Blog Archive

Sunday, December 20, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১১৬

[পূর্বকথা - কৃষ্ণের কথা মত অর্জুন সরস্বতীর তীর থেকে সুভদ্রাকে হরণ করলেন...যদুবীররা ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করল ... সুভদ্রা অর্জুনের সারথি হলেন...যদুবীররা পরাস্ত হতে লাগল ..... এ সংবাদ বলরাম শুনে কৃষ্ণের উপর অভিমান করতে লাগলেন... কৃষ্ণ এসে দাদাকে বোঝালেন সুভদ্রা অর্জুনকেই স্বামী হিসেবে চান..... বলরাম অর্জুনের কাছে বিবাহ প্রস্তাব পাঠালেন ..... ] 



দুর্যোধনের অভিমানে স্বদেশ যাত্রা ও পার্থের সহিত সুভদ্রার বিবাহঃ 

এদিকে রাজা দুর্যোধন সব সৈন্যদের নিয়ে যাদব সৈন্যদের মাঝে গিয়ে পরল। 
সেখানে সব শুনল যে পার্থ ভদ্রাকে হরণ করেছে।

মহাক্রোধে দুর্যোধন গর্জে উঠল –হে কৃপাচার্য, হে পিতামহ, আচার্য বিদুর সবাই দেখুন পান্ডুপুত্রের কান্ড। যে কন্যার জন্য বলরাম আমায় আমন্ত্রণ করলেন, দেখুন তাকেই দুষ্ট হরণ করল! আমাকে সবাই চেনে। আমি এখনই অর্জুনকে হত্যা করব, কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না। 

কর্ণ বলে –মহারাজ, আপনি বসে দেখুন, আজ্ঞা দিলেই আমি তাকে বেঁধে আনতে পারি। 

শুনে গান্ধারী নন্দন দুর্যোধন তাকে আজ্ঞা দিল বীর কর্ণও দ্রুত লাল চোখ করে দৌড়াল। 

বৃকোদর ভীম বলেন –কোথায় যাও সূতপুত্র! অদ্ভুত কথা বললে অর্জুনকে তুমি ধরবে। সুরাসুর যক্ষ যাকে যুদ্ধে হারাতে পারে না তাকে ধরতে যেতে লজ্জা করছে না! ওরে মূর্খ দুরাচার, তোমার এত অহঙ্কার! আমার সামনে এমন প্রতিজ্ঞা কর! আমার হাত থেকে বাঁচলে তখন অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করতে যেও। 

এই বলে ভীম লাফিয়ে ভূমিতে পরলেন। গদা ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি এগিয়ে আসতে লাগলেন, যেন সাক্ষাৎ দন্ডপাণি(যম)। 

বিদুর বলেন –হে দুর্যোধন, পার্থের সাথে তোমার যুদ্ধের কি প্রয়োজন! তোমাকে আমন্ত্রণ করে যিনি এনেছেন তাঁর কাছে গিয়ে সব জিজ্ঞেস করা উচিত। তিনি যেমন বলবেন তেমন না হয় করা যাবে। এখন পার্থের সাথে কলহ করা উচিত নয়। 

ভীষ্ম ও দ্রোণও তাতে সম্মত হয়ে বলেন –যিনি আমন্ত্রণ করেছেন, তাঁর কাছেই আগে চল। অনেক বোঝানোর পর রাজা দুর্যোধন দ্বারাবতী যেতে সম্মত হল। 

সে সময় সাত্যকি অর্জুনের কাছে উপস্থিত হল। 
পার্থকে ডেকে মধুর বচনে সে বলে –ক্রোধ ত্যাগ করুন ধনঞ্জয়, এরা শিশু এদের উপর আক্রোশের কি দরকার! না বুঝে এরা দোষ করেছে। আপনার সাথে মিথ্যে যুদ্ধ করল। সব শুনে কৃষ্ণ-রাম দুজনেই মন্দ বলেছেন। তাই আমাকে দ্রুত পাঠালেন। আপনাকে নিয়ে যেতে আমি এসেছি। যদুবংশীয়রা ও ভোজবংশীয়রা(দ্বারকা বর্তমানে গুজরাটের অঞ্চল, ভোজ গুজরাটের কচের কাছে দ্বারকার কিছু দূরে অবস্থিত) সকলে একত্রে বসে স্থির করেছেন সুভদ্রাকে আপনার হাতেই সমর্পণ করা হবে। 

সাত্যকির বিনয় বচন শুনে ফাল্গুনি(অর্জুন) শান্ত হলেন ও যুদ্ধ ত্যাগ করলেন। 
সব দেখে শুনে দুর্যোধনের অভিমান হল। সে তখনই সসৈন্য নিজের দেশের উদ্দেশ্যে ফিরে চলল। 

পার্থ তখন দারুককে মুক্ত করে কৃতাঞ্জলি সহকারে সবিনয়ে বলেন –কৃষ্ণ যেমন, আপনিও আমার কাছে তেমনই। আপনার প্রতি অপরাধ করেছি, আমায় ক্ষমা করুন। 

দারুক বলেন –পার্থ আপনি বড় একটি কাজ করলেন। এতো আমার বন্ধন ছিল না। এ আমার ধর্ম রক্ষা করলেন। আপনি আমায় বন্ধি না করলে আজ আমি বলরামকে কি ভাবে মুখ দেখাতাম! আমাকে এই অবস্থাতেই বলরামের কাছে নিয়ে চলুন। না হলে তিনি আমার উপর খুব রাগ করবেন। 

অর্জুন বলেন –তা আর উচিত কর্ম হবে না। আপনাকে বেঁধে নিয়ে গেলে কৃষ্ণ আমার উপর কুপিত হবেন। রাম অবশ্যই আমাদের ক্ষমা করবেন। 

এই বলে তখনই পার্থ দারুককে মুক্ত করলেন। তারপর সব যদুবীররা সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে আদর করে দ্বারকায় নিয়ে চলল। 

ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, বিদুর প্রমুখ এবং ভুরিশ্রবা, সোমদত্ত, বাহ্লিক প্রমুখদের নিয়ে সসৈন্য ভীমসেন অর্জুনের আগে আগে চললেন। পিছনে কাম প্রমুখ সকল যাদববীররা চলল। 

দেব নারায়ণ কৃষ্ণ এগিয়ে এসে সকলকে অভ্যর্থনা করলেন। যদুনারীরা উলুধ্বনি দিতে লাগল। 
রত্নময় সিংহাসনে ভদ্রা ও পার্থকে বসিয়ে বেদ অনুসারে তাদের বিবাহ দেওয়া হল। বসুদেব ভদ্রাকে সম্প্রদান করলেন। যদুরা আনন্দ মনে পার্থকে প্রচুর যৌতুক দান করল। 

পুণ্যকথা ভারতের শুনেন পুণ্যবান। পৃথিবীতে এর সমান সুখ আর কিছু নেই। 
সুভদ্রার হরণ কাহিনী যে নর শুনেন, তাঁর সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় ব্যাসদেবের বচনে।
......................................

Monday, December 14, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১১৫

[পূর্বকথা - কৃষ্ণের কথা মত অর্জুন সরস্বতীর তীর থেকে সুভদ্রাকে হরণ করলেন...যদুবীররা ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করল ... সুভদ্রা অর্জুনের সারথি হলেন...যদুবীররা পরাস্ত হতে লাগল ..... এ সংবাদ বলরাম শুনে কৃষ্ণের উপর অভিমান করতে লাগলেন... ] 

বলরামের সহিত শ্রীকৃষ্ণের কথাঃ



দূত পুনরায় জোড়হাতে বলে –হে যদুনাথ, নিঃশব্দ রয়ে গেলেন কেন! আজ্ঞা করুন আমি এখন কি করি! কুমাররা আমায় বার্তার কারণে পাঠালেন! যাদব প্রধান মহাবীর কামদেব যিনি তিনলোকে অব্যর্থ তাঁর ধনুর্গুণ তিলতিল করে কাটা গেছে। একটিও আর অস্ত্র নেই, তূণও শূন্য। শাম্ব, গদ, সারণ প্রমুখ যতবীর যাদবরা আছেন, কারো তনুই অক্ষত নয়। কারো ধ্বজা কাটা গেছে, কারো বা সারথি, কারো রথ নষ্ট হয়েছে-সে এখন পদাতি। কারো অস্ত্র, ধনুর্গুণ কিচ্ছু নেই। সবাইকে একা অর্জুন জয় করেছেন। এখন আপনারা অস্ত্র, রথ, অশ্ব সব পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। আপনি চলুন বা দেবকীপুত্র কৃষ্ণ চলুক সব স্বচক্ষে দেখে আসবেন। কুমারদের পক্ষে অর্জুনকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। অর্জুনও স্নেহ করে কুমারদের প্রাণে মারেন নি। তাই প্রভু, তারা এখনও পরান নিয়ে বেঁচে আছেন। 

গোবিন্দ বলেন –আমি অর্জুনকে চিনি। তাকে পরাজিত করার মত পৃথিবীতে কাউকে দেখি না। আজ এমনকি ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ, পঞ্চাননও পার্থকে জিততে পারবেন না। কুমাররা তাঁর কাছে শিশু , তারা আর কি করবে! তুমি সত্যই বলেছ পার্থ তাদের প্রাণে মারবেন না। তাঁর সাথে যুদ্ধ করা উচিত নয়। সে তো অন্যায় কিছু করেন নি! শাস্ত্র মতে ক্ষত্রিয়ধর্মে বলপ্রয়োগ করে বিবাহের প্রশংসা আছে, যেখানে কন্যার সম্মতি আছে। ধনঞ্জয়ের দোষ দেখি না। 
আমাদের ভগিনীর কাজটাও দেখুন। অর্জুনে যদি তাঁর মন না থাকত, তবে সে অশ্ব চালাত কেন! তবে ধনঞ্জয় কি আপনার মহিমা জানেন না! আপনি এখনই গিয়ে তাঁর গরিমা খর্ব করতে পারেন। তবে পার্থকে জীবন্ত ধরা সম্ভব নয়। অনেক চেষ্টা করে তাকে প্রাণে মারতে হবে। পার্থকে হত্যা করলে সুভদ্রাও প্রাণ ত্যাগ করবে। বলুন দেবতা তাতে কি কর্ম সাধন হবে! 
এমন অবস্থায় আমার মত যদি সবাই আজ্ঞা দেন তো জানাই। আপনার প্রিয়ম্বদ কেউ অর্জুনের কাছে যাক। প্রিয় বাক্যে কুন্তীকুমারকে তুষ্ট করে ফিরিয়ে আনুন। এখনই তাকে এনে ভদ্রাকে তাঁর হাতে সমর্পণ করুন। এতে সবার মঙ্গল হবে। লোকসমাজে সম্মান থাকবে। আমার মনে আর কিছুই আসছে না। 

কৃষ্ণের এত কথা শুনে হলধর বলরাম ক্রোধ সংবরণ করে বলেন –আমাকে আর জিজ্ঞেস করছ কেন! তোমার মন যা চাইছে তাই কর। তোমার মনে যা আছে তাই হবে। তোমার অন্যথা আর কে করতে পারে। তখন যদি তোমার কথা মেনে নিতাম, তাহলে এখন আর আমায় এমন লজ্জায় পরতে হত না। 

এরপর বলরাম সাত্যকিকে ডেকে বলেন –আপনি এখনই আমার প্রতিনিধি হয়ে অর্জুনের কাছে গিয়ে তাকে মধুর বচনে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনুন। 
এই বলে সাত্যকিকে রথে চড়িয়ে যুদ্ধ স্থলে পাঠালেন। 

আদি পর্ব মহাভারতের বিচিত্র উপাখ্যান, কাশীরাম দাস কহেন, সাধুজন সদা করেন পান।
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers