Blog Archive

Sunday, August 23, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১০১

[পূর্বকথা - পারিজাত হরণের কথা...নারদ পারিজাতপুষ্প কৃষ্ণকে দিলে তিনি তা স্ত্রী রুক্মিণীকে পরিয়ে দেন... সে কথা শুনে সত্যভামার অভিমান হয়...তিনি আহার নিদ্রা ত্যাগ করেন, কৃষ্ণ এসে তার মানভঞ্জন করেন এবং পারিজাত বৃক্ষ উপহারের আঙ্গিকার করেন...শ্রীকৃষ্ণের সুরপুরী গমন করেন...শ্রীকৃষ্ণের সাথে ইন্দ্রের সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ শুরু হয়...] 



মহাদেবের যুদ্ধস্থলে গমনঃ 

গোবিন্দ ও ইন্দ্রের সেই যুদ্ধের যেন আর শেষ নেই। ভয়ংকর শব্দ শুনে শুনে ত্রিলোকের লোক হতজ্ঞান হতে লাগল। দেখে নারদ মুনি চিন্তিত হয়ে ক্ষীরোদসাগরতীরে কশ্যপ মুনির কাছে দ্রুত গেলেন। 

নারদ কশ্যপ মুনিকে বলেন –মুনি আপনি কি করছেন! আপনার পুত্র দেবরাজ ইন্দ্রের বড়ই বিপদ। অজ্ঞান হয়ে তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছেন। কৃষ্ণ দয়া করে প্রাণে মারছেন না তাই তাঁর কৃপায় দেবরাজ এখনও বেঁচে আছেন। দেবরাজ তার সব অস্ত্র হেনেছেন। কৃষ্ণ এখনও সংযত আছেন। একবার তিনি সুদর্শন চক্র ছাড়লে ইন্দ্র কিন্তু খন্ড খন্ড হবেন কেউ আটকাতে পারবে না।

শুনে কশ্যপ মুনি চিন্তিত হলেন কি ভাবে এই যুদ্ধ থামাবেন। এঁদের দুজনকে মহাদেব ছাড়া আর কেউ শান্ত করতে পারবে না বুঝে কশ্যপ শিবের স্তুতি শুরু করলেন। কশ্যপের স্তবে তুষ্ট হয়ে ত্রিলোচন হর যুদ্ধ নিবারণ করতে যুদ্ধ স্থানে গেলেন। 


একদিকে খগেন্দ্র-উপেন্দ্র, অন্যদিকে গজেন্দ্র ইন্দ্ররাজ, যোগেন্দ্র-মহাদেব বৃষেন্দ্রারূঢ় হয়ে তাদের মাঝে দাঁড়ালেন। 

শিব কৃষ্ণকে বলেন –হে শ্রীহরি, শান্ত হয়ে একটু শুনুন। আপনার সঙ্গে কি ইন্দ্র পারেন! আপনিই তাকে দেবরাজ করে স্বর্গে স্থাপন করেছেন। এখন তাকে নিগ্রহ করা আপনার উচিত নয়। 

গোবিন্দ বলেন –ইন্দ্র স্বর্গভোগ করেন, করুক। কিন্তু আমায় তো পারিজাত বৃক্ষটি দিতে পারেন! তা উনি দিতে চাইছেন না। তিনি এটি নিজে উপার্জনও করেন নি। ক্ষীরোদসাগর মন্থন করে সুরাসুর সকলে একে তুলেছে। মন্থনের দ্রব্যে সবার ভাগ আছে। 
বিশেষ করে বামনাবতারে আমি বামনরূপে তার পরেই জন্মেছিলাম। স্বর্গের যত সুখ সেই ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা সব সে ভোগ করছে। আমি সব কিছু থেকে ব্রাত্য। আমি তো কেবল পারিজাত বৃক্ষটি চেয়েছিলাম। তার কি উচিত হল এর জন্য যুদ্ধ করা! 

গোবিন্দের কথা শুনে দেবপঞ্চানন-শিব ইন্দ্রের কাছে গেলেন। 
ইন্দ্রকে গিরীশ(=গিরি+ঈশ[ঈশ্বর]) শিব বলেন –ইন্দ্র আপনি কি জ্ঞান হারিয়েছেন! জানেন না নারায়ণ পুরুষ-প্রধান! তার সাথে দ্বন্দ্বে আপনার কোন কল্যাণ নেই। আমার কথা শুনুন হে সুরপতি, এ যুদ্ধ বন্ধ করুন। যদুবংশপতি কৃষ্ণ যদি পারিজাত চান তাকে তাই দিয়ে বন্ধুত্ব করুন তার সাথে। 

ইন্দ্র বলেন –হে পশুপতি অবধান করুন! ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা প্রভৃতি যত যান, বজ্র, শচী, নন্দনকানন, পারিজাত এসব নিয়েই আমার স্বর্গের ইন্দ্রত্ব, আমার ভূষণ। দেবকীকুমার কৃষ্ণ যদি পারিজাত বৃক্ষ নিয়ে নেন তবে আমার স্বর্গের ইন্দ্রত্ব আর কি রইল! 


মহেশ বলেন –হরি তো অবতাররূপে খর্ব আপনার চেয়ে। বামনরূপে তিনি তোমার কনিষ্ঠ ভাই, অদিতির উদরে তোমার সহোদর। সেই কনিষ্ঠের অধিকারে নারায়ণ আপনার কাছে তার ভাগ চাইছেন। তাকে পুষ্পরাজ দিয়ে এযুদ্ধ শেষ করুন। 

ইন্দ্র বলেন –আপনার বাক্য অমান্য করব না। কৃষ্ণ যদি আমার কনিষ্ঠ ভাই হন তবে জ্যেষ্ঠ ভাইকে যেমন সম্মান করার না করে এমন বলপ্রয়োগ করছেন কেন! এতটুকু মান্য না করে বলে টেনে নিয়ে ভূমণ্ডলে ফেললেন। 


এতশুনে গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে শিব বলেন –আমাকে দেখে অন্তত ক্রোধ ত্যাগ করুন, হে যদুনাথ! অজ্ঞান হয়ে দেব সুরপতি ইন্দ্র আপনার সাথে যুদ্ধে মত্ত হয়েছেন। আপনিই তাকে ইন্দ্রত্ব দিয়েছেন। বারবার বিপদে তাকে রক্ষা করেছেন। নিজের অর্জিত বৃক্ষ যদি বিষবৃক্ষ হয় তবু তাকে নিজে হাতে নষ্ট করা সমুচিত নয়। পারিজাত পুষ্প নিয়ে যেতে চান যান। 
কিন্তু ইন্দ্র সম্পর্কে আপনার জ্যেষ্ঠ ভাই, সে সম্মান তাকে আপনার দেওয়া উচিত। আমার অনুরোধ রাখুন। 

নারায়ণ শিব বাক্য স্বীকার করে শিবকে নিয়ে ইন্দ্রস্থানে গেলেন। কৃষ্ণ বিধান মত কনিষ্ঠ হওয়ায় ইন্দ্রকে প্রণাম করলেন। 


হৃষ্ট মনে দেবরাজ ইন্দ্র কৃষ্ণের কোলে পারিজাত বৃক্ষ দান করে বলেন –যতদিন আপনি অবনীমণ্ডলে(পৃথিবীতে) থাকবেন ততদিন এই বৃক্ষ আপনার সাথে থাকবে। তারপর পারিজাত বৃক্ষ পুনরায় স্বর্গপুরে ফিরে আসবে। 
এই বলে দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গে চললেন। 
সত্যভামার দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রাণী শচীদেবী হাসলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম কহেন, সাধু সদা তা করেন পান। 
...................................

Sunday, August 16, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১০০

[পূর্বকথা - অর্জুন বারো বছরের বনবাস কালে প্রভাস তীর্থে এলে গোবিন্দ তাকে দ্বারকায় নিয়ে আসেন..সেখানে সুভদ্রাকে দেখে অর্জুনের ভাল লাগে...কথা প্রসঙ্গে পারিজাত হরণের কথা ওঠে...নারদ পারিজাতপুষ্প কৃষ্ণকে দিলে তিনি তা স্ত্রী রুক্মিণীকে পরিয়ে দেন... সে কথা শুনে সত্যভামার অভিমান হয়...তিনি আহার নিদ্রা ত্যাগ করেন, কৃষ্ণ এসে তার মানভঞ্জন করেন এবং পারিজাত বৃক্ষ উপহারের আঙ্গিকার করেন...] 


শ্রীকৃষ্ণের সুরপুরী গমনঃ

নারদ কৃষ্ণকে বললেন –হে নারায়ণ, দেবতাদের মাতা অদিতি তার কুন্ডলের কারণে খুবই দুঃখিত। নরকাসুর অমরাবতীর সব দেবতাদের হারিয়ে বলপ্রয়োগ করে অদিতির কুন্ডল হরণ করেছে। পৃথিবীর পুত্র এই নরক দুর্মতি। তাকে না মারলে পুনরায় স্বর্গের বসতি প্রতিষ্ঠা হবে না। 


নরকাসুর হত্যা

শুনে গোবিন্দ নরকাসুরকে হত্যা করতে চললেন। 


নরককে হত্যা করে ষোল হাজার দেব কুমারীকে উদ্ধার করলেন। তারা স্বেচ্ছায় মুরারিকে বিবাহ করল। 


গোবিন্দ মাতা অদিতির কুন্ডল তাকে ফিরিয়ে দিলেন ও অমর নগরে চললেন। 

নন্দনকাননে প্রবেশ করতেই কুসুমরাজ পারিজাতের সৌরভে সকলে আমোদিত হলেন। কৃষ্ণ সাত্যকিকে বৃক্ষটি আনতে বললেন। শুনে সাত্যকি দ্রুত বৃক্ষের কাছে গেলে দেখল বহু রক্ষ তা পাহারা দিচ্ছে। 


তারা অস্ত্র হাতে তেড়ে এলে সাত্যকি তাদের বলে –নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে যুদ্ধ না করে দ্রুত ইন্দ্রের কাছে গিয়ে সব জানাও। 

সকলে ইন্দ্রকে গিয়ে বলল –প্রভূ দ্রুত চলুন গরুড়ে করে তিনজন মানুষ এসে পারিজাত বৃক্ষের জন্য নন্দন বন ভাঙ্গছে। 

শুনে ইন্দ্রের মনে পরল গোবিন্দের পারিজাত নিতে আসার কথা ছিল। 
ক্রোধে তিনি থরথর, সহস্র লোচন কালচক্রের মত ঘোরে। নানা অস্ত্রে তিনি সমর সাজ করতে লাগলেন। হাতে বজ্র নিয়ে দেবরাজ যুদ্ধে চললেন। 

শচীদেবী বলেন –আমিও আপনার সাথে যাব, যুদ্ধ দেখব। 
শুনে ইন্দ্র নিজের বামে স্ত্রীকে বসালেন। সঙ্গে সখা জয়দেব ও পুত্র জয়ন্তকে সঙ্গে নিলেন। এভাবে চারজনে গজে করে নারায়ণ যেখানে আছেন সে স্থানে চললেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত লহরী, কাশীদাস কহেন, শুনে তরি ভববারি।
..................


শ্রীকৃষ্ণের সহিত ইন্দ্রের যুদ্ধঃ

কৃষ্ণ ও ইন্দ্রের যুদ্ধ শুরু হল। ছয়জনের অস্ত্রে অস্ত্রে আগুন ঝড়তে লাগল। 

উপেন্দ্রাণী-সত্যভামাকে দেখে ইন্দ্রাণী ক্রোধে বলেন –হে ভারতী, তোমার এত গর্ব যে আমার ভূষণ-পুষ্প হরণ করতে এসেছ! তোমার মর্যাদাবোধ থাকলে নিজে এগিয়ে গিয়ে যেখান থেকে পারিজাত উপড়েছ সেখানে রেখে এস। বামন হয়ে চাঁদ ধরার ইচ্ছে! আজ এমন শিক্ষা দেব যে সব গর্ব ভাঙ্গবে। 

সত্যভামা বলেন –শচী, মিছে গর্ব কর। তোমার ক্ষমতা আমি সব জানি। শাশুড়ির কুন্ডল যখন নরক হরণ করল তখন স্বামী আখণ্ডলকে(ইন্দ্র) বলে তা উদ্ধার করতে পারলে না! সে অসুর তো স্বর্গ লুটেপুটে ছারখার করল, তোমার ভাতার(স্বামী) তো কিছুই রক্ষা করতে পারল না। সেই নরকাসুরের পুরী ভেঙ্গে তাকে হত্যা করে আমার স্বামী হরি তোমার শাশুড়ি অদিতির কুন্ডল উদ্ধার করে আনলেন। এই পারিজাতের পুষ্পে কেবল তোমার একার কি ভাবে অধিকার হয়! সমুদ্র মন্থনে এর জন্ম। তাই এর বিভাগ সমান হবে। আমাদেরও ভাগ দিতে হবে। তুমি কেন একা পারিজাত পুষ্প ভূষণ করবে! দেখি আজ আমি পারিজাত নিয়েই যাব, কিভাবে তুমি রাখতে পার। 

সতী সত্যভামা ও শচীর কোন্দল শুনে মুখে বস্ত্র দিয়ে দেবতারা হাসতে থাকেন। 
আনন্দ লহরীতে নারদ মুনিকে হাসতে দেখে পুরন্দর ইন্দ্র অতিশয় রোষে(রাগে) কাঁপতে থাকেন। 


উপেন্দ্র(কৃষ্ণ) ও ইন্দ্রের স্বর্গে এমন যুদ্ধ দেখে ত্রিভুবন চমৎকৃত হল। স্বর্গে তাদের নানা অস্ত্রের প্রহার পৃথিবীর মধ্যে উড়ে আসে উল্কার আকার। দর্পক(কন্দর্প-কামদেব) ও জয়ন্তের যুদ্ধের তুলনাও দেওয়া যাবে না। শরজালে দুজনে গগন ছাইল। 
সাত্যকি সে সময় পারিজাত বৃক্ষতরু গরুড়ের উপর তুলল। তার সাথে জয়দেবের যুদ্ধ শুরু হল। 
খগেন্দ্র(গরুড়) ও গজেন্দ্রের(ঐরাবত) যুদ্ধও বর্ণনাতীত। তাদের গর্জনে ত্রৈলোক্যজন বধির হল। গজেন্দ্র তার দাঁত দিয়ে গরুড়কে প্রহার করে। গরুড়ও গজেন্দ্রের শুড় নখে বিদ্ধ করেন। গরুড়ের নখাঘাতে গজেন্দ্র অস্থির। তার সর্বাঙ্গ খন্ড খন্ড করে রক্তধারা বহে। গজেন্দ্র আর শূন্যে থাকতে পারল না, অজ্ঞান হয়ে ভূমিতে পরল। সারা শরীর দিয়ে রক্ত বহে, শরীর কাঁপতে থাকে মাতঙ্গরাজের, তিনি পর্বতের উপর গিয়ে পড়লে পর্বত অর্ধেক তলিয়ে গেল। আখন্ডল ইন্দ্র সেই পর্বতের উপর গিয়ে দাঁড়ালেন। 

ইন্দ্র বলেন –কৃষ্ণ তুমি গর্ব করো না। আমি যুদ্ধে ভয় পাইনি কিন্তু আমার বাহন গরুড়ের আঘাতে অস্থির। চল আমরা ভূমিতে নেমে যুদ্ধ করি। 

ইন্দ্রের কথায় কৃষ্ণ হেসে বলেন –তুমি যেখানে বলবে সেখানে গিয়েই আমি যুদ্ধ করতে রাজি। 

পুনরায় যুদ্ধ শুরু হল। ইন্দ্র যত অস্ত্র মারেন, কৃষ্ণ দামোদর সহজেই তা কাটেন। 
সর্ব অস্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে দেখে মনে মনে লজ্জা পেয়ে ইন্দ্র অতি ক্রোধে কৃষ্ণের উপর বজ্র প্রহার করলেন। 

গোবিন্দ গরুড়কে বলেন –সুরপতি ইন্দ্র বজ্র অস্ত্র হাতে নিয়েছেন। সুদর্শন চক্র এক্ষুনি তা তিল তিল করে কাটবে। কিন্তু তাতে মুনি বাক্য ব্যর্থ হবে ভেবে আমার খারাপ লাগছে। তুমি এর উপায় বার কর খগেশ্বর। নিজের একটি পক্ষ বজ্রের উপর ফেল। 


প্রভুর আজ্ঞা পেয়ে গরুড় ঠোঁটে নিজের একটি পালক উপড়ে বজ্রের উপর ফেললেন। বজ্র পক্ষ চূর্ণ করে পুনরায় ইন্দ্রের কাছে ফিরল। একবারই বজ্র ব্যবহার করা যায়। দেখে আখন্ডল অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহেন, শুনেন পুণ্যবান। 

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers