Blog Archive

Wednesday, December 2, 2009

আমার বন্ধুরা ... (পর্ব-১)

আজ আমার ছোটবেলা থেকে যে যে বন্ধুর কথা মনে আসছে তাদের সম্পর্কে বলবো।

খুব ছোটবেলা পাড়ার নার্সারী স্কুলে পড়তাম। এখানে আমাদের বাড়ির সব বাচ্চারাই পড়ে। এখানে মনে আছে মাটিতে আসন পেতে বসতাম আর বিয়ে বিয়ে খেলতাম(হাঃ...হাঃ!)। একবার খুব অসুস্থ হলে সব বন্ধুরা বাড়িতে দেখতে আসে। কিন্তু আফসোস কারো নাম মনে নেই।

খুব ছোটতে দিদা গানের স্কুলে ভর্তি করে দেয়। কাকিমারাও ওখানেই গান শিখত। হারমোনিয়ামটা পেল্লাই লাগত। গানের স্কুলে আমায় বড়দের সাথেই গাইতে হত। একবার পোগ্রামে সবচেয়ে ছোট বলে একদম সামনে দাড় করিয়ে দিল। এদিকে মাইকটাও অনেক উঁচুতে, পাড়ার দুই দাদা বোধ হয় তারপর ঠিক করে দেয়। এরা একবার আমাদের বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে আসে, দাদু উঠতে দেয় নি, যেটা আমার খারাপ লাগে।

এরপর মনেপরে লেক গার্লস স্কুলে পড়ি। খুব বন্ধু হয় শ্বাস্বতী। ওর বাড়ি কাছে ছিল। বলত স্কুল থেকে বেরিয়েই নাক বরাবর গেলেই ওর বাড়ি, কিন্তু স্কুল থেকে বেরলেই নাক বরাবর দেওয়াল ছাড়া কিছুই চোখে পরত না।

আমি স্কুল বাসে যেতাম। বাস খুব ঘুরে ঘুরে স্টুডেন্ট তুলত। এ রকম একদিন গলফগ্রিনের বাস স্ট্যান্ডে একজন বেঁটে গোল মত হাসি খুশি লোককে দেখে বাসকাকু আর দিদিরা খুব খুশি হয়। আমরা বাস থেকে নামলে উনি সবার সাথে হাত মেলান। উনি সবার মত স্ট্যান্ডে না দাঁড়িয়ে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাই স্কুলের গাড়ী দাড়িয়েছে ভেবেছিলাম। কিছুদিন পর একটা সিনেমা দেখে তাকে চিনি তিনি -রবি ঘোষ।

আমি বহু স্কুলে পড়ি। লেক গার্লসে পড়তেই প্রথম আমি পাপার সাথে ডবল ডেকার বাসে চড়ি। লেক গার্লস ছাড়ানোর কারণের পিছনে একটা মজার ঘটনা আছে। তখন আমাদের পরীক্ষা চলছে। বাস খুব দেরি করে এলো। এত্তো মেয়েদের নিয়ে আরো দেরি করে স্কুল গেল। বড়গেট বন্ধ করে দিয়েছে! বড়দি খুব রাগী আর লম্বা-চওড়া মহিলা ছিলেন। উনি বেরিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে বাস-কাকুদের তুমুল বকতে লাগলেন। সেই ফাঁকে একটি দিদি তার পায়ের ফাঁক দিয়ে বা পাশ দিয়ে স্কুলে ঢুকে গেল। এদিকে শাস্তি স্বরুপ বাসের স্টুডেন্টদের স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হল না। সকালের স্কুলে বাচ্চারাই যেতাম। বাস কাকুরা ফাঁপরে পরল! আমাদের অনেক লযেন্স দিল, বড় বড় পেন্সিলও! তারপর কোথায় যেন সব ঘুরতেও গেলাম, মনে হয় শেয়ালদা স্টেশনের ব্রিজে বাস দাড়িয়ে ছিল, কারণ ওই ঘড়িটা মনে আছে। শেষে স্কুল ছুটি হলে সেই দিদিটাকে নিয়েই বাড়ি ফিরলাম। অন্যদের খবর জানি না, তবে আমায় কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি, তাই বলিও নি! পরে রেজাল্ট বেরলে ওই দিনের পরীক্ষায় এবসেন্ট লেখা দেখে তো দাদু ক্ষেপে লাল! তখন সব সামনে আসে। বাস ছারিয়ে দাদুই গাড়িতে ক’দিন দেওয়া নেওয়া করে।

তারপর বাড়ির কাছের স্কুলে ভর্তি হই। সেখানের স্মৃতি বলতে মনে পড়ে ‘অবাক জলপান’ নাটক করেছিলাম। এখানে লেখাপড়া হোচ্ছে না বলে তারপর হোস্টেলে চলে আসি আর আমার সাপে বর হয়-এর আগের সব স্মৃতি ঝাঁপসা।

হোস্টেলে আমি বাঁধা গরু ছারা পাই-মনের সুখে খুব আনন্দে থাকি। হোস্টেলের গল্প আগেই বলেছি। এখানে আমার বন্ধু হয় চৈতালী আর রুমকি।

রুমকিটা একটু ক্ষেপি গোছের ছিল। দেখতে খুব সুন্দর। আমি ওর ছবি আঁকতাম। অনেক বই পড়েছে, অঙ্কে তুখোড়! আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়ত। তবু আমরা খুব বন্ধু ছিলাম। ওর লম্বা লম্বা কড়ে আঙ্গুলগুলো বাইরের দিকে অদ্ভুত রকম বাঁকা ছিল। ও বলত ও আগের জন্মে কৃষ্ণ ছিল।

চৈতালী বর্ধমানের কোন গ্রাম থেকে এসেছিল। ওদের বাড়ির সামনেই পুকুর ছিল। ও গল্প করত বহুদূরে স্কুল, ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যেত। তবু ফিরে ওই পুকুরে ডুব না দিলে ওর ঠাকুমা ওকে ঘরে ঢুকতে দিত না। ওর বাবা মারা গেলে মা ওকে নিয়ে চলে আসে।

এছাড়া হোমেও ক’জন বন্ধু ছিল। তারা মাঝে মাঝেই লুকিয়ে হোস্টেলের পিছন দিকে জড় হত। তখন ওরা মোমবাতির উপর চামচে বোরোলিন গরম করে সূচ দিয়ে কান ও নাক বিঁধত। আমরা সূচ আর বোরোলিন সাপ্লাই করতাম। আমাদেরও করে দেবে বলত। চৈতালীই একবার করে। পরে আমাদের সুপার সবিতাদির কাছে বকুনি খায়।

চৈতালীর মাথায় খুব চুল ছিল। যেমন লম্বা, তেমনি গোছ! অথচ ও সার্ফ দিয়ে মাথা ঘষত, দিদিরাও অবাক হত। আমাদের সবিতাদি খুব নিয়মে রাখতেন। মাসে একবার স্যাম্পু। রুমকির মামারা এই বড় বড় সানসিল্ক দিয়ে যেত। ও আমাদের সবাইকেই মাখতে দিত। তবে রুমকি আমাদের চেয়ে বেশ কিছু বড় ছিল। ফলে আমরাও ওর কাছে বহু এঁচোড়ে পাকা সব তথ্য পাই।



হোস্টেল থেকে নিজে জেদ করে চলে আসি ততোদিনে পাপা জলপাইগুড়ি চলে এসেছে। এখানে বন্ধু হয় বাপ্পা আর যাদের বাড়ি প্রথমে ভাড়া ছিলাম, সে বাড়ির ছেলে শুভ। আমরা তিনজন পাপার এনে দেওয়া বিভিন্ন ধরনের গেম খেলতাম। ওরা জেলা স্কুলে পড়ত। আমি সেন্টাল স্কুলে ভর্তি হলাম। পাপার বন্ধুর মেয়েও ওই স্কুলে টুয়েলভে পড়ত, তার নামও দীপান্বিতা। আমায় খুব ভালবাসত । টিফিনে নিজের কাছে নিয়ে যেত। তবে বেশিদিন দীপান্বিতাদিকে পাইনি।

ক্লাস সিক্সে আমার বন্ধুত্ব হয় সম্পার সাথে, পাশাপাশি বসার সূত্রে। পরের বছর থেকে সেকশন চেঞ্জ হতে থাকে, দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরে সে বন্ধুত্ব দৃঢ হয় কলেজে গিয়ে, যা এখনও অটুট। এই ক্লাসে সম্পা ছারা কবিতা, অঞ্জুদের সাথেও বন্ধুত্ব হয়।

অনেক বছর পর যখন কলেজে বেশ ডানা গজাচ্ছে! তখন সম্পা আর আমি পাহাড়পুরের দিকে যাই, রাস্তা বেশ দূর। ওখানেই কবিতা, অঞ্জুরা থাকত। সে সময় কবিতার বোন বোধ হয় মারা যায়, হঠাৎই। কাকিমা খুব কাঁদছিলেন। তো কথা বলতে বলতে কবিতার ঘরে এলাম। ওর ঘরে ঢুকতেই ও দরজার উপর একটা মাঝারি সাইজের ঝোলান ছবি দেখিয়ে বললো দেখ। হাতে আঁকা ছেলেমানুষি ছবি। একটা চুড়িদার পরা মেয়ে। রংটা বেশ উজ্জ্বল। দেখে ভাবলাম সেই বোনের আঁকা হয়ত! বল্লাম বাঃ বেশ এঁকেছে! তাতে কবিতা হেসে বল্ল এটা তোরই আঁকা। নতুন ক্লাসে অন্য সেকশনে চলে যেতে ওকে এঁকে দিই। তাও ছয়-সাত বছর আগেকার ঘটনা। সামান্য ছবিটা কেউ এত্ত সুন্দর করে রেখে দেয়! দেখে যেমন লজ্জা পেয়েছিলাম, তেমনি অভিভূতও হই।

ওর বাড়ি থেকে কিছু দুরেই অঞ্জুদের বাড়ি। কি বলবো, এখনও কল্পনা করি ওমন বাড়িতে থাকব। কারোর অবস্থাই খুব ভাল ছিল না। অঞ্জুদের বাড়িটা দুর থেকে কবিতা দেখাল। কোথায় বাড়ি! খালি সুপুরীর বন মনে হল। আমরা তিনজন এগোলাম।
রাস্তা থেকে ওদের সীমানা একটু উপরে। সুপুরী গাছের শেকড় যেন স্থানটাকে ধরে উঁচু করে রেখেছে। সম্পা সাইকেল চালিয়ে ক্লান্ত। অঞ্জু বললো আগে জল খেয়ে নে’। সেই সুপুরীর বনের নিচে কুয়ো। বাইরে রোদ কিন্তু সে স্থানটা কি যে ঠান্ডা-গাছের ছায়ায়, কি বলল! আর তেমনি ঠান্ডা আর মিষ্টি সে কুয়োর জল। অঞ্জুদের সাধারণ কাঠের বাড়ি আর টিনের চাল। কিন্তু সব কি পরিষ্কার! টিপ্‌-টপ্‌। স্কুলে যে সেলাই করেছি সেগুলোই আসবাবে ঢাকা দেওয়া। শেষে বাড়ির অন্য দিকে গেলাম। গিয়ে যেন অন্য ভুবন দেখলাম। কিছুদুর থেকে সবুজ ধানক্ষেত, যেন আমাদের দেখে আনন্দে হেলে-দুলে হাসছে। চারদিকে অদ্ভুত মিষ্টি হাওয়া। জানিনা সে দৃশ্য বোঝাতে পারলাম কিনা। কিন্তু আমি চোখ বুজলেই অঞ্জুর বাড়ি আর চারপাশের প্রকৃতি এখনও দেখতে পাই।

ক্লাস সেভেনে উঠলাম। নতুন সব বন্ধু। আমি বরাবর মাঝারি ধরনের শান্ত-শিষ্ট স্টুডেন্ট। আমার পাশে বসল-সুদীপ্তা। আমি কি শান্ত! ওকে দেখতে হত। মুখে রা-টি নেই! পড়া ধরলেও প্রায়ই সেই অবস্থা। ওর মত ঠান্ডা মেয়ে আমি দেখিনি। আমি বেশ অত্যাচার করতাম ওর উপর, মনে আছে। প্রায়ই তখন এমনি এমনি নাকি আমার পা ব্যাথা করত, আর আমি ওর কোলে পাটি তুলে বস থাকতাম। পড়ায় আমার বেশি মন লাগত না। সেকেন্ড বেঞ্চে ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। বরাবর ছোট-খাট, পড়া ধরার টাইমে আররো ছোট্ট হয়ে যেতাম। যে টিচার বেশি বকে না তার ক্লাসে আপন মনে বসে নিজের খাতায়, পাশের জনের খাতায় হিজিবিজি আঁকতাম। সচরাচর সবাই খাতা টেনে নিত। এই সুদীপ্তা কিন্তু কিছু বলত না। এমনকি আমায় গল্পের বইও সাপ্লাই করত। অনেকদিন পর ওকে আসাম মোড়ে একবার দেখি। সেই লাজুক হাসি। সঙ্গে কাকিমা ছিলেন।

এরপরের বছরগুলো কাকে কখন পেলাম ঠিক মনে নেই। তবে কিছুজনের কথা না বল্লেই নয়।

সীমা-যাকে মার্‌কামারা মেয়ে বলে। আগে থেকেই চিনতাম। তখন এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত। এবার আমার সাথে বসল। বোধ হয় ক্লাস নাইন।
উমা দেওয়ালের দিকে ধারে বসত। শান্ত, সাধাসিধে, মারওয়ারী ছিল, চোখে চশমা। তার পাশে আমি, আমার পাশে কুমকুম-গলাটা অসম্ভব নেকি-নেকি। সবাই ওকে ক্ষেপাতোও! ও বলতো ছোটবেলায় ও নাকি কাকে নকল করত, এখন এমনই হয়ে গেছে। তার পাশে বসতেন সীমা। অথচ সীমার পিছন দিকে বসার কথা। টিচার চোখের সামনে রাখবে বলে ওকে সেকেন্ড বেঞ্চে রাখেন। ওর সামনে মোহিনী সুর। ফাস্টগার্ল ভিষণ মিষ্টি দেখতে কিন্তু বেশ গম্ভীরও। পেছন ফিরে বসত, দুদিকে ছোট বিনুনী, ঘাড়ের কাছে একটা ছোট্ট সাদা স্পট। ওর বাবা দুবাইতে চাকরী করতেন। দীপ্তি সিনেমা হলের পাশে ওদের সুন্দর দু’তলা বাড়িতে বড় বারান্দায় খুব সুন্দর একটা দোলনা ঝুলত, যা ওদিক দিয়ে গেলে বরাবর চোখে পরত। মোহিনী এখন USA থাকে।

যার কথা বলছিলাম। সীমা-ছোট হাইট। কিন্তু একদম ঠিক-ঠাক। নাকটা একটু চাঁপা। গায়ের রঙটাও। ভিষণ চটপটে। মুখে সব সময় একটা দুষ্টু-মিষ্টি হাসি লেগে আছে। এখন মনে হয় সেই ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরাই যেন সে ছিল। সীমা খুবই চটুল ছিল। জলপাইগুড়ি একটু শহরতলি। আমরা কলকাতার খবর কাগজ একদিন পর পেতাম। কিন্তু সীমা লেটেস্ট হিন্দী সিনেমার নায়িকার চুলের কাটটি বোধ হয় জলপাইগুড়িতেই সবার আগে কেটে নিত। তেমনি ড্রেসও। যে কোন ছুটির আগে রঙিন ড্রেসে সবাই স্কুলে আসলে সীমাকে দেখতে হত।

আমাদের স্কুলের উল্টোদিকে ছেলেদের স্কুল। টিফিনে সীমাদের গ্যাংটা স্কুলের পিছনে চলে যেত আর উঁচু পাচিল টপকে নাকি চিঠি উড়ে আসত। সবই শোনা। অথচ দুই স্কুলের মাঝে বড় রাস্তাও ছিল। সীমারা অফ পিরিওডে গুজগুজ করে বিভিন্ন ধরনের গল্প করত। কুমকুম সঙ্গে থাকত। আমি তেমন পাত্তা পেতেম না, কারণ টাউনে থাকতাম না, কোথায় কি হচ্ছে তাও যানতাম না।

তবু সীমাকে কেন যানি আমার ভাল লাগত আর ও-ও আমায় বেশ স্নেহ করত। এ সময় বাপ্পা হোস্টেলে। আমরাও ভাড়া বাড়ি ছেরে আসাম মোড়ে বেশ একটু নির্জন স্থানে। আর বিভিন্ন কারনে আমি আরো অন্তর্মুখী হচ্ছি। শেফালী দি পিটির টিচার। কোন কারনে একটা দলবদ্ধ নাচ করতেই হবে। উনি খুব রাগী ছিলেন। এদিকে সেই কোন ছোটকালে হোস্টেলে দু’-একবার নেচেছি। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করত। তখন এই সীমা কেন যানি সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত আর খুব ভাল হচ্ছে বলে উৎসাহ দিয়ে দিয়ে ফাইনালটা উৎরে দিয়েছিল।

পরে আবার আমি স্কুল চেঞ্জ করি। সীমাও শিলিগুড়ি চলে যায়। কলেজে থাকাকালিন রাস্তায় হঠাৎ হই-হই করে চিৎকার! সম্পা সঙ্গে ছিল। ঘুরে দেখি সীমা। আমাকেই ডাকছে। সঙ্গে অনেক সঙ্গি-সাথী। সম্পা বিশেষ খুশি হয়নি, সরে গেল। সীমা আমার খোঁজ খবর নিল। নিজের তালেই থাকে। খুব আনন্দ করতে পারে। সবার সাথে হই-হই
করে পরিচয় পালাও সাঙ্গ হল।

কলেজে কুমকুমের সাথেও বহুদিন পর দেখা হয়। ওর স্বপ্নের রাজপুত্রের গল্প আমায় ক্লাসে শুনতে হত। শেষে ওদের পাশের পাড়ায় তার সাথে কুমকুমের আলাপও হল। তখন শুরু হল রাগ-অনুরাগ পালা। তাও আমরা বন্ধুরা হ্যান্ডেল করতাম।

শেষে কলেজে তার সাথে কুমকুম আমার আলাপ করাল। দেখে আমার কল্পনা একেবারে ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে গেল। কম বয়সের প্রেম বলে হয়ত! কুমকুম বলত এই লম্বা! অথচ যে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কুমকুমের সমান। কুমকুম গল্প করত প্রচন্ড রাগী। অথচ শান্ত, একটু ভিরু ভিরু রোগা পাতলা ছেলে, হাতটাও অসম্ভব ঠান্ডা! তার সামনেই কুমকুম সেই আগের টোনেই গল্প করছে -দীপান্বিতা, মনে আছে! তুই টিফিনে স্কুলে কুকুরদের বসে বসে রুটি খাওয়াতিস! ভাব! মনে হচ্ছিল দিই ঠাস করে! হাঃ...হাঃ! আসলে কুমকুমটা বরাবরই একটু আদুরে টাইপের, আমরা সবাই ওকে খুব ভাল বাসতাম।

আমার সাথে ওর বন্ধুত্বের আরেক কারণ ওর বোন মালিনী। ও আমাদের থেকে দু’তিন ক্লাস নিচে পড়ত । খুব সুন্দরী আর এক থেকে তিনের মধ্যে সব সময় থাকত। মালিনী ছিল যেমন সিনেমা খোড়, তেমনি গল্পের বইয়ের পোকা। আমরা কুমকুমের মাধ্যমে বই আদান-প্রদান করতাম। মালিনী ডিবেটেও যেত টিচাররা খুব পছন্দ করতেন। একবার ওর নোট খাতার সাথে সিনেমার ডাইরি ওলোট-পালোট হয় আর তা টিচারের হাতে পরে। বহুত বকুনী খায়, কেবল প্রচন্ড ভাল মেরিট বলে রক্ষা পায়।

এবার দু’জনের কথা বলব। এরা হচ্ছে তপতি ও কুসুম। তপতিকে দেখতে একদম কপিলদেবের মত। ওর মধ্যে কেমন একটা উড়নচন্ডী ব্যাপার ছিল। অন্য সবাই ওকে প্রায় এড়িয়ে চলত। নরমাল মেয়েদের মত কক্ষণ গল্প করত না। এই কোথায় মারামারি হচ্ছে, ক্রিকেটের কে কি করল, ফুটবলে কোন দেশ কেন সেরা-এই ধরনের টপিক। আমি বরাবর মোটামুটি ভাল শ্রোতা। তপতির সঙ্গ কেউ তেমন চাইত না। আমার মনে হত ও কি বলছে বোঝা দরকার। শুনতাম। আদ্দেক বুঝতাম না। ওর তাতে কিছু এসে যেত না। ও হাত-পা নেরে প্রায় উত্তেজিত হয়ে উঠে দারিয়ে ঠিক কি কি ঘটেছে আমায় বোঝাবার চেষ্টা করত। তপতি পড়াশুনায় মোটামুটি ছিল। নাইনেই ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন এলো। বেশ শান্ত হয়ে গেল। চুপচাপ থাকত। তারপর একটা চাপা গুঞ্জন। তপতি আর কুসুমকে নাকি সব যায়গায় একা দেখা যায়। টিফিনে দু’জন একা বসে থাকে!

এবার কুসুমের কথা বলি। আগে কখন চোখে পরেনি। শান্ত, পিছনদিকের বাঞ্চে বসত। হাতের লেখা পড়া যেতনা। টেনে সেকশন আলাদা হল। গুঞ্জন আরো বারলো। আমি আর তপতির সাথে কথা বলতাম না। তারপর আবার স্কুল চেঞ্জ হল। তখনও কিন্তু যারা টাউনে কোচিন পড়ত তাদের মাধ্যমে স্কুলে তপতি-কুসুমের নামে মুখরোচক কাহিনী শুনতাম। সত্যি বলতে প্রচন্ড একরকম ঘেন্না হত।

কিন্তু এসময় একটা খুব দরকারে আমায় আবার স্কুলে আসতে হল। আমি খুব সাধারণ ছিলাম। কেউ যে খুব চিনত তেমন না। ক’জন টিচার হয়ত মুখ চিনত। বন্ধুরা সবাই ছরিয়ে গেছে। আমি স্কুলে গেলাম। তখনও তপতিরা ওখানেই ইলেভেন-টুয়েলভ পড়ছে। ও কোথায় ক্লাস করছিল। রুম থেকে ঠিক দেখেছে। দৌড়ে চলে এলো। হাত ধরে কত্ত গল্প। আমায় দেখে খুব খুশি। কি কাজে এসেছি জিজ্ঞেস করে নিজেই লম্ফ-ঝম্প করে সব করে দিল। আমার খুব ভাল লেগেছিল। কৈ! ওতো সেই আগের মতই আছে। তখন বুঝলাম ও ওই আছে অন্যরা খারাপ কথা বলে মজা পাচ্ছে। টিফিনে কুসুমও এলো, তখনোও চুপ করে খালি মিষ্টি মিষ্টি হেসে চলেছে। তপতি বকবক্‌ করেই চলেছে। তবে কুসুমকে দেখে ওর চোখে অদ্ভুত একটা উজ্জলতা দেখলাম। আমারতো খুব মজাই লাগল। একটু যে অস্বস্থি হচ্ছিল না তা নয়!

এই তপতি-কুসুমের সাথে আবার যোগাযোগ হয় কলেজে গিয়ে। তখন আমার নাম A.C. College ও P.D. Collegeএ আছে। P.D. College এ টুরিজম নিয়েছি, কিন্তু শেষে অনারস না থাকায় A.C. Collegeএ চলে আসি। Collegeএ তপতিও টুরিজম নিল।

আমাদের প্রফেসর একদম কম বয়েসী, নতুন জয়েন করেছেন, খুব হ্যান্ডসাম। ফলে অন্য ক্লাসের মেয়েরাও এমনি ক্লাস করত। আর প্রায়ই উল্টো-পালটা প্রশ্ন করে স্যারকে নাজেহাল করত। স্যার বোধ হয় সদ্য জয়েন করেছিলেন। বেশ ঘাবড়ে যেতেন। গিজ গিজ করছে চারদিকে মেয়ে উনি বড়বড় পা ফেলে মাথা নিচু করে হনহন্ করে হেটে যেতেন। এনার সাথে আবার দেখি তপতির খুব ভাব। উনিও কেবল তপতির কাছেই ফ্রি হতেন। আমাদের নিজেদের বহু কাজ করতে হত স্যারের সাথে, নোটের চেয়ে বই পত্তর নিয়ে ঘাটাঘাটি, স্যার তপতিকে প্রায় শিক্ষন্ডী করে মেয়েদের থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করতেন। মেয়েরাও খুব মজা পেতাম। অন্য ডিপারমেন্টে কুসুম ভর্তি হয়ে ছিল।

এসময় আমার খুব কাছের বন্ধু হয় মোনিকা নামে একটি খুব সফট মেয়ে। কোনদুর ল্যাটাগুড়ি বা অমন কোন যায়গার গ্রাম থেকে আসে। বাড়িতে সব দাদা ওই ছোট ছিল, বাবা-মারও খুব আদুরে। বাবার কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেলত। ও টাউনে কাকার বাড়ি থেকে পড়তে এসেছে। একটু বকলেই কেঁদে ফেলত। আমি বোঝাতাম এখানে এরকম করলে প্যাক খেয়ে মরতে হবে। ও ওর গ্রামের কথা বলত। বিকেলে সব গ্রামে হই-হই করে খেলত। বাবা ডেকে আনত, ও আসতে চাইত না। মা বকত, বাবা কক্ষন বকত না। ও যখন শহরে আসছে তখন নাকি বাবা আর মেয়ে দু’জনে দু’জনকে ধরে কেঁদেই চলেছে! ওর ঠাকুমা আবার ওর বিয়ের জন্য উঠেপরে লেগেছিল। কিন্তু লেখেপড়ায় ভাল বলে কাকুই ওকে টাউনে পাঠিয়ে দেন। বেশ লম্বা-ফর্সা হাসলে বা কাঁদলে দু’সময়ই ওকে পুতুলের মতই লাগত। হাঃ, হাঃ! সেন্টাল স্কুলে কাকলী নামে একটি মেয়ে আবার আমায় জাপানী পুতুল নাম দিয়েছিল। কেন কে যানে!

P.D. Collegeতে কিছুদিন ক্লাস করে A.C. Collegeএ চলে এলাম। P.D. Collegeর বাইরে ছেলেদের দঙ্গল সব সময় জটলা করত। এখানে অনেক ফ্রি। আমি চলে আসতে তপতি আর মোনিকা খুব দুঃখ করেছিল।

ক’দিন পরে দেখি কুসুম এখানে চলে এসেছে। ওর বাড়ি থেকে নাকি মেয়েদের P.D. College ছারিয়ে A.C. Collegeএ ভর্তি করেছে তপতির কারণে। এই নিয়েও একচোট মজা হয়ে গেল। এবার কুসুমকে ভাল করে লক্ষ করার সুযোগ এলো। এতদিনে বেশ লক্ষ্মী টাইপের সুন্দরী হয়েছে। প্রচুর ছেলেরা প্রপোস করছে, ও তা উপভোগও করত দেখতাম। মাঝে মাঝে তপতিও কলেজে আসত। তবে ও খুব কমই এই কলেজে আসত, কারণ প্রচুর প্যাক খেত, উভয় তরফ থেকেই। আমার খুব খারাপ লাগত। বরাবর আমার তপতিটার জন্য মায়া হত। এখনও ভাবলে হয়। নিচু ক্লাসে ও ডানপিঠে একটু গুন্ডী টাইপের ছিল। কলেজে উঠে দেখলাম খুব শান্ত আর কেমন দুঃখি দুঃখি হয়েগেছে।

এবার একটু অন্যদের কথা বলি। যেমন ক্লাসের এক থেকে দশের মধ্যে যারা থাকত। মোহিনী, শিউলি, সাজি, কবিতা-নিবেদিতা(যমজ বোন), সম্পা-আরো অনেকের নাম ভুলে যাচ্ছি।

মোহিনী পড়াশুনা নিয়ে থাকত। তবে খুব দরকারে ওর মধ্যে একটা লিডার ভাব যেগে উঠত।

শিউলি খুব তুখোড় ছিল সব বিষয়েই, তবে ওকে কখন আমার ক্লাসে পাইনি।

সাজি খুব অমায়িক মেয়ে ছিল। আমারা ক্লাস টেনে যে রুমে বসতাম তার পিছনেই দেওয়াল আর তার পাশেই ওদের বিশাল বাড়ি। বাড়িটা খুব ভাল লাগত, কারণ বাড়িটার মাঝখান দিয়ে একটা বড় নারকেল গাছ গেছে। সেটা নাকি অনেক পুরানো আর ওদের মারোয়ারী ফ্যামিলীর লাকি গাছ। আবার বাড়িও করতে হবে! তো গাছটাকে মাঝে রেখে পুর বাড়ি তৈরি। কি ভাবে হয়েছে বরাবর তা নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ওর বাবা প্রচন্ড রাগী ছিলেন। ওরা বোধ হয় তিন বোন। ছেলে ছিলনা বলে কাকুর বোধ হয় দুঃখ ছিল। অথচ তিনটি মেয়েই যাকে বলে রত্ন, তেমনি ছিল। সাজি গল্প করত ওর বাবা রেগে গেলে নাকি বেল্ট খুলে মারতেন!

কবিতা-নিবেদিতা যমজ বোন। হঠাৎ দেখলে চিনতে একটু অসুবিধা হবে।

তবে আমার মনে হত নিবেদিতা খুব কাটাকাটা সুন্দরী, অল্পতে রেগেও যেত। এমনই এক সামান্য কারনে নিচু ক্লাসে আমাদের কথা বন্ধ হয়। অথচ বড় হয়ে যা দু’জনেই জানতাম খুব বোকা বোকা। তবু কেউই আগ বারিয়ে আর কথা বলে উঠতে পারিনি। কলেজে পরীক্ষায় আমাদের সিট পরে পাশাপাশি। ওর ভিতর দিকে। প্রায়ই দেরি করে আসত। দু’জনেই মিষ্টি করে হাসতাম।

কবিতাটা ছিল বিনদাস। ওরা যখন নিচের ক্লাসে পড়ত সব সময় চাইত অন্য অন্য সেকশনে বসতে। এক ক্লাসে কখনও বসতে হলেও দুরে দুরে থাকত। কেউ কাউকে চেনা দিতে চাইত না। দেখে অবাক লাগত। ওদের আবার একটা ওদের মতই দেখতে বোন নিচু ক্লাসে ভর্তি হল। এবার টিফিনে দুই দিদি দেখি দু’দিক দিয়ে বোনকে সারাক্ষণ গার্ড করছে!

কবিতা তুলনামুলক ভাবে বেশি স্টুডিয়াস ছিল। ডিবেটও করত। সদর গার্লসে আমার সাথে ও-ও এলো। দিব্বি অফ পিরিওডে টেবিলে পা তুলে ওর বয়ফ্রেন্ডের জয়েন্ট ফ্যামিলিতে খাওয়ার সময় কেমন ঘণ্টা বাজিয়ে খেতে ডাকা হয় সে সব গল্প করত।

আরেকটি রেঙ্ক করা মেয়ে ছিল নামটা কিছুতেই মাথায় আসছে না। ও প্রায়ই স্কুলে আসত না। টীচাররা খুব বকতেন। কিন্তু যখন আসত তখন সবার মন জয় করে রাখত আর খুব ভাল রেজাল্টও করত। যেহেতু খুব কম স্কুলে আসত আর খুব চুপচাপ থাকত, তাই ওর কোন বন্ধু তেমন ছিল না। প্রচুর ভাল ভাল ইংলিশ সিনেমা দেখত। টিফিনে বা অফপিরিওডে বসে বসে আমি খুব মন দিয়ে সেসব গল্প শুনতাম। ওর কাছেই আমি ‘সিলভার বুলেট’ সিনেমার গল্প শুনি আর ক্লাসে বলে সবাইকে খুব খুশি করি। পরে সিনেমাটা দেখে বরং ওর বলা গল্পটাই আমার বেশি ভাল লেগেছিল।

সেন্ট্রালে আর একটি মেয়ে ছিল নাম মনে নেই। তাকে দেখলে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হত। এও রেঙ্ক করত। কিন্তু সব সময় কেমন দুঃখি দুঃখি মত থাকত। শুনেছি রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সাহায্য করত। একটা বিনুনী করে আসত। সেটা সরু হতে হতে শেষে একটু হয়ে থাকত। সব সময় মুখে কি একটা কষ্টের হাসি ঝুলত। যে কোন ছুটিতে সবাই রঙীন জামা পরে যেতাম। ও অদ্ভুত! সাধারণ একটা ফ্রক পরেই চলে আসত। আমার যখন কোন কারণে খুব কষ্ট হত সব সময় ওর কথা ভাবতাম। এত্ত ভাল মেয়ে তাও কেমন যেন কষ্ট সব সময় ওর চোখে-মুখে।

অথচ ওর হাতে ছিল জাদু! সেলাই ক্লাসে ধর টিচার সবাইকে সেলাইয়ের ছবি পছন্দ করে নিতে বললেন। সবাই হুরমুর করে ভালগুলো তুলে নিত। সবার শেষে যেটা পরে থাকত সেটা ও পেত। একবার মনে আছে একটা খুব বোকা বোকা টুকরিতে দুটো ফলের ছবি ওর ভাগ্যে পরল। সাধারণ ম্যার ম্যারে ছবি। কিন্তু টিকুজিতে ও যখন করল! অসাধারণ! দিদিমনিরাও অবাক হয়ে গেলেন।
কিন্তু ও বরাবর কেমন ছোট্টটিই হয়ে রইল। আর বয়স হতে হট করে একটু দিদা দিদা লাগত। কখনো কিছু দরকার কিনা প্রশ্ন করতে পারি নি, সংকোচ হত। আমার ওকে নিয়ে এই কষ্ট ওর পাড়ার একটা মেয়ে এক একবার যেনে আমায় খুব বকে। বলে জানিস ওদের বাড়ির সব দরজা –জানলা দামি-দামি কাঠ আর কাঁচের! তবু ওই ছোট্ট মেয়েটার মনে যে কি কষ্ট ছিল কোন দিন বুঝে উঠি নি।

এছাড়া সেন্ট্রালের আর যাদের কথা মনে আসছে-সুজাতা, পাপিয়া, বেবি, সুইটি, নুপুর, দীপশিখা, নিশা, তমালী, বিপাসা, অন্তরা, অজন্তা, তৃণা, মালা......।

নিশার কথা একটু বলি। ছোট খাট, চোখটা মায়া ভরা, বড় বড় চোখের পাতা। একটা ঘুম ঘুম ব্যাপার ছিল। ও-ও র্যাসঙ্ক করত। ও আর ওর দিদি আমাদের স্কুলে পড়ত। মা ছিল না। বাবা ছিল। টিচাররা খুব ভালবাসত। দিদিটা ছিল উলটো পিঠ! পরে আরো বাজে হয়ে যায়। যাক, নিশার কথা বলি। ও কলেজে ভর্তি হল আবার নার্সিংএ ও ওর নাম উঠে ছিল। ঠিক এই সময় ওর বাবা মারা গেলেন। জ্যাঠার কাছে দু’বোন চলে এলো। জ্যাঠা ওর নামও চেঞ্জ করে দিল।

এত শান্ত! নার্সিংএ যাবার একটুও ইচ্ছে ছিল না। আমাদের সাথে ক’দিন ক্লাসও করে। শেষে যেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পর সেই কোন দুর যায়গা থেকে পালিয়েও আসে। পাগলাগারদে বা ওমন কোন ভয়ঙ্কর রূগীদের ওখানে ওকে যেতে হয়েছিল। কাউকে কিছু না বলে চলে এলো। এদিকে ওর দিদিকে নিয়ে জ্যেঠা নাজেহাল। ওকেও আর রাখবেনা! ও কলেজে এসে কি কান্নাই না কাঁদত। ও ঠিক আমার ডিপার্টমেন্টের ছিল না। ওর সহপাঠিরা যে কি ভাল ছিল! ছেলেরা উঠে পরে লাগল। ওর জ্যেঠাকে বোঝাল। হল না। তো, ওকে নিয়ে ছেলেগুলো আবার ওর যেখানে নার্সিংএর ট্রেনিং চলছে সেখানে গেল। ওরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। পরে শুনেছি ও অনেক মানিয়ে নিয়েছিল।

দীপশিখার কথা মনে আছে, কারণ ও ছিল ওর মার একদম কার্বন কপি! মুখে একটা ছোট্ট আঁচিল, সেটি পর্যন্ত!


(সকল চরিত্রের নাম পরিবর্তন করা হল)

Wednesday, September 9, 2009

ভুলো আর কালু


আজ ভুলো আর কালুর কথা বলবো। ভুলো আর কালু –নাম দু’টো বলতেই যেন ভুলো তার খুব গম্ভীর মুখ নিয়ে আর কালু আনন্দের টগ্‌বগ্‌ করতে করতে আমার মনে ঘুরে গেল!

ভুলো-কালুকে আমরা মামা-ভাগ্নেই মেনে নিয়েছি। যদিও ভুলোর দিক দিয়ে সে সম্পর্ক ভুলো মানতে চাইত না। তবে কালুর কথা সে বিষয়ে বিশেষ জানি না। আসলে জলপাইগুড়িতে আমাদের বড় লোহার গেট কখনো খোলা পেলেই ভুলো বেরিয়ে যেত, আর কালু আমাদের গেটের কাছেই প্রায় সারাদিন আড্ডা মারত। ফলে, ভুলো বেরিয়েই দাঁত ক্ষিচিয়ে কালুকে তাড়া করত(মানে, এটা আমার ধারণা, কারণ আমি থাকলেতো আর বেরতে পারত না!)। আমি তখন ভুলোর খোঁজ়ে দৌড়াতাম। গন্তব্য মোটামুটি যানাই থাকত বা রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস করলেই হত।
আমাদের বাড়ি থেকে আসামমোড় হাইওয়ে একদম কাছে। তবে সেটা কালুর এলাকা নয় তাই রক্ষে! সাধারণত কিছু দুরে একটা গলি ছিল, তার মধ্যে দিয়ে কিছুটা গেলেই ছোট শষ্যের ক্ষেত। সেখানেই দুটোকে পাওয়া যেত। আমাকে দেখেই কালু লেজ পায়ের ফাঁকে করে শুয়ে পড়ত। যদিও ভুলো মনে হয় তখনই বেশি তড়পাত! হা...হাঃ! আমি ভুলোকে কোলে নিয়ে আসতাম। তখনও তিনি গড়গড় করতেন!

ভুলো আসার আগের কিছু ঘটনা আমার মনে আছে। তখনও আমরা শিল্পসমিতি পাড়ায় থাকি। কিছুদিন আগেই পাপাকে বিলোটকাকুই(ওখানে রিক্সা খুব দরকার হতো, বিলোটকাকু আমাদের রিক্সা চালাত)বোধহয় দুটো কুকুরছানা দেয়। সারাদিন আমাদের পেছন পেছন ঘুরত। খুব বিস্কুট খেত। একটা ছিল কালো, উলের মত গোল। তখন খুব বৃষ্টি হচ্ছে! কালো বলটাকেই সবাই বেশি আদর করতাম। কিন্তু দু’দিন পরেই সেটা মরে গেল। তার চার-পাঁচ দিনের মাথায় খয়েরী রঙের অন্যটা। সদ্য কালোটা মারা গেছে বলে ওকে খুব যত্ন করা হচ্ছিল, কিন্তু এটা একটু দুর্বল আর ক্রিমিগ্রস্ত ছিল মনেহয়। এ মারা গেল রাতের দিকে। প্রচন্ড কষ্ট হয়েছিল। একে প্রথমদিকে অত ভালবাসি নি। কিন্তু মারা যেতে এর জন্যই বোধহয় বেশি কাঁদলাম!

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই শুনলাম আসাম মোড়ের বাড়িতে একটা কুকুর আনা হয়েছে। আসাম মোড়ে আমাদের বাড়ির পাশে একটা ছেলে থাকত, একটু বেশি মাত্রায় হিরোগিরি করত, তবে পাড়ার মধ্যে নয়! সারাদিন খুব জোরে ইংলিশ গান শুনত। জ্যাঠিমা আবার লতার ভক্ত ছিলেন। জ্যাঠিমা একটু সফিসটিকেটেড ছিলেন।
তো, ছেলেটির কুকুর পোষার মনে হয় সখ ছিল। পরেও দেখেছি খুব সুন্দর দামী দামী কুকুর এনেছে। তুলিকে যেন আমি এখনো দেখতে পাই। গোল সাদা তুলোর বল! মেয়ে কুকুর, খুব আদিখ্যেতাও হত। কিন্তু বড় হতে সেটার লোম কেন যানি উঠে গেল! একটু ঘা মতও হল। প্রথমে ওকে ওরা বাড়ি থেকে বার করে দিল। আমি তুলিকে রুটি নিয়ে কত ডাকলাম! এলো না। তারপর শুনলাম ওদের ভাড়াটে নাকি দড়ি বেঁধে অনেকদুর ছেরে এসেছে!

এই ছেলেটি হোলিচাইল্ডের কোন নানের কাছ থেকে ছোট্ট ভুলোকে কোলে করে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। দেশি কুকুর বলে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। ছেলেটি মুখ চুন করে বাইরে বসেছিল। তখন ভুলোকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে নেওয়া হল।

ভুলোর প্রথমদিনের কথা আমার এখনও মনে আছে। আসাম মোড়ের বাড়ি গেছি। পেছনে তখন বোধ হয় মুরগীর পোলট্রি। একটা যায়গায় পাটকাঠি দিয়ে কোন কারণে ঘেরা। তার মধ্যে একটা খয়রী ছোট্ট কুকুর। কিন্তু খুব তার রাগ! ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দিয়ে পাটকাঠি ভাঙ্গার চেষ্টা করছে, আর উল্টে উল্টে পরছে। দেখে হাসি পেল। কিন্তু তবু পাত্তা দিইনি। কারণ তখনো সেই ওই দুটোর শোক হয়ত ছিল। তারপর মাঝে মাঝে ভুলোকে শিল্পসমিতির বাড়িতেও আনা হত। শুভদেরও তার কিছু আগে একটা কালো দেশি মেয়ে কুকুর এনেছে। ভুলো এলে ওরা খেলতো। তাই দেখে পাড়ার আরেকটা ছোট ছেলে তাদের বাড়ির পেল্লাই একটা কুকুর নিয়ে আসত। বাড়ির পিছনে উঠোনে ওরা খেলত। এই করে করে ভুলোর সাথে বন্ধুত্ব হল। তখন ভুলো আমায় তেলও মারত। পেছন পেছন লেজ নেরে নেরে খুব ঘুরত। যানত না পরে কি কপালে আছে।

এরপর বাপ্পা হোস্টেল গেল আর আমরা আসাম মোড়ের বাড়িতে চলে এলাম। তখন থেকে ভুলো হল আমার বন্ধু। আমরা যা খেতাম, ও-ও তাই খেত। মুখের খুব টেস্ট হল। একটু এদিক ওদিক হলে খেত না। আমি খাবার নিয়ে ওর সাথে ঘুরতাম। ও দৌড়াত। আবার ভাল খাবার হলে পেট ঠুঁসে খেত। আমার খুব মনে আছে একটু বড় হয়েছে ভুলো। আমি মজা করে এই বড় বড় সাইজের ভাতের গোল্লা পাকাতাম। ওর মনের মত হলে ও অমন তিনখানা গোল্লা খেয়ে নিত। তারপর পেটের দু’দিকটা অদ্ভূত রকম ফুলিয়ে তিনি টুক টুক করে বাগানে নেমে যেতেন!

তখনও ভুলোর এক বছর হয় নি! আমাদের আসাম মোড়ের বাড়ির চারপাশে ঝোপঝার ছিল। খুব বড় বড় মেঠো ইদুর, ছুঁচো, এমনকি ঢোরা সাপ, ব্যাঙ সব চলে আসত। ভুলো তাদের শাসন করত। একদিন একটা ছুঁচো দিল মুখের সামনেটা কামড়ে! ভুলোর মুখটা ভামের মত ফুলে গেল। নেতিয়ে পরল! এমনিতেই সব সময় ওর হাত–পা কাটত। সারা জীবন খুব ভুগেছে!
তো, সেবার সবাই ধরেই নিলাম ভুলো মারা যাবে। পাঁচ-ছয়দিন ওমন মুখ ফোলা, নেতিয়ে পরে ছিল। একটা বেতের চেয়ারে বিছানা করে শোয়ান হল। পাউরুটিকে জলে ভিজিয়ে ছোট্ট হোমিওপাতিকের গুলির মত খাওয়াতাম। হাঁ করতে পারত না। ড্রপারে জল খেত। কিন্তু ভুলো সেবার বেঁচে গেল। ভুলো পনেরো বছর আমাদের সাথে ছিল।

এসময় হোলিচাইল্ড স্কুলের উল্টোদিকে একদম ভুলোর মত দেখতে কিন্তু একটু বড় একটা মেয়ে কুকুর পাঁচটা ছানা দিল। খুব সুন্দর দেখতে তাদের! সব ক’টা কালো। ক’টাকে লোকে নিয়ে গেল। শেষে দু’টি রইল। মা-কুকুরটা আমরা বেরলেই পেছন পেছন নেজ নেরে আসত। তো, ওকে আমরা খেতে দিতাম। যে দু’টো রইল তারা একটু চলার মত হতেই মাটা দুই সন্তানকে নিয়ে আমাদের বাড়ির গেটে চলে আসত ঠিক ভুলোর খাবার সময়গুলো। ভুলোর থালায় যা থাকত গেটের তলা দিয়ে চালান করে দিতাম।
বাচ্চাগুলো একটু বড় হতে মাটা আর আসত না। তখন দু’টির মধ্যে যেটি একটু বড় সে প্রায় সব খেয়ে নিত। আর অন্যটা ভেবলার মত দুরে বসে থাকত। ধিরে ধিরে ভ্যাবলাটার জন্য মায়া হতে লাগল। বড়টাকে সরিয়ে দিতাম। আস্তে আস্তে সেই ভেবলা, ওরফে আমার কালু বেশ গুন্ডা হয়ে গেল। আর বড়টাকে খেতেই দিত না। সেটা ওরই দিদি ছিল। আমাকেও বেশ ভয় পেতে লাগল। শেষে আর আসত না। কেমন যেন খারাপ লাগত। পরে দুরে দুরে অনেকবার দেখেছি। মুখটা দুঃখি দুঃখি লাগল। আলাদা মাঝে মাঝে খাওয়াতামও! শেষে বেশ বড় হল। দু’একবার বাচ্চাও হল। তারপর আর দেখতাম না। খোঁজ নিয়ে যানলাম গাড়ি এ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। তারপর থেকে কালু বিশেষ ধরনের কিছু গাড়ি রাস্তায় দেখলেই চ্যাঁচামেচি করে তাড়া করত।

এবার আমার কালুর কথা বলি। খুব দুষ্টূ! সব সময় মনের ভেতর কি যে আনন্দ নিয়ে ঘুরত! আমাদের দেখলেই এমন জোরে জোরে লেজ নেরে চারপাশে ঘুরবে যে পা-ই নারতে পারবেনা! পাপা ভোরে বা রাতের দিকে পায়েচারি করতে বেরলে, সামনে সামনে কালু ঘাড় উঁচু করে হাটত। কি ডাঁট! কোন মেয়ে কুকুরের দিকেও তাকাত না। হাঃ...হাঃ!


(বাপ্পা আর কালু খেলছে......ছবিটা ঠিক ভাবে তোলা যায়নি...কালু খুব নড়ছিল)

কালুর গা-টা ছিল চকচকে কালো। মনে হবে কেউ যেন বার্নিস করে দিয়েছে! কালু-ভুলো সব ওদিকের কুকুরেরই লেজ বেশ থোপা-থোপা আর লোম এখানকার দেশি কুকুরের তুলনায় বেশ বড় বড়। কালুর মুখের সামনেটা আবার সাদা। কান দুটো ছিল লটকানো মত। চারপায়ে যেন কেউ সাদা মোজা পরিয়ে দিয়েছে। আর লেজের শেষ দিকটাও অনেকটা দুধ সাদা। এক কথায় আমার কালু ছিল পাড়ার ডন-হিরো! আবার কপালে এই বড় সাদা তিলকও ছিল! এটা একটু ভুলোরও ছিল। তাই-ই পাপা ভুলোকে আদিখ্যেতা করে রাজপুত্র ডাকত!

কালু যখন বেশ ছোট, মার পিছে পিছে ঘোরে তখন পাপাকে অনেক বলে–ক’য়ে কালুকে গেটের এপারে নিয়ে এলাম। ভুলো খুব রাগ দেখালো। ওকে অন্য ঘরে আটকে রাখলাম। কালুর গায়ে ওসুধ দিলাম। চান করানো হল। পেট ভরে মাংস-ভাতও খেল। প্রথমদিন প্রচন্ড আনন্দে আমাদের সারা বাড়ি নেচে বেরাল। তারপরদিনই কি একটা পরাধিনতার গন্ধ হয়ত পেল। বড় গেটের ওপারে মাকে দেখে ঘাবড়ে থুম মেরে বসে রইল। মাও একটু কুই-কুই করল। সেদিন কালু বুঝল ও আর ওপারে যেতে পারবে না। মনমরা রইল। আমারও কেমন যেন লাগল। বিকেলে মাটা আবার এলো কালুকে আমি গেটের বাইরে ছেরে দিলাম। পাশেই বড় মাঠ। মা-আর ছেলে দৌড়ে সেখানে চলে গেল। আর কি আনন্দে নাচা-নাচি! হুটো-পুটি! এই হল বন্ধন মুক্তি! মা-ছেলের আনন্দ দেখে আমার ও খুব ভাল লাগল।
ওই মাঠটাতে লোকে গরু-ছাগল বেঁধে চরাতে রেখে যেত। কালু তাদের সাথেও খেলত। যারা খেলতে চাইত না, তাদের পায়ে কুট-কুট করে কামড়ে দিত।

তবে কালু ভুলোকে খুব সন্মান করত! ভুলোর সামনে কখন লেজ সোজা বা কান খাঁড়া করে আসত না। আমাদের তখন ছাদটা হয়েগেছে। তবে বরাবর নেড়া ছাদ ছিল। প্রথমেতো ভুলোকে ঠেলে ঠেলে ছাদে ওঠানো হল! তারপর সেটাই হল তার রাজত্ব। সামনে দিকে একটু নিচু কার্নিসে তিনি হেলান দিয়ে বসে পুর রাজত্ব চালাতেন। ওখানে সব একতলা বাড়ি। পাশাপাশি মাত্র দুটো বাড়ি। তার পাশেই বড় মাঠ। বাড়ির সামনে দিয়ে চওড়া রাস্তাটা চলে গেছে। ওদিকে খুব বেশি লোকজন যাতাযাত করত না। সারাদিন ছাদে বসে কালুকে নইলে পাশের বাড়ির কুকুরটাকে, নাহয় পাশের মাঠের জীবজন্তুগুলোকে ধমকাতো। ও উপরে বসে নিচে মাটির সবাইকে বকত। পাশের বাড়িগুলোর ছাদে কেউ উঠত না। আমাদের বাড়ি লোকে চিনতো অ্যালসেসিয়ানদের বাড়ি নামে। আমার বন্ধুরাও ভুলোকে অ্যালসেসিয়ান ভাবত। খুব গাট্টা-গোট্টা ছিল। আর মুখটা অসম্ভব গম্ভীর, জ্ঞানী জ্ঞানী। সাকুল্যে একবারই কাজের মাসির পাগলী মেয়েকে ভাল রকম কামড়ায়, যখন সে নাচানাচি করছিল। ওঃ না! আর একজনকেও কামড়ায়, সে কথা পরে; সে কথা তেমন কেউ যানে না আমি আর পাপা ছারা।

ভুলো সারা বাড়ি পাহারা দিত। আর আমার সারাদিনের যেহেতু সঙ্গী! তাই আমি ওকে প্রচুর ব্যায়াম করাতাম। ধর একটা মাংসের হাড় মাটিতে শক্ত করে পুঁতে দিলাম। ভুলো পুর বাগান খুঁড়ে দিত সেটার জন্য। আমার তাতে বেশ লাভ হত। বাপ্পা এলে হাত উচূ করে দাড়াত আর ও অনেক দূর থেকে প্রচন্ড বেগে দৌড়ে এসে হাতটা ডেঙাতো। বাপ্পার কিছু কিছু খেলা দেখে আমার ভয় লাগল। কিন্তু ভুলো সে সব খেলতে আবার খুব ভালবাসতো। যেমন একটা খুব মোটা শক্ত দড়ির সামনে বড় গিট বেধে তাতে মাংস বা হাড় আটকে দিল। ভুলো সেটা ঝাঁপিয়ে পরে নিত। বাপ্পা তখন দড়িটাকে বনবন করে ঘোরাত। বলতে নেই ভুলোটা বেশ ভারি ছিল। শেষ দিকে যদিও একটু রোগা হয়ে গেছিল।

কিছুতেই চান করতে চাইত না। ওকে চান করান একটা যুদ্ধ ছিল। একবার টিউবকলে বেঁধে বাপ্পা চান করাতে গেল। আমি যখন ব্যাপারটা দেখতে গেলাম, তখন দুজনেই কাদা মেখে হাফাচ্ছে। বাপ্পারও জ়েদ চেপে গেল চান আজ ওকে করিয়েই ছারবে! সেই করতে গিয়ে হাত-পা ছরে একেক্কার কান্ড। আমি তাই কখনও ভুলোকে অন্য কারোর হাতে ছারতাম না। চানের সময় ভুলো আমায় খুব ভয় পেত। আমিও মনে মনে ওকে ভয় পেতাম, কিন্তু বুঝতে দিতাম না। খুব চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বকেই যেতাম। ও কান পেছনে করে ভয়ে কাঠ হয়ে বসে থাকত। বুড়ো হওয়ার পর মাঝে মাঝে গড়গড় করত।

ভুলোকে ভ্যাক্সিনের জন্য প্রতি বছর টাউনে পশুহাসপাতালে রিক্সায় করে নিয়ে যেতাম। ওর একটা মোটা প্রেসকিপসনের ফোলডারই হয়ে গেছিল। সারা বছর কিছু না কিছু হতেই থাকত। ডাক্তার টনিক ট্যাবলেট সব লিখে দিত। আমিও সব খাওয়াতাম। শেষে একজন মনেহয় ডাক্তার নয়, আমাদের বাড়ি এলো। দেখে-শুনে বল্ল সব ডাক্তার ওর উপর এক্সপেরিমেন্ট করে গেছে। আসলে ভুলোর ক্রীমির লক্ষণ ছিল। উনি বল্লেন বাড়িতে শিউলি, নিম গাছ আছে তার পাতা বেটে খাওয়াতে। একদিন ছেড়ে ছেড়ে ওকে তাই খাওয়াতাম। সব কিছু একটু টেস্ট করে খাওয়ান আমার স্বভাব। একদিন নিমপাতা বাটা একটু খেয়েই আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরনোর জোগার। আহা ব্যাচারা ভুলো কিন্তু সব খেত, মানে খেতে বাধ্য করতাম।

জলপাইগুড়িতে কালীপূজোয় আমরা সোয়েটার পড়ে ঠাকুর দেখতে যেতাম। ঠান্ডা ওখানে তা’তাড়ি পরে যেত। তার উপর আসাম মোড়টা লোকবসতিপূর্ণ না হওয়ায় ঠান্ডা আরো জেঁকে পড়ত। একদিন দেখি বাপ্পা খুব জোরে সাইকেল চালিয়ে এসেই কিছু না বলে পাই পাই করে ছাদে দৌড়েছে। ‘কি হল, কি হল’ করে পেছন পেছন যেতেই দেখি ভুলোকে পাঁজাকোলা করে সিড়ি দিয়ে নেমে আসছে। সকালে রোদ উঠলে ভুলো উপরে চলে যেত। আমরা দিনে উপরে তেমন যেতামই না। তো, এত ঠান্ডা পরেছে! ভুলো বোধহয় কার্নিসে দাড়িয়ে টলছিল। বাপ্পা দুর থেকে দেখে দৌড়ে এসে নামালো। নইলে নিচে পরে সেদিনই ভুলো শেষ হয়ে যেত।
আমরা যেখানে থাকতাম সেখানে কিছুই তেমন পাওয়া যেতনা। টাউনে আসতে হত। কি করা যায়! ভুলোর দাঁতে দাঁতে লেগে গেছে! বাপ্পা একজন মানুষের ডাক্তারকেই ধরে আনল। তিনি কিন্তু ভাল ছিলেন। এসে ওকে দেখেই গরম দুধ খাওয়াতে বল্লেন। দু’তিনটে কম্বল চাপানো হল। উনি কি একটা ইঞ্জেকসনও ভুলোকে দিয়ে দিলেন। এখন ভেবে একটু অবাক হচ্ছি।
ভুলো কিন্তু খুব ঠান্ডায় আমাদের সোয়েটার পরেই ঘুরে বেরাত! শোয়ার জন্য বিভিন্ন যায়গায় গদি, বিছানা করে রাখলেও পছন্দ ছিল আমার, নয়ত বাপ্পার খাট। বাপ্পার খাট ঘাটা থাকত। তাই আমার ঘরে নিজেই খাটে উঠে শুয়ে থাকত। পাপা দেখলে বকতো তাতে একটু বিরক্ত হয়ে নেমে আসত।

যখন আমি গলা সাধতাম, তখন ভুলো অনেক ধৈর্য নিয়ে চুপ করে বসে তা শুনতো। ভুলোর আনন্দ হলে আবার মাঝে মাঝে আমার সাথে গলা মেলাবার চেষ্টাও করত। কিন্তু আমি আবার তা সহ্য করতাম না! হাঃ...হাঃ!

পাপা অফিস থেকে এলে ঢাউস কালো ছাতাটা ভুলো মুখে করে বেঁকে বেঁকে দৌড়ে ঘরে নিয়ে যেত। সকালের কাগজ কোন ভাবে ওর নাগালে এলে কুটি কুটি করে ছারত। চা খাওয়ার সময় বিস্কুটের জন্য হেঙ্গলামো করত। এটা এখন আমার পেঁচি মানে কোকিলা-সুন্দরী করেন। মাসি বিকেলে চা বল্লেই ইনি ক্যা-ক্যা করে দু’ডানা থরথর করে আদিখ্যেতের ডাক ডাকবেন!

মাধ্যমিক পর্যন্ত ভুলো ছারা তেমন কোন বন্ধু ছিলনা, স্কুলে ছারা। ইলেভেন থেকে বাইরে টুকটাক যাওয়া শুরু করলাম। ভুলোকেও অত সময় দিতাম না। ওর নখ বারতে লাগল। এবার নখ কাটার লোক আসত। সেদিনগুলো খুব ভয়ের ছিল। প্রতিবার খুব ব্লিডিং হত। কিন্তু কলকাতায় দেখেছি অন্য ধরনের কাঁচি ব্যাবহার করে ওতে অত ব্লিডিং হতনা।

আমরা যখন কলকাতায় আসবো তখন ভুলোকে কি করে আনা হবে তাই নিয়ে বড় বড় মিটিং হয়ে যেত। শেষে পাপা বড় পাঞ্জাবী ট্রাকে দু’জন সিকিউরিটির সাথে ভুলোকে কলকাতায় পাঠালো, যদিও সঙ্গে কিছু মালপত্রও ছিল।

কলকাতায় ওর জন্য একটা ছোট বাগান মত করা হয়। সেখানে ও টয়লেট করত। কখনও ঘরে করত না। শেষদিকে যখন আর দাঁড়ানোরও ক্ষমতা নেই তখনও বাগানে আসা চাই! আমি কোলে করে এনে ধরে থাকতাম।
ভুলো দেখতে রাগী হলেও খুব শান্ত প্রকৃতির ছিল। আমাদের জলপাইগুড়ির বাড়িতে সব সময় অনেক কাজের লোক থাকত। কে পেছনে কি করছে দেখা সম্ভব ছিল না। তবে জীবজন্তু হয়ত সব মনে রাখে। একটা ছেলেকে পাপা সিউড়ি থেকে এনেছিল। খুব চুপচাপ থাকত কিন্তু ভুলোর উপর একটু অত্যাচার করত। পাপা প্রথম দেখেই বারন করে, কিন্তু ছেলেটা কি করত কে যানে! ওকে দেখলেই ভুলো অদ্ভূত অন্য রকম গর্জাত। আমরা দু’জনকেই বকতাম। এবার ছেলেটা পাপার সাথে সিউড়ি চলে যাবে। আমারা খাওয়া দাওয়া করে রাতে বারান্দায় বসে কথা বলছি। মাটিতে ভুলো আর কিছু দুরে ছেলেটা বসে। আচমকা লোডসেডিং হল। তার ভেতরই কথা চলছে হঠাৎ ভুলো কোকিয়ে উঠে গর্জে ছেলেটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ছেলেটাও অসম্ভব সাহসী চুপ করে বসে রইল। পরে দেখা গেল মাথাটা খুবলে খুবলে কামড়েছে। দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে গেছিল। এরপরে আর কোনদিন ভুলোরর ওই রূপ দেখা যায়নি।

কলকাতায় আসার পর সবাই একবার পুরী যাবো ঠিক হল। ভুলোকে বেহালার একটা ক্রেসে রাখা হল। খুব ভাল সব ব্যাবস্থা! কিন্তু এসে শুনলাম খুব রাগ দেখাত। আর থালাটাও কামড়ে বারটা বাজিয়ে দিয়েছে। তারপর আর ওকে রেখে সবাই কখনও কোথাও যাইনি।

আমাকেও একবার কুকুরে কামড়ায় এখনও হাতে ন’টা দাগের হালকা চিহ্ন আছে। তবে ভুলো নয়, এটা জিমির স্মৃতি। আমরা খুব ছোট থেকে কলকাতার বাড়িতে ওকে দেখছি। চাচা ওকে দেখভাল করত। চাচা আমাদের বাড়ি কাজ করত। অদ্ভূত লোক ছিল! জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব করত। চাচার ছবি দেব। চাচা একবার দাদুর মারের হাত থেকে আমায় বাঁচায়। জিমি সিড়িতে এমনি শুত। সবার খাওয়ার পর এটোকাটা খেত। ঘরে ঢুকত না। দাদুর তৈরী কুকুর। আমরা ছোটতে প্রতি বছর কলকাতা ঘুরতে আসতাম। তখন ক’বছর আসা হয়নি। আর জলপাইগুড়িতে ভুলোর সাথে থেকে থেকে আমার ধারণা হয় ওদের হাতে করে খাওয়াতে হয়। কারন কালুও কোনদিন আমায় কামড়ায়নি। তো আমরা পরদিন ভোরের ট্রেনে জলপাইগুড়ি ফিরবো। দিদা রাতে খাওয়া হয়ে যেতে দুটো রুটি দিয়ে বল্লো জিমিকে দিয়ে দিতে। শুধু রূটি! আমার কষ্ট হল। তবু তাই নিয়ে সিড়ির কাছে গিয়ে ওকে ডাকলাম। জিমি তখন খুব বুড়িও হয়েগেছে। চোখ ঘোলাটে, পায়ে বড় বড় নখ নিয়ে খুট খুট করে হাটে! মায়া হল রুটি ছিরে হাতে করে খাওয়াতে গেলাম। জিমি উল্টো বুঝল। কোনদিন ওভাবে হয়ত কেউ খাওয়ায় নি! আমার হাতেই কামড় বসালো। দেখে দাদুই প্রথম কাগজ পাকিয়ে জিমিকে তেরে গেল। আমিই বারণ করলাম। কারণ দোষটা আমার ছিল। জিমি ততক্ষনে ভয়ে জড়সড় হয়ে সিড়িতে বসে। আমার হাত দিয়ে দরদর করে রক্ত পরছে। তখন পূজোর সময়। কিছু করা গেলনা। ভোরে ট্রেনে উঠে রাতে শিলিগূড়ি পৌছলাম। সেদিন বোধহয় অস্টমী ছিল। জলপাইগুড়ি ফেরার গাড়িও পেলাম না। একটা হোটেলে যে করে হোক কাটান হল। হাত রুমালে বাঁধা, ফুলে ঢোল। পাপাকে এমনিই দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছিল, ব্যাথার কথা বলে আর টেনসনে ফেললাম না। পরদিন বিকেলে জলপাইগুড়ি পৌছে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হল। চব্বিশ ঘন্টা হয়েগেছে বলে উনি খুব রাগ করলেন। কিন্তু জিমি তারপরও অনেক দিন ছিল।

দাদু জিমিকে কাগজ পাকিয়ে ভয় দেখাত। একবার মনে আছে দাদু জলপাইগুড়ি গেছে। দাদু বেশ রাগী আর গম্ভীর প্রকৃতির রাশভারী মানুষ ছিলেন। তো, ভুলো তখন যা পাচ্ছে তাই চেবাচ্ছে। এঘর-ওঘর লন্ডভন্ড করছে। দিদা একদিন জিমির মত খেতে দিল, শুঁকেও দেখল না। দাদু ওর উপর খুব রেগে গেল! কাগজ পাকিয়ে বকতে গেল, ভুলো ভাবলো দাদু বুঝি ধরাধরি খেলতে চাইছে। দাদুও শাসন করবেই! এবার ভুলো এঘর–ওঘর ছোটে, দাদুও পিছন পিছন যায়। আমিতো দাদুকে খুব ভয় পেতাম! ভুলোর কান্ড দেখে থ! দাদুও বুঝল এ জিমি নয়! হুম্‌! করে গিয়ে বারান্দার ইজিচেইয়ারে গা এলিয়ে দিল। ভুলোও লক্ষী ছেলের মত দাদুরই পায়ের কাছে শুয়ে পরল। দাদু শুধু একবার আড়চোখে ওকে দেখে নিল।

এখানে আসার পর প্রতিদিনই প্রায় চারতলায় ছাদে ঘুরতে নিয়ে যেতাম। এখানেও একদিন সদর দরজা খোলা পেয়ে কাট্টি মারেন। আমি ভাবছি কোথায় খুঁজবো! চারদিকেই পথ! ওমা! উনি নিজেই দেখি গুটি গুটি ফিরছেন!

শেষের দিকে বাপ্পা কোলে করে ছাদে দিয়ে আসত। কেমন উদাস হয়ে গেছিল। একদিন খুড়তুতো বোন দেখে খাটে পাশে হেলান দিয়ে ভুলো শুয়ে, একদম পাশেই কয়েল জ্বলছে, ডেকে দিল আড়চোখে ব্যাপারটা দেখেও সরল না। আমি এসে সরিয়ে দিলাম।

শেষ দিনগুলোর কথাও মনে আছে। শেষে আর মাথাও তুলতে পারে না। খাইয়ে দিলে খায়। দুদিন কিচ্ছু খেল না। মাথার কাছে বসে থাকতাম। একদিন একটা ডেয়ো পিঁপড়ে দেখি চোখের পাতায় বসে। আস্তে করে ছারিয়ে দিলাম। অদ্ভূত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। খুব কষ্ট হত। আমি না থাকলে কুই কুই করে কেঁদেই যেত। বাপ্পা আমাকে বেরতে বারণ করল।

শেষে একদিন সকালের দিকে ভুলো চলে গেল। আমাদের কত্তদিনের সঙ্গী! তখন পাপা অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। পাপা বেরিয়ে গেল। প্রায় দু’ঘণ্টা পর একটা পশু-সমাধিক্ষেত্রের গাড়ি, ফুলের রিং এসব নিয়ে এলো। পাপা অল্পতেই একটু নার্ভাস হয়ে যেত। কিন্তু পাপা সেদিন খুব শান্ত ভাবে সব পরপর করে গেল। আমি যে কি কৃতজ্ঞ সে দিনটার জন্য!
তার ক’দিন আগেই কাকুদের সাদা কুকুরটা মারা গেল হঠাৎ। বোনকে আর পাওয়া যায় না! বন্ধুদের বাড়ি খোঁজ খোঁজ! কাকু কুকুরটাকে একজন রিক্সাওলাকে দিয়ে কোথায় পাঠিয়ে দিল। পিসিরাও তাই করে।
পাপা! আমার পাপা! পাপা যানত ভুলো আমাদের পরিবারেরই সদস্য। পনেরো বছর! আমার জীবনের খুব খুব সুন্দর অনেকগুলো সময়ের স্মৃতিতে ভুলো-কালু জ্বলজ্বল করে। পাপা-আমি সেই ছোট্ট গাড়িতে করে শহর ছারিয়ে অনেক দূরে ভুলোকে রাখতে গেলাম।

যেখানে গেলাম সেখানে গিয়ে মনটা শান্ত হল। চার দিকে কত্ত কুকুর, কত্ত বেড়াল! যদিও বিড়ালগুলো বিশাল জালে ঘেরা স্থানে ছিল। একটা বুড়ো, অন্ধ বিশাল বাঁদর, পাখি -কতকিছু ছিল সেখানে। পাপা অফিসে কাজ করছিল। আমায় ঘিরে দশ-কুড়িটা কুকুর বসে-দাড়িয়ে যেন সঙ্গ দিচ্ছিল। বেশ খানিক্ষণ থাকতে হয়েছিল। ওদের সবার জন্য রান্না হচ্ছে দেখতে গেলাম।

তারপর পাপা ডাকল। সকাল থেকে আমি একটুও কাঁদিনি, কারণ ভুলো শান্তি পেল যানতাম। আমার ভাই-বোনরা আমায় দেখে অবাক হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে যখন অনুভব করলাম আর কোনদিন ভুলোকে দেখতে পাব না, তখন হয়ত ভেঙ্গে পরি। পাপা তুলে আনল। আমরা ফিরলাম। কতো কষ্ট করে ফিরলাম। একটূ জায়গায় তিনজন মানুষ(ড্রাইভার নিয়ে) প্রায় চারঘণ্টা ঠায় বসে! পাপার সব চেয়ে কষ্ট হয়েছিল। তখন বুঝলাম পাপা আসলে কে! পাপা আমায় কি ভাবে চেনে! সেদিন পাপা ভুলোর জন্য আর আমার জন্যেও ওত কষ্ট করেছিল।

(পাপা আর ভুলো...রাতে তোলা)

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers