Blog Archive

Tuesday, July 1, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৫৯

যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যে অভিষেকঃ 
 

মুনি বলেন, রাজা অবধান কর, তোমার পিতামহের উপাখ্যান।
রাজা ধৃতরাষ্ট্র বিধান বুঝে যুবরাজ ঘোষণায় অনুমতি দিলেন। কুরুকুলের জৈষ্ঠ হলেন কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠির। ধর্মশীল ধীর এই রাজকুমারকে সকলে ভালবাসতেন। যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজরূপে অভিষেক করা হলে সমাজে সকলে প্রীত হলেন। যুধিষ্ঠিরের সৌজন্যে সকলে বশেও থাকল। পৃথিবীর চারদিকে ধর্মপুত্রের যশ ছরিয়ে পড়ল। বৃকোদর(যার উদরে বৃক বা জঠরাগ্নি আছে, বহুভোজী) ভীম বলরামের কাছে অসিযুদ্ধ গদাযুদ্ধ ও রথযুদ্ধ শিখলেন। অর্জুন নানাবিধ অস্ত্রের প্রয়োগে পটুতা লাভ করলেন। সহদেব সর্ব প্রকার নীতিশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হলেন। দ্রোণের শিক্ষার ফলে নকুলও অতিরথ(যিনি অসংখ্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন) এবং চিত্রযোধী(বিচিত্র যুদ্ধকারী) নামে খ্যাত হলেন। 

ভীম ও অর্জুন দুই ভাই রাজার আজ্ঞায় চারদিকের রাজাদের শাসন করে বেড়ান। বহু রাজাদের সাথে তাদের যুদ্ধ হল এবং এত রাজ্য জয় করলেন যে তাদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। উত্তর পশ্চিম পূর্ব জম্মুদ্বীপ প্রভৃতি থেকে দু’জনে বহু রত্ন জিতে আনলেন। পূর্বে কুরুকুলের পক্ষে যা যা অসাধ্য ছিল ভীমার্জুন দুইভাই তাই আয়ত্ত করলেন। নানা রত্নে হস্তিনানগর পূর্ণ হল, পৃথিবীতে দুই সহোদর ভাইদের যশ ছরিয়ে পড়ল। সহদেবও মন্ত্রী হয়ে ভুবনে নাম করলেন। তিনি দেবগুরুর আরাধনা করে সর্বজ্ঞ হলেন। নকুলও দুর্জয় যোদ্ধা, সর্বগুণ সম্পন্ন এবং ধীর। কৌরবকুমারদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর শরীরের অধিকারী। পান্ডবদের প্রশংসায় পৃথিবীর সকলে মুখরিত হল। কুরুকুলের অন্য রাজপুরুষরা পান্ডবদের কাছে ম্লান হয়ে গেল। দিনে দিনে পান্ডবদে গৌরব শুক্লপক্ষের শশীর মত বাড়তেই থাকল। পান্ডবদের বীরগাঁথা মানুষ দিনরাত গাইতে লাগলো। 

এতসব শুনে ধৃতরাষ্ট্র বিষণ্ণ হলেন। পান্ডবদের যশ দিন দিন বাড়তেই থাকল। বিধির লিখন কেউই খন্ডন করত পারে না। তবু অন্ধ রাজা মনে মনে ভয় পেলেন। কারণ তার পুত্রদের কথা কেউ বলেই না। পান্ডবরাই যেন পৃথিবীর মন জয় করেছে। এসব ভেবে ভেবে তার নিদ্রা গেল, আহারের রুচি নেই। তখন তিনি কুরুবংশের অতি বৃদ্ধ এক মন্ত্রী নাম কণিক-যিনি জাতে ব্রাহ্মণ, তাকে ডেকে পাঠালেন। 

একান্তে কণিককে ডেকে তিনি বললেন -পরম বিশ্বাস করি বলেই তোমায় ডেকে পাঠালাম। দিনরাত আমার অন্তরে একটু সুখ নেই, তোমার মন্ত্রণা বলেই আমি এই দুঃখ খন্ডন করতে চাই। পান্ডবদের যশের কীর্তি দিনে দিনে যত বাড়ছে আমার চিত্তও ততই আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠছে। এর কি উপায় আছে তুমি বলো। 

কণিক বলে -যদি আমার কথা শুন তা হলে এই দুশ্চিন্তা খন্ডাবে। 
ধৃতরাষ্ট্র বলেন তিনি অবশ্যই কণিকের পরামর্শ শুনবেন।

তখন কণিক রাজাকে প্রকৃত রাজনীতি কি তা বোঝাল। শাস্ত্রে এমন বিহিত আছে- কাজ না থাকলেও দন্ড দেবে। সকলকে নিজের বশে রাখবে। নিজের ভুল সব সময় পরম যত্নে লুকাবে। পরের ভুল অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে ধরবে। 
রাজা বুঝে শুনে কাজ করবেন-কখনও গোপন করবেন, কখনও সব ব্যক্ত করবেন- যখন যেমন দরকার। শত্রুকে দুর্বল দেখেও দয়া করবেন না। শত্রু শরণ নিলেও রক্ষা করবেন না। শত্রুকে বালক দেখেও সাহায্য করবেন না। ব্যাধি, আগুন, রিপু, জল সবই এক ও সমান। তবে শত্রুকে যখন শক্তিশালী দেখবে তখন তার প্রতি বিনয় দেখাবে। বহু ক্লেশ হলেও অপমান সহ্য করে নেবে। সব সময় তাকে কাঁধে চড়িয়ে রাখবে অর্থাৎ যত্নবান হবে। তবে সময় পেলেই তাকে সেখান থেকে টেনে আছড়ে মাটিতে ফেলবে। 

এ প্রসঙ্গে একটি পূর্বের কাহিনী বলি রাজা ভাল করে শুনুন।–
বনেতে সবচেয়ে বিজ্ঞ হল শেয়াল। বনে সিংহ, বাঘ, বেজি, ইদুঁর ও শেয়াল- পাঁচজনে বহুদিন বন্ধু হয়ে বাস করে। একদিন বনে একটি হরিণী চরছিল। সে গর্ভবতী হওয়ায় তার শরীরে অনেক মাংস। শেয়াল দেখে হরিণীর ঈশ্বর তাকে সাহায্য করলেন ফলে সিংহও বহু চেষ্টা করে তাকে ধরতে পারল না। শেয়াল তখন বন্ধুদের ডেকে বলল, আমার কথা মন দিয়ে শোন তা হলেই আমরা হরিণ ধরতে পারব। শক্তিতে যখন একে ধরতে পারছি না তখন ইদুঁরের মাধ্যমেই এর প্রাণ নেব। শ্রান্ত হয়ে হরিণী অবশ্যই কোথাও শোবে। তখন ইদুঁর সেখানে লুকিয়ে ধিরে ধিরে যাবে। দুর থেকে সুরঙ্গ করে সে হরিণের কাছে যাবে। খুব নিঃশব্দে যেতে হবে যাতে হরিণী না যানতে পারে। সুরঙ্গ শেষ হবে হরিণের পায়ের কাছে। ইদুঁর সুরঙ্গ থেকে বেরিয়েই হরিণের পায়ের শির কেটে দেবে। পায়ের শির কাটা গেলে হরিণ অশক্ত হবে। তখন সহজেই সিংহ তাকে বধ করবে। এত শুনে সবাই রাজি হল। শেয়াল যা নির্দেশ দিল সকলেই তা পালন করল। ইদুঁরের দংশনে হরিণের পায়ের শির কাটা গেল। হীনশক্তি দেখে সিংহ তাকে ধরে ফেলল। হরিণ মারা পরতে সকলে আনন্দিত হল। কিন্তু শেয়াল মনে মনে অন্য চিন্তা শুরু করল। মনে মনে সে ভাবল আমার বুদ্ধিতেই হরিণ মরল, কিন্তু সিংহ আর বাঘ মাংস খাবার পর আমি আর কতটুকু পাব। খেতে হলে আমি পুর মাংসই খাব এবং তার জন্য যা করতে হয় তাই করব। এই ভেবে শেয়াল যোড়হাত করে সবার কাছে গিয়ে বলল দেখ দৈবযোগে আজ হরিণ মরল তাই প্রথমে পিতৃলোকে মাংস শ্রাদ্ধ দেওয়া উচিত। স্নান করে সবাই আগে শুদ্ধ হয়ে এস ততক্ষণ আমি হরিণকে লক্ষ রাখছি। বুদ্ধিমান শেয়ালের কথা শুনে সকলে স্নান করতে গেল। 
সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও বলিষ্ঠ সিংহ দ্রুত স্নান করে চলে এল। সিংহ এসে দেখে শেয়াল বিরস বদনে বসে আছে। সে শেয়ালকে বিরস বদনের কারণ জিজ্ঞেস করল এবং তাকে দ্রুত স্নান করে আসতে বলল। 
শৃগাল সিংহকে বন্ধু সম্বোধন করে বলল, কি বলি বন্ধু ইদুঁরের কথা শুনে আমি বড়ই ব্যথা পেলাম। যখন তুমি স্নানে গেলে তখন সে তোমার নামে যে কুবচন করল তা বলতেও আমার লজ্জা হয়। ইদুঁর বলল সকলে সিংহকে বীর বলে অথচ আমি হরিণ মারলাম আর তাই সিংহ খাবে। 
শুনে সিংহ দুঃখিত হল। অভিমান করে বলল –কি ছার ইদুঁর! তার এত সাহস! আমি কিছুতেই ঐ মাংস খাব না। নিজের বীর্য্যে হরিণ এখনই ধরে আমি খাব। যে এমন অন্যায় বাক্য বলতে পারে তার মুখও আমি আর দেখব না। নিজের অর্জিত বস্তু আমি নিজেই ভক্ষণ করব। এত বলে সিংহ ঘন বনে ঢুকে গেল। 
এরপর স্নান করে বাঘ সেখানে উপস্থিত হল। আস্তে আস্তে শিয়াল তার কাছে গিয়ে বলল -প্রাণসখা শুন তোমার ভাগ্য ভাল এখনই তোমার সিংহের সাথে দেখা হল না। সে তোমার উপর খুব রেগে আছে, হয়ত তোমার নামে কেউ তাকে কিছু বলে থাকবে। এখনই সে তোমাকে ধরতে গেল। আমাকে বলে গেল যেন একথা আমি তোমায় না জানাই। কিন্তু আমার প্রিয় বন্ধু তোমায় না বলে আমি থাকতে পারলাম না, এবার তুমি কি করবে ভেবে দেখ। 
শেয়ালের কথা শুনে বাঘ অবাক হল এবং ভাবল কি জানি কি ভাবে আমি সিংহের কি ক্ষতি করলাম যে সে আমায় ধরতে চায়। কি করবে কোথা যাবে সে ভেবে অস্থির হল। তবে এ স্থান অবশ্যই নিরাপদ নয়, এখনই হয়ত সিংহ ঘুরে চলে আসবে-এই ভেবে বাঘ দ্রুত ঘোর বনে প্রবেশ করে আত্মগোপন করল। 
এসময় ইদুঁর সেখানে এল। তাকে দেখে শেয়াল কান্না জুড়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে ইদুঁরকে জড়িয়ে ধরে প্রলাপ করে বলল -বন্ধু নকুলের(বেজি) কি দুর্মতি হল সে নিজের পূর্ব প্রকৃতি এখনও ছাড়তে পারেনি। হঠাৎ তার সাপের সাথে দেখা হল। যুদ্ধে তার কাছে হেরে তাকেও বন্ধু করে নিল। স্নান করে এখানে দু’জনে উপস্থিত হল। বেজি সাপকেও মাংসের ভাগ দিতে হবে বলল। অথচ আমরা পাঁচজন মিলে হরিণ মারলাম। তাই আমি সাপকে ভাগ দিতে না চাইলে সে রেগে গেল এবং তোমাকে ধরে খেতে বলল। এখন বেজি ও সাপ তোমায় খুঁজতে গেছে। আমাকেও বলে গেছে তুমি এলে যেন তোমায় ধরি। এত শুনে ইদুঁরের প্রাণ উড়ে গেল। দ্রুত সে পালিয়ে অন্য স্থানে চলে গেল। 
তখন বেজি সেখানে উপস্থিত হল। তাকে দেখে শেয়াল ক্রোধের সঙ্গে বলল -দেখ সিংহ, বাঘ আর ইদুঁরের সাথে আমার যুদ্ধ হল। তারা হেরে পালিয়েছে বনে। তোমার যদি শক্তি থাকে তা হলে আমার সাথে এসে যুদ্ধ কর, নয় প্রাণ নিয়ে পালাও। বেজি শেয়ালের চেয়ে ছোট ও দুর্বল। সহজেই সে ভয়ে পালিয়ে গেল।
এভাবে শেয়াল বুদ্ধি দিয়ে চারজনকে চারভাবে ঠকিয়ে নিজেই পুর মাংস খেল। 

কণিক আরো বললে -রাজা ভাল করে শুনুন এভাবেই রাজা রাজ্যবান হন। বলিষ্ঠকে বুদ্ধিতে জিতে মারবে। লোভিকে ধন দিয়ে ছলনা করে মারবে। শত্রুকে কোন ভাবে পেলে অবশ্যই ছাড়বে না। বিশ্বাস জন্মিয়ে বিপক্ষকে মারবে। সব সময় মনে রাখবে শত্রু তোমার জীবনের বৈরী। তাকে যেকোন প্রকারে মারতে হবে। ছলে–বলে–কৌশলে শত্রুকে যমের বাড়ি পাঠাতেই হবে। বেদেও এমন বিচার আছে। সেখানেও বলে বিশ্বাস জন্মিয়ে শত্রুকে মারা যায়। ভার্গব(পরশুরাম)ও বলেন এতে পাপ নেই। শত্রুকে বিশ্বাস করে পালন করলে তার গর্ভেই তোমার বিনাশ হবে। এসব ভাল ভাবে বুঝে রাজা উপায় বার করুন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরে দুঃখই পাবেন। এত বলে কণিক নিজের গৃহে ফিরে গেল।

অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। 

ভারতের পূণ্যকথা শুনলে পবিত্র হবে। কাশীরাম দাস সেই অদ্ভূত কাহিনীই বর্ণনা করেছেন।
....................................

Saturday, June 14, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৫৮

দ্রোণাচার্য্যের দক্ষিণা প্রার্থনাঃ 


কিছুদিন পর দ্রোণাচার্য শিষ্যদের কাছে তার গুরুদক্ষিণা প্রার্থনা করলেন।

দ্রোণ বললেন- হে, অর্জুন! দুর্যোধন! ধনরত্নের আমার কোন প্রয়োজন নেই। বিখ্যাত পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যুদ্ধে হারিয়ে আমার সামনে বেঁধে আন – এই হবে আমার দক্ষিণা।

শিক্ষাগ্রহণের পূর্বে কুন্তীর পুত্ররা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন গুরু যা চাইবেন তাই দেবেন। তারা পূর্ব সত্য পালনে ব্রতী হলেন। 
গুরুর এই বাক্যে যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধনও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। সৈন্যদের প্রস্তুত হতে আদেশ দিলেন। রথ, হাতি, ঘোড়া, পদাতিক সকলের মধ্যে সাজসাজ রব উঠল। রাজকুমাররা দ্রোণকে সঙ্গে নিয়ে সসৈন্য পাঞ্চাল রাজ্য আক্রমণ করলেন। 
পাঞ্চাল রাজ দ্রূপদও তাঁর ভাইদের সাথে কৌরবদের প্রতি আক্রমণ করলেন। 

দুর্যোধনদের দর্প দেখে অর্জুন গুরুকে বলেন- এরা দ্রুপদকে বন্দী করতে পারবে না। ওরা আগে নিজেদের বিক্রম দেখাক তারপরে আমি যুদ্ধে নামব। এই বলে তিনি নগর থেকে অর্ধ ক্রোশ দূরে ভাইদের সাথে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

দ্রুপদের বাণবর্ষণে দুর্যোধনরা ব্যতিব্যস্ত হলেন। তাদের সৈন্যদের উপর নগরবাসী বালক বৃদ্ধ সকলে মুষল (মুগুর/গদা) ও যষ্টি(লাঠি) বর্ষণ করতে লাগল। কৌরবদের আর্তরব শুনে যুধিষ্ঠির যুদ্ধে যাওয়া উচিত মনে করলেন। সৈন্যদের প্রস্তুত হতে দেখে অর্জুন এক রথে চরে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। 
তিনি দু’হাত জোড় করে যুধিষ্ঠিরকে বলেন – আমি থাকতে আপনি যুদ্ধে যাবেন কেন, প্রভু! আমার দ্বারা যদি কর্ম সাধন সম্ভব না হয় তবে অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেবেন। 
এত বলেই অর্জুন দ্রুত পাঞ্চাল নগরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ভীমও তাঁকে অনুসরণ করলেন। 

দ্রুপদরাজ অর্জুনের আগমনের কারণ জানতে পারলেন এবং সৈন্যদের আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আজ্ঞা দিলেন। তিনি চিন্তিতও হলেন কেন অর্জুন হঠাৎ এভাবে এলেন এই ভেবে। রাজা তার মন্ত্রীকে অর্জুনের কাছে পাঠালেন। মন্ত্রী অর্জুনের কাছে করযোড়ে উপস্থিত হলেন এবং তিনি কি কারণে আগমন করেছেন জানতে চাইলেন। দ্রুপদরাজের প্রতিনিধি হয়ে তিনি অর্জুনের জন্য কি কাজ করতে পারেন জানতে চাইলেন এবং বিশেষ রূপে দ্রুপদ রাজার আশ্রয়ে অতিথি হতে আমন্ত্রণ জানালেন। 
অর্জুন বললেন তিনি সকল অতিথির পূজাই নেবেন যদি রাজা এসে তার সাথে যুদ্ধ করেন। তিনি সসৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে এসে যদি অর্জুনের সাথে যুদ্ধ না করেন তবে পাঞ্চালের ক্ষতি হবে এও জানালেন।
মন্ত্রী রাজার কাছে অর্জুনের সকল কথা জানালে দ্রুপদরাজ ক্রোধে কাঁপতে লাগলেন। ক্ষত্রিয় হয়ে এ বাক্য শুনে কেউই স্থির থাকতে পারে না। তিনি চতুরঙ্গে সেজে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। এত অশ্ব, গজ ও রথ এল যে তা গণনা করা গেল না। তিনি সসৈন্য গিয়ে পান্ডুপুত্র অর্জুনকে ঘিরে ফেললেন। সে সময় অর্জুন বিষণ্ণ মনে একা বসেছিলেন। চারদিক থেকে সৈন্যরা অস্ত্র বর্ষণ শুরু করলে তার চেতনা হল। তিনি আকর্ণ টেনে ধনুর্গুণে টঙ্কার ধ্বনি দিলেন। গুরু দ্রোণের চরণ স্মরণ করে যে শর নিক্ষেপ করলেন তাতে মুহুর্তে সূর্যের মুখ ঢেকে গেল। চারদিকে নতুন আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষণ শুরু হল। প্রবল বেগে সৈন্যদের উপর পরতে লাগল। ভীমও যমের মত গদা হাতে ধাবিত হলেন পাঞ্চালরাজের সৈন্যদের দিকে এবং অশ্ব, রথ সব ধ্বংস করতে লাগলেন। সারথিরা পালাল, রথী বা যোদ্ধারা কাটা পড়ল। হাতির দাঁত ভাঙ্গল-তাতে সে পালাল। ঘোড়ায় চড়ে যে বীর এলেন সে কাটা পড়লে অশ্বও পালাল। হাত কাটা গেলে পদাতিকরাও পালাল। যারা পালাল তারাই প্রাণে বাঁচল। বাকি সৈন্য যুদ্ধে প্রাণ দিল। অর্জুনের সাথে দ্রুপদ ও তার ভাই সত্যজিতের ভীষণ যুদ্ধ হল। অর্জুনের শরাঘাতে সত্যজিতের অশ্ব ও সারথি বিনষ্ট হলে সত্যজিত পালালেন। তখন অর্জুন দ্রুপদের ধনু ও রথধ্বজ ছিন্ন এবং অশ্ব ও সারথিকে শরবিদ্ধ করে খড়্গ হাতে লাফ দিয়ে তার রথে উঠলেন। সৈন্যদের দুর্দশা দেখে দ্রুপদও ভয়ে পলায়ন করতে লাগলেন। পিছন থেকে অর্জুন তাকে অভয় দিলেন। অর্জুন কথা দিলেন রাজা তার সাথে যুদ্ধ করলে তার প্রাণ অর্জুন নেবেন না। কিন্তু প্রাণ ভয়ে যদি তিনি পালাতে চান তা হলে অর্জুনের হাত থেকে তার আজ আর মুক্তি নেই। অর্জুনের কথায় রাজা সম্মত হলেন। তিনি অর্জুনের সাথে দারুন যুদ্ধ শুরু করলেন। মন্ত্র পরে অর্জুন যে দিব্য অস্ত্র ছাড়লেন তাতে রাজার ধনুক কাটা গেল। রাজা চিন্তিতত হলেন। অর্জুন রাজাকে দুহাতে ধরে নিজের রথে উঠিয়ে নিজ রাজ্যের উদ্দেশ্যে গমন করলেন এবং ভীমকে বললেন দ্রুপদরাজা কুরুবীরদের আত্মীয়, আর তার সৈন্য বধ করবেন না, আসুন আমরা গুরুদক্ষিণা দেব।

সে সময় পথে দুর্যোধনের সাথে দেখা হল। চতুরঙ্গে(হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতি) দল বেঁধে দুর্যোধন আসছিলেন। দুর্যোধন দ্রুপদকে অর্জুনের রথে দেখে বিরক্ত হলেন এবং এটা ঠিক হয়নি জানালেন। কারণ দ্রোণ দ্রুপদকে বেঁধে তার সামনে আনতে বলেছিলেন। এত বলে দুর্যোধন নিজেই রথে উঠে দ্রুপদের হাত-পা বাঁধলেন। রাজার চুল ধরে পথে হাঁটিয়ে তাকে দ্রোণের সম্মুখে এনে ফেললেন। দ্রোণের চরণে গিয়ে দ্রূপদ পতিত হলেন। 


দ্রুপদ

দ্রুপদকে দেখে দ্রোণ বললেন – হে রাজা তোমার সৈন্য, প্রজা, দন্ড, ছাতা সব কোথায় গেল! 
তিনি উপহাস্য করে দ্রুপদকে অভয় দান করলেন। বললেন –আমি জাতে ব্রাহ্মণ, আমার ক্রোধ ক্ষনিকের। বিশেষ করে বাল্যের বন্ধুর প্রতি। হে বন্ধু, পূর্বের কথা তোমার স্মরণ হয়! সেবককে আজ্ঞা দিয়েছিলে একটি ভোজনের। আজ আমরা সমান হলাম। এবার তুমিও আমায় রাজা বলতে পার। বাল্যকালে তুমি যে অঙ্গীকার করেছিলে রাজা হলে আমায় অর্ধেক রাজ্য দেবে – সে বচন তুমি পালন করনি। কিন্তু আজ তোমার সেই রাজ্য সম্পূর্ণরূপে আমার শাসনে। তুমি তোমার সত্য পালন করনি, কিন্তু আমি পালন করব। তুমি বাল্যকালে আমার সঙ্গে খেলেছিলে, সেজন্য তোমার প্রতি আমার এখনও স্নেহ আছে। অরাজা রাজার সখা হতে পারেনা। তাই তোমাকে আমি আমার অর্ধেক রাজ্য দিলাম, গঙ্গার দক্ষিণে চরমন্বতী নদী পর্যন্ত তুমি রাজত্ব কর। গঙ্গার উত্তরতটের রাজ্য পুরটাই আমার হল। অর্ধেক অর্ধেক রাজ্য দুজনেরই সমান হল। যদি ইচ্ছে কর তবে আমাকে সখা মনে করতে পার।
দ্রোণ দ্রুপদকে মুক্ত করে দিলেন এবং সখারূপে আহ্বান জানালেন।
দ্রুপদ বলেন, শক্তিমান মহাত্মার পক্ষে এমন আচরণ আশ্চর্য নয়, আমি প্রীত হয়েছি, আপনার চিরস্থায়ী প্রণয় কামনা করি। 

মুক্ত হয়ে দ্রুপদ নিজ রাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন কিন্তু ক্ষত্রিয়েরা সহজে ক্ষমা করে না। শেষ পর্যন্ত তিনি অভিমানে রাজ্যে গেলেন না। ভাগীরথী নদী তীরে মাকন্দীনগরে থেকে গেলেন। সেখানে থেকে তিনি দুঃখের সাথে চিন্তা করতে লাগলেন কি ভাবে দ্রোণকে পরাজিত করবেন। কুরুকুলের বীররা যার শিষ্য তাকে সহজে পরাজিত করা যাবে না। শক্তিতে যে তিনি দ্রোণের সমান নন একথা সব সময় তার মাথায় ঘুরতে লাগলো। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের দুষ্টমতি পুত্র দুর্যোধন তাকে সভার মাঝে বেঁধে নিয়ে গেল-একথাও তিনি ভুলতে পারলেন না। ব্রাহ্মণের মন্ত্র ছাড়া যজ্ঞ সম্ভব নয় একথা তিনি জানেন। ব্রাহ্মণ দ্রোণকে ও দুর্যোধনকে বধ করার উদ্দেশ্যে তিনি ব্রাহ্মণদের নিয়ে যজ্ঞ শুরু করলেন। 
এভাবে ভাগীরথীর দক্ষিণদিকের রাজা হলেন দ্রুপদ ও অহিচ্ছত্রা নামে গঙ্গার উত্তরের রাজ্যের ঈশ্বর হলেন দ্রোণাচার্য। 

মহাভারতের কথা অমৃত সমান, এক মনে শুনলে বাড়ে দিব্য জ্ঞান।
....................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers