Blog Archive

Sunday, July 11, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১১


পরীক্ষিতের ব্রহ্মশাপঃ
এরপর সৌতি বললেন- অনেক বছর পর পান্ডু বংশে পরীক্ষিত নামে রাজা জন্মালেন। যিনি মহা পূণ্যবান এবং যার সূর্যের মত প্রতাপ। কৃপাচার্যের শিক্ষায় তিনি সকল শাস্ত্র আয়ত্ত করেন।


সর্বগুণ যুক্ত রাজা ছিলেন সত্যব্রত। অনেকদিন ধরে তিনি বনে বনে মৃগয়া করছিলেন। একদিন এক হরিণকে বাণ মারলেন। হরিণটি পালিয়ে গেল, রাজা তার পিছু নিলেন। পরীক্ষিতের বাণে কেউ বাঁচে না, তবু দৈবের বলে হরিণটি হারিয়ে গেল।

রাজা বনের অনেক গভীরে ঢুকে পড়লেন। তার প্রচন্ড জল তেষ্টা পেল। শেষে তিনি এক গোচারণভূমিতে উপস্থিত হলেন এবং দেখলেন বাছুররা দুধ পান করছে। আর তাদের মুখ থেকে যে ফেনা বের হচ্ছে তা পান করছেন একজন ঋষি।

ঋষিকে দেখে রাজা কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কোন বাণবিদ্ধ মৃগ দেখেছেন কিনা। তিনি নিজের পরিচয়ও দিলেন এবং ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা বললেন। মৌণ ঋষি কোন উত্তর দিলেন না। রাজা তবু বারবার হরিণটি কোন পথে গেছে তা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।


রাজা জানতেন না ঋষি মৌনব্রত করছেন, ফলে উত্তর না পেয়ে তিনি রেগে গেলেন। একে তিনি রাজা, তার উপর অতিথি! রাজা ঋষিকে দুষ্ট প্রতিপন্ন করলেন এবং রেগে একটি মৃত সাপ ধনুকের সামনে দিয়ে তুলে ঋষির গলায় পরিয়ে দিলেন। শেষে রাজা ঘোড়ায় চেপে হস্তিনানগরে ফিরে গেলেন।

ঋষির এক ব্রাহ্মণ পুত্র ছিলো, তাঁর নাম শৃঙ্গী। তার বন্ধু কৃশ তাকে বললো -তুমি কিসের গর্ব কর! বনে গিয়ে দেখ রাজা তোমার পিতার সাথে কি ব্যবহার করেছেন!

বনে এসে শৃঙ্গী দেখে বাবার গলায় মৃত সাপের মালা। এই দেখে সে রেগে গেল এবং হাতে জল নিয়ে রাজাকে শাপ দিল –আজ থেকে সাতদিনের মধ্যে রাজা পরীক্ষিত তক্ষক সাপের কামড়ে মারা যাবে।

পুত্রের এই শাপ শুনে ঋষির মনে দুঃখ হল। মৌনভঙ্গের পর তিনি অনুতাপ করতে লাগলেন। সন্তানকে রাগের মাথায় শাপ দেওয়ার জন্য শাসন করলেন।

তিনি বললেন -রাজাকে শাপ দেওয়া অনুচিত। তিনি প্রজাপালন করেন। তিনি ব্রাহ্মণদের যজ্ঞে সাহায্য করেন। দুষ্ট, দৈত্য, চোর ও ভয় দুর হয় রাজার হস্তক্ষেপে। রাজ্য রক্ষার জন্যই বিধাতা রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। রাজা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ অর্থাৎ শ্রোত্রিয়, তাকে শাপ দেওয়া পাপ।
তাছাড়া পরীক্ষিত অন্য রাজাদের মত নন। তিনি পিতামহের মতনই স্বধর্মে পন্ডিত। আমি মৌনব্রতে আছি তা রাজা জানতেন না। সে সময় তিনি ক্ষুধার্তও ছিলেন, তাই ভুল করে ফেলেছেন। তাছাড়া তিনি আমাদের অতিথি। আমিই অতিথিসেবা করিনি। এই বলে তিনি হাহাকার করতে লাগলেন এবং পুত্রকে দুঃখ ভুলে ক্ষমা করে দিতে বললেন।

এত শুনে শৃঙ্গী বললেন –আমার কথা সহজ়ে খন্ডন হবে না। যা বলে ফেলেছি তা ফলবেই।

এত শুনে ঋষি চিন্তিত হলেন এবং যখন বুঝলেন অভিশাপ আর খন্ডিত হবে না, তখন তার শিষ্য গৌরমুখকে রাজার কাছে সব জানিয়ে আসতে বললেন।

হস্তিনাপুরে গৌরমুখ পরীক্ষিতের সাথে দেখা করতে গেলেন। রাজা তার পা ধুইয়ে দিলেন। তারপর কোথা থেকে, কি কারণে এসেছেন জানতে চাইলেন।

গৌরমুখ বললেন –রাজা মন দিয়ে শুন। মৃগয়া করতে তুমি বনে গেছিলে এবং এক ঋষির গলায় মৃত সাপ জড়িয়ে এলে। তা দেখে তার পুত্র ক্রোধিত হয় এবং তোমায় শাপ দেয়। তার পিতা তখন তা জানতেন না। পরে সব শুনে খুবই দুঃখিত হন এবং আমায় তোমার কাছে পাঠান। পুত্রকে অনেক বুঝিয়েও তিনি শাপমোচন করতে পারেন নি। সাতদিনের মধ্যেই তোমার তক্ষকের কামড়ে মৃত্যু হবে। এর একটা উপায় এখন থেকেই কর।

সব শুনে রাজা বজ্রাহত হলেন এবং নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন –হিংসা করে আমি কি পাপই না করলাম! মৃত্যুর চিন্তা আমি আর করি না। সেই ঋষি ও তার পুত্রকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। তিনি যে মৌনব্রতে ছিলেন তা আমি জানতাম না। তবে যে শাস্তি আমার হল তা আমি নেব। আপনি ঋষিকে আমার প্রণাম জানাবেন। দৈবের বাক্য খন্ডন করা সম্ভব নয়। এত সব বলে গৌরমুখকে তিনি বিদায় সম্ভাষণ জানালেন।

সব মন্ত্রীরা এসে সব শুনে আলোচনা শুরু করলো। কি উপায়ে তাদের রাজাকে বাঁচান যায়। তারা ঠিক করলেন একটি উঁচু মঞ্চে করা যাক। সেখানে রাজাকে ঘিরে সব মন্ত্রীরা পাহারায় বসবেন। সাপ থেকে তাকে দুরে রাখার চেষ্টা হল। বেদজ্ঞ পন্ডিতদের এনে রাজা তার চারদিকে রাখলেন এবং দানধ্যান করে ও হরির নামগান শুনতে লাগলেন।

তক্ষকনাগ
..........................................

Wednesday, July 7, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত – ১০

নাগ-রাজার তপস্যা:

শেষনাগ, বাদামী গুহা, কর্ণাটক

এবার শৌনকাদি মুনিরা সৌতির কাছে কদ্রু এবং তাঁর এক সহস্র পুত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন।

সৌতি তখন বললেন –নাগেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ হলেন শেষনাগ। তারপর বাসুকি, ঐরাবত, তক্ষক, কর্কট, সিংহ-আঁখি, বামন, কলিয়, এলাপত্র, মহোদর, কুন্ডর, অনীল, নীল, বৃত্ত, অকর্কর, মনিনাগ, আপূরণ, আর্য্যক, উগ্রক, সুরামুখ, দধিমুখ, কলস, পোতক, কৌরব্য, কুটর, আপ্ত, কম্বল, তিত্তিরি-আরো অনেক!

সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জ্যেষ্ঠ শেষ বিষধর। তিনি জিতেন্দ্রিয়, সুপন্ডিত এবং ধর্মে তৎপর। ভাইদের অসৎ ব্যবহার এবং মায়ের অন্যায় শাপদানে ব্যথিত হয়ে সকলকে ত্যাগ করে তিনি নানা তীর্থে তপস্যা করতে গেলেন। হিমালয়ে আশ্রম করে শেষ সেখানে কঠিন তপস্যা করেন।

তার তপস্যায় প্রজাপতি তুষ্ট হলেন। ব্রহ্মা তাকে বর দিতে চাইলেন। শেষ তার দুঃখের কথা অর্থাৎ দুষ্ট ভাইদের কথা, সৎ ভাই গরুড়ের কথা, গরুড়ের বীরত্ব-সব জানিয়ে ব্রহ্মার কাছে এই বর প্রার্থনা করলেন যে দুষ্ট ভাইদের সংস্রবে যেন তাকে আসতে না হয় এবং তপস্যা করেই যেন তার প্রাণ যায়। ব্রহ্মা তাকে আশির্বাদ করলেন এবং পৃথিবী ধারণে অনুরোধ করলেন।

ব্রহ্মার আদেশে শেষনাগ পৃথিবীকে ধারণ করলেন এবং ব্রহ্মার সাহায্যেই তার গরুড়ের সাথে বন্ধুত্ব হল। ব্রহ্মার আজ্ঞায় শেষ পাতালে প্রবেশ করে পৃথিবীকে ধারণ করলেন। তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাকে নাগরাজ করলেন।

নাগলোক এবং দেবলোকে সকলে তাকে পূজা করতে লাগল। শেষে তিনি ব্রহ্মার আজ্ঞায় সব ভাইদের ত্যাগ করে পাতালেই অবস্থান করতে লাগলেন।

নাগ পঞ্চমীতে পূজিত নাগ দেবতারাঃ অনন্ত নাগ, শেষ নাগ, বাসুকি, পদ্মনাভ, শঙ্খপলা, কালিয়া, তক্ষক, কম্বাল এবং মহাপদ্ম

শেষ চলে যেতে বাসুকি চিন্তিত হলেন। মায়ের শাপে তিনিও দুঃখিত ছিলেন।
তিনি সব ভাইদের ডেকে বললেন –মায়ের শাপ থেকে নিষ্কৃতি নেই। পিতার শাপের প্রতিকার থাকলেও মায়ের শাপের হাত থেকে রক্ষা নেই। মা যখন রেগে শাপ দিলেন, পিতা এবং পিতামহও তাকে স্বীকার করলেন। জন্মেজয়ের যজ্ঞে অবশ্যই সবাই সংহার হবে। এখন থেকেই তার প্রতিকারের চেষ্টা করতে হবে।

এত কথা শুনে এক এক ভাই এক এক রকম পরামর্শ দিতে থাকল।

একজন বললে-আমি ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মেজয়ের কাছে যজ্ঞ ভিক্ষা চাইবো।

আর এক নাগ বললে-আমি রাজমন্ত্রী হয়ে রাজাকে যজ্ঞই করতে দেব না।

কেউ বা বললে-কে যজ্ঞ করবে! যজ্ঞের হোতাকেই মেরে ফেলবো।

কেউ বলে উঠল–সব ব্রাহ্মণদের খাব, তা হলে ব্রাহ্মণ ছাড়া আর যজ্ঞ হবে না।

কেউ আবার বললো-ব্রাহ্মণকে রাগিয়ে লাভ নেই। লোকে বিপদে পড়লে তাদের দান করে। তারা তুষ্ট থাকলে সবাই রক্ষা পায়।

কোন নাগ আবার বললো সে জলধর হয়ে যজ্ঞ নিভিয়ে দেবে।

কেউ বা বললো সব যজ্ঞের শষ্য চুরি করবে।

আবার কেউ পরামর্শ করলো-সব নাগ বেড়ার মত যজ্ঞস্থান ঘিরে রাখবে এবং যে কাছে আসবে তাকেই ভক্ষণ করবে। এতে রাজা ভয় পেয়ে যজ্ঞ বন্ধ করে দেবে।

কিন্তু বাসুকির এসবে মন ভরল না।
তিনি বললেন –দৈব শক্তি নিবারণ ক্ষমতা আমাদের নেই। অবশ্যই সাপের বংশ ধ্বংস হবে।

এলাপত্র নামে এক নাগ সব শুনে বললেন –মায়ের বচন কখনও লঙ্ঘণ করা যায় না। সব যুক্তিই অকারণ। মায়ের বচন আর দৈবের লিখন, খন্ডিত হয় না। যজ্ঞ অবশ্যই হবে। পান্ডুবংশে জন্মেজয়ের জন্ম হবে। তার যজ্ঞ বন্ধ করার শক্তি কারো নেই। একটাই উপায় আছে, সবাই ব্রহ্মার কথা মন দিয়ে শুন।

যখন মা সন্তানদের অভিশাপ দিলেন তখন দেবতারা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন মা কি তাঁর সন্তানদের এমন শাপ দিতে পারেন!

ব্রহ্মা তখন তাদের মন দিয়ে শুনতে বলেন। সর্পরা সকলের ক্ষতি করছে। তাদের শেষ না করলে বিষে সংসার ভরে যাবে। তবে যে নাগ ধর্মে অনুগত হবে, তারাই জন্মেজয়ের যজ্ঞে রক্ষা পারে। তার একটা উপায় আছে।

যখন দেবাসুর সমুদ্রমন্থন করলো, বাসুকি তখন মন্থন দড়ি হলেন। দেবতারা তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মাকে বললেন বাসুকি সমুদ্রমন্থনে সাহায্য করেছেন। মার ভয়ে বাসুকি ভীত তার এই ভয় যেন দুর হয়।
ব্রহ্মা বলেন বোন জরৎকারীর সন্তানই তাদের রক্ষা করবে।

মনসা/জরৎকারী ও পুত্র আস্তিক

যাযাবর বংশে জরৎকারু নামে এক জ্ঞানী জন্মগ্রহণ করবেন। তার বিবাহ হবে জরৎকারীর সাথে। জরৎকারী বাসুকী অর্থাৎ নাগেদের বোন। তার গর্ভে জন্মাবে আস্তিক নামে এক পুত্র। সেই আস্তিকই নাগদের রক্ষা করবে।
এই একমাত্র পথ। এছাড়া নাগেদের আর কোন পথ নেই। বোন জরৎকারীর বিবাহ যাযাবর জরৎকারুর সাথে দিলে তবেই সবাই নিস্তার পাবে।

এলাপত্রের একথা শ্রবণ করে সকলে সাধুবাদ দিতে লাগল।

সব শুনে বাসুকি আনন্দিত হলেন এবং জরৎকারুকে খোঁজার জন্য চর নিযুক্ত করলেন।
চরদের আদেশ দিলেন –তোমরা লুকিয়ে থাকবে এবং জরৎকারুকে দেখলেই আমাকে খবর দেবে।

এভাবে বাসুকি তার বোনকে জরৎকারুকে দান করতে প্রস্তুত হতে লাগলেন।
………………………

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers