Blog Archive

Thursday, April 21, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১২৫

[পূর্বকথা - অগ্নির হাত থেকে রক্ষা করায় কৃতজ্ঞ ময়দানব কৃষ্ণের আদেশে ত্রিলোক বিখ্যাত দিব্য মণিময় সভা নির্মাণ করলেন ইন্দ্রপ্রস্থে... একদিন নারদমুনি সভায় উপস্থিত হলেন এবং নানা উপদেশ দিয়ে লোকপালদের সভা-বর্ণনা করলেন এবং সব শেষে জানালেন পান্ডুর মনের ইচ্ছে পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে যেন স্থান করে দেয়.....]



যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ চিন্তা ও শ্রীকৃষ্ণের নিকট দূত প্রেরণঃ 

নারদমুনির মুখে পিতা পান্ডুর মনের ইচ্ছের কথা শুনে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির চঞ্চল হলেন। অন্য কিছুতে আর মন দিতে পারেন না। 
তিনি ভাইদের ডেকে বলেন –নারদমুনি বলে গেলেন পিতার ইচ্ছে আমরা রাজসূয় যজ্ঞ করি, তাহলে তিনি ইন্দ্রপদের স্থান পাবেন। আমি এ যজ্ঞ করতে চাই। সকলের কি মতামত! 
চারভাই মত দিলেন। 
সব শুনে মন্ত্রী ও পারিষদরা যজ্ঞের সপক্ষে বলে – চিন্তা করবেন না মহারাজ, আপনি এ যজ্ঞ করুন। কার সাধ্য আপনাদের বিরোধ করে! 

মন্ত্রীদের কথা শুনে যুধিষ্ঠির মনে মনে ভাবলেন –যার যে কাজে শোভা পায় না, তার সে কাজেই বেশি লোভ হয়। তারপরে বিড়ম্বনা হতে পারে। চারদিকে সবাই নিন্দা করবে। তার উপর রাজসূয় এক বিষম যজ্ঞ, সকলে তার যোগ্যও হয় না। কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গোবিন্দের পরামর্শ নিতে হবে। এই কর্ম আমার যোগ্য কিনা তিনিই সঠিক বলতে পারবেন। তিনি যদি সম্মতি দেন তবেই আমি এ যজ্ঞে ব্রতি হব। 
এই ভেবে যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের কাছে ইন্দ্রসেনকে(যুধিষ্ঠিরের সারথি) দূত হিসেবে পাঠালেন। 

দূত দ্রুত দ্বারকায় পৌঁছে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ করে সকল কথা নিবেদন করে যোড়করে বলে –আপনার অদর্শনে কুন্তীপুত্র মনের দুঃখে আছেন। 

একথা শুনে গোবিন্দ দ্রুত বৈনতেয়(বিনতার পুত্র-গরুড়) আরোহণ করে ইন্দ্রসেনের সাথে চললেন। 
সূর্য পাটে গেলে তারা ইন্দ্রপ্রস্থে এসে পৌঁছালেন। 

কৃষ্ণ স্বয়ং এসেছেন শুনে আনন্দিত যুধিষ্ঠির ভাই ও মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন। তিনি নিজে এসে কৃষ্ণের অভ্যর্থনা করলেন।

কৃষ্ণ ধর্মপুত্রকে নমস্কার জানিয়ে সকলের কুশল সংবাদ নিলেন। 
ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ভক্তিভরে কৃষ্ণের পূজা করেন। সবশেষে সকলে মিলে সভায় আলোচনা করতে বসলেন। 

তাদের দেখে মনে হল যেন চন্দ্রের মণ্ডলী। 

যিনি নিজ হৃদয়ে সদা শ্রীহরির চরণ বন্দনা করেন, তার চরণকমল সদা কাশীরাম ভজেন।
....................................



গোবিন্দ-যুধিষ্ঠির সংবাদঃ

ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কৃষ্ণ-গোবিন্দকে বলেন –নারদমুনিকে পিতা পান্ডু মহারাজ বলেছেন যে রাজসূয় মহাযজ্ঞ সংসারে দুর্লভ। এই যজ্ঞ করলে পিতা খুশি হবেন, ইন্দ্রসভায় স্থান পাবেন। সে কারণে আমি এযজ্ঞ করতে চাই। 
এখন আপনার অনুমতি প্রয়োজন। সকলেই আমার মতে মত দিচ্ছেন। কেউবা আমার উপর প্রীত হয়ে, কেউবা ধনের লোভে। 
কিন্তু আপনার মুখ থেকে অনুমতি না পেলে মনের সন্দেহ দূর হবে না। আমার এখন কি কর্তব্য বলুন। আপনি পাণ্ডবদের পতি, আপনার অনুমতি বিনা আমরা কোন পথ দেখতে পাই না। 

গোবিন্দ বলেন –আপনি সর্ব গুণবান। আপনার সমান রাজা পৃথিবীতে কেউ নেই। আপনি এই যজ্ঞের যোগ্য ব্যক্তি। 
তবে আপনার কাছে আমার এক নিবেদন আছে। আমি যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। এই মহাযজ্ঞের জন্য এক লক্ষ রাজার সহযোগিতা চাই। মগধের রাজা জরাসন্ধ এখন শ্রেষ্ঠ রাজা। পৃথিবীর অধিকাংশ রাজাই এখন তার বশ্যতা মেনে নিয়েছে। সকলে তাকে ভয় পায়। অধিকাংশকে সে বলপ্রয়োগ করে বেঁধে এনেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু দুষ্ট রাজারা। এদের মধ্যে উল্লেখ্য-শিশুপাল, করূষরাজ দন্তবক্র, যবনরাজ, পুণ্ডরীক, কোশলরাজ, বাসুদেব, বিদর্ভরাজ রুক্মি, প্রাগজ্যোতিষের রাজা নরকের পুত্র মহাবীর ভগদত্ত-এমন অনেক রাজা তার দলে আছে। 
ইক্ষ্বাকু(সূর্যবংশীয় প্রথম রাজা, বৈবস্বত মনুর পুত্র) ও ইলার বংশের যত রাজারা আছে তাদের অধিকাংশ জরাসন্ধের বশ্যতা মেনেছে। যারা মানেনি তারা নিজ রাজ্যে অত্যাচারিত হয়ে উত্তরে পালাতে বাধ্য হয়েছে। জরাসন্ধের দুই কন্যা অস্তি ও প্রাপ্তির বিবাহ হয় আমার মামা কংসের সাথে, তাই সম্পর্কে তারা আমার মাতুলী (মামী)। কংসকে হত্যা করায় তারা পিতা মগধরাজকে বাধ্য করে মথুরা আক্রমণের জন্য। জরাসন্ধ এত সৈন্যসামন্ত নিয়ে এলো যে শত বছরেও তাদের ধ্বংস করে শেষ করা যাবে না। বলরাম ও আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের সংহার করতে থাকি। সে কারণে জরাসন্ধ আঠারোবার যুদ্ধ করল। তখন অনেক চিন্তা করে আমরা সবাই বুঝলাম মথুরায় আর থাকা নিরাপদ নয়। দুই মাতুলী সব সময় পিতাকে উস্কাবে আর মগধরাজ জরাসন্ধ বার বার মারতে আসবে। 
অনেক বিচার বিবেচনা করে মথুরা ত্যাগ করে অনেক দূরে দ্বারকায় চলে এলাম। 
আমার সাথে সে যুদ্ধে যারা জরাসন্ধের সাথে যোগ দেয়নি সেই ছিয়াশী রাজাদের সে নিজ ভবনে এখনও বন্দি করে রেখেছে। তাদের সাথে পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে। এদের সকলকে তার ইষ্ট শিব-রুদ্রের সামনে পূজার পর বলি দেওয়া হবে। এই রাজারা মুক্ত হলে তবেই আপনার এই যজ্ঞ সম্ভব হবে। 
জরাসন্ধকে হত্যা করতে পারলেই আপনি নিষ্কন্ট হয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারবেন। জরাসন্ধ বেঁচে থাকলে এ যজ্ঞ অসম্ভব। তার মৃত্যু হলে তার বশ্য রাজারাও আপনার বশ্যতা মানবে। ফলে সংসারে আপনার অনন্ত জয় ঘোষিত হবে। আমার এই মত। 

কমললোচন কৃষ্ণের এত কথা শুনে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বলেন –আপনি ঠিকই বলেছেন। আমিও প্রথমে চারদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তারপরে না হয় জরাসন্ধের বিষয়টি বিচার করব। 

ভীমসেন তখন বলে ওঠেন –আমি আর ধৈর্য্য ধরতে পারছি না। প্রথমে আমি বৃহদ্রথের এই পুত্রের হত্যা করতে চাই। তাকে হত্যা করলেই বহু রাজা মুক্ত হবে। তাদের সাহায্য পেলে আর কেউ আমাদের যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটাতে পারবে না। রাজা হয়ে ভয়ে শান্তির ভজনা করলে লক্ষ্মী পাবেন না। পূর্বে এমন অনেক রাজা ছিলেন। বাহুবলে ভরতরাজ ভূমণ্ডল শাসন করে গেছে। তারও পূর্বে মান্ধাতার কাছে সকলে বশ্যতা মানে। কৃতবীর্য্যের প্রতাপের কথা এখনও জগতে ঘোষিত হয়। ভগীরথও প্রজা পালনে এভাবে খ্যাতি পান। 

শ্রীকৃষ্ণ বলেন –মহারাজ শুনুন, যখন মগধরাজ জরাসন্ধ হত হবে সকল রাজারা অনায়াসে বশ্যতা মানবে। আপনি আমার সাথে ভীমার্জুনকে দিন। আমরা জরাসন্ধের দুর্দান্ত সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করব না। কৌশলে মগধপতিকে হত্যা করতে হবে। 

সব শুনে চিন্তিত যুধিষ্ঠির বলেন –আপনারা যা বলছেন তাতে আমার মন মানছে না। মগধরাজ জরাসন্ধ রাজচক্রবর্তী। তাকে সুরপতি ইন্দ্রও ভয় করেন। 
এখনি শুনলাম তার ভয়ে আপনি স্বয়ং জগন্নাথ মথুরা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে পশ্চিমে সমুদ্রতীরে আশ্রয় নিয়েছেন। 
ভীমার্জুন আমার দুই চক্ষু, আপনি শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আমার প্রাণ। এই সংকটে আপনাদের পাঠাতে মন চায় না। এমন সাংঘাতিক যজ্ঞের আমার প্রয়োজন নেই। আমি আপনাদের জন্য সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হতেও রাজি আছি। 

এত কথা শুনে ধনঞ্জয় অর্জুন বলেন –মহারাজ, এসব কি বলছেন! সংসারে কেউই চিরজীবী হয় না। যুদ্ধ না করেও কেউ কি এখনও অমর হতে পেরেছে! সঙ্কটকালে দুঃখ পেতেই হয়, তাবলে সুকর্ম বিহীন রাজা হওয়া তো বৃথা জন্মের সমতুল্য। 
আমরা চেষ্টা করে দেখি, যদি সফল না হই তখন আপনি পুনরায় চিন্তা করবেন। এখন শ্রীকৃষ্ণের সাথে আমাদের যেতে দিন। 

ইন্দ্রপুত্র অর্জুনের এই কথা শুনে নারায়ণ কৃষ্ণ “সাধু, সাধু” রবে প্রশংসা করলেন। 

সভাপর্ব সুধারস জরাসন্ধ বধে, কাশীরাম দাস কহেন গোবিন্দের পদে।
......................................

Sunday, February 14, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১২৪

[পূর্বকথা - অগ্নির হাত থেকে রক্ষা করায় কৃতজ্ঞ ময়দানব কৃষ্ণের আদেশে ত্রিলোক বিখ্যাত দিব্য মণিময় সভা নির্মাণ করলেন ইন্দ্রপ্রস্থে... একদিন নারদমুনি সভায় উপস্থিত হলেন এবং নানা উপদেশ দিলেন.....]


নারদ কর্ত্তৃক লোকপালগণের সভা-বর্ণনাঃ 

নারদ বলেন –হে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শুনুন আপনাকে প্রথমে ইন্দ্রের সভার বর্ণনা দিই। 
দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে দিয়ে দেবরাজ তার সভা নির্মাণ করান। সে বিচিত্র সভা যেন কোটি চন্দ্রের প্রভায় আলোকিত। দেবঋষি, ব্রহ্মঋষি ও ধার্মিকরা সে সভায় বসেন। সে সভা উচ্চতায় পঞ্চ যোজনের(চারক্রোশ পরিমাণ দৈর্ঘ্য) অধিক, শত যোজন দীর্ঘ বিস্তার। 


শচীদেবী ও ইন্দ্র

শচীদেবীকে নিয়ে ইন্দ্র সদা এই সভায় বিহার করেন। সে সভা শূন্যপথে থাকতে পারে এবং ইচ্ছানুসারে যেথায় খুশি যেতে পারে। সেখানে জরা, শোক, ভয়ের স্থান নেই। সকলে সর্বদা আনন্দে থাকেন। 

ইন্দের এই আশ্রমে সকল দেবতাদের অবস্থান। মরুৎ(বায়ুদেবতা), কুবের প্রমুখ সিদ্ধপুরুষরা অম্লান-কুসুম বস্ত্রে ও বিবিধ ভূষণে সজ্জিত হয়ে অবস্থান করেন। 
এছাড়া অষ্টবসু, নবগ্রহ, ধর্ম, কাম, অর্থ, তড়িৎ, বিদ্যুৎ, সপ্তবিংশ কৃষ্ণবর্ত্ম(অগ্নি), যজ্ঞ, মন্ত্র, দক্ষিণা সব যেন মূর্তিমন্ত হয়ে আছেন। সেই পুণ্যজনের অনন্ত কথা লিখে শেষ করা যায় না। সেখানে তেত্রিশকোটি দেবতা পুরন্দর-ইন্দ্রের সেবা করছেন। এসভার গুণ বর্ণনাতীত। 
রাজা হরিশচন্দ্রও এই সভা অলঙ্কৃত করছেন। 


যমরাজ

এবার আপনাকে যমরাজের সভার কথা বলি, শুনুন জৈষ্ঠ্য পান্ডব! 
যমরাজের সভা দৈর্ঘে-প্রস্থে শত শত যোজন বিস্তৃত। আদিত্য-সূর্যের সমান সে সভার প্রভা। সে সভা না শীতল, না তপ্ত। সেখানে দুঃখের স্থান নেই। চারদিক প্রেমময়। হিংসার স্থান নেই, সব স্থানে সুখ অবস্থান করে। 
সব কথা এত অল্প সময়ে বলে শেষ করতে পারবো না, কিছু কিছু বলছি, শুনুন। 

যযাতি, নহুষ, পুরু, ভরত, কৃতবীর্য্য, কার্ত্তবীর্য্য, সুনীথ, সুরথ, শিবি, মৎস্য, বৃহদ্রথ, নল, বহীনর, শ্রতশ্রবা, পৃথুলাশ্ব, দিবোদাস, অম্বরীষ, রঘু, প্রতর্দ্দন, পৃষদশ্ব, সদশ্ব, মরুত্ত, বসুমন, শরভ, সৃঞ্জয়, বেণ, ঐন, উশীনর, পুরু, কুৎস, প্রদ্যুম্ন, বাহ্লীক রাজা, শশবিন্দু, কক্ষসেন, সগর, কেকয়, জনক, ত্রিগর্ত, বার্ত্ত, জয়, জন্মেজয়, অজ, ভগীরথ, দিলীপ, লক্ষ্মণ, রাম, ভীমজানু, পৃথু, পৃথুবেগ, করন্দম প্রমুখ রাজারা তো আছেনই, এমনকি ধৃতরাষ্ট্রের মত শতজন, ভীষ্মের মত দুইশত, ভীমের মত শত ও কৃষ্ণার্জুনের মত শত শত জন এখানে আছেন। প্রতীপ, শান্তনু ও তোমাদের পিতা পান্ডুও এখানে থাকেন। 
অশ্বমেধ যজ্ঞের মত বহু যজ্ঞ ফলের দান এখানেই থাকে। 


এবার বরুণদেবের(জলদেবতা) সভার কথা বলি। সেও এক অপূর্ব সভা। এটিও বিশ্বকর্মার নির্মাণ। 
জলের মধ্যে এই সভার নাম পুষ্করমালী। এই সভা শত শত যোজন বিস্তৃত। নানা রত্নে এই সভাকে সজ্জিত করা হয়েছে। বরুণদেব সেখানে স্ত্রী বারুণীর সাথে পুত্র, পৌত্র, পাত্র, মিত্র, পুরোহিতসহ অবস্থান করেন। 


বিশ্বকর্মা

দ্বাদশ আদিত্য(বিবস্বান্‌, অর্যমা, পূষা, ত্বষ্টা, সবিতা, ভগ, ধাতা, বিধাতা, বরুণ, মিত্র, শক্র ও উরুক্রম) ও সকল নাগ এখানে অবস্থান করেন। বাসুকি, তক্ষক, কর্কোটক, ঐরাবত, সংহ্লাদ, প্রহ্লাদ, বলি, নমুচি দানব, বিপ্রচিত্তি, কালকেয়, দুর্মুখ শরভ(পৌরাণিক অষ্টপদ ও সিংহাপেক্ষা বলবান মৃগবিশেষ), এছাড়া মূর্তিমন্ত চার সিন্ধু(সাগর), এবং আরো নদীরা-যেমন জাহ্নবী(গঙ্গা), যমুনা, সিন্ধু, সরস্বতী, শোণ, চন্দ্রভাগা, বিপাশা, বিতস্তা, ইরাবতী, শতদ্রু, সরযূ, চর্মণ্বতী, কিম্পুনা, বিদিশা, কৃষ্ণবেণ্বা, গোদাবরী, নর্মদা, বিশল্যা, বেণ্বা, লাঙ্গলী, কাবেরী, দেবনদী মহানদী, ভারবী, ভৈরবী, ক্ষীরবতী, দুগ্ধবতী, লোহিতা, সুরভি, করতোয়া, গান্ডকী, আত্রেয়ী, শ্রীগোমতী, ঝুম্‌ঝুমি, স্বর্ণরেখা নদী, পদ্মাবতী প্রমুখ এবং বিভিন্ন তড়াগ(দীঘি) ও পুষ্করিণ্যাদিরা মূর্তিমতী হয়ে সকলে বরুণদেবের সেবা করেন। 
এছাড়া চারি মেঘ(জলধর, জীমূত, বারিদ, নীরদ) সেখানে পরিবার সহ অবস্থান করেন। 


কুবের 

এবার কুবেরের সভার কথা বলি, শুনুন। কৈলাস-শিখরে এই সভাও বিশ্বকর্মার অপূর্ব নির্মাণ। শতেক যোজন দীর্ঘ, সত্তর যোজন বিস্তৃত। সেখানে গুহ্যক(কুবের অনুচর) যক্ষ, কিন্নর, কিন্নরী, চিত্রসেনা, রম্ভা, ইরা, ঘৃতাচী, মেনকা, চারুনেত্রা, উর্বশী, বুদ্বুদা, চিত্ররেখা, মিশ্রকেশী, অলম্বুষা প্রমুখ সুন্দরী মহাদেবীরা নৃত্যগীত করে সর্বদা কুবেরের সেবা করেন। 

পুত্র নলকুবর ও অন্য মন্ত্রীরা মণিভদ্র, শ্বেতভদ্র, ভদ্র, সুলোচন, গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষরা, লক্ষ লক্ষ প্রেত, ভূত, পিশাচ, রাক্ষস, দিব্যরক্ষ, ফলকক্ষ, ফলোদক, তুম্বুরু প্রভৃতি, হাহা, হূহূ, বিশ্বাবসু, চিত্রসেন, কৃতী, চিত্ররথ, মহেন্দ্র, মাতঙ্গ বিদ্যাধর, বিভীষণ ও তার ভাইরা, এছাড়া সকল পর্বতরা মূর্তিমান হয়ে এখানে থাকেন-হিমাদ্রি, মৈনাক, গন্ধমাদন, মলয়া, এমনকি আমি ও আমার মত আরো অনেকে এখানে থাকেন। 
উমা সহ সদানন্দ শিব তাঁর নন্দী, ভৃঙ্গী, গণপতি/গণেশ, কার্ত্তিক, বৃষভ, পিশাচ, খেচর, শিবাগণ সকলকে নিয়ে সেখানে সুখে বাস করেন।


ব্রহ্মা

এবার আমি ব্রহ্মার সভার বর্ণনা করি। পূর্বে দেবযুগে দিবাকর-সূর্য মনুষ্যদেহ ধারণ করে মনুষ্যলোকে ভ্রমণ করছিলেন। পথে আমার সাথে দেখা হলে তিনি দিব্যচক্ষে আমার পরিচয় জানতে পেরে আলাপ করেন ও ব্রহ্মার সভার গুণ বর্ণনা করেন। শুনে আমার সে সভা দেখার ইচ্ছে হল। আমি তাঁকে অনুরোধ করি কিভাবে ব্রহ্মার সভায় উপস্থিত হওয়া যায় তা জানানোর জন্য। তিনি আমায় হিমালয়ে সহস্র বছর ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করতে বলেন। আমি সেই তপস্যা শুরু করি। সহস্র বছর পর সেই দেব দিবাকর এসে আমায় ব্রহ্মপুরী নিয়ে যান। সেখানের যা অপূর্ব রূপ দেখলাম, বলে বোঝাতে পারব না। সে সভার আদি-অন্ত নেই। 
ব্রহ্মা নিজে এই সভা নির্মাণ করেন। চন্দ্র-সূর্যের প্রভায় সে সভা সর্বদা আলোকিত হয়। শূন্যে সে সভা শোভা পাচ্ছে। 

সেই সভায় বসে বিধাতা ব্রহ্মা বিধির বিধান দেন। সকল প্রজাপতিরা তাকে ঘিরে থাকেন। প্রচেতা, মরীচি, দক্ষ, পুলহ, গৌতম, অঙ্গিরা, বলিষ্ঠ ভৃগু, সনক, কর্দম, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, ক্রতু, পুলস্ত্য, প্রহ্লাদ, বালখিল্য, অগস্ত্য, মান্ডব্য, ভরদ্বাজ প্রমুখ এই সভা উজ্জ্বল করেন। 
এছাড়া শরীরী ও অশরীরী পিতৃগণ সেখানে ব্রহ্মার উপাসনা করেন। 
গন্ধর্বরাও সেখানে আছেন। এমনকি আয়ুর্বেদ, চন্দ্র, তারা, সূর্য, সন্ধ্যা, ছায়া, ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, কান্তি, শান্তি, ক্ষমা, অষ্টবসু, নবগ্রহ, শিব সহ উমা সকলেই সেথায় যান। 
চতুর্বেদ, ষটশাস্ত্র, তন্ত্র, স্মৃতি, শ্রুতি, চারযুগ, বর্ষ, মাস, দিবা সহ রাত যেমন আছেন। তেমনি সাবিত্রী, ভারতী, লক্ষ্মী, অদিতি, বিন্তা, ভদ্রা, ষষ্ঠী, অরুন্ধতী, নাগমাতা কদ্রু প্রমুখ মহান নারীরাও এখানে ব্রহ্মার উপাসনা করেন। 
মূর্তিমন্ত হয়ে নারায়ণ এখানে আছেন। ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ, হুতাশন-অগ্নি আরো কত বলি! সবাই এখানে অবস্থান করেন। 
নিত্য এসে সকলে সৃষ্টির অধিকারী ব্রহ্মার সেবা করেন। 

এই দুই নয়নে আমি অনেক সভা দেখলাম কিন্তু ব্রহ্মার সভার মত নয়নাভিরাম আর কখনও দেখিনি। মনুষ্যলোকেও নয়। 

যুধিষ্ঠির বলেন –হে দেব! আপনার প্রসাদে আমি এমন সুন্দর সভার বর্ণনা শুনতে পেলাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। তবে একটি কথা ভেবে বিস্মিত হচ্ছি। 
যত নৃপতিরা পৃথিবীতে শাসন করেছেন সকলে যমের ভবনে আছেন। কেবল রাজা হরিশচন্দ্র কিভাবে ইন্দ্রের সভা আলো করলেন! তিনি কোন পুণ্যবলে এমন সম্মান পেলেন! 
আমার পিতা পান্ডুকে যমালয়ে আপনি দেখেছেন। তিনি কি আমার জন্য কোন বার্তা প্রেরণ করেছেন! 


রাজা হরিশচন্দ্র

নারদ বলেন –হে যুধিষ্ঠির, সূর্যবংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতি হরিশচন্দ্রের আখ্যান শুনুন। এক রথে তিনি সমগ্র মর্তপুরী জয় করেন। বাহুবলে তিনি সপ্তদ্বীপের অধিপতি হন। ইনিই আবার রাজসূয় যজ্ঞ করেন। অনেক ব্রাহ্মণ সে যজ্ঞে আমন্ত্রিত হন। রাজা প্রতি জনের সেবা করেন। শাস্ত্রমতে যিনি যে দক্ষিণা প্রার্থনা করেছেন তার পাঁচগুণ রাজা তাদের দান করেন। সকল রাজার থেকে তিনি অধিক দানধ্যান করে এই স্বর্গস্থানের ফল লাভ করেন। 
যে রাজারা রাজসূয় যজ্ঞ করেন, যারা পলায়ন না করে সংগ্রামে নিহত হন এবং যারা তীব্র তপস্যায় দেহ ত্যাগ করেন, তারাই ইন্দ্র সভায় নিত্য বিরাজ করেন। 
তোমার পিতা পান্ডুর সাথে আমার যমালয়ে দেখা হয়। তিনি আমায় বিনয়ের সাথে বলেন –ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আমার সন্তান। তার বীর্যবন্ত ভাইরা তার অনুগত। কমললোচন কৃষ্ণ তার সুহৃদ। পৃথিবীতে তার অসাধ্য নেই। পুত্র অনায়াসে রাজসূয় যজ্ঞ করতে পারে। এই রাজসূয় যজ্ঞ যদি সফল হয় তবে আমিও রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান পাবো। 

হে যুধিষ্ঠির পান্ডু মহারাজ আমার মাধ্যমে আপনাকে একথা বলে পাঠালেন, এবার আপনি ভেবে দেখুন কি করবেন। সব যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ এই রাজসূয় যজ্ঞ। তবে এই যজ্ঞে বহু বিঘ্ন ঘটে। সামান্য ছিদ্র পেলেই যক্ষ রক্ষ সকলে যজ্ঞ পন্ড করে। এই যজ্ঞের কারণে রাজারা যুদ্ধ করে। এখন আপনি দেখুন যা ভাল বোঝেন, করুন। আমায় এবার বিদায় দিন আমি দ্বারাবতী যাব। 

এই বলে নারদ অন্য মুনিদের নিয়ে দ্বারকায় চললেন কৃষ্ণ দর্শনে। 

সভাপর্বের এই অনুপম বর্ণনা করেন কাশীরাম দাস এবং তা শ্রবণ করেন সকল সাধু জন। 
......................................


পাদটীকাঃ

দশটি দিক/কোণের রক্ষকঃ-

ইন্দ্র- পূর্ব দিকের রক্ষক [বৃষ্টির দেবতা, মিষ্টি জলের উৎস]
বরুণ- পশ্চিম দিকের রক্ষক [সমুদ্রের দেবতা, নোনতা জলের উৎস]
যম- দক্ষিণ দিকের রক্ষক [মৃত্যুর দেবতা, শেষ বা নাশ]
কুবের- উত্তর দিকের রক্ষক [ধন সম্পদের দেবতা, উন্নতি]

এছাড়া, 
উত্তর-পূর্ব দিকের/ ঈশাণ কোণের রক্ষক -শিব
উত্তর-পশ্চিম দিকের রক্ষক - পবন/বায়ু দেবতা
দক্ষিণ-পূর্ব দিকের রক্ষক - অগ্নি
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের রক্ষক - নৈঋত

উপর দিকের রক্ষক - ব্রহ্মা
নিচের দিকে রক্ষক - বিষ্ণু [বিষ্ণু আমাদের পালন কর্তা, তিনি উত্তর-পূর্ব দিকে মাথা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে পা করে অবস্থান করেন]

.....................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers