Blog Archive

Wednesday, August 13, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৬২

পান্ডবের নিকট হিড়িম্বার আগমনঃ 


নিশাচরী হিড়িম্বা দুর থেকে ভীমকে দেখতে লাগলো। ভীমের সুন্দর দেহ ঘন ঘন অবলোকন করে হরষিত হল। পাহাড়ের মত উচ্চ, শালগাছের তেজী চারার মত তেজ, চাঁদের মত মুখ, পদ্মের মত চোখ, সিংহের বিক্রম, হাতদুটি হাতির মত বলশালী, শঙ্খের মত গম্ভীর স্বর, পাখির ঠোঁটের মত নাক – ভীমের শরীরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সে অনঙ্গ(মদন) বাণে বিদ্ধ হল। 

হিড়িম্বা চিন্তা করলো- এমন সুন্দর রূপ ইহলোকে যক্ষ–রক্ষ-মানুষের মধ্যে সে দেখেনি। 
সে ভাবল – আমি ভাগ্যবতী আজ বিধি এঁনার সাথে আমায় মেলালেন। এঁনাকেই আমি স্বামীরূপে বরণ করব। ভাই আমার দুরাচারী। এমন সুন্দর মানুষকে মেরে মনের সুখে খেতে চায়! একে আমি বাঁচাব, স্বামীরূপে লাভ করে চিরকাল এর সাথে সুখে কাটাব। 

-এতসব কামনা করে কামরূপা নিশাচরী হিড়িম্বা দিব্যরূপে সুন্দরী নারী হল। পূর্ণচন্দ্রের মত তার মুখটি হল, নয়ন হরিণের মত চঞ্চল, ভারি স্তন, সুগঠিত স্থূল নিতম্ব। ভুরুটি কামে ধনুকের মত বাঁকা, তিলফুলের মত সুচারু নাসিকা, কানদুটি শকুনিকেও হারায়, উরু দুটি হস্তির মত যেমন বলশালী তেমনি কলাগাছের মতই সুন্দর, মত্ত হস্তিনীর মত তার চলন। চাঁপাফুলের মত তার শরীরের মোহিত করা অঙ্গ শোভা, দেখে মুনিরাও মোহিত হবেন। 
সলজ্জ ভাবে সে ভীমের পাশে এসে বসল ও কোকিলের মত মৃদু সুকন্ঠে বলল – কে তুমি, কোথা থেকে, কি কারণে এ বনে এসেছো! দেবতার মত প্রায় দেখতে এই চারজন যারা মাটিতে ঘুমাচ্ছে তারাই বা কে হন! নিদ্রারতা এই ঘন শ্যামা নিরুপমা নারীই বা তোমার কে হন! 
এই ঘনবনে সবাই অচেতনে নিদ্রা যাচ্ছেন- যান এটি একটি রাক্ষসের বাসস্থান। তোমাদের একটুও ভয় নেই, মনে হচ্ছে খুব দু;সাহস! এই বন পাপাচারী ভয়ঙ্কর হিড়িম্ব রাক্ষসের। সে আমার ভাই হয়। আমাকে এখানে তোমাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। মানুষের শত্রু সে, মাংসের লোভী - তোমাদের খেতে চায়। 
তোমার দেহ সৌন্দর্য দেখে আমার কাম ভাব জাগ্রত হয়েছে, তোমাকে স্বামীরূপে বরণ করতে চাই। আমি মিথ্যে কথা বলছি না, স্বামী! রাক্ষসের থেকে সাবধান হও। তুমি যদি আজ্ঞা কর এক্ষুনি তোমায় অন্যস্থানে নিয়ে যাই। 

হিড়িম্বার কথা শুনে মেঘের মত গম্ভীর স্বরে ভীম বলেন – তোমায় সুলক্ষণী দেখতে, কিন্তু অনীতির কথা বললে যা সভ্য মানুষের মত নয়। মা আর ভাইদের ছেড়ে এক নারীর সাথে চলে যাব এমন দুরাচারী আমি নই। সকলকে রাক্ষসের মুখে ফেলে আমি তোমার সাথে সুখে বাস করবো কামশরে অজ্ঞান হয়ে এমন কাজ করতে, এমন বাক্য বলতে তোমার লজ্জা হল না! 

এত শুনে মৃদু স্বরে যোড়হাতে হিড়িম্বা সুন্দরী বলে –আজ্ঞা করুন মহাশয়! আপনার যারা প্রিয় আমি তাদের প্রাণ রক্ষা করব। আমার দুষ্ট ভাই এখনই এখানে আসবে, তাই আমি আপনাদের সাবধান করছি। এনাদের সবাইকে জাগিয়ে আপনারা আমার পিঠে উঠে বসুন। আমি আপনাদের অন্য নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাব। 

ভীম বলেন –আমার মা ও ভাইরা সুখে নিদ্রা যাচ্ছেন, তাদের কেন বিরক্ত করব। তোমার ভাইকে! তাকে আমি চিনি না, ভয়ও পাই না। কীটের মত আমি রাক্ষসদের মারি। দেবতা-গন্ধর্ব-যক্ষ কেউ আমার পরাক্রমের সামনে দাড়াতে পারবে না। হে সুন্দরী সুলোচনা, আমার হাতদুটি দেখ, যমও এদের ভয় পান। তুমি এখানে থাকবে কি যাবে তা তোমার ইচ্ছে। তবে ভাইকে গিয়ে পাঠাতেও পার। দেখি সে আমার কি করতে পারে। 

ভীম ও হিড়ম্বা যখন আলাপ করছেন তখন ওদিকে বোনের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে প্রচন্ড রেগে হিড়িম্ব রাক্ষস সেখানে উপস্থিত হল। তার অতি ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে মনে হয় যুগান্ত সামনে দাঁড়িয়ে। ঘোড় গর্জন করতে করতে সে এগিয়ে এলো। 

ভাইকে এভাবে আসতে দেখে হিড়িম্বা সুন্দরী স্তব্ধ হয়ে গেল। সকরুন স্বরে ভীমকে বললো –দেখ আমার ভাই প্রচন্ড রেগে দুরন্ত বেগে আসছে। সে অতি নিষ্ঠুর, নির্দয়। অনেক মানুষ খেতে দেখেছি তাকে। তুমি আর দেরি করো না। এটা এই রাক্ষসেরই ভূমি। আজ্ঞা কর প্রভূ, আমার পিঠে করে তোমাদের নিয়ে আকাশে উড়ে যাই, যেখানে বলবে নিমেষে সেখানে নিয়ে যাব-আমি মায়াবিনী। 

হিড়িম্বের রাগ ও হিড়িম্বার উদ্বেগ দেখে ভীম হেসে বললেন- স্থির হও রাক্ষসনন্দিনী, ভয় করো না, তুমি বসে আমার কৌতুক দেখ। আসুক তোমার ভাই, মুহুর্তে সে পতঙ্গের মত প্রাণ দেবে। আমি দুঃখিত যে কিছুক্ষণ পর তোমায় ভাতৃশোকে মুজ্ঝমান হতে হবে ভেবে। 

এই ভারত সঙ্গীত রস শ্রবণ করলে বাড়ে পুণ্য যশ, এটি শুভ ও পরম পবিত্র। কলির কলুষতা নাশ করতেই কাশীরাম রচনা করলেন আদি পর্বে পান্ডব চরিত্র।

Wednesday, July 30, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৬১



জতুগৃহ-দাহঃ 

পরিবার নিয়ে পুরোচন গৃহে শুতে গেলো এবং নিদ্রায় অচেতন হল। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বৃকোদর ভীমকে আজ্ঞা দিলেন এখনই পুরোচনের গৃহে অগ্নি দেওয়ার জন্য। ভীম পুরোচনের দরজায় আগুন দিলেন। ভাইরা মাকে নিয়ে সুরঙ্গে প্রবেশ করলেন। ভীম অন্যান্য গৃহে আগুন লাগিয়ে সুরঙ্গে প্রবেশ করলেন। মাকে নিয়ে পাঁচভাই দ্রুত এগিয়ে চললেন। এদিকে প্রবল বায়ুতে জতুগৃহে আগুন ছড়াতে লাগল। আগুনের উত্তাপে ও শব্দে গ্রামবাসীরা ছুটে এলো। জল নিয়ে সকলে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখার জন্য জতুগৃহের কাছে কেউ যেতে সাহস পেল না। চারদিকে লোকজন হাহাকার করে ঘুরতে লাগল। গালা(জৌ), ঘি, তেলের গন্ধ চারদিকে ছড়াতে লাগলো। দুষ্ট ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতিতেই এই জতুগৃহ নির্মাণ ও তার দুর্বুদ্ধিতেই পান্ডুপুত্রদের ছলনা করে দগ্ধ করা হল-এই কথা সকলে আলোচনা করতে লাগলো। ধর্মশীল পাঁচ ভায়ের কোন অপরাধ ছিল না, তারা ছিলেন সর্ব গুণে গুণী, জিতেন্দ্রিয়, সত্যবাদী। ভাগ্যক্রমে পাপাত্মা পুরোচনও পুড়ে মরেছে। সবই ভাগ্য বলে সবাই আলোচনা করতে লাগল –নির্দোষীদের যারা হিংসে করে নারায়ণ তাদের এমনই শাস্তি দেন। এতসব বলে সকলে পান্ডবদের গূণ স্মরণ করে শোকে রোদন করতে লাগলো। 

এদিকে মায়ের সাথে পান্ডবরা সুরঙ্গ থেকে বেরিয়ে গহন বনে প্রবেশ করলেন। ঘোর অন্ধকার রাত্রি, গহনবন, লতা, বৃক্ষ, কাঁটা পেরিয়ে ছয়জন এগোতে থাকেন। রাজার পত্নী কুন্তী ও তার রাজপুত্ররা অন্ধকারে পথের দিশা ঠিক করতে পারলেন না। পথে চলতে চলতে ক্লান্ত কুন্তী অশক্ত হয়ে পরলেন। যুধিষ্ঠির, ধনঞ্জয় অর্জুন, নকুল ও সহদেবও পথের শ্রান্তিতে ভেঙ্গে পরলেন। কুন্তীদেবী অচেতন হয়ে পরলেন। পাঁচভাইও আর দ্রুত এগোতে পারলেন না। তখন ভীম মাকে কাঁধে বসিয়ে নকুল-সহদেবকে কোলে নিয়ে যুধিষ্ঠির-অর্জুনের হাত ধরে বেগে চলতে লাগলেন। মহাবলী ভীমের চরণে বৃক্ষ, শীলা চূর্ণ হতে লাগল। শেষরাত্রে তারা গঙ্গারতীরে উপস্থিত হলেন। গভীর গঙ্গার জলের বিস্তার দেখে পান্ডবরা চিন্তিত হলেন কিভাবে গঙ্গা পার হবেন। ভীম জলের গভীরতা পরিমাপ করতে গেলেন। 

সে সময় গঙ্গারতীরে একটি পতাকা শোভিত নৌকা উপস্থিত হল। নৌকাটি বিদুরের এক কৈবর্ত (কৃষিজীবী ও মৎসজীবী) অনুচরের। তিনিও গঙ্গাতীরে পান্ডবদের খুঁজছিলেন। দুর থেকে পান্ডবদের দেখতে পেয়ে তিনি নমস্কার করে এগিয়ে এসে বিদুরের সংবাদ দিলেন। 
তিনি বললেন-বিদুর পরম যত্ন্রে আপনাদের গঙ্গার পর পারে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। পান্ডবরা যাতে তাকে অবিশ্বাস না করেন সে জন্য তিনি বিদুরের সেই সঙ্কেতটি বললেন যেটি বারণাবতে আসার সময় বিদুর যুধিষ্ঠিরকে বলেন। যেখানে জন্ম সেখানেই ভক্ষ্য হওয়া শীতল বিনাশের সমান, বিপক্ষের ভয় আছে যেখানে সেই দেশেই যাওয়া ভাল। সেই সঙ্কেত আসার সময় আমায় বলে পাঠালেন গঙ্গা পার করার জন্য। 
তার কথা শুনে পান্ডবদের বিশ্বাস জন্মাল। ছয়জনে নৌকায় আরোহণ করলেন। নৌকা বায়ু বেগে চলল। পুনরায় বিদুরের অনুচর বলে বিদুর আরো বলে পাঠিয়েছেন –কিছুকাল অজ্ঞাতবাসে কোন স্থানে দুঃখকষ্ট সহ্য করে এই দুঃসময় কাটিয়ে নিও। এভাবে গঙ্গার পর পারে পান্ডবরা উপস্থিত হলেন। 
কূলে উঠে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কৈবর্তকুমারকে বলেন বিদুরকে গিয়ে বলবেন ভীষণ বিপদ থেকে আপনার সাহায্যে উদ্ধার হতে পারলাম। তার চেয়ে পান্ডবদের কাছের বন্ধু কেউ আর নেই। তার জন্যেই আজ আমরা প্রাণে বাঁচলাম। আবার ভাগ্য সদয় হলে তার দর্শণ অবশ্যই পাব। এত বলে বিদায়কালীন সম্ভাষণ জানালেন। ভোর হতেই পান্ডবরা বনে প্রবেশ করলেন। গঙ্গার দক্ষিণদিকে কুন্তীসহ পুত্ররা যাত্রা করলেন। উত্তরদিকে নৌকা নিয়ে ধীবর গমন করল। 


এদিকে প্রভাত হলে নগরের লোকজন জতুগৃহের সামনে এসে শোক করতে লাগল। জল দিয়ে আগুন নেভাল। ছাই উল্টে সকলকে খুঁজতে শুরু করল। দ্বারের মধ্যে পুরোচনকে দেখল তার ভাই ও বন্ধুদের নিয়ে পুড়ে গেছে। অস্ত্রগৃহে যত অস্ত্রধারী ছিল তারাও সেখানে পুড়ে মারা গেছে। সকলে প্রতিটি ভস্ম পরখ করে দেখতে লাগল। সে সময় এক সাথে ছয়টি দগ্ধ মৃতদেহ দেখে তারা হাহাকার করে উঠল। ভূমির উপর গড়াগড়ি দিতে লাগলো শোকে। কোথায় কুন্তী কোথায় পান্ডব ভাইরা-সকলে হায় হায় করতে থাকল। চারদিকে ভস্মস্তূপ দেখে ক্রন্দন রোল উঠল। পাপিষ্ঠ দুর্যোধনের এই কাজ। সেই পুরোচনকে জতুগৃহ তৈরী করতে পাঠাল। দুষ্টবুদ্ধি ধৃতরাষ্ট্রও সব জানত। সেই ছলনা করে পান্ডবদের পুড়িয়ে মারল। এখনই আমাদের উচিত হস্তিনাপুরে লোক পাঠিয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে জানান যে তার আর কিছু ভয় নেই, তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে। হস্তিনাপুরে দূত গেল, অন্ধ রাজাকে গিয়ে সব জানান হল। গালায় নির্মিত গৃহে কুন্তীসহ পান্ডুর পুত্ররা রাত্রে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। পরিবারসহ পুরোচনও দগ্ধ হয়েছে। এতশুনে শোকে ধৃতরাষ্ট্র অচেতন হলেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান হলে কুন্তী ও পাঁচপুত্রের নাম করে হাহাকার করতে করতে কাঁদতে লাগলেন। নিজেই নিজেকে দোষ দিতে লাগলেন –আমিই পান্ডবদের মারলাম। ভাতৃশোকে এ পাপ ছিল না। এমন বহুবিধ বিলাপ করতে লাগলেন অন্ধরাজা। অন্তঃপুরীর ভিতরও সংবাদ গেল। গান্ধারীসহ যত পুরনারীরা ছিলেন সকলে আকুল হয়ে শোক করতে লাগলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, পন্ডীত বিদুর সকলে পান্ডবদের মৃত্যু শুনে শোকাতুর হলেন। নগরের লোকেরা পান্ডবদের গুণের কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগল। কেউ যুধিষ্ঠিরের নাম নিয়ে হাহাকার করে, কেউবা ভীম কেউ অর্জুন ও মাদ্রীপুত্রদের কথা ভেবে, অনেকে মা কুন্তীর কথা ভেবে কেঁদে ওঠে। এভাবে নগরে সকলে পান্ডবদের হারিয়ে শোকে আকুল হয়ে উঠল। শেষে ধৃতরাষ্ট্র বিধান মত শ্রাদ্ধ করালেন। ব্রাহ্মণদের বহু রত্ন ও গরু দান করলেন। 

এদিকে পান্ডবরা অতি কষ্টে হিড়িম্বের অরণ্যে প্রবেশ করল। পথ শ্রমে, ভয়ে, ক্ষুদায় ও তৃষ্ণায় কুন্তী আর চলতে পারেন না। তিনি পাঁচপুত্রকে ডেকে বলেন – বহুদুর এই অরণ্যের ভিতর চলে এলাম, তৃষ্ণায় আমার প্রাণ যায়, আর বিনা জলপান করে যেতে পারব না। কিছুক্ষণ এই স্থানে বিশ্রাম নেওয়া যাক। শুনে চিন্তিত হয়ে যুধিষ্ঠির বলেন - না জানি পুরোচন মরল কি বেঁচে গেল, সে দুষ্ট দুর্যোধনের মন্ত্রী। আমাদের সমাচার কেউ যদি তাদের গিয়ে জানায় তবে তো তারা সৈন্য সাজিয়ে এখানে যুদ্ধ করতে চলে আসবে। তখন আমরা কি করবো। 
ভীম বলেন এখানে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, জলপান করে তৃপ্ত হয়ে আবার রওনা হওয়া যাবে। চারভাই ও মাকে একটি বটমূলে বিশ্রাম করতে রেখে ভীম জলের খোঁজে বেরিয়ে পরল। জলচরদের শব্দ শুনে শুনে জলের কাছে তিনি পৌছালেন। জলে নেমে ভীম স্নান করলেন এবং প্রাণ ভরে জলপান করলেন। কিন্তু মা ও ভাইদের জন্য জল নিয়ে যাওয়ার জন্য কোন পাত্র খুঁজে পেলেন না। কিছু না পেয়ে ভীম কাপড় ভিজিয়ে বস্ত্রে করেই জল নিয়ে চললেন। জলের খোঁজে তিনি প্রায় দুই ক্রোশ চলে আসেন। দ্রুত তিনি মা ও ভাইদের কাছে ফিরে চললেন। এসে দেখেন সকলে নিদ্রায় অচেতন। তাদের দেখে ভীমের প্রচন্ড মনোকষ্ট হল। তিনি আপন মনে প্রলাপ শুরু করলেন। -বসুদেবের বোন, ভোজরাজের রাজকন্যা, বিচিত্রবীর্য্যের পুত্রবধু, মহারাজ পান্ডুর পত্নী -যিনি বিচিত্র পালঙ্কের মনোহর শয্যায় শয়ন করতেন, আমাদের সেই মা আজ ভূমিতে শুয়ে আছেন। বিধি কি বিধান লিখলেন কপালে! পদ্মের মত কোমল শরীর হেন ভাইরাও আজ মাটিতে লুটিয়ে আছে। ঈশ্বরের মত সত্যবাদী যোগ্যবান সহজ মানুষ বড়ভাই, বীর্যবন্ত অর্জুন, অনুপম সহদেব, সুন্দর নকুল –এই সর্বগুণ সম্পন্ন ভাইদের ভূমিতে শুয়ে থাকতে দেখে তিনি হাহাকার করতে লাগলেন। তাদের এই দুর্গতির জন্য দায়ি দুষ্টবুদ্ধির জ্ঞাতি ভাই দুর্যোধন। বিপদে লোকে জ্ঞাতির কাছেই সাহায্য পায়। বনে যেমন বৃক্ষে বৃক্ষকে রক্ষা করে। কিন্তু কুলাঙ্গার দুর্যোধন জ্ঞাতি শত্রু। তার জন্য আজ পাঁচভাই বনে ঘুরে ফিরছি। দুর্যোধন, কর্ণ আর শকুনি দুর্মতি –ধৃতরাষ্ট্র এই তিনজনের অনীতি পরামর্শ গ্রহণ করলেন! লোভে তারা ধর্ম মানল না, পাপে নিমগ্ন হল। আসলে পুণ্যবলে দুষ্ট পাপীলোক জয় লাভ করতে পারবে না সৎলোকের বিরুদ্ধে। কোন দেবতাও এমন বর দেবেন না। তারা যে অন্যায় আমাদের সাথে করল কেউ কখনও জ্ঞাতির সাথে তা করে না। দৈবের নির্বন্ধ কখনও খন্ডন হওয়ার নয়। রাজা ধৃতরাষ্ট্র যখন এমন অন্যায় করতে পারলেন, বিধি মতে শাস্তিও তখন আমিই তাকে ভাল ভাবে দেব। সকলের চেয়ে বড় এবং শক্তিতে শ্রেষ্ঠ দুষ্ট ধৃতরাষ্ট্রকে নিষেধ করার ক্ষমতাও অন্য রাজাদের নেই। রাজার এই পাপই কৌরবদের নিধন করবে। অবশ্যই তার শতেক পুত্রকে হত্যা করব। এত দুঃখ আমার ঈশ্বরসম বড়ভাই যুধিষ্ঠির কেন সহ্য করছেন! তার সামান্য নির্দেশ পেলেই সকলকে সংহার করতে পারি। মহাধর্মশীল তুমি ধর্মে তৎপর বলেই তোমায় এত দুঃখ পেতে হয়, হে গুণের সাগর যুধিষ্ঠির! দয়াশীল বলেই তুমি আজ্ঞা দিলে না গদা দিয়ে সকল দুষ্টের দমনের। সে কারণে এখনও দুষ্ট তোমাদের জীবন রয়ে গেল। ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের সাথে ছলনা করে আজ আমাদের সকলকে এই দুঃখে পতিত করলে। তিনি জানেন আমি সকলকে সংহার করতে পারি, তবু ধর্মের কারণে আজ্ঞা দিচ্ছেন না। 
এসব বলতে বলতে বৃকোদর রেগে গেলেন। দুই চোখ কচ্‌লে লাল করে তুললেন। আবার মা ও ভাইদের দেখে ক্রোধ দমন করলেন। তাদের নিদ্রাভঙ্গ করা ঠিক হবে না ভেবে তাদের পাশে বটবৃক্ষমূলে জেগে বসে পাহারা দিতে লাগলেন। 

সে সময় হিড়িম্ব নামে এক নিশাচর ভয়ঙ্করদর্শ রাক্ষস দন্তপাটি বার করে জিভ লক্‌লক্‌ করে তাদের লক্ষ্য করছিল। তার দীর্ঘ কর্ণ, রক্তবর্ণ চক্ষু কূপের মত কোঠরে ঢোকা। কুচ্‌কুচে কাল, বিশাল মাথা। সে কাছেই এক গাছের উপর বসেছিল। মানুষের গন্ধ পেয়ে লোভে অন্ধ হয়ে সে চারদিকে চাইতে লাগল। বটবৃক্ষমূলে ছয়জনের চাঁদের মত রূপ দেখে তার জিভে জল এলো। মনে মনে খুশি হয়ে সে তার স্বসা অর্থাৎ বোন হিড়িম্বাকে বললো – কতদিন আমরা খাবার না পেয়ে উপবাসে আছি। দেখ দৈব যোগে মানুষ নিজে এসে হাজির হয়েছে। ভাল সময় মাংস উপস্থিত। ছয়জনকে এক্ষুনি গিয়ে ধরে আন। ভয় পাবে না, এটা আমার বন, এখানে কেউ তোমার বিরোধ করবে না। ভায়ের কথা শুনে রাক্ষসী হিড়িম্বা ভীম যেখানে বসে ছিলেন সেখানে উপস্থিত হল। 
মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers