসে। এত্তো ছোট্ট গাড়িতে কি কষ্টই না সেদিন অত্তো বড় মানুষটা পেয়েছিল!
আমাদের রেজাল্টের সময় পাপা বেশি ভয়ে থাকত। ভাবত যদি ফেল করি তা’লে হয়ত বাড়ি ছেরে চলেই যাব। আবার ভাল ফল করলে পাড়ার সব বাড়িতে মিষ্টির বড়২ প্যাকেট পাঠাত। মোবাইল হবার পর ঘন্টায়২ পাপা ফোন করত-কি করছি, কি খাছি, জল খেয়েছি কিনা – তখন হাঁফিইয়ে উঠতাম। এখন সে চুপ থাকে।
আমার পাপা আমায় কখন কিছুতে না বলত না। যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। কত্তো যায়গায় ঘুরেছি। কলকাতায় আসার পর দূরে বর্ধমান ইউনিভার্সিটি যাব- প্রতিদিন পাপা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। পাপার সঙ্গে বেরিয়ে মজা হত। পাপা ট্যাক্সি ছাড়া এক পাও নড়ত না। কত্তো ঘুরতাম, কত্তো খেতাম! গ্রামে২ পাপার সাথে ঘুরে মজা। বড়২ পদ্ম পাতায় গরম২ খাবার খাওয়া! খুঁজে২ পুরোনো২ দোকানে সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার খাওয়া পাপার নেশা ছিল।
পাপার গল্প লোকেদের মুখে শুনতে এত্তো ভাললাগে কি বলব! একটা বিয়ে বাড়িতে মামাদাদুর পাশে বসে২ আমি পাপার ছোট্টবেলার দুষ্টুমীর গল্প শুনছিলাম। আবার দিদির কাছে পাপার গল্পও শুনেছি। আমরা তখন খুব ছোট্ট। পাপার তখন নতুন সংসার। মা একটু আদুরে ছিল, পাপাই বাড়ির অনেক কাজ করত। বিকেলে বাইরে টেবিলে পা তুলে পাপা পাইপ টানতে২ আরাম করত-দিদিও পাপার দেখাদেখি অমন করত। দিদি বলে পাপার পাল্লায় পরে দিদিও ছোট্ট থেকে ছেলেদের মত হয়ে গেছে।
আমি যখন খুব ছোট্ট তখন আমার পক্স হয়। জন্মের পরে পরেই। পাপা-মা তখন শহর থেকে অনেক দূরে থাকত। মাসি-মেসো আমাকে প্রথম দেখতে এসেছে। এদিকে পাপা ঘরে দরজা জানলা বন্ধ করে, মশারি টাঙিয়ে, ঘরে ধুনোর ধোঁয়া দিয়ে, মশারির মধ্যে আমাকে কোলে নিয়ে বসে। কিছুতেই আমাকে বাইরে আনবে না, যদি মরে যাই! মা বলে পাপা আমায় সারাদিন এতো কোলে নিয়ে২ ঘুরত যে তাই আমি বেশি বাড়িনি। আমি যখন হষ্টেলে তখন জলপাইগুড়িতে বাপ্পার একটা দুর্ঘটনা ঘটে, সেলাইও করতে হয়। শুনেছি পাপা এত্তো কান্নাকাটি করে যে পাড়ার সবাই জড় হয়। বাপ্পা তখন খুব ছোট্ট- এখনও বলে ও ভেবে অবাক হচ্ছিল পাপা এত কাঁদছে কেন।
কলকাতা আসার পর পাপার সাথে কয়েকবার পুরী যাই। প্রথমবার পুরী গেলাম, পৌঁছতে২ সন্ধে। আমি, পাপা, বাপ্পা বিচে গেলাম। আমার জ্ঞানত সেই প্রথম সমুদ্র দেখা। পাপাও অনেকদিন পর এল। দু’জনের ভিষণ আনন্দ হচ্ছে। বাপ্পাটা বাইরে আরো চুপচাপ। তো, আমি আর পাপা উট দেখে তার পিঠে চরে বসলাম। পাপা আবার উটটাকে দৌড় করাতে বল্ল। উটটা ল্যাগ-ব্যাগে পা নিয়ে দৌড়চ্ছে-সে কি অভিজ্ঞতা! পরদিন সমুদ্রে নেমেও পাপা ছেলেমানুষ হয়ে গেল। একা একাই মাঝ সমুদ্রের দিকে সাঁতার লাগাচ্ছে। পাপা আর বাপ্পা থাকলে এসময় বাপ্পাকেই অভিভাবক হতে হত। পাপা আর আমি ছেলেমানুষের মত যা খুশি করতাম।
আমার সব সময় কেন যানি মনে হয় আমায় শুধু পাপাই ভালবাসে। একবার দুঃখ করে বল্লাম আমারতো অন্নপ্রাশনই করনি। পাপা অবাক হয়ে বল্ল কে বলেছে! আত্মীয়দের মাঝে সে সময় ছিলাম না ঠিকই, তবে যেখানে ছিলাম সেখানেই অন্নপ্রাশন হয়, এবং ৫০০ মুরগি রান্না হয়। শুনে মুরগিগুলোর জন্য কষ্ট হলেও কেন যেন একটু গর্বও হয়।
আজ এত সুন্দর দিনে পাপার কথা বলে খুব ভাল লাগছে। অবশ্যই সবার বাবাই খুব ভাল হয়। তবু আমার পাপা যেন একাধারে আমার বাবা-মা এবং ভীষণ প্রিয় বন্ধুও ছিল। আমার পাপা যেখানেই থাকুক ঈশ্বর যেন তাকে এমনই খুব খুব ভাল রাখেন।।

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers