Blog Archive

Wednesday, September 22, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ২৭


বৃষপর্ব্ব-কন্যা শর্মিষ্ঠার দাসীত্বের বিবরণঃ

জন্মেজয় যোড়হাতে পুনরায় কি হল জিজ্ঞাসা করলেন।

মুনি বলেন –কচের দুঃখ দেবযানীর মনে থেকে গেল।

তিনি একদিন বৃষপর্ব্বপুরে স্নান করতে গেলেন।

বৃষপর্বরাজার কন্যা শর্মিষ্ঠাও দাসীদের সাথে সেখানে স্নান করতে এলেন।

চৈত্ররথ নামে বনে এক সরোবর ছিল। সেখানেই সকলে জলক্রীড়া করছিলেন। সকলে আপনার বস্ত্র পাড়ে রেখে জলে নামেন।

এমন সময় খরতর বায়ু বয়। সকলের বস্ত্র একত্র হয়ে যায়।
দৈত্য কন্যা শর্মিষ্ঠা সকলের আগে উঠে ভুল বশত দেবযানীর বস্ত্র পরিধান করেন।

দেবযানী দেখে ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন -শুদ্র কন্যা হয়ে শর্মিষ্ঠার এত অহংকার! যে সে ব্রাহ্মণ কন্যার বস্ত্র পরে!

দেবযানীর বাক্যে শর্মিষ্ঠাও কুপিতা হয়ে বলেন -সত্যি, তাদের মধ্যে অনেক অন্তর! কারণ তার পিতার অন্ন গ্রহণ করেন দেবযানীর পিতা, তার পিতার সদা স্তুতি গান দেবযানীর পিতা।

এসব কথা বলতে বলতে রাগে শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে কূপে ফেলে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

দেবযানী বাঁচল কি মরল কেউ তা দেখল না।

সেই বনেই ভাগ্যের ফেরে সে সময় যযাতি মৃগয়া করছিলেন।
যযাতির সৈন্যরা তৃষ্ণার্ত হয়ে জলের সন্ধানে বেড়িয়ে কূপে সুন্দরীকে পড়ে থাকতে দেখে রাজাকে সে কথা জানায়।

যযাতি এসে দেখেন এক অতি পুরাতন কূপ তৃণে আচ্ছন্ন, সেখানে চন্দ্রের সমান এক কন্যা পড়ে আছেন। তিনি কন্যার পরিচয় জানতে চান।

দেবযানী বলেন –সব পরিচয় দেব, আগে হাত বাড়িয়ে তোল। আমি শুক্রাচার্যের কন্যা।

রাজা ভয় পান। একে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শুক্রের কন্যা, তায় যুবতী।

দেবযানী আশ্বস্ত করলেন নারীকে অন্ধকূপ থেকে বাঁচালে রাজার কোন পাপ হবে না।

যযাতি কন্যার ডান হাত ধরে তাকে কূপ থেকে উদ্ধার করলেন। পরে নিজ দেশে ফিরে গেলেন।

সে সময় ঘূর্ণিকা দাসীকে দেখে দেবযানী কেঁদে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে পিতাকে বলে পাঠান তিনি কোন মুখে পিতৃগৃহে যাবেন।

ঘূর্ণিকার মুখে শর্মিষ্ঠার দেবযানীকে কূপে ফেলার ঘটনা শুনে শুক্র বিষণ্ণ হন এবং প্রাণপ্রিয় কন্যাকে দেখতে যান।

গিয়ে দেখেন কন্যা বনের ভিতর হেঁট মুখে বসে কাঁদছেন। তিনি কন্যাকে শান্তনা দিতে থাকেন। দেবযানী শর্মিষ্ঠার সকল কথা পিতাকে যানান।

শুক্র দেবযানীকে ক্রোধ দমন করতে বলেন।
তিনি বলেন –ক্রোধে মানুষ ভ্রষ্ট হয়, যে ক্রোধকে দমন করতে পারে সেই প্রকৃত সর্ব ধর্মে ধার্মিক।

তবু দেবযানীর মন থেকে কষ্ট দুর হয় না। শর্মিষ্ঠার অপমান তাকে পীড়িত করে।
বলেন –পিতা আমি ওসব কথা জানি, কিন্তু পন্ডিতেরা বলেন নীচ লোকের কাছে অপমানিত হওয়ার চেয়ে মরণ ভাল। অস্ত্রাঘাতে যে ক্ষত হয় তা সারে, কিন্তু বাক্ক্ষত সারে না।

কন্যার কথা শুনে শুক্র বৃষপর্ব রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে জানালেন তিনি রাজ্য ত্যাগ করতে চান।
ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বৃহস্পতির নন্দন কচকে তারা মিথ্যা হত্যার চেষ্টা করেছে। তার কন্যা শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে মারবার জন্য অন্ধকূপে ফেলেছে।
নারীবধ, ব্রাহ্মবধ যারা করে তারা পাপী। তাদের কাছে থাকলে তারও পাপ হবে।

দৈত্যরাজ শুক্রের পায়ে এসে পড়লেন। তাকে অনুনয় করতে লাগলেন, শুক্র যেন তাদের ত্যাগ না করেন। সকল পাপের জন্য তিনি ক্ষমা চাইলেন।

শুক্র বলেন –আমার আদরের কন্যা দেবযানীকে যদি তুষ্ট করতে পার তবেই আমি এস্থানে থাকব।

রাজা যোড়হাতে দেবযানীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।
দেবযানী কোন কথা শুনতে নারাজ। তিনি শর্মিষ্ঠাকে দাসীরূপে চান।

রাজা অন্তপুরে দাসী পাঠান কন্যা শর্মিষ্ঠাকে আনার জন্য। কুল রক্ষার্থে, স্বজাতীর কল্যাণার্থে শর্মিষ্ঠা চতুরদোলায় চেপে পিতার সামনে উপস্থিত হলেন।

বৃষপর্ব বলেন দৈবের লিখন তাই শর্মিষ্ঠাকে দেবযানীর দাসী হতে হবে।
শর্মিষ্ঠা বলেন –পিতা আপনার আজ্ঞায় এবং নিজ কর্ম দোষে আমি দাসী হলাম।

দেবযানী বলেন –তুমি রাজকন্যা! তোমার পিতার স্তুতি আমার পিতা করেন। তুমি কি ভাবে আমার দাসী হবে!

এই ব্যঙ্গে শর্মিষ্ঠা বলেন –জ্ঞাতির কুশল আর পিতার বচন রাখতেই আমি দাসী হলাম। এতে আমার এতটুকু লজ্জা নেই।

এভাবে শুক্র কন্যা দেবযানীকে আপন গৃহে নিয়ে গেলেন। এবং শর্মিষ্ঠাও তার দাসীরূপে সে গৃহে অবস্থান করতে লাগলেন।

..........................................

Tuesday, September 21, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ২৬


কচ ও দেবযানীর পরস্পর অভিশাপঃ
কিছুদিন পর দেবযানী কচকে দেবপূজার জন্য ফুল আনতে বললেন। ফুল আনতে গিয়ে কচ পুনরায় দৈত্যদের হাতে পড়লেন।


এবার তাকে টুকরো টুকরো করে ঘৃতে ভাজা হল। তারা বিচার করল অন্য কেউ এ মাংস ভক্ষণ করলে তার নিস্তার নেই। কারণ শুক্রের মন্ত্রে কচ বাঁচবে কিন্তু ভক্ষকের প্রাণটি যাবে। শেষ পর্যন্ত সে মাংস সুরাসহ শুক্রকেই খাইয়ে দিল।

এদিকে দেবযানী পুনরায় পিতার কাছে কচের পুষ্প আনতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার কথা জানালেন। তিনি আশঙ্কা করলেন দৈত্যরা পুনরায় কচকে হত্যা করেছে।


শুক্রাচার্য কন্যাকে বোঝালেন মৃত জনের জন্য বিলাপ কর না। ব্রহ্মা, ইন্দ্র, চন্দ্র, সূর্য-এদের মৃত্যু হলে তারাও আর বাঁচবে না। দেবযানী বৃথাই মৃত কচের জন্য ক্রন্দন করছেন।
কিন্তু দেবযানী কচকে না দেখতে পেলে মৃত্যুবরণ করবেন জানালেন। কন্যার কথায় শুক্র চিন্তিত হলেন।


ধ্যানে বসে দেখলেন কচ তারই উদরে। তিনি কচকে কি ভাবে তার উদরে গেলেন জানতে চাইলেন। কচ সকল কথা জানালেন। শুক্র চিন্তিত হলেন। কারণ কচকে বাঁচালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবার কচকে না বাঁচালে তার দ্বারা ব্রাহ্মণ হত্যা হয়।

শেষে শুক্র কচকে বললেন –বৃহস্পতি পুত্র, তুমি সিদ্ধিলাভ করেছ, দেবযানী তোমাকে স্নেহ করে। যদি তুমি কচরূপী ইন্দ্র না হও তবে আমার সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ কর। বৎস, তুমি পুত্ররূপে আমার উদর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিও, গুরুর নিকট বিদ্যা লাভ করে তোমার যেন ধর্মবুদ্ধি হয়।

তিনি কচকে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিক্ষা দিচ্ছেন। কারণ কচ বাঁচলে তার মৃত্যু হবে। কচ পরে সেই মন্ত্রবলে গুরুকে বাঁচাবেন। এভাবে শুক্রের গর্ভে বসে কচ মন্ত্র অধ্যয়ন করলেন। শেষে শুক্র নিজের উদর চিরে শিষ্যকে মন্ত্রের বলে বাঁচালেন এবং নিজ়ে মৃত্যুবরণ করলেন। পরে কচ মন্ত্রের সাহায্যে গুরুকে প্রাণদান করলেন।


প্রাণ পেয়ে শুক্র সুরার উপর রেগে গিয়ে শাপ দিলেন –ব্রাহ্মণ হয়ে যে সুরা পান বা সুরার ঘ্রাণ নেবে সে অধার্মিক ও ব্রহ্মঘাতী হবে। তার ব্রহ্মতেজ নষ্ট হবে। ইহলোকে সে অপূজিত হবে এবং মরলে নরকে যাবে।
পরে শুক্র দৈত্যদের ডেকে বললেন তার শিষ্যকে কেউ হিংসা করবে না-এ বাক্য না শুনলে তার অশেষ দুঃখ আছে।


কচকে তিনি আশির্বাদ করলেন নির্ভয়ে যেখানে খুশি বিচরণ করতে পারবেন। এভাবে শুক্রের কাছে কচ সকল বিদ্যা অধ্যয়ন করলেন। শেষে দেবযানীর কাছে এসে প্রার্থনা করলেন নিজের দেশে যাওয়ার অনুমতি দিতে।


দেবযানী বিষণ্ণ হলেন। কচকে ডেকে তাকে বিবাহ করতে অনুরোধ করলেন। কচ একথায় বিস্মিত হলেন। কারণ গুরুকন্যা তার কাছে ভগিনীর সমান।

দেবযানী বললেন –তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। তাছাড়া আমার জন্যই তুমি বার বার মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছো। এখন আমায় এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়।


কচ চিন্তিত হলেন। তিনি দেবযানীকে বোঝাতে চাইলেন।
বললেন –দেবযানী, প্রসন্ন হও, তুমি আমার কাছে গুরুরও অধিক। তোমার যেখানে উৎপত্তি, শুক্রাচার্যের সেই দেহের মধ্যে আমিও বাস করেছি। ধর্মত তুমি আমার ভগিনী। অতএব আর ওরূপ কথা বলো না। তোমাদের গৃহে আমি সুখে বাস করেছি, এখন যাবার অনুমতি দাও, আশীর্বাদ করো, সাবধানে আমার গুরুদেবের সেবা করো।

একথা শুনে দেবযানী ক্রোধিত হলেন। তিনি অভিশাপ দিলেন, নারী হয়ে তিনি বারবার অনুরোধ করলেন কচ তাও কথা রাখলেন না। তাই তার পিতার কাছ থেকে কচ যত বিদ্যা শিখেছেন সব নিষ্ফল হবে।
দেবযানীর বাক্যে কচ ব্যাথিত হলেন। বললেন, বিনা অপরাধে তাকে দেবযানী এত বড় অভিশাপ দিলেন। কামে উত্তেজিত হয়ে তিনি কচকে অভিশাপ দিলেন। তাই তাকেও শাপ নিতে হবে।

কচ দেবযানীকে অভিশাপ দিলেন ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শুক্রের কন্যা হয়ে তাকে ক্ষত্রিয়ের স্ত্রী হতে হবে। দেবযানীর শাপও তার লাগবে। কচ প্রত্যক্ষ ভাবে কোন বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারবেন না। তবে তার শিষ্যরা ফলদায়ী হবেন।

এই বলে কচ ইন্দ্রের নগরে উপস্থিত হলেন। কচকে দেখে দেবতারা আনন্দিত হলেন। তার কাছ থেকে দেবযানীর সকল কথা শুনলেন।
নিশঙ্ক হয়ে দেবতারা আবার যুদ্ধে উপনীত হলেন। দেব-দানবের সে যুদ্ধের বর্ণনা অবর্ণনীয়।
..........................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers