Blog Archive

Sunday, November 13, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩২

[পূর্বকথা পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ......অর্জুন, ভীম ও সহদেব সে কারণে দ্বিগ্বিজয় যাত্রা করেন


নকুলের দিগ্বিজয়ঃ 

পশ্চিমদিকে গেলেন নকুলবীর। সঙ্গে গেল বহু গজ, বাজি(ঘোড়া), রথ, রথী ও পদাতিক। তাদের সিংহনাদ, শঙ্খনাদ, ধনুকের টঙ্কার, রথের নির্ঘোষে(প্রচন্ড শব্দ) সংসার স্তব্ধ হল। 

প্রথমে তার সাথে রোহিতক দেশের রাজার যুদ্ধ হল। এই রাজার সমর-সখা হলেন ময়ূরবাহন। ফলে তার সৈন্যবাহিনী শিখী(ময়ূর)পূর্ণ। নকুলের সাথে তাদের অপ্রমিত যুদ্ধ হল, যেন নকুল(নেউল/বেজি)-ভুজঙ্গের(সাপ) যুদ্ধ। নকুল বায়ু অবতার অস্ত্র হানলেন। মহাবজ্রাঘাত শব্দে শিখীরা আতঙ্কিত হল। অনল অস্ত্রে বীর নকুল শিখীদের পাখা পোড়ালেন। ভয়ে শিখীরা রাজাকে একা ফেলে পালাল। রাজাও ভয়ে প্রচুর কর এনে দান করলেন। 

সেখান থেকে নকুলবীর মালব, শিরীষ/শৈরীষক, শিবি, বর্বর পুষ্কর প্রভৃতি দেশের রাজাদের জয় করলেন। 
পশ্চিম দিগন্তে সিন্ধুনদীকূলে নকুল উপস্থিত হলেন। সরস্বতী তটে যত রাজারা আছে সকলে মাদ্রীপুত্রের বশ্যতা মানল। 
খরক, কন্টক আর পঞ্চনদ দেশ জিতে নকুল সৌতিকপুরে প্রবেশ করলেন। 
বৃন্দারক, দ্বারপাল নরপতি, প্রতিবিন্ধ্য রাজা প্রমুখদের কাছে দূত পাঠিয়ে কর আদায় হল। 

তারপর দ্বারকানগরে দূত গেল। সব শুনে দেবকীপুত্র কৃষ্ণ খুব সুখি হলেন। 
ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞা কৃষ্ণ শিরোধার্য করে শকট(রথ) ভর্তি করে কর পাঠালেন। 

এভাবে একে একে বহু দেশ জয় করতে করতে নকুল মাতুলালয় মদ্রদেশে এলেন।শল্য নরপতি সে খবর শুনে ভাগ্নেকে আদর করে এনে বহু উপহার দিলেন। এভাবে সেখান থেকে কর নিয়ে নকুল সমুদ্রতীরে ম্লেচ্ছদেশে গেলেন। সেখানে দারুন দুর্দান্ত সব যবনের বাস। তাদের সবাইকে জয় করে সেখান থেকেও বহু ধন পেলেন। সেখানে যত রাজারা ছিল সকলকে নকুল অনায়াসে জয় করলেন। 

এভাবে বহু ধন নিয়ে মহামতি নকুল ইন্দ্রপ্রস্থে প্রত্যাবর্তন করতে লাগলেন। সঙ্গে বহু ধন, মত্ত হাতির দল চলল। ‘জয় জয় বীর’ কোলাহলের মধ্যেই চতুরঙ্গ দল নিয়ে তিনি রাজ্যে প্রবেশ করলেন। 
বিভিন্ন দেশ থেকে যত ধন পেয়েছিলেন নকুল সব ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করলেন। 
সব কিছু ভাণ্ডারে সঞ্চিত করে তিনি নিজ আলয়ে বিশ্রাম নিতে গেলেন। 

পান্ডব বিজয়-কথা যে যন শুনেন, তার জয় হয়ে থাকে সর্বত্র গমনে। 

সভাপর্ব সুধারস বেদব্যাস বিরচিলেন, কাশীরাম দাস তাই কহেন সঙ্গীতের মাধ্যমে।
........................


যুধিষ্ঠিরের রাজ্য-বর্ণনঃ 

এভাবে সকল পৃথিবীর সকল রাজারা কর প্রদান করলে ধর্মরায় যুধিষ্ঠির পরমানন্দে যজ্ঞের আয়োজন করতে লাগলেন। এই সত্যপ্রিয় ধর্মের রক্ষক, প্রজা পালক দুষ্ট চোর এবং বৈরী(শত্রু)দের উচিত দন্ড দিতেও পারদর্শী। যজ্ঞ এবং নানা মহোৎসবে দেশ মেতে উঠল। এমন কি সেই সময় অনুসারে জীমূত(মেঘ) বর্ষণ ঘটায়। গবীরাও প্রচুর দুগ্ধ দেয়, শস্য ফলে চতুর্গুণ। 
এই স্বপ্নের রাজ্যের মানুষরা যেন প্রতিকুলের রূপই ভুলেছে। ব্যাধিভয়, অগ্নিভয় এই রাজ্য থেকে পালিয়েছে। কারণ ধর্মপুত্র স্বয়ং ধর্মের রূপ নিয়ে রাজ্য শাসন করছেন। ধন্য ধান্যে সংসার পূর্ণ হল। চারদিকে ধন্য ধন্য ধ্বনি উচ্চারিত হতে লাগল। অক্ষয় অব্যয় ধন দেখে সকলে মোহিত হল। 

যুধিষ্ঠিরের ভাইরা, মন্ত্রী, সুহৃদ বন্ধুরা সকলে এবার যজ্ঞ শুরুর অনুরোধ করলেন। পৃথিবীর সকল রাজারা এত ধন ও গবী উপহার দিয়েছে যে গুণে শেষ করা সম্ভব নয়। এখন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের অসাধ্য কিছুই নেই। সময়ে কাজ করে নেওয়া উচিত। 

এতসব পরামর্শ শুনতে শুনতে রাজা কৃষ্ণের কথা ভাবতে লাগলেন। তখন স্বয়ং কৃষ্ণ সনাতন সেখানে উপস্থিত হলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহেন শুনেন পুণ্যবান।
.....................



ইন্দ্রপ্রস্থে শ্রীকৃষ্ণের আগমনঃ 

শরতের পদ্মের কলির মত অরুণ যুগল নেত্র, শ্রুতিমূলে মকর কুণ্ডল, বিকশিত মুখপদ্ম-যেন কোটি সুধাকর পদ্ম, ওষ্ঠাধর অধর মণ্ডল। তনুটি যেন নীলাম্বুজ(নীলপদ্ম), আজানুলম্বিত ভুজ(হাত)-ইনিই ঘোরতর তিমির বিনাশক কৃষ্ণ। 
মস্তকে তার মুকুট শোভে, যেন শত দিবাকর(সূর্য) প্রভা। কনক(সোনা)-বরণ পীতবাস(হলুদবস্ত্র)। 
তার যুগলপদ যেন কোকনদ(লালপদ্ম)-যা অখিল ভুবনকে অভয় দেয়, যায় স্মরণে ভবের সকল বিঘ্ন খন্ডিত হয়। যে পদ অহর্নিশ ধ্যান করছেন অজ(অজর অমর) ঈশ(ঈশ্বর), শুকদেব(ব্যাসদেবের ব্রহ্মচারী পুত্র), ধ্রুব(রাজা উত্তানপাদের হরিভক্ত পুত্র), নারদমুনি, প্রহ্লাদ(দানবরাজ হিরণ্যকশিপুর হরিভক্ত পুত্র) প্রমুখ। এই পাদপদ্মেই মোক্ষ মেলে। 
যার থেকে সুরনদীর(দেবনদী/গঙ্গা) জন্ম এবং যিনি তিনলোকের পরিত্রাতা। যার পদচিহ্ন পেয়ে অনন্তনাগ অভয় হলেন। 
ইনি বক্র, বক, কেশী, কংস, কালীয় সকলের দর্প ধ্বংস করেন। 

নিজের ভক্তের ইনি রক্ষক। 

পাণ্ডবদের বন্ধু, যিনি নিজরূপে অখিল সৃজন করেন –সেই কৃষ্ণ গরুড়ধ্বজে চড়ে অগণিত অশ্ব-গজ-চতুরঙ্গ-যদুদের নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে উপস্থিত হলেন। 
ধর্মরাজের জন্য অনেক রত্ন সঙ্গে আনলেন। তার আগমনে চারদিক আনন্দ মুখর হয়ে উঠল। পাঞ্চজন্য বেজে উঠলেই ইন্দ্রপ্রস্থে সকলে বুঝলেন হরি উপস্থিত হয়েছেন। 

কৃষ্ণের আগমন বার্তা পেয়ে যুধিষ্ঠির ব্যস্ত হয়ে ভাইদের ও মন্ত্রীদের কৃষ্ণকে অভ্যর্থনার জন্য পাঠালেন। ভীমপার্থ অনুব্রজি(অভ্যর্থনা) গোবিন্দে ষড়ঙ্গে(ছয় অঙ্গ-মস্তক, দুইহাত, দুইপদ ও কোমর) পূজে রাজপুরীতে নিয়ে চললেন। 

ধর্মপুত্রকে দেখে শ্রীকৃষ্ণ দুর থেকেই ভুমিতে লুটিয়ে তাকে প্রণাম জানালেন। অসংখ্য অমূল্য ধন, অশ্ব, গজ, শৃঙ্গী(বৃক্ষ) অগণিত বিতরণ করলেন। 

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরও আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে বহু পূজা করলেন। 

পঞ্চপাণ্ডবদের মাঝে কৃষ্ণ যেন দ্বিজরাজ। সভার সর্বজন দুচোখ ভরে তাদের দেখে। 

গোবিন্দের পাশে বসে যুধিষ্ঠির মৃদু ভাষে বিনয়ের সাথে বলেন –আপনার অনুগ্রহে আমি এ ভারতভূমণ্ডল জয় করতে সক্ষম হলাম। আমি না চাইতেই এত সম্পদ পেয়েছি যে রাখার স্থান নেই। আপনার অনুমতি পেলে সব দ্বিজ-ব্রাহ্মণদের দান করতে চাই। আমি স্বর্গ কামনা করি না, কেবল আপনার পদাম্বুজ ভিক্ষা চাই। পিতার আজ্ঞা পালনের জন্য আপনার অনুমতি চাই। 
হে প্রভূ, আপনার মুখাম্বুজে শুনতে চাই আমি কিভাবে যজ্ঞের দীক্ষা নেব। আপনি আজ্ঞা দিলে সকল রাজাদের নিমন্ত্রণ পাঠাই। 

রাজার বিনয়বাক্য শুনে কোমল গভীর বাণীতে গঙ্গাধর আশ্বাস দিয়ে বলেন –এ জগতে যত রাজা আছেন সকলে আপনার গুণেই আপনার বশে এসেছেন। আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনার যজ্ঞ আমিও দেখতে পাব। আপনি নিষ্কণ্টক মনে যজ্ঞ শুরু করুন। 
আমায় আপনি আজ্ঞা করুন, আমার দ্বারা যা যা করা সম্ভব তাই আমি করব। আমার সাথে সকল যদুরাও আছেন একাজে। ভাই, মন্ত্রী, বন্ধু যার যা কাজ সেখানে তাদের নিয়োগ করুন। 

গোবিন্দের আজ্ঞা পেয়ে ভূপতি যুধিষ্ঠির সানন্দে তাকে কৃতাজ্ঞলি স্তব করে বলেন –আপনি আসতেই আমি বুঝে গেছি আমার মন বাঞ্ছা এবার পূর্ণ হবে। আপনাতেই প্রভূ ভক্তি ঋদ্ধি(সমৃদ্ধি)। হে প্রভূ, ভক্তের মনের বাঞ্ছা সিদ্ধি করুন, আপনিই যে ভক্তজনে কৃপাবান। 

কাশীদাস বলেন যদি তরিবে এই ভবনদী ভজনা করুন সাধুজন দেব ভগবানে।

......................................

Saturday, October 29, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩১

[পূর্বকথা - পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ......অর্জুন ও ভীম সে কারণে দ্বিগ্বিজয় যাত্রা করেন



সহদেবের দিগ্বিজয়ঃ

বাম্যদিকে(দক্ষিণদিকে) সহদেব সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলেন। 
প্রথমে তিনি শূরসেন(মথুরার কাছে) রাজ্যে এলেন। সেখানের নরপতি প্রীতিপূর্বক বহু রত্ন প্রদান করলেন। 
এরপর সহদেব মৎস্যদেশও জয় করলেন। অধিরাজের মহাবলধর দন্তবক্রের সাথেও সহদেবের সংগ্রাম হল এবং তাকে হারিয়ে বহু কর আদায় করলেন। 
এরপর সুকুমার ও সুমিত্র নামে দুই রাজাকেও হারালেন। 
নিষাদ রাজাকে হারিয়ে গোশৃঙ্গ জয় করলেন। 
শ্রেণীমান রাজাও তার কাছে হেরে গেল। 
এরপর সহদেব কুন্তিভোজ রাজ্যে চতুরঙ্গ নিয়ে প্রবেশ করলেন। কুন্তিভোজ রাজা প্রীতমনে সহদেবকে কর প্রদান করেন। 
এরপর সহদেব অবন্তী নগরে বিন্দ অনুবিন্দ রাজাকে পরাস্ত করলে নানা ধন ও বহু পূজা পেলেন।

পরে বিদর্ভ নগরে এসে রাজা ভীষ্মকের কাছে দূত পাঠান হল। ভীষ্মক জানতে পারলেন জামাই কৃষ্ণ-গোবিন্দের সখা এঁরা, তাই আনন্দ মনে তিনি সহদেবকে যথোচিত পূজা করে নানা রত্ন প্রদান করলেন। 

এরপর কান্তার, কোশলাধিপ, নাটকেয়, হেরম্ব, মারুধ, মুঞ্জগ্রাম, বাতাধিপ, পান্ড্যদেশ জয় করা হল। তারপর কিষ্কিন্ধ্যা প্রদেশে সহদেব প্রবেশ করলেন। সেখানের দুই কপিরাজ(বানররাজ) মৈন্দ ও দ্বিবিদ। তারা শত্রু সৈন্য দেখে প্রচুর বানরসৈন্য নিয়ে বৃক্ষ-শিলা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করল। এভাবে বানর-মনুষ্যের মহারণ শুরু হল। সাতদিন ধরে অবিরাম সে যুদ্ধ চলল। রাতেও তা বন্ধ হল না। 
শেষে বানররাজরা খুশি হয়ে সহদেবকে বলে –কে তুমি, কি কারণে এখানে এলে! 

সহদেব তার সকল কথা জানালেন। 

বানররাজরা বলে –এটা কিষ্কিন্ধ্যানগর, মানুষের এত শক্তি নেই যে আমাদের জয় করে। তবে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির যজ্ঞ করবেন। আমরা কর না দিলে সে যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটবে, তাই ধন দিতে সম্মত হচ্ছি। তুমি যত পার নিয়ে যাও। 

এই বলে শত শত রত্ন রাজি দান করা হল। যত রত্ন পেলেন সহদেব সব দেশে পাঠিয়ে মাহিষ্মতীপুরে উপস্থিত হলেন। 
মাহিষ্মতীপুরীর রাজা হলেন মহাতেজা নীল। তিনি শত্রুর আক্রমণ শুনে মহারণে ধেয়ে এলেন। নীলরাজের সাথে সহদেবের সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ হল। হুতাশন অগ্নি স্বয়ং নীলের সেনাপতি। শত্রু দেখে অগ্নি নিজ মূর্তি ধারণ করলেন। ফলে সহদেবের চোখের সামনে দাবদাহে তার সৈন্যরা প্রাণ দিতে লাগল। সব দেখে পান্ডুপুত্র বিস্মিত হলেন। 

জন্মেজয় তখন বৈশম্পায়ন মুনিকে জিজ্ঞাসা করেন –সেকি! হুতাশন অগ্নি কিভাবে রাজা নীলের কাছে বাঁধা পরলেন! 

মুনি বলেন – নীল রাজা সর্বদা যজ্ঞ করতেন। সর্বদা অগ্নি প্রজ্বলিত থাকতেন। রাজা নীলের সুন্দরী তনয়া সকলের পূর্বে অগ্নি বৈশ্বানরের পূজা করতেন। যতক্ষণ না এই কন্যা পূজা করেন, ততক্ষণ অগ্নি উজ্জ্বল হতেন না। কন্যার বিম্বোষ্ঠ(লাল ঠোঁট), চন্দ্র আনন(মুখ) দেখে অগ্নিদেব কামানলে দগ্ধ হলেন। দ্বিজ মূর্তি ধরে তিনি কন্যার কাছে এসে মধুর বচনে আলাপ করতে লাগলেন। 

রাজা নীল তা দেখে ক্রোধে তাকে দন্ড দিতে গেলেন। বৈশ্বানর এবার প্রচন্ড রেগে স্বমূর্তি ধারণ করেন। তাই দেখে রাজা ভয় পেয়ে তার স্তব করতে থাকেন এবং নিজ কন্যাকে অগ্নির হাতে সমর্পণ করেন। সন্তুষ্ট হয়ে অগ্নি রাজাকে বর দিতে চান। 

রাজা বলেন –আপনি সর্বদা আমার সদনে থাকুন। শত্রুরা যেন কোনদিন আমায় পরাস্ত না করে, দেখবেন। সন্তুষ্ট হয়ে অগ্নি সেই বর দিয়ে কন্যার সাথে রাজপুরীতেই অবস্থান করতে লাগলেন। যারা এতসব না যেনে মাহিষ্মতীপুরী আক্রমণ করতে এল, তারাই মৃত্যু মুখে পরল। তাই ভয়ে আর কেউ সে মুখ হয় না। নিষ্কন্টক হয়ে রাজা নীল মহানন্দে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। 

এদিকে অগ্নি যখন সহদেবের সৈন্যদের পুড়িয়ে মারতে লাগলেন, সৈন্যরা ভয়ে পালাতে লাগল। মদ্রসুতাসুত(মদ্রকন্যা মাদ্রীর পুত্র) সহদেব সব দেখে শুনে অবাক হলেন। 
অনেক চিন্তা করে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করে অগ্নির স্তব শুরু করলেন –হে অগ্নিদেব! সকল দেবতার উৎপত্তি আপনার মাধ্যমে। আপনি পাপহন্তা, সর্ব ঘটে আপনার স্থিতি। রুদ্রগর্ভ, জলোদ্ভব, বায়ুসখা, শিখী, চিত্রভানু, বিভাবসু প্রমুখ আরো কত নামে আপনি খ্যাত। আপনার পিঙ্গ(অগ্নিবর্ণ) আঁখি(চোখ)। আপনাকে আরাধনা করলে দেব পিতৃগণ তুষ্ট হন। সে কারণে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির যজ্ঞের আয়োজন করছেন। নিজের ভক্তের কাজে বিঘ্ন ঘটান কি উচিত কর্ম, প্রভূ! জগতে আপনি সবার হিতের জন্যেই বিখ্যাত। প্রসন্ন হন, প্রভূ! 

সহদেবের স্তুতিবাক্যে দেব হুতাশন অগ্নি শান্ত হলেন। সহদেবকে আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন –উঠুন হে কুরু পুত্র! ভয় পাবেন না। এই নীলধ্বজপুর আমার রক্ষণ। সে কারণে আপনার সেনা দহন করলাম। আপনি আমার প্রিয় পাত্র তাই ক্ষমা করলাম। আমি আপনার সাহায্য করব। নীলরাজাকে বলব তিনি আপনার যোগ্য সম্মান করবেন। 

অগ্নির কথা মত রাজা নীল সহদেবের পূজা করে প্রচুর ধনরত্ন দান করলেন। 

এরপর সহদেব ত্রিপুরের দেশে প্রবেশ করলেন। সে দেশ জয় করে কৌশিক, সুরাষ্ট্র জয় করে ভোজ কটকে প্রবেশ করলেন। কৃষ্ণের শালা রুক্মির সাথে সহদেবের যুদ্ধ হল। রুক্মি যুদ্ধে হেরে বহু রত্ন কর দিল। 
তারপর সহদেব শর্পকের দেশে গেলেন দন্ডককাননে। সমুদ্রের তীরে ম্লেচ্ছ কিরাতদের বসতি। খুব সহজেই এদের সকলকে জয় করা গেল। 
আরো দক্ষিণে বহু রাক্ষসদের বাস। পান্ডুর এই পুত্র তাদের সংহার করলেন। 

সেখান থেকে বীর সহদেব দীর্ঘকর্ণদেশে গেলেন। সেখানের অধিবাসীদের অতি দীর্ঘ দুই কান, শরীর বিবর্ণ। কালমুখ, হ্রস্বমুখ, কোলগিরি প্রভৃতি বহু রাজাদের জিতে বহু ধনরত্ন পেলেন। 
তাম্রদ্বীপ, রামগিরি অবহেলায় জয় হল। 
এরপর সহদেব কৌতূহল নিয়ে একপদ দেশে গেলেন। সেখানে যত মানুষ বাস করে সকলের একটি মাত্র পা। হাতে তারা ধনুক ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে ব্যাঙের মত লাফিয়ে চলে। 
সঞ্জয়ন্তীনগরের ভূপতিকেও জয় করা গেল। 
এছাড়া কর্ণাটক, কলিঙ্গ, পান্ড্য, দ্রাবিড়, উষ্ট্র, কেরল, অন্ধ্র-এই আটদেশের বীর রাজা দূত মুখে সহদেবের সংবাদ শুনে কর দিলেন। 

আরো দক্ষিণে সেতুবন্ধে সমুদ্রতীরে এসে সহদেব লঙ্কায় বিভীষণের কাছে দূত পাঠালেন। সময় বুঝে রাক্ষসরাজ বহু ধনরত্ন তাকে ভেট করলেন। এই পর্যন্ত গিয়ে মাদ্রীর এই পুত্র নিবর্ত হলেন। 
আনন্দ মনে তিনি ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। ধন রথ সব তিনি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে নিবেদন করলেন। 
আনন্দিত মনে তার বিজয়কাহিনী বললেন। 

দক্ষিণ ভারতে পাণ্ডবদের জয়ের কথা যে জন শুনেন তার সর্বত্র জয় কাশীদাস ভণেন। 
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers