Blog Archive

Sunday, December 14, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৭০

 
কল্মাষপাদ রাজার উপাখ্যানঃ 

বিশ্বামিত্র মুনি হলেন অতি মহান যোগী তপস্বী। তাঁর সমান কেউ নেই। কিন্তু বিশ্বামিত্রের মনে সব সময় বশিষ্ঠের অপমানের কথা মনে ছিল। সুর(দেবতা), অসুর, নাগ, নর সকলে বশিষ্ঠের পূজা করে। দেবরাজ তাঁর সাথে বসে সুধা পান করেন। এত সব ভেবে ভেবে তিনি বশিষ্ঠের উপর আরো ক্রোধিত হলেন। বশিষ্ঠের কোন ছিদ্রতা, দুর্বলতার খোঁজে তিনি ঘুরতে লাগলেন। 

ইক্ষ্বাকুবংশের রাজা সর্বগুণ সম্পন্ন, সংসারে তিনি কল্মাষপাদ নামে বিখ্যাত। মহা মুনি বশিষ্ঠ তাঁর পুরহিত। রাজা যজ্ঞের কারণে বশিষ্ঠকে আমন্ত্রণ জানালেন। কিছু কাজ থাকায় বশিষ্ঠ আসতে পারলেন না। রাজা বলে পাঠালেন তিনি তখনই যজ্ঞ করতে চান। তবু বশিষ্ঠ না এলে রাজা রেগে গেলেন ও বিশ্বামিত্রকে যজ্ঞ করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। রাজা নিজে বিশ্বামিত্রকে নিয়ে এলেন। 
পথে বশিষ্ঠের পুত্র শক্ত্রির সঙ্গে দেখা হল। 
রাজা বলেন – মুনিবর আমার পথ ছেড়ে যান। 
শক্ত্রি বলেন – রাজা আমাকে আগে যেতে পথ দিন। 
রাজা বলেন – এ পথ রাজার, সবাই তা যানে। তাই আপনি আগে পথ ছাড়ুন। আমি এখনই যজ্ঞ করতে যাব। 
শক্ত্রি বলেন – বেদে আছে ব্রাহ্মণকে আগে পথ ছেড়ে দিতে হয়। আপনি একটু পথ ছাড়ুন, আমি চলে যাই। 
 
শক্ত্রি 

এইভাবে দু’জনের কথা কাটাকাটি হতে লাগল, কেউই পথ ছাড়তে রাজি হলেন না। রাজা রেগে গিয়ে হাতে যে দন্ড ছিল তা দিয়ে মুনিকে প্রহার করলেন। আঘাতে শক্ত্রির শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। 
শক্ত্রি মুনি রেগে গেলেন। ক্রুদ্ধ চোখে রাজাকে বললেন – উচ্চবংশে জন্মে এমন নীতি বিরুদ্ধ কাজ করলি। দুর্বুদ্ধিতে তুই ব্রাহ্মণকে হিংসা করলি! এই পাপে আমার অভিশাপে তুই নিশাচর হবি। নরমাংস ভোজী রাক্ষসে পরিণত হবি। 

শাপ শুনে সৌদাসপুত্র কল্মাষপাদ ভয় পেলেন। তিনি শক্ত্রিমুনিকে প্রসন্ন করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। কল্মাষপাদকে যজমানরূপে পাওয়ার জন্য বিশ্বামিত্রেরও চেষ্টা ছিল। 
রাজা যখন কাকুতি মিনতি করছেন তখন বিশ্বামিত্রের আদেশে কিংকর নামে এক রাক্ষস রাজার শরীরে প্রবেশ করল। সঙ্গে সঙ্গে রাজা হতজ্ঞান হলেন। বিশ্বামিত্র মুনিও সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্দ্ধান হলেন। সামনে শক্ত্রিমুনিকে পেয়ে রাজা তাকে বাঘের মত চেপে ধরল। রাজা রেগে বলে – দুষ্ট তুমি আমাকে শাপ দিলে, এবার ফল ভোগ কর। 
বলেই শক্ত্রিকে বধ করে তাঁর ঘাড়ের রক্ত খেল। শক্ত্রিকে ভক্ষণ করে তাঁর ভয়ঙ্কর মূর্তি হল। উন্মাদের মত বনের ভিতর ঘুরতে লাগল। বিশ্বামিত্রমুনি এ অবস্থায় দেখে কৌশলে তাকে বশিষ্ঠের আশ্রমে নিয়ে গেলেন ও মুনির শতপুত্রকে দেখিয়ে দিলেন। রাক্ষস এক এক করে শতপুত্র ভক্ষণ করল। 
 
রাক্ষস রাজা 
বশিষ্ঠ আশ্রমে ফিরে পুত্রদের না দেখতে পেয়ে অবাক হলেন। ধ্যানের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন বিশ্বামিত্রের প্ররোচনায় রাক্ষস তাঁর শতপুত্রসহ শক্ত্রিকে ভক্ষণ করেছে। অতি ধৈর্য্যবন্ত হলেও তিনি শতপুত্রের শোক সহ্য করতে পারলেন না। পুত্রশোকে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। শোকাতুর মুনি সমুদ্রে ঝঁপ দিলেন। সমুদ্র তা দেখে সস্নেহে তাকে কূলে রেখে গেল। সমুদ্রে মরণ হল না দেখে মুনি উচ্চ পর্বতে উঠলেন। সেখান থেকে ঝাঁপ দিলেন। বিশ সহস্র ক্রোশ উঁচু থেকে পরেও মুনি তুলোর রাশির উপর পরলেন। তিনি শোকে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। এবার শোকতপ্ত মুনি আগুনের মাঝে প্রবেশ করলেন। অগ্নিও নিজেকে প্রসারিত করে আকাশ স্পর্শ করে শীতল হয়ে গেল। মুনিকে অগ্নির তাপ স্পর্শ করল না। এরপর বশিষ্ঠ ঘন অরণ্যে প্রবেশ করলে হিংস্র বন্য পশু- বাঘ, হাতী, ভাল্লুক, শুকর সকলে শোকাতুর মুনিকে দেখে পালালো। এভাবে অনেক চেষ্টা করেও বশিষ্ঠ মৃত্যু বরণ করতে পারলেন না। শোকে মুনি নানা দেশ ভ্রমণ করতে লাগলেন। অনেকদিন পর শেষে নিজের আশ্রমে ফিরলেন। ঘরে প্রবেশ করে শতপুত্রকে দেখতে না পেয়ে আবার পুত্রশোকে তাঁর শরীর অবশ হল। তিনি পূর্বকাল স্বপ্নের মত দেখতে লাগলেন, চারদিকে পুত্রেরা উচ্চ কন্ঠে বেদপাঠ করছে। এসব চিন্তা করতে করতে বশিষ্ঠ কষ্ট পেতে লাগলেন। গৃহে প্রবেশের মন চাইল না। পুনরায় তিনি দেশান্তরি হলেন। আবার আত্মহত্যার নানা চেষ্টা তিনি করতে লাগলেন। দেখলেন একটি গভীর নদীতে লক্ষ লক্ষ ভয়ঙ্কর কুমীর ভাসছে, তাতে ঝাঁপ দিতে গেলেন মুনি। সে সময় পিছন থেকে বেদপাঠের ধ্বনি শুনতে পেলেন। বিস্মিত হয়ে মুনি পিছন ফিরে দেখলেন শক্ত্রির স্ত্রী বিধবা অদৃশ্যন্তী দাঁড়িয়ে আছে। 

 
শক্ত্রির স্ত্রী বিধবা অদৃশ্যন্তী 

যোড়হাতে শক্ত্রির বিধবা স্ত্রী বলেন – প্রভূ, আমি আপনার সাথে এখানে এসেছি। 
মুনি প্রশ্ন করেন – তোমার সঙ্গে আর কে আছে! শক্ত্রির মত কণ্ঠস্বরে কে যেন বেদপাঠ করছিল মনে হল! 
অদৃশ্যন্তী বিনয়ের সঙ্গে জানান – আমার গর্ভে শক্ত্রির পুত্র বড় হচ্ছে। বার বছর ধরে সে বেদ অধ্যয়ন করেছে, সেই বেদপাঠ করছিল। 
তাঁর বংশের সন্তান জীবিত আছে জেনে বশিষ্ঠ আনন্দিত হয়ে পুত্রবধূকে নিয়ে আশ্রমে চললেন। পথে রাক্ষসরূপী কল্মাসপাদের সাথে দেখা হল। রাক্ষস বশিষ্ঠকে দেখে ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করে তাকে খেতে গেল। তাঁর বিকটরূপ দেখে অদৃশ্যন্তী থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। বশিষ্ঠ তাঁর ভীত পুত্রবধূকে বললেন – ভয় নেই, ইনি কল্মাষপাদ রাজা। 
এই বলে তিনি হুঙ্কার করে কল্মাষপাদকে থামিয়ে তাঁর গায়ে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে তাকে শাপমুক্ত করলেন। চেতনা পেয়ে রাজা পূর্বের কথা সব মনে পরল। কৃতাঞ্জলিপুটে তিনি বশিষ্ঠের স্তব করে বলেন – অধম, পাপিষ্ঠ আমি, আমার পাপের অন্ত নেই। আপনি দয়াবন্ত, দয়া করুন, মুনিরাজ! 
মুনি বলেন- শীঘ্র অযোধ্যা নগরে ফিরে গিয়ে রাজ্য শাসন কর। কিন্তু আর কখনও ব্রাহ্মণের অপমান করো না। 
রাজা কল্মাষপাদ বলেন – আমি আপনার আজ্ঞাধীন হয়ে দ্বিজ-ব্রাহ্মণদের পূজা করব। সূর্যবংশে আমার জন্ম সৌদাস রাজার পুত্র আমি। এমন কিছু করুন যাতে আমায় কেউ নিন্দা না করে। 
আশীর্বাদ পেয়ে রাজা অযোধ্যায় ফিরলেন। পুত্রবধূকে নিয়ে বশিষ্ঠ নিজের ঘরে এলেন। কিছুদিন পর শক্ত্রির বিধবা স্ত্রী অদৃশ্যন্তী একটি পুত্র জন্ম দিল। ইনি হলেন মুনি পরাশর। পৌত্র দেখে বশিষ্ঠের শোক নিবৃত্ত হল। তিনি অতি যত্নে বালককে শিক্ষাদান করতে লাগলেন। শিশুকাল থেকেই পরাশর মহা মুনি। তিনি বশিষ্ঠকেই পিতা বলে জানতেন। একদিন পরাশর মায়ের সামনেই বশিষ্ঠকে পিতা বলে সম্বোধন করলে অদৃশ্যন্তী সাশ্রুনয়নে বলেন – পিতৃহীন পুত্র আমার বড় অভাগা। পিতামহকে পিতা বলে আর ডেকো না। যখন তুমি আমার গর্ভে ছিলে, তখনই তোমার পিতাকে বনে রাক্ষস খেয়ে নেয়। 
মায়ের মুখে একথা শুনে, বিশেষ করে মায়ের শোক ক্রন্দন দেখে পরাশর মুনি রাগে কাঁপতে লাগলেন। ক্রুদ্ধ পরাশর চিন্তা করতে লাগলেন- বিধাতা এত বড় নির্দয়! রাক্ষসের হাতে আমার পিতাকে মারলেন! আজ আমি বিধাতার সব সৃষ্টি বিনাশ করব। ত্রিলোকে তাঁর সৃষ্টির একজনকেও রাখব না। 
 
পরাশর মুনি 
পরাশর যখন এই সংকল্প করছেন বশিষ্ঠ মুনি সব কথা জানতে পারলেন। পৌত্রকে নিরস্ত করার জন্য মধুর বচনে প্রবোধ দিয়ে বলেন – অকারণে শিশু তুমি কার উপর রাগ কর! ক্রোধ ব্রাহ্মণের উচিত কর্ম নয়। বেদে বলে ক্ষমা ও শান্তি ব্রাহ্মণের ধর্ম। কর্ম অনুসারে শক্ত্রির এমন মৃত্যু হল। তাঁর জন্য অনুশোচনা করো না। কার এত শক্তি তাকে মারতে পারে। সবাই সংসারে কর্ম অনুরূপ ফল পায়। ক্রোধ শান্ত কর, বস! তত্ত্বে মন দাও। অকারণে সৃষ্টির বিনাশ কেন করবে। এই বলে এক উপাখ্যান শোনান।

মহাভারতের কথা অমৃত লহরী। শুনলে অধর্ম ক্ষয় হয়, পরলোকের পায় তরি। 
.................................... 

Sunday, November 30, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৬৯

 

বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠ বিরোধ: 

অর্জুন বিস্মিত হয়ে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ মুনির অদ্ভূত কলহের কারণ জানতে চাইলেন। 

গন্ধর্ব তখন সে সব পুরানো কথা বললেন- ব্রহ্মার মানসপুত্র বশিষ্ঠ, অরুন্ধতির পতি এবং ইক্ষাকুকুলের পুরোহিত। 
 
অন্যদিকে কান্যকুব্জ দেশে কুশিকের পুত্র হলেন গাধি, তার পুত্র বিশ্বামিত্র ছিলেন সর্ব গুণ সম্পন্ন। বেদ, বিদ্যা, বুদ্ধিতে ভুবন বিখ্যাত। 
 
একদিন তিনি সসৈন্য মৃগয়া করতে মহাবনে প্রবেশ করলেন। মৃগয়ায় শ্রান্ত রাজা ক্ষুদা-পিপাসায় পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। মনোহর স্থান দেখে রাজা খুশি হলেন। রাজাকে দেখে মুনি অতিথি সৎকারে মন দিলেন। রাজার সৈনিকদের পরিশ্রান্ত দেখে তিনি তার কামধেনু নন্দিনীকে ডেকে বললেন– দেখ রাজার সৈন্যরা আমার অতিথি। যে যা চায় তাই দিয়ে তাকে তুষ্ট কোরো। 
 
বশিষ্ঠ মুনির আজ্ঞা পেয়ে সুরভী সংসারে যা অদ্ভূত তেমন কর্ম করল। হুঙ্কার দিয়ে নানা দ্রব্য আনলেন চর্ব্য-চষ্য-লেহ্য-পেয় নানা রত্ন ধন। বস্ত্র, অলঙ্কার, মালা, কুসুম, চন্দন, বিচিত্র পালঙ্ক আর বসার আসন। যে যা চাইতে লাগলো, তাই পেলো। সকল সৈন্য আনন্দিত হল। 
 
দরিদ্র মুনির এমন বিস্ময় কর্ম দেখে গাধির পুত্র বিশ্বামিত্র অবাক হলেন। বশিষ্ঠের কাছে গিয়ে বলেন– আমি আপনাকে এক কোটি গরু দান করবো, যাদের খুর সোনায় মন্ডিত করে দেব। তার পরিবর্তে এই ধেনু আমায় দিন। অথবা আপনি যদি চান আমি রাজ্যও দিতে রাজি আছি। হস্তী, অশ্ব, পদাতিক যত সৈন্য সব আপনাকে দেব এই ধেনুর পরিবর্তে। 

বশিষ্ঠ বলেন– আমি কামধেনু দান করব না। এটি দেবতা ও অতিথিদের জন্য আমার কাছে আছে। 

রাজা বলেন– মুনি, তুমি জাতে ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণদের এমন জিনিষের প্রয়োজন হয় না। এ কেবল রাজার ঘরেই সাজে। একে বনে নিয়ে তুমি কি করবে। নিজের ইচ্ছেতে ধেনু দান না করলে, যেন আমি বল প্রয়োগ করে ছলে-বলে-কৌশলে একে অধিকার করবো। 

বশিষ্ঠ বলেন- তুমি তোমার দেশে শ্রেষ্ঠ, তাও সৈন্য সামন্ত নিয়ে। যা ইচ্ছে তুমি করে দেখ। আমি তপস্বী- আমার আর কি শক্তি! 
 
শুনে বিশ্বামিত্র সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন – কামধেনু সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চল। 
শুনে সৈন্যরা কামধেনুর গলায় দড়ি বেঁধে পিছনে বাড়ী মেরে মেরে নিয়ে চললো। প্রচন্ড মার খেয়েও কামধেনু নড়ল না। সজলাক্ষে ব্যাকুল ভাবে মুনির মুখের পানে চেয়ে রইলো। 
মুনি বলেন – নন্দিনী, আমার কাছে তুমি কি চাও। আমার সামনে তোমার এত কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমি সামান্য তপস্বী ব্রাহ্মণ, আমি আর কিবা করতে পারি তোমার জন্য। রাজা বল প্রয়োগ করে তোমায় নিয়ে যেতে চায়। 
সে সময় রাজার সৈন্যরা কামধেনুর সন্তান ছোট্ট বাছুরটিকে ধরে গলায় দড়ি বেঁধে আগে আগে টেনে নিয়ে চললো। সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে কামধেনু নন্দিনী ডাক ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মুনিকে বলে – ভগবান, বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের কশাঘাতে অনাথা আমি ও আমার সন্তান বিলাপ করছি। আপনি তা উপেক্ষা করছেন কেন! আমি কি করবো আজ্ঞা করুন। 
মুনি দুঃখিত হয়ে বলেন – ক্ষত্রিয়ের বল তেজ, ব্রাহ্মণের বল ক্ষমা। কল্যাণী, আমি তোমায় ত্যাগ করিনি। নিজের শক্তিবলে যদি থাকতে পার, তবে আমার কাছেই থাক, এর বেশি আর কি বলবো। 
 
মুনির মুখে একথা শোনা মাত্র পয়স্বিনী(দুগ্ধবতী গাভী) কামধেনু ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। ঊর্দ্ধমুখে গাভী হাম্বা রবে ডাক ছেরে শরীর বাড়াতে লাগল এবং বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের তাড়াতে লাগলো। তার বিভিন্ন অঙ্গ থেকে নানাজাতির সৈন্য লাখে লাখে বের হল। পুচ্ছ থেকে পহ্লব নামে জাতি নানা অস্ত্র হাতে তেড়ে এল। মূত্রে জন্ম হল বহু ব্যাধের। দুই পাশ থেকে জন্ম নিল কিরাত ও যবন। মুখের ফেণা থেকেও অনেক সৈন্যের জন্ম হল। চারি পা হতে নানাজাতির ম্লেচ্ছরা জন্ম নিল। সকলে নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের তাড়া করল। দুই দলের সৈন্যদের প্রচন্ড যুদ্ধ হল। বিশ্বামিত্রের একজন সৈন্যের বিরুদ্ধে মুনির পাঁচজন সৈন্য হল। সহ্য করতে না পেরে বিশ্বামিত্রের সৈন্যরা রণে ভঙ্গ দিল। রাজার সামনেই তারা পালাতে লাগল। অনেক সৈন্য রক্তের নদীতে আহত হয়ে পরে রইল। এভাবে মুনির সৈন্য রাজার সৈন্যদের পিছনে পিছনে দৌড়ে তাদের বিতাড়িত করল। মুনির সৈন্য বিশ্বামিত্রকেও বনের বাইরে পাঠিয়ে মুনিকে এসে প্রণাম করল। 

বিশ্বামিত্র সব দেখে শুনে বড়ই অপমানিত বোধ করলেন। এমন অদ্ভূত ঘটনা দেখে তিনি মনে মনে আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে বলেন – ক্ষত্রিয় বলকে ধিক্‌! ব্রহ্মতেজই বল। সব দেখে বুঝেছি তপস্যাই পরম বল। সামান্য বিবাদে একটি ব্রাহ্মণ তপস্বীকে পরাজিত করতে পারলাম না, এ জন্মের আর কোন প্রয়োজন দেখি না। তপস্যা করে আমিও ব্রাহ্মণ হব, না হলে প্রাণত্যাগ করব। এসব ভেবে তিনি সব সৈন্যদের দেশে পাঠিয়ে গহন বনে তপস্যা করতে গেলেন। 
 
বিশ্বামিত্রের সেই তপস্যা ছিল সাঙ্ঘাতিক। তার তপে ত্রিভুবন তপ্ত হয়ে উঠল। গ্রীষ্মকালে রাজা চারদিকে হোমাগ্নি জ্বেলে তার মাঝে ঊর্দ্ধপদে তপস্যা করেন। নাকে, মুখে রক্ত বহে ভয়ঙ্কর দেখালো। ধিরে ধিরে রাজা অস্থি-চর্মসার হয়ে ওঠেন। আহার কেবল পবন(বাতাস)। বর্ষাকালে উন্মুক্ত স্থানে যোগাসনে বসেন। ঘোর বৃষ্টিবাদলের মাঝে তিনি অচেতন হয়ে তপস্যায় রত। শীতকালে হীনবস্ত্র নিরাশ্রয়ে থাকেন। এই ভাবে সহস্র বছর তিনি তপস্যা করলেন। তাঁর তপে ব্রহ্মা তুষ্ট হয়ে বর দিতে এলেন। 

ব্রহ্মা বলেন- বর প্রার্থনা কর, গাধির নন্দন, বিশ্বামিত্র! 
বিশ্বামিত্র যোড় হাতে বলেন- আমায় ব্রাহ্মণ করে দিন। 
বিরিঞ্চি(ব্রহ্মা) বলেন – ক্ষত্রিয়কুলে তোমার জন্ম। তুমি কি ভাবে ব্রাহ্মণ হবে! এতো দুস্কর কর্ম! অন্য যে কোন বর প্রার্থনা কর। 
বিশ্বামিত্র ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন – অন্য আর কিছুর প্রয়োজন নেই। 
ব্রহ্মা বলেন – পরের জন্মে তুমি ব্রাহ্মণই হবে। এখন যা চাও প্রার্থনা করে নাও। 
বিশ্বামিত্র বলেন- আমি অন্য কিছু চাই না। ব্রাহ্মণত্ব দান করুন না হয় প্রাণ নিন। 
এত কথা শুনে বিধাতা(ব্রহ্মা) সে স্থান ত্যাগ করলেন। 

গাধি পুত্র বিশ্বামিত্র পুনরায় তপস্যা শুরু করলেন। ঊর্দ্ধবাহু, ঊর্দ্ধমুখ করে এক পায়ের আঙ্গুলে দাঁড়িয়ে থাকেন। তপ করতে করতে তিনি শুষ্ক কাঠের মত হয়ে গেলেন। কেবল হাড়ের খাঁচায় প্রাণটা রয়ে গেল। তাঁর এই প্রচন্ড তপস্যার তেজে তিনলোক তপ্ত হতে লাগলো। ইন্দ্রাদি সকল দেবতারা ভয় পেলেন। এত সহ্য করতে না পেরে ব্রহ্মা আবার এসে বিশ্বামিত্রকে মিনতি করলেন বর চাওয়ার জন্য। 
 
বিশ্বামিত্র বলেন –আমি আগেই বলেছি আমি কি চাই। বর দিতে চাইলে আমাকে ব্রাহ্মণ কর। 
এবার ব্রহ্মা এড়িয়ে যেতে পারলেন না। তিনি নিজের উত্তরীয় বিশ্বামিত্রের গলায় পরিয়ে দিলেন। এভাবে ব্রহ্মা বর প্রদান করে ব্রহ্মলোকে ফিরে গেলেন। 
.................................... 

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers