Blog Archive

Saturday, May 28, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১২৯

[পূর্বকথা - পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ........কৃষ্ণ প্রথমে জরাসন্ধ বধের কথা বলেন ....ভীমার্জুনকে সাথে নিয়ে কৃষ্ণ গিরিব্রজে রওনা দেন ..ভীম যুদ্ধে জরাসন্ধকে বধ করেন



অর্জ্জুনের দ্বিগ্বিজয় যাত্রাঃ 

কৃতাঞ্জলি করে মহাবলী পার্থ অর্জুন রাজা যুধিষ্ঠিরকে বলেন –মহারাজ, আজ্ঞা করুন রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করি। 
অতুল কার্মুক(ধনুক), গান্ডীব ধনুক, অক্ষয় তূণ, কপিধ্বজ রথ, দেব দত্তাম্বুজ(অম্বুজ-পদ্ম), সুচারু তুরঙ্গম(ঘোড়া) বল নিয়ে আমরা রাজকোষের ধনবৃদ্ধি করব। অগম্য পথে উত্তরে গিয়ে আমি সকল রাজ্য জয় করব, সব রাজাদের বশ্যতা আদায় করব। 

অর্জুনের কথা শুনে যুধিষ্ঠির তাকে স্নেহালিঙ্গনে সম্মতি জানালেন। 
শুভক্ষণ দেখে ব্রাহ্মণদের মঙ্গলবচনের মাধ্যমে কৃষ্ণ-মাধবের স্মরণ নিয়ে যাত্রার আয়োজন হল। রথ, গজ, বাজী(অশ্ব), সেনারা সেজে উঠল। 
উত্তরে অর্জুন গেলেন, পূর্বে ভীম, পশ্চিমে নকুল এবং কনিষ্ঠ ভাই সহদেব দক্ষিণ বিজয়ে বেরলেন। 

অর্জুনের সেনা শ্বেত, পীত(হলুদ) নানাবর্ণে সেজে, বিবিধ বাজনা বাজিয়ে এগোতে থাকে। শঙ্খনাদ, হাতির গর্জন এবং বিবিন্ন শব্দে ক্ষিতি কেঁপে কেঁপে উঠল। 
অর্জুন প্রথমে কুলিন্দ দেশে প্রবেশ করে অনায়াসে তাদের জয় করলেন। 
কালকূট(বিপদসঙ্কুল) বর্ত্ম(পথ) পেরিয়ে সহজেই আনর্ত দেশের রাজাকে জয় করলেন। 
শাকল সুদ্বীপ, প্রতিবিন্ধ্য রাজ্যও অনায়াসে জয় করলেন। 
এরপর প্রাগ্‌জ্যোতিষ রাজ্যে এলেন।এই রাজ্যের রাজা ভগদত্ত ভুবন বিখ্যাত। তার অগণিত সেনা-যারা কিরাত(ব্যাধ) কাননবাসী। এই বন্য সৈনিকদের অসীম ধৈয্য। তাদের হাতে ধনুক, গুঞ্জহারের(কুঁচফলের) মালায় সজ্জিত, উঁচু করে ঝুঁটি বাঁধা, শরীরে বৃক্ষলতা বেষ্টিত। তারা পরম হরষে যুদ্ধ করতে লাগল। এভাবে উভয় পক্ষের সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ হল। 
ভগদত্ত রাজা পুরন্দরাত্মজ(ইন্দ্রপুত্র) অর্জুনের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ করলেন। নানা অস্ত্রে, ধনুকে তারা তাদের সকল শিক্ষা প্রয়োগ করতে লাগলেন। মারুত(বাতাস), অনল(অগ্নি), সূর্য, বসু, জল-বিবিধ মন্ত্র শিক্ষা প্রয়োগ হল। আটদিন ক্রমাগত বিশ্রাম না নিয়ে উপবাসে দুই বীর যুদ্ধ করতে লাগলেন। 
শেষে ভগদত্ত হেসে অর্জুনকে বলেন – হে মহামত্তবীর এবার রণে নিবর্ত হও। তুমি আমার সখা পুরুহূতের(ইন্দ্রের) যোগ্য পুত্র। তোমার শক্তি সম্পর্কে ধারনা ছিল না। এতদিনে তোমার যোগ্যতা জেনে খুশি হচ্ছি। কিসের কারণে তুমি এই যুদ্ধ করছ! কি চাও দয়া করে আমায় বল। 

অর্জুন বিনয়ের সাথে বলেন –ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কুরুকুলের রাজা হলেন। তিনি রাজসূয় ক্রতু(যজ্ঞ) করতে চান। আপনি যদি আমার উপর প্রীত হন তবে দয়া করে কিছু করদান করুন। 

প্রাগ্‌জ্যোতিষের ভগদত্ত রাজা আনন্দ মনে বহু ধন দিয়ে অর্জুনের পূজা করলেন। 

এরপর অর্জুন আবার আরো উত্তরে দিগ্বিজয়ে বেরলেন। বিভিন্ন পর্বতে শত শত রাজাদের হারিয়ে তাদের বশ্যতা নিলেন। কেউ আনন্দে ধন দিলেন, কেউবা সংগ্রাম করল। 
উলূক(ইন্দ্র)পুত্রের সঙ্গে বৃহন্ত নৃপের অনেক যুদ্ধ হল। 
মোদাপুরে দেবকসুদাম বহু ধন দান করল। 
পৌরব পর্বতের রাজা সেনাবিন্দু অর্জুনের হাতে রত্নসিন্ধু তুলে দিল। 
লোহিতদেশের মহাবল রাজা অর্জুনের অনেক পূজা করলেন। 
ত্রিগর্তের রাজাকে অনায়াসে জয় করা গেল। 
সিংহপুরের সিংহরাজ বশ্যতা জানাল। 
বাহ্লীক, দরদ জয় হল। 
রাজা কোকনদ, যিনি কামগিরির মাঝে বাস করেন, তার রাজ্যটি অপূর্ব সুন্দর। অশেষ ঘোটক(ঘোড়া), শুক্ল(সাদা) ময়ূর আনন্দে সারা দেশে ঘোরে। এই রাজাও অর্জুনকে আনন্দিত করলেন।
নৃপতি জীবন অর্জুনের সাথে মহারণ করলেন। শেষে হেরে পার্থের ভজনা করতে লাগলেন। এখান থেকেও পার্থ নানা বর্ণের রাশি রাশি ধনরত্ন পেলেন। 
এভাবে একে একে সব দেশ জয় করে অর্জুন হেমন্তগিরিতে উঠলেন। সেখানেও অভেলে গন্ধর্ব দানবপুরী জয় করলেন। 

কৈলাস পর্বতে কুবেরের বাসস্থান, সেখানে কোটি কোটি যক্ষ রক্ষের বাস। সেখানেও যুদ্ধ হল। শেষে কিরীটীর(অর্জুনের) জয় হল। ইন্দ্রের কুমার ইন্দ্রের সমান যুদ্ধ করে বহু যক্ষ মারতে লাগলেন। তারা ভয়ে পালিয়ে কুবেরের কাছে এসে বলে দেশে শত্রুর আক্রমণ ঘটেছে। শুনে বৈশ্রবণ(বিশ্রবা মুনির পুত্র-কুবের) বহু ধন নিয়ে পান্ডুপুত্রকে উপহার দিয়ে স্নেহের সাথে বিদায় জানালেন। 

হাটক নগর, সেখানের গুহ্যকনিবাসীদের জয় করে অনেক ধন আহোরণ হল। 
এভাবে বহু ধন রত্ন নিয়ে অর্জুন আনন্দ মনে আরো এগোতে লাগলেন। 
মানসসরোবর দেখে পার্থ খুব সুখী হলেন। এই অমরনগরী কোটি কোটি শশিমুখী অপ্সরা কিন্নরী পূর্ণ। জিতেন্দ্রিয় ধীর পার্থ মহাবীর কারো পানে দৃষ্টি দেন না। সেই সরোবরে বহু ঋষি বাস করতেন, তারা অর্জুনকে অনেক আশীর্বাদ করলেন। সেখান থেকে কৌতুহল নিয়ে পার্থ আরো উত্তরে দ্রুত যেতে থাকলেন। সকল স্থানে তেজময় মার্তণ্ডের(সূর্যের) মত ঘুরে পার্থ ভারত জয় করতে লাগলেন। 

আরো উত্তরে তিনি হরিবর্ষ নামে এক স্থানে এলেন। তাকে দেখে দ্বারপালরা লৌহদণ্ড নিয়ে তেড়ে এলো। জীবন্ত মানুষ দেখে তারা বিস্মিত হয়ে অর্জুনকে বলে –তোমার দেখছি খুব সাহস! মানব শরীরে এখানে উপস্থিত হয়েছ! এর আগে এমন কখনও দেখিনি। এবার নিজেকে নিবৃত কর। এস্থান কেউ জয় করতে পারে না। এই উত্তরপুর কুরুর নগর-এখানে কি কারণে এসেছ! এখানে তো কাউকে দেখতে পাবে না, জীবন্ত এখানে কেউ থাকে না, কার সাথে তুমি যুদ্ধ করবে! 

কুন্তীপুত্র পার্থ দ্বারীদের বলেন –ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ। আমি তার কিঙ্কর দাস মাত্র। তোমাদের লঙ্ঘন করে আমি পুরীতে প্রবেশ করব না, কথা দিচ্ছি। তবে তোমরা আমায় কিছু কর প্রদান কর। 
একথা শুনে দ্বারপালরা বহু রত্ন এনে ধনঞ্জয়ের হাতে তুলে দিল। ধন পেয়ে পার্থ সানন্দ হৃদয়ে দক্ষিণে মুখ ফেরালেন। 
ফেরার পথেও বহু মহীপালকে জয় করে কর আদায় করলেন। 

শেষে বহু বাদ্য বাজিয়ে চতুরঙ্গে নিজ নগরে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি বহু মণি, মরকত, কনক, রজত, মুক্তা, প্রবাল রাশি, বিবিধ বসন, গো আদি বাহন ও বহু দাসদাসী সঙ্গে আনলেন। জয় জয় শব্দে, শঙ্খের নিনাদে পার্থ ইন্দ্রপ্রস্থে প্রবেশ করলেন। 

ইন্দ্রের আত্মজ পার্থ সজ্জা পরিবর্তন করে ধর্মপুত্রের সামনে উপস্থিত হলেন। মাটিতে দণ্ডবৎ হয়ে করজোড়ে যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম জানালেন। ধিরে ধিরে তার অভিযানের সব কথা যুধিষ্ঠির শুনতে লাগলেন। 

সব শেষে অর্জুন বলেন –উত্তরদিকের সকল নৃপ আপনার বশ্যতা মেনে নিয়েছেন। সকলে কর প্রদান করেছেন, দেখুন নৃপবর! 

আনন্দে যুধিষ্ঠির অর্জুনকে আলিঙ্গন করলেন। অনেক ভাবে ভাইকে তুষ্ট করলেন। পার্থ যা যা এনেছিলেন সব রাজকোষে সঞ্চিত রেখে নিজ নিবাসে ফিরে গেলেন।
......................................

Sunday, May 22, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১২৮

[পূর্বকথা - পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ....যুধিষ্ঠির পরামর্শের জন্য কৃষ্ণকে আহ্বান জানালেন....কৃষ্ণ প্রথমে জরাসন্ধ বধের কথা বলেন ....ভীমার্জুনকে সাথে নিয়ে কৃষ্ণ রওনা দেন .. তারা ছদ্মবেশে গিরিব্রজে প্রবেশ করে জরাসন্ধকে যুদ্ধে আহ্বান জানান.] 



জরাসন্ধের সহিত ভীমের যুদ্ধঃ 

মগধরাজ জরাসন্ধের সাথে ভীমসেনের সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ শুরু হল।
তাদের দেখে মনে হল যেন গজরাজ-নক্র(কুমীর) যুদ্ধ করছে। 
বৃত্তাসুর-শক্রের(দেবরাজ ইন্দ্রের) যুদ্ধের কথা মনে পরে অথবা রাম-রাবণের যুদ্ধের কথা। 
প্রথমে তারা গদা যুদ্ধ শুরু করল। কর্কশ বচনে, ভৎসনা করতে করতে উভয়ে উভয়ের উপর রাগে মত্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। 

জরাসন্ধ বলে –ওরে পান্ডব, কোন খান্ডব বন থেকে মগধে এসেছিস মৃত্যুর টানে! নিয়তিই তোকে টেনে এনেছে, দেখ তোর কি করি! 

শুনে গর্জন করতে করতে ভীম বলেন –তোমাকেই শমনের(যমের) মনে পরেছে। তার দূত হয়ে আমি এলাম তোমায় হত্যা করতে। 

ক্রোধে বৃকোদর কদলীপাতার মত থর থর করে কাঁপতে থাকেন। দুজনে দ্রুত পরস্পরকে ঘুরে নিয়ে করাঘাত শুরু করে। 
তাদের সাংঘাতিক গর্জনে সকলের কানে তালা লেগে গেল। দাঁত কড়মড় করে, নিশ্বাসে ঝড় তুলে তারা লড়তে লাগল। করে কর, পায়ে পা জড়িয়ে তারা পরস্পরকে টানতে থাকে। কখনও বা দৌড়ে এসে মাথা দিয়ে গুঁতো মারে, বুকে আঘাত করে। তাদের লাল চোখ, সারা শরীর দিয়ে যেন আগুন ছুটছে, নয়নানলে যেন দুজনে দুজনকে দহন করে। কখনও বা বজ্রমুষ্টিতে, উরুতে, কোমড়ে আঘাত হেনে ভূমিতে জড়াজড়ি করে গড়াগড়ি দেয়। তাদের শরীরের ঘর্মে রণাঙ্গন ভিজে যায়, তবু সেই ধুলোকাদা মেখে তারা মল্লযুদ্ধ করতে থাকে। দুজনেই আঘাত পায়, রক্তে দেহ ভেসে যেতে থাকে। রাগে লম্ফঝম্ফ করে কাঁপতে কাঁপতে তবু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তাদের পায়ের চাপে ভূমি কাঁপতে থাকে। 
পুনরায় গদাযুদ্ধ শুরু হয়। গদার প্রহার হৃদয়ে, শিরে, পিঠে, বাহুতে পরতে থাকে। সকলে দেখে গদার আঘাতে অগ্নি ঝরে, কেউ কারো চেয়ে যেন ঊন(কম) নয়। দুজনে দুজনকে মাটিতে আছড়ে ফেলে আবার লাফিয়ে ওঠে। যেন দুই বারণ(হাতি) বারুণী(মদ) পান করে পর্বত মাঝে যুঝছে। বা দুই বৃষভ(ষাঁড়) সুরভি(স্বর্গের কামধেনু) লোভে গোষ্ঠে যুদ্ধ করছে। 
কার্তিক মাসের প্রথমদিন এ যুদ্ধ শুরু হয়। অহর্নিশি অবিরাম দুজনে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এভাবে চতুর্দশ দিন কেটে গেল। 

কাশীদাস বলেন এভাবে তারা কেবল বায়ু পান করে অবিশ্রাম যুদ্ধ করতে থাকল।
....................................



জরাসন্ধ-বধ ও রাজগণের কারামোচনঃ 

অহর্নিশি চোদ্দদিন ক্রমাগত একভাবে যুদ্ধ করে চললেন ভীমসেন ও মগধরাজ জরাসন্ধ। অনাহারে, বিশ্রামহীন অবস্থায় লড়তে লড়তে বৃহদ্রথ কুমার জরাসন্ধ দুর্বল হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। অঙ্গ অচল হল, ধিরে ধিরে তার জ্ঞান লোপ পেল। তবু সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 
পবনপুত্র ভীম মহাপরাক্রমী। তিনি এত যুদ্ধ করেও কোন কষ্ট বোধ করলেন না। 

কৃষ্ণ ভীমকে ডেকে বলেন –কি দেখছ! এই সুযোগে শত্রুকে সংহার কর! 

কৃষ্ণের কথা শুনে বৃকোদর ভীম ক্রোধের সাথে জরাসন্ধকে দুই পায়ে ভূমিতে ফেললেন। তারপর দুহাতে জরাসন্ধের দুই পা ধরে চক্রাকারে চারদিকে ঘোরাতে থাকেন। শতবার এভাবে ঘুড়িয়ে তাকে ছুঁড়ে ফেলে তার বুকে মহাবলে চেপে বসেন। জরাসন্ধের কন্ঠ জানু দিয়ে চেপে বুকে বজ্রমুষ্টি মারতে থাকেন। সেই গুরু গর্জনে ধরা কাঁপতে শুরু করে। রাজ্যের লোক সেই কম্পনে মৃতপ্রায় বোধ করল, ভয়ে তারা এমন চিৎকার করে যে কেউ কারো কথা বোঝে না। ভয়ে গর্ভবতী নারীর গর্ভ খসে। হাতি, ঘোড়া প্রমুখ জীবজন্তু দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। বৃকোদর ভীম সর্বশক্তি দিয়ে জরাসন্ধকে হত্যার চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু সফল হন না। 

আশ্চর্য হয়ে তিনি কৃষ্ণকে বলেন –আমি সর্বশক্তি দিয়ে একে হত্যার চেষ্টা করছি, কিন্তু এর দেখছি মরণ নেই! 

যদুরায় কৃষ্ণ ভীমকে কাছে ডেকে বলেন –পূর্বে জরা একে সন্ধি করেছিল। সেই পথেই একে হত্যা করতে হবে। 

এই বলে শ্রীনাথ কৃষ্ণ একটি তৃণ দুই করে ধরে চিরে দেখালেন। সমগ্র বিষয়টি বুঝে কুন্তীপুত্র ভীম হৃষ্ট মনে পুনরায় গর্জন করতে করতে জরাসন্ধের দিকে ধেয়ে যান। সিংহ যেমন মৃগকে অবহেলায় মারে, তেমনি বজ্রমুষ্টির প্রহারে জরাসন্ধকে মাটিতে ফেলে। জরাসন্ধের এক পা নিজের একপায়ে চেপে ধরে অন্য পা হাত দিয়ে হুঙ্কার মেরে টান দেন বৃকোদর। মাঝখান থেকে চিরে জরাসন্ধকে দু’টুকরো করা হল। এভাবে জন্মকালের রূপ ফিরে পেয়ে জরাসন্ধ প্রাণ হারায়। 

জরাসন্ধ নিহত হলে নারায়ণ কৃষ্ণ হরষিত হলেন। আনন্দে তিন বীর পরস্পরকে আলিঙ্গন করেন। মগধরাজের মৃত্যু সংবাদে নগরবাসী ভয় পেল। 
জরাসন্ধের পুত্র সহদেব প্রচন্ড ভয় পেয়ে পাত্রমিত্র নিয়ে কম্পিত কলেবরে গোবিন্দের চরণে এসে করজোড়ে স্তব করে বলে –হে প্রভু, আপনার মহিমা অপার। আপনিই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, আদ্যাশক্তি, বৈশ্বানর(অগ্নি)। আপনিই আমার কাছে চন্দ্র, সূর্য, জলেশ্বর, বায়ু, শক্তি-বল, চরাচর। আমি অতি মূঢমতি(নির্বোধ)। চারিবেদ আপনার সঠিক স্বরূপ বর্ণনায় অক্ষম, আমার সেখানে কি বা সাধ্য! আমায় রক্ষা করুন, আশ্রয় দিন। 
এইভাবে জরাসন্ধের পুত্র সহদেব শ্রীকৃষ্ণের বহু স্তুতি করলে গদাধর ঈষৎ হেসে অভয় আশ্বাস দেন। তিনি সহদেবকে মগধের সিংহাসনে বসিয়ে বন্দিশালা থেকে সকল রাজাকে মুক্ত করেন। সকল রাজাদের নানা রত্ন, বসনভূষণ দেওয়া হল।

বন্দিরাজারা মুক্ত হয়ে কৃষ্ণকে প্রণাম করে বলে –সদয় হৃদয় আপনার, আপনি সেবকরঞ্জন। 
দুর্বলের বল, আপনি গৌরব ভঞ্জন। 
অনাথের আপনি নাথ। 
আপনিই হিংসকের অরি(শত্রু)। ধর্মের পালন হেতু আজ আপনি মর্তে অবতীর্ণ। 
আপনার গুণ বেদেরও অগোচর। কে আপনাকে বর্ণনা করবে! 
শিব শঙ্করও আপনাকে যোগধ্যানে সকল সময় ধরতে পারেন না। 
জরাসন্ধ আমাদের যত দুঃখ দিয়েছিল সব তা দূর হল আপনাকে দর্শন করে। আপনার অভয় পঙ্কজপদ দর্শন করে আজ নয়ন সার্থক হল। তার উপর আপনার মুখ নিসৃত অমৃত ভাষ্য শ্রবণে কর্ণ ধন্য হল। জরাসন্ধ আজই আমাদের বলি দিত, আপনার কৃপায় আমরা উদ্ধার পেলাম। আমরা ধন্য, প্রভু! আপনি আজ্ঞা করুন আমরা আপনার জন্য কি করতে পারি। 

গোবিন্দ সহাস্যে বলেন –আপনারা সকলে নিজ নিজ রাজ্যে গমন করুন। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করবেন, আপনারা দয়া করে তাকে সাহায্য করবেন। 
একথা শুনে সকল রাজারা অঙ্গীকার করে কৃষ্ণকে প্রণাম করে যে যার দেশে ফিরে গেল। 

কৃষ্ণ-নারায়ণ জরাসন্ধের দিব্যরথ এনে ভীমার্জুনের সাথে তাতে আরোহণ করলেন। অপূর্ব সুন্দর সে রথটি পূর্বে পুরন্দর ইন্দ্রের ছিল। তিনি এটিতে চড়ে ঊনশত বার দানব দলন করেন। এই রথের ধ্বজা যোজন দুর থেকেও দেখা যায়। ইন্দ্রের থেকে এই রথটি বৃহদ্রথের পিতা মগধরাজ উপরিচর বসু উপহার পান। পরে সেটি বৃহদ্রথ ও তারপর জরাসন্ধের হয়। সে রথে তিন বীর আরোহণ করেন। 

গোবিন্দ গরুড়কে স্মরণ করেন। খগরাজ এসে সে রথের ধ্বজায় বসার অনুমতি নিলেন। কৃষ্ণ স্বয়ং সে রথের সারথী হয়ে শঙ্খনাদ করে শীঘ্র ইন্দপ্রস্থে উপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠিরকে নমস্কার করে গোবিন্দ সকল ঘটনা জানালেন। 
আনন্দে যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি গোবিন্দের পুজা-স্তব করলেন। 
জরাসন্ধের রথ ও আরো অনেক অমূল্য রত্ন রাজা যুধিষ্ঠির হৃষ্ট মনে কৃষ্ণকে উপহার দিলেন। সেই রথে আরোহণ করে দেব দামোদর সকলের মেলানি(বিদায়কালীন সম্ভাষণ) নিয়ে দ্বারকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। 

মহাভারতের এই পবিত্র পুণ্যকথা-গোবিন্দের লীলা, রথ, পান্ডব কথা। 
সভাপর্বের সুধারস জরাসন্ধ বধে, কাশীরাম দাস কহেন আশ্রয় নিয়ে গোবিন্দের পদে। 
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers