Blog Archive

Tuesday, February 24, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৮২

[পূর্বকথা - দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্ষত্রিয়দের বারবার লক্ষ্যভেদের জন্য অনুরোধ জানাতে লাগলেন...শেষে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞায় লক্ষ্য ভেদ করতে উঠলেন... তিনি গুরুজনদের প্রণাম জানালেন...কৃষ্ণ বলরামকে বলেন তিনি অর্জুনকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবেন ...অর্জুন অনায়াসে লক্ষ্যভেদে সক্ষম হলেন ...অন্যান্য রাজা ক্রুদ্ধ হল... অর্জুনের সাথে তাদের যুদ্ধ শুরু হল

দ্বিজগণের সহিত ক্ষত্রগণের যুদ্ধঃ 
 
প্রলয়কালে যেমন সাগর উথলে ওঠে, তেমনি রাজারা ‘মার, মার’ শব্দে ধেয়ে এলো। চারদিকে সবার মুখে একই রব-দুষ্টমতি দ্বিজ ব্রাহ্মণদের আজ মেরে ফেলতে হবে। 
সেই সিংহনাদে ব্রাহ্মণরা প্রমাদ গণল। যুধিষ্ঠিরকে ডেকে তারা বলে –দেখ মনে হচ্ছে যেন শেষকাল উপস্থিত। বাঁধভাঙ্গা সমুদ্র যেন উথলাচ্ছে। চল সকল ব্রাহ্মণ-আমরা দ্রুত এখান থেকে চলে যাই। মরতে এই ব্রাহ্মণদের আমরা সঙ্গে আনলাম। নিজে তো মরবেই সঙ্গে অন্য দ্বিজ-ব্রাহ্মণদেরও দুঃখ দেবে। ক্ষত্রিয় রাজাদের সঙ্গে মিছে বিবাদ ঘটাল। দক্ষিণার অভিপ্রায় ত্যাগ করে এখন প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে হয়। এখানে থাকলে মরতে হবে। ক্ষত্রিয়ের কাজ কখনও ব্রাক্ষণকে সাজে না। রাজকন্যা দেখে লোভে লক্ষ্যভেদ করে বসল। যাক্‌ সে সব কথা বলে আর লাভ নেই। দেখ ক্ষত্রিয়রা ‘দ্বিজ মার’ রব তুলে এগিয়ে আসছে। 
পালাও, পালাও বলে সব ব্রাহ্মণরা ডাকতে লাগল। 

মুনিরাও ঊর্দ্ধমুখে পালাল। বিশসহস্র শিষ্য নিয়ে মার্কন্ড মুনি, পঞ্চাশজন শিষ্য নিয়ে কৌন্ডমুনি পালালেন। বাইশসহস্র শিষ্য নিয়ে ব্যাস পালালেন। পুলস্ত্যমুনিও পিছু নিলেন। ষাটশত শিষ্য নিয়ে পালালেন দুর্বাসা। পচিশসহস্র নিয়ে পরাশরমুনিও স্থান ত্যাগ করলেন। 
চারদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু হল। সব দেখে দ্বন্দ্ব প্রিয় ঋষি আনন্দিত হয়ে উল্লাসে করতালি দিয়ে নাচেন। ‘লাগ, লাগ’ বলে ডাক ছাড়ে আর ক্ষণে ক্ষণে রাজাদের গালি দিতে থাকে -ক্ষত্রকুলে তোমাদের জন্ম ব্যর্থ হল। একজন বামুন সকলকে পরাজিত করল। কন্যা নিয়ে সে যদি এই সভা ছেড়ে যায় তবে কোন লজ্জায় তোমরা মুখ দেখাবে! 
এই বলে ঊর্দ্ধবাহু নাচে ঋষিবর। 
তা শুনে রাজারা ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রাহ্মণদের সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু করল। যদিও সকল ক্ষত্রের অস্ত্র ইন্দ্রপুত্র অর্জুন সহজেই কাটলেন। নিজের অস্ত্রে রাজাদের প্রহার করতে লাগলেন। কারো ধনুক কাটা গেল, কারোবা গুণ, কারো কাটে খড়্গ, তো কারো তূণ। কেউ সারথি হারায়, কেউ বা রথ, কারোবা শর, শেল, শূল, শক্তি সব নষ্ট হল। শেষ পর্যন্ত সকল রাজা নিরস্ত্র হল। দশ দশ বাণে সবাইকে বিদ্ধ করলেন অর্জুন। মুখে, বাহুতে, পায়ে বাণ খেয়ে কেউ মূর্ছা গেল, কেউ বা গড়াগড়ি খেতে লাগল। সকল সারথিরা ভয়ে রথের মুখ ঘুরিয়ে নিল। চারদিকে রাজারা যুদ্ধ ভঙ্গ দিয়ে পালাতে শুরু করল। 
পেছন ফিরে পার্থ কৃষ্ণাকে আশ্বাস দিতে থাকেন। 

তাই দেখে বীর কর্ণ খলখল করে হেসে বলে –কি কাজ করছ দ্বিজ, তোমার কি লজ্জা নেই! সভার মাঝে পরের নারীর সাথে সম্ভাষণ করছ! আগে কৃষ্ণাকে নিজের স্ত্রী কর, তারপর তাঁর সাথে কথা বলতে এসো। ভিক্ষুক হয়ে এ অদ্ভূত ইচ্ছা কি ভাবে হল যে রাজার কন্যাকে কামনা কর। 

পার্থ ঘুরে রাধার পুত্রকে বলেন –কর্ণ তুমি এখনও জীবিত! ওরে দুরাচার, ধন্য তোর প্রাণ! আমার বাণ খেয়েও বেঁচে আছিস। 

কর্ণ বলে -দ্বিজ বুঝে ভাষা প্রয়োগ কর। তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ জানি না। ব্রাহ্মণ বলেই তোমায় অনুরোধ করলাম। আমি রেগে গেলে কারো প্রাণে বাঁচা সম্ভব নয়। 

কর্ণের কথা শুনে পার্থ বলেন –আমি দ্বিজ একথা কে বলেছে। যুদ্ধ ভয় আছে বলেই তুমি এ অযুহাত দিচ্ছ। দুর্যোধনের ভাঁড়, তুমি বৃথা রাজ্য ভোগ কর। শাস্ত্রমতে ক্ষত্রনীতিতে বলে তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে নেই যে রণে ভীত। আর সেখানেই বলেছে যুদ্ধে ব্রাহ্মণ গুরু একই সমান। তুমি দেখছি বড়ই ধার্মিক ও ব্রহ্মবধে ভীত। তাই একজনকে ঘিরে ধরেছিলে সকলে মিলে। এখন বল হারিয়ে অনুরোধ করতে এসেছ। কে তোমায় ক্রোধ শান্ত করতে বলেছে! যত শক্তি আছে প্রয়োগ কর, আমাকে ব্রাহ্মণ ভেবে ক্ষমা করতে চেয়ো না। 

অর্জুনের কথায় কর্ণ রাগে জ্বলতে থাকে। নানা ধরনের অস্ত্র বীর পার্থের উপর বর্ষণ করতে থাকে। এভাবে কর্ণ ও ধনঞ্জয়ের সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ শুরু হল। 
বীর বৃকোদর ভীমও বৃক্ষ হাতে আসরে নেমে পরলেন। মার মার রবে চারদিকে অস্ত্র কাটতে থাকেন। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যেমন মেঘ ফেটে বৃষ্টি হয় তেমনি অস্ত্রবর্ষণ হতে থাকে। মুষল-মুদ্গর-শেল-শূল-শক্তি-জাঠ-গদা-চক্র-পরশু-ভুশুন্ডি কোটি কোটি পরতে লাগল। চতুর্দিকে মার মার রব ওঠে, ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টির মত অস্ত্র ফেলতে থাকে। বীর বৃকোদর শরজালে ঢেকে গেলেন। কুয়াসা যেমন ভাবে পর্বতকে আচ্ছাদিত করে। 
বায়ুনন্দন ভীমের বায়ু পরাক্রম। এমন অজাযুদ্ধ(যাতে প্রকৃত যুদ্ধ অপেক্ষা আস্ফালনই বেশি) দেখে তিনি বাঘের মত ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি প্রকৃত সংগ্রামে আনন্দ পান তাই এসব অস্ত্র প্রহারে একটুও তার শ্রম হল না। সংগ্রাম, আহার ও রমণী-রমণে তিনি সহজে ঠাঁই নারা হন না। ঘি পরলে যেমন আগুনে তেজ বাড়ে তেমনি যত অস্ত্র পড়তে থাকে ভীমের ক্রোধ ততই উথলে ওঠে। জন্তুদের সামনে তিনি কালরূপে উপস্থিত হলেন। গর্জন করতে করতে বৃক্ষ ঘুরিয়ে তিনি সব অস্ত্র নিবারণ করে বৃক্ষ দিয়ে আথালিপাথালি মারতে থাকেন। রথ, রথী, অশ্ব, হাতি, ধ্বজ সব চূর্ণ হতে থাকে। ডানে-বামে-আগে-পিছের বহু সৈন্য তাঁর গাছে নিপাতিল। তারপর মুখ তুলে বৃকোদর যেদিকে চান সেদিকের সৈন্য প্রাণ ভয়ে পালায়। সিন্ধুজলের মাঝে যেন তিনি মন্দর পর্বত। মত্ত হস্তিবর যেন পদ্মবন ভাঙ্গে। মৃগেন্দ্র(সিংহ) বিহার করছেন যেন গজেন্দ্রমন্ডলে। দানবের মধ্যে যেন দেব আখন্ডল(ইন্দ্র)। দন্ড হাতে যম, যেন বজ্র হাতে ইন্দ্র। সব রাজাদের তিনি তাড়িয়ে নিয়ে যান। বাঘ যেন ছাগলের পালকে খেদিয়ে নিয়ে যায়। সকল রাজা ভয়ে পালাল। 
বিংশ অক্ষৌহিনীপতি(১০৯৩৫০পদাতিক, ৬৫৬১০অশ্ব, ২১৮৭০হস্তী, ২১৮৭০রথ- মোট ২১৮৭০০ চতুরঙ্গ সেনাবিশিষ্ট বাহিনী) জরাসন্ধ পালাল, একাদশ অক্ষৌহিনীপতি দুর্যোধন, সপ্ত অক্ষৌহিনীপতি বিরাটরাজা, পঞ্চ অক্ষৌহিনীপতি শিশুপাল, নব অক্ষৌহিনীপতি কলিঙ্গরাজ, বিন্দ-অনুবিন্দ চার অক্ষৌহিনীপতি সবাই পালাল। কোথায় গেল রথ, গজ, তুরঙ্গ, পদাতি-সকলে যে যার প্রাণ নিয়ে একাই পালাতে লাগল। ‘আসছে, আসছে’ বলে সকলে পিছনে আর না তাকিয়ে দৌড়ায়। মাথা থেকে মুকুট, হাত থেকে ধনুক খসে পরে। কেউ আর সাহস করে সে সব তুলতে যায় না। উর্দ্ধশ্বাসে সব পালায় আর পিছনে ভীমসেন ‘মার, মার’ বলে ডাক দেন। 

 
সব দেখে মদ্ররাজ গর্জে ওঠে। নানা অস্ত্রে ভীমকে প্রহার করতে থাকে। রেগে ভীম বৃক্ষ দিয়ে প্রহার করে তাঁর রথ চূর্ণ করেন। লাফ দিয়ে শল্য মাটিতে পরে। হয়(ঘোড়া), রথ চূর্ণ হতে গদা হাতে শল্য ও বৃক্ষ হাতে ভীমের অসীম যুদ্ধ হল। সকলে লুকিয়ে লুকিয়ে কৌতুক দেখতে লাগল। গোল করে দু’জনে দুজনকে ঘুরতে থাকে। শেষে পর্বতের উপর যেন পর্বত পরল। সকলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। পর্বতে বজ্রাঘাত হলে যেমন শব্দ হয় তেমনি দুজনের শব্দে চারদিক পূর্ণ হল। মত্ত হাতির মত তারা লড়তে লাগল। মনে হল মত্ত ষাঁড় যেন প্রলয়ের মেঘের মত গর্জন করছে। তাদের ঘনঘন হুঙ্কারে সকলে কাঁপতে লাগল। তারা পরস্পরকে দেখে দাঁত কড়মড়ি করতে লাগল। তাদের চরণের দর্পে ভূমিকম্প হতে লাগল। এভাবে অনেক্ষণ যুদ্ধ হতে থাকল। শেষে ভীম রাগে ঠোঁট কামড়ে শল্যের হাতে বৃক্ষের প্রহার করলেন। গুরুতর আঘাতে গদা খসে পরল। নিরস্ত্র শল্যের আর কিছু রইল না। লাফ দিয়ে পবনকুমার ভীম তাকে ধরে ফেললেন। শল্যের পা ধরে তাকে শূন্যে ঘোরাতে লাগলেন। 
তা দেখে ব্রাহ্মণমন্ডলী হাসতে লাগল। তারা টিটকারি দিয়ে, করতালি দিয়ে নাচতে নাচতে বলে -আরে দুষ্ট ক্ষত্রগণ যে কাজ করলে তাঁর উচিত ফলও হাতেনাতে পেলে। তবে এই মদ্রপতি সর্বদা ব্রাহ্মণদের সেবা করেছে, সে কারণে একে মারা উচিত নয়। 
শল্য প্রায় জ্ঞান হারাতে বসেছিল। আর দু-তিন পাকে প্রাণ বেরিয়ে যেত। ভীম ব্রাহ্মণদের অনুরোধে এবং সম্পর্কে তাঁর মামা হওয়ায় শল্যকে ছেড়ে দিলেন। 
দেখে রাজারা অবাক হল। বাহুযুদ্ধে শল্যকে কেউ পরাজিত করতে পারত না-এক হলধর বলরাম এবং বীর বৃকোদর ভীম ছাড়া। 

মহাভারতের কথা সুধা সিন্ধুর মত, কাশীদাস কহেন সাধু শুনেন অবিরত। 
................................... 

Monday, February 23, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৮১

[পূর্বকথা - দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্ষত্রিয়দের বারবার লক্ষ্যভেদের জন্য অনুরোধ জানাতে লাগলেন...শেষে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞায় লক্ষ্য ভেদ করতে উঠলেন... তিনি গুরুজনদের প্রণাম জানালেন...কৃষ্ণ বলরামকে বলেন তিনি অর্জুনকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবেন ...অর্জুন অনায়াসে লক্ষ্যভেদে সক্ষম হলেন ...অন্যান্য রাজা ক্রুদ্ধ হল... ] 

অর্জ্জুনের সহিত রাজগণের যুদ্ধঃ 

 

ক্রুদ্ধ রাজারা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হন-জরাসন্ধ, শল্য, শাল্ব, কর্ণ, দুর্য্যোধন, শিশুপাল, দন্তবক্র(শিশুপালের ভাই, কৃষ্ণের শত্রু), কাশীর রাজা, রুক্মী, ভগদত্ত, ভোজ, কলিঙ্গ প্রভৃতি। চিত্রসেন, মদ্রসেন, চন্দ্রসেন, নীলধ্বজ, রোহিত, মহাতেজা বিরাট, কিচক(বিরাটের সেনাপতি), ত্রিগর্ত, সুবাহু রাজা প্রমুখ সকলে নানা অস্ত্রবর্ষণ শুরু করে। খট্টাঙ্গ(মুগুর বিশেষ), ত্রিশূল, জঠী, ভূষন্ডী, তোমর, শেল, শূল, চক্র, গদা, মুষল, মুদ্গর(গদা) প্রভৃতি অস্ত্র রাজারা প্রয়োগ করতে লাগলো। 

রাজাদের এমন রূপ দেখে দ্রৌপদীর হৃদয় কম্পিত হল, তিনি ভয়ে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলেন –দ্বিজবর, এখন তো কোন উপায় দেখছি না। রাজারা সমুদ্রের মত আমাদের ঘিরে ফেলেছে। এদের বিরুদ্ধে আমার পিতার শক্তি খুবই সামান্য। আমি আপনাকে বরণ করে সকলকেই বিপদের ফেললাম। 

অর্জুন দ্রৌপদীকে অভয় দিয়ে বলেন –তুমি আমার কাছে থাক। আমার পিছনে নির্ভয়ে দাড়িয়ে দেখ আমি কি করি। 

কৃষ্ণা দ্রৌপদী অবাক হয়ে বলেন –একা আপনি কি করবেন এই লক্ষ রাজাদের বিরুদ্ধে! 

হেসে অর্জুন বলেন –হে গুণবতী, একাই আমি এই নরপতিদের বিনাশ করব। একার প্রতাপও কত শক্তিধারী তা তুমি দেখছি জাননা। একা সিংহ সকল শত্রুকে তাড়ায়, একেশ্বর গরুড় সকল পক্ষীকে নাশ করতে পারে, একেশ্বর পুরন্দর-ইন্দ্র সকল দানবকে বিনাশ করেন, একা বাঘ লক্ষ হরিণ নাশ করে, একা বিষধর শেষনাগ সমুদ্রমন্থন করলেন, একা হনুমান লঙ্কা জ্বালালেন-তেমনি আমিও এই রাজাদের নাশ করব, তুমি ভয় পেয় না। 

এভাবে অর্জুন দ্রৌপদী-কৃষ্ণাকে আশ্বাস দিলেন। অর্জুন ধনুরগুণে টঙ্কার দিলেন। দ্রুপদরাজা পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখন্ডী এবং ভাই সত্যজিতকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন কিন্তু মুহুর্তে রাজাদের আক্রমণে সসৈন্য পলায়ন করলেন। অর্জুনকে সকলে ঘিরে ফেললো। 
দেখে পবনকুমার ভীম ঠোঁট কামড়ালেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের সম্মতি চাইলেন। 
যুধিষ্ঠির সব দেখে সম্মত হয়ে বলেন –অনর্থ হল, একলক্ষ রাজা অর্জুনকে ঘিরে ধরেছে। শীঘ্র গিয়ে ভীম অর্জুনকে নিয়ে এস। যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজন নেই। 

বড়ভাইয়ের অনুমতি পেয়ে বৃকোদর ভীম একটি দীর্ঘ বৃক্ষ উপড়িয়ে দৌড়ে গেলেন। অতি উঁচু বৃক্ষটিকে নিষ্পত্র করলেন। বায়ুবেগে ধেয়ে ভীম সৈন্যদের মধ্যে প্রবেশ করলেন। ব্রাহ্মণরাও ক্ষত্রিয়দের এমন আক্রমণে রেগে গেল। ভীমের পিছন পিছন তারাও দৌড়াল। 
তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল –দেখ, এই পাপিষ্ট দুরাচার ক্ষত্রিয়রা স্বচক্ষে দেখল সভার মাঝে এই ব্রাহ্মণ-দ্বিজ লক্ষ্যভেদ করেছেন। নিজেদের শক্তি ছিল না, কিন্তু ব্রাহ্মণকে করতে দেখে প্রতিহিংসায় এতজন মিলে এক ব্রাহ্মণবধে চলেছে। এমন অন্যায় আমরা সহ্য করব না। যুদ্ধ করে আমরা সবাই প্রাণ দেব। আজ সবকটাকে যুদ্ধে মারব, এমন কর্ম সহ্য করব না। 

এসব বলতে বলতে ব্রাহ্মণরা হাতে দন্ড তুলে নিল। হরিণের চামড়া শরীরে দৃঢ় ভাবে বেঁধে নিল। লক্ষ লক্ষ্ ব্রাহ্মণ বায়ুবেগে দৌড়ে গেল রাজাদের দিকে। 

দেখে অর্জুন কৃতাঞ্জলি করে ব্রাহ্মণদের পায়েরধূলি গ্রহণ করলেন। বিনয়ের সঙ্গে বলেন –আপনারা এখানে এলেন কেন! আপনারা দাঁড়িয়ে দেখুন কি হয়। যাদের মুখের বচনে ভস্ম করেন, তাদের সাথে যুদ্ধ করা আপনাদের শোভা পায় না। আপনাদের চরণ প্রসাদে আমি অনায়াসে দুষ্ট ক্ষত্রিয়দের মারব। যে ভাবে এরা অন্যায় করল তার উচিত শিক্ষা এরা এখানেই পেয়ে যাবে। 
এভাবে ব্রাহ্মণদের নিবৃত্ত করে অর্জুন রাজাদের উদ্দেশ্যে ধেয়ে গেলেন। 

সব দেখে হেসে বলরাম কৃষ্ণকে বলেন –আমি আগে যা বলেছিলাম দেখ তাই হল। একলক্ষ রাজা সসৈন্য নিয়ে অর্জুনকে ঘিরে ধরেছে। একা পার্থ কত জনকে বাঁধা দেবে! এর তো কোন প্রতিকারই দেখছি না। রাজারা সবাই প্রতিজ্ঞা করেছে ব্রাহ্মণকে মেরে কন্যাকে দুর্যোধনের হাতে তুলে দেবে। 

 
বলরামের কথায় কৃষ্ণ দুঃখিত হলেন। করুণায় নয়ন বিকশিত হল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেন –হে যাদববীর! যা বললেন তা সত্য। একলক্ষ রাজারা একজন মানুষকে মারতে উদ্যত। কিন্তু অর্জুনের পরাক্রম সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত নন। যদি সুরাসুর ও মনুষ্য এক সাথে অর্জুনের সাথে বিবাদ করে তবু সে মুহুর্তে সসাগর ভূমি জয় করতে পারে। সে হচ্ছে দুর্গম বনে মদমত্ত বাঘের মত, তাকে কি করতে পারে ছাগরূপ রাজারা! তুমি বললে রাজারা তাকে মেরে কন্যা দুর্যোধনকে দেবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কবে কোথায় চাঁদ ধরতে পারে! বাঘের মুখে শেয়াল কবেই বা মাংস ধরে। তবে যদি দেখি অর্জুনের বিপদ উপস্থিত তখন সুদর্শনচক্রে আমি সবাইকে ছেদ করব। 

শুনে বলরাম মনে মনে ভয় পেলেন। তাঁর শিষ্য দুর্যোধনকে তিনি স্নেহ করতেন। পান্ডবদের শত্রু এই ছলে যদি কৃষ্ণ তাকে বশ করেন এই ভেবে তিনি কৃষ্ণকে বলেন –আমাদের এই যুদ্ধের মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই। বিশেষত আপনার মতে যখন অর্জুন অনায়াসে এদের হারাবেন। আমরা বরং এখান থেকে যুদ্ধ দেখি। 

গোবিন্দ(কৃষ্ণ) বলেন –আমি যুদ্ধে যাব না। আপনার আজ্ঞা লঙ্ঘন করব না। পার্থকে ত্রিভুবনে জয় করার মত শক্তি কারো নেই। এক্ষুনি তা দেখতে পাবেন। আমার কথা না ফললে সুমেরু টলে যাবে, সিন্ধুর জল শুকাবে, দাবানলও চিরদিনের মত শীতল হবে। দিনমনি সূর্যও যদি পশ্চিমে উদয় হন তবুও কেউ যুদ্ধে অর্জুনকে পরাজিত করতে পারবে না। 

গোবিন্দের মুখে অর্জুনের এত কথা শুনে বলরাম চুপ করে গেলেন। একলক্ষ রাজারা পার্থকে ঘিরে ফেলল। কিন্তু পার্থ ব্যাঘ্রের মত মৃগরূপী রাজাদের সম্ভ্রম দেখালেন না। মহাবীর অর্জুন হিমাদ্রি পর্বতের মত অনড়। সমুদ্রের মত তাঁর গভীর বুদ্ধি। জন্তুদের মধ্যে যেন কালান্ত যম। ইন্দ্রের সন্তান ইন্দ্রের মতই পরাক্রমী। বৃক্ষ যেমন অনায়াসে বৃষ্টিধারা মাথা পেতে নেন, তেমনি অর্জুন রাজাদের বাণবৃষ্টি সহ্য করলেন। 
দেবতারা এই দৃশ্য দেখে অর্জুনের জন্য চিন্তিত হলেন। একা পার্থের লক্ষ বিপক্ষ। তাঁর হাতে আছে মাত্র তিনটি অস্ত্র লক্ষ্যভেদের জন্য। পুত্রকে সাহায্যের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র দ্রুত অস্ত্রপূর্ণ তূণ(বাণ রাখার পাত্র) পাঠিয়ে দিলেন। প্রসাদরূপে পুত্রকে তিনি বৈজয়ন্তী মালাও পাঠালেন। 
খুশি হয়ে অর্জুন সিংহনাদ ছাড়েন। ধনুকে টঙ্কার দিয়ে নিমেষে সকল শরবৃষ্টি রোধ করেন। যেন মহাবাতাস এসে মেঘমালা উড়িয়ে দিল, সমুদ্রের ঢেউ সহজেই ভেলা উল্টে দিল। শিশুরা যেমন গেন্ডু(বল) খেলে, রাজারাও তেমনি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছিল। দাবাগ্নি যেমন ভাবে বৃষ্টির জলে শেষ হয়, তেমনি পার্থও নিমেষে তাদের শান্ত করলেন। 

মহাভারতের কথা সুধাসিন্ধুর সমান। কাশীদাস কহেন এবং সর্বদা সাধুরা তা পান করেন। 
................................... 

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers