Blog Archive

Sunday, July 25, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৪

আস্তীকের জন্মঃ

জরৎকারু পত্নীকে রেখে চলে গেলেন। জরৎকারী অশ্রুজলপূর্ণ চক্ষে, বুকে করাঘাত করতে করতে ভ্রাতৃগৃহে আশ্রয় নিলেন।

বোনকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসতে দেখে বাসুকি চমকে উঠলেন। মুখে কথা খুঁজে পেলেন না।

বাসুকি কান্নার কারণ জানতে চাইলে জরৎকারী বললেন –মুনি আমায় ছেড়ে বনে চলে গেছেন।


শুনে বাসুকি বিষণ্ণ হয়ে গেলেন। একে মায়ের শাপে সব সময় ভীত, তার উপর এই দূর্ঘটনা!
বোনকে বললেন –তোমায় জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা করছে। তবু তুমি দয়া করে বল, তোমার গর্ভে জরৎকারুর পুত্র এসেছে কিনা। তার কারণেই তোমায় চিরদিনের জন্য জরৎকারুকে দিলাম। এদিকে সন্তান এখনও হয়নি, অথচ মুনি চলে গেলেন। মাতৃশাপের কি হবে! লজ্জা করলেও আমরা সব ভাইরা চিন্তিত, সত্য কথা বল, বোন!

সলজ্জ ভাবে জরৎকারী জানালেন –তোমাদের দুঃখের সব কথাই জানি। মুনি চলে যাচ্ছেন দেখে আমি তার পায়ে পড়ি। তিনি ‘অস্তি, অস্তি’ বলে আমার গর্ভে আশির্বাদ করেন। এবং বলেন দুই কুলেরই সে রক্ষা করবে। এই বলে তিনি বনে যান। তোমরা চিন্তা ত্যাগ কর, মুনির বাক্য মিথ্যা হবে না।


জরৎকারীর কথা শুনে খুশিতে সব নাগ ভাইরা উৎসবে মেতে উঠল। আনন্দিত বাসুকি রাজা বোনকে পূজা করে, নানা অলঙ্কারে সাজালেন।

শেষে সব উৎসবের পর একান্তে বোনকে ডেকে কি কারণে মুনি ছেড়ে গেলেন জানতে চাইলেন। জরৎকারী সমস্ত ঘটনা দাদাকে বললেন। সব শুনে বাসুকি অবাক হলেন।
শেষে বললেন –ভালই হয়েছে ব্রাহ্মণ বনে গেছে। বোন তুমি দুঃখ করো না। এই গৃহ নিজের ভেবে সুখে থাক। তুমি আমার গৃহে দেবীর মত থাকবে। সহস্র ভ্রাতা এবং তাদের স্ত্রীরা তোমার সেবা করবে।

এই বলে বাসুকি সবাইকে ডেকে সে আদেশ দিয়ে সবাইকে তার সেবায় নিযুক্ত করলেন।
এভাবে জরৎকারী সব দুঃখ ভুলে ভাইদের সাথে থাকতে লাগলেন।


নির্দিষ্ট সময়ে কোল আলো করে তিনি একটি শিশুপুত্র জন্ম দিলেন। শিশুটি খুবই সুন্দর, পূর্ণ শশীর মত তার রূপ। সব নাগরা তাকে দেখে আনন্দিত হল। রূপে গুণে অনুপম শিশুটির নাম রাখা হল –আস্তীক। যেহেতু গৃহ ত্যাগের সময় পিতা এ কথাই উচ্চারণ করেন, তাই এই নামকরণ।

শৈশব থেকেই পুত্র সর্ব গুণে গুণান্বিত। বেদ, বিদ্যা, ব্রতে পারঙ্গম।


আস্তীকের জন্মকথা অপূর্ব ভারত গাঁথা। তা শুনলে সব অধর্ম নাশ হয়। কমলাকান্তের পুত্র কাশীদাস এই গাঁথা রচনা করেন।

মনসা/জরৎকারী
..........................................

Wednesday, July 21, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩

জরৎকারুর পত্নীত্যাগঃ

শৌনকাদি মুনিরা বললেন -সুত্রধরের পুত্র সৌতি অনেক অদ্ভূত কথা শোনালেন, এবার জরৎকারু মুনিকে বাসুকি ভগ্নী দিলে কি ভাবে আস্তিকের জন্ম হল তা বলুন।

সৌতি বললেন -জরৎকারু বিবাহ করে বনে বনে আবার ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। একদিন বাসুকি বোনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন জরৎকারুর সাথে তার কি কথা হল। মুনি ঠিকভাবে বোনের দেখাশোনা করেন কিনা তাও জানতে চাইলেন।

বোন জরৎকারী বললেন –মুনিকে প্রায় আমি দেখতেই পাই না। তিনি কোথায় থাকেন, কোথায় যান-আমি কিছুই জানি না।

এসব শুনে বাসুকি দুঃখিত হলেন।

একদিন তিনি জরৎকারুর দেখা পেলেন।
বাসুকি বললেন –মুনি তোমাকে আমার বোন দান করেছি। তাকে যত্ন করে রেখেছিলাম তোমার জন্য, তুমি তাকে ভাল ভাবে পালন করবে ভেবে।


জরৎকারু বললেন –আমার বিয়ের ইচ্ছে ছিল না। পিতৃপিতামহদের জন্য বিবাহ করতে হল। ঘরে আমার মন লাগে না। বাড়িতে কারো কথা আমি সহ্য করতে পারি না। তোমার বোন সত্যবচন করুক যে, সে কখনও আমায় কোন কথা শোনাবে না, তাহলে ঘর করবো। যদি সত্যবচন ভাঙ্গে তা হলে তাকে আমি ত্যাগ করবো।

বাসুকি বললেন –আমার বোন সত্যবচন করবে। যেদিন সে তোমায় অপ্রিয় কথা শুনাবে সেদিন তুমি তাকে ত্যাগ করো।

তারপর বাসুকি বোনের জন্য অনেক মনিরত্ন দিয়ে প্রাসাদ বানিয়ে দিলেন। জরৎকারু পত্নীকে নিয়ে সেখানে সুখে বাস করতে লাগলেন। এভাবে জরৎকারী গর্ভবতী হলেন। এভাবে নাগিনীর গর্ভে মুনির সন্তান ধিরে ধিরে শশিকলার মত বাড়তে লাগলো। জরৎকারী সব সময় স্বামীর সেবা করেন, তার সামনে করযোড়ে থাকেন। যখন যা আজ্ঞা করেন জরৎকারু তখনই তা পালন করেন। এভাবে নাগিনী মুনির অনেক সেবা করতে লাগলেন।

একদিন দেখলেন দিন শেষ হচ্ছে, সূর্য ডুবছে, এদিকে মুনি তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সন্ধ্যা উপস্থিত দেখে জরৎকারী ভয় পেলেন। সন্ধ্যাও যায়, এদিকে ডাকলে স্বামী যদি রাগ করেন! ভেবে ভেবে নাগিনী চিন্তিত হলেন। শেষে ঠিক করলেন মুনি যা করে করবেন কিন্তু সন্ধ্যা কর্ম না করলে পঞ্চপাপ হবে স্বামীর। এই ভেবে জরৎকারী মুনিকে ডেকে বললেন –প্রভু, সন্ধ্যা শেষ হতে চলেছে, উঠুন!

নিদ্রা ভঙ্গ হতে মুনি রাগে কাঁপতে লাগলেন। রাগে মুখ লাল হল, ঠোঁট কাঁপতে লাগলো।
তিনি বললেন –অহঙ্কার করে আমায় অমান্য করলি! আমি আর তোর মুখ দেখবো না।

জরৎকারী বললেন –প্রভু, আমার উপর অকারণে রাগ কর! আমার কোন দোষ নেই। সূর্য কখন ডুবে গেল, সন্ধ্যাও পিছে যায়। সন্ধ্যা না দিলে কত পাপ হয় তুমিতো তা জান! সে জন্যই ঘুম ভাঙালাম। এটাকে যদি দোষ ভাব তা হলে অবশ্যই ত্যাগ কর।

মুনি বললেন –নাগিনী না বুঝে কথা বলিস না। আমি সন্ধ্যা না করলে সন্ধ্যাকাল শেষ হতে পারবে না। সন্ধ্যার এত সাহস আমায় না বলে চলে যাবে!

সন্ধ্যাও করযোড়ে বলে –মুনি রাগ করো না, আমি এখনো তোমার জন্য আছি।

মুনি বলেন –শুনলি নাগিনী নিজের কানে! আমার কথা তুই অমান্য করেছিস, আমি অবশ্যই তোকে ত্যাগ করে বনে যাব। আর কখনও তোর মুখ দেখব না।


মুনির কথা শুনে জরৎকারী কাঁদতে কাঁদতে তার পায়ের উপর পড়লেন। বলেন –না জেনে প্রভু দোষ করেছি, এবারের মত ক্ষমা কর। ভাইরা আমার দুঃখ পাবে। ভাইরা তোমার হাতে আমায় অনেক আশা নিয়ে দিয়েছিলেন। মায়ের শাপে ভাইদের মনে ভয় হয়, তোমার হাতে আমায় দিয়ে সে ভয় দুর হয়। তোমার ঔরসে, আমার গর্ভে যে সন্তান হবে তারই আমার ভাইদের রক্ষা করার কথা। সন্তান না হতেই তুমি চলে যাচ্ছ! ভাইদের আমি কি বলবো। তুমি যদি আমায় ছেড়ে যাও তা হলে আমি তোমার সামনেই প্রাণ ত্যাগ করবো।

এত শুনে মুনি সদয় হলেন। তিনি নাগিনীর উদরে হাত দিয়ে ‘অস্তি, অস্তি’ বলে হাত বোলালেন।
বললেন –এই গর্ভে আছে নাগকুলের রক্ষাকর্তা এবং আমার ও তোমার কুল রক্ষক। চিন্তা ছেড়ে তুমি ভাইদের গৃহে যাও। ভাইদের বুঝিও তারা যেন দুঃখ না করেন। আমার কথা কখনও মিথ্যা হবে না, তোমাকে আমি অবশ্যই ত্যাগ করেছি। এতকিছু বলে পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে মুনি গৃহ ত্যাগ করে বনে তপস্যা করতে যান।

ব্রাহ্মণের বাক্য অব্যর্থ বুঝে নাগিনী মুনিকে আর কিছু বললেন না। মাথায় ব্রাহ্মণের পদধুলি নিয়ে ভ্রাতৃগৃহে গমন করলেন।
..........................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers