Blog Archive

Sunday, January 15, 2017

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩৬

[পূর্বকথা পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ......অর্জুন, ভীম নকুল ও সহদেব সে কারণে দ্বিগ্বিজয় যাত্রা করেন.....যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে যজ্ঞের আয়োজন করেন ....... চারদিকে দূতদের আমন্ত্রণের জন্য পাঠান শুরু হল...... মুনিরা হোম যজ্ঞের আয়োজন শুরু করেন......দেবগণকে নিমন্ত্রণ করতে অর্জ্জুন যাত্রা করেন ......] 



বাসুকি-নিমন্ত্রণে পাতালে পার্থের যাত্রাঃ 

অর্জুনকে দেব নারায়ণ জিজ্ঞাসা করেন –বল, কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করে এলে! 
শুনে অর্জুন এত নাম বললেন যে লিখলে একটি বই হয়ে যাবে। তিনি জানালেন কুবেরাদি সকল দেবতাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। সকল বৃত্তান্ত তিনি বিস্তারিত বললেন। 

গোবিন্দ বলেন –এবার তুমি পাতালে গিয়ে শেষনাগকে নিমন্ত্রণ করে এস। স্বর্গে যেমন দেবরাজ ইন্দ্র, পাতালে তেমনি শেষনাগ বাসুকি। তুমি ছাড়া কারো সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। বাসুকি এলেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে। বিলম্ব না করে সখা এখনই যাত্রা কর। 

কৃষ্ণের আজ্ঞায় পার্থ সঙ্গে সঙ্গে দিব্যরথে পাতালে গেলেন। 
নাগের আলয়ে গিয়ে দেখেন চারদিকে ফণী বেষ্টিত হয়ে শেষনাগ অবস্থান করছেন। দশ শত ফণা মস্তকের উপর, তিনশত ফণায় শোভিত চরাচর। কূর্মের(কচ্ছপ) পিঠে উপবিষ্ট রতন বেষ্টিত। 

পার্থ হৃষ্ট মনে জোড়হাতে প্রণাম জানিয়ে বলেন –রাজসূয় যজ্ঞের কারণে আপনাকে নিমন্ত্রণ করতে এলাম, রাজন! সুরলোকের সকল দেবতারা উপস্থিত হবেন। ব্রহ্মা-শিব-ইন্দ্র আদি যত দিকপাল যজ্ঞে অধিষ্ঠান হবেন। আপনি এলে এ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে। দয়া করে আপনি আসুন। 

শেষনাগ হেসে বলেন –শুনুন ধনঞ্জয়, এ যজ্ঞে গোবিন্দ উপস্থিত, তিনিই কর্তা। তার দর্শনে সকল যজ্ঞের ফল মেলে। কৃষ্ণ যেখানে আছেন সেখানে ব্রহ্মা-মহেশ আসবেনই। অকারণেই আমাকে নিমন্ত্রণ করতে এলেন। আপনি গিয়ে কৃষ্ণের অর্চনা ভাল ভাবে করুন, তাতেই সাফল্য মিলবে। অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে কত শত প্রাণী বিদ্যমান। কত ব্রহ্মা, শিব, ইন্দ্র, শেষনাগ-এই সব শাখাপাত্রকে তুষ্ট করা সম্ভব যদি মূলে জল সিঞ্চন করেন। 

অর্জুন বলেন –হে দেব, যা বললেন তা বেদেও প্রমাণিত। এসবই তার মায়া। তবু জেনে শুনে সবাই মায়া ধন্ধে পরে। 

নাগরাজ বলেন –আপনি কিছু না জেনেই আমায় নিতে এলেন। আমি আমার মস্তকে ক্ষিতির ভার ধারণ করি। আমি গেলে যজ্ঞের স্থানই বা কে ধরে রাখবে! 

অর্জুন বলেন –কৃষ্ণ আমায় আপনার কাছে পাঠালেন। আপনি গেলে তবেই এ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হবে। ক্ষিতিভারের কারণ আপনি যদি না যেতে পারেন তবে আমার অনুরোধ, আপনি দয়া করে যজ্ঞে যান, আমি এই পৃথিবীর ভার ধারণ করছি। 

একথা শুনে বিস্মিত হয়ে বিষধর হেসে বলেন –পৃথিবী ধারণ করতে আপনি স্বীকার করছেন! তবে এই নিন আমি ছাড়ছি, আপনি সত্য পালন করুন। 

এত শুনে ধনঞ্জয় হাতে গান্ডীব ধনুক নিয়ে করজোড়ে গান্ডীবদাতা শিবকে স্মরণ করেন, ভক্তিভাবে কৃষ্ণকে প্রণাম জানান এবং গুরু দ্রোণের পদ বন্দনা করে তূণ থেকে অদ্ভুত স্তম্ভন(কন্দর্পের পঞ্চবাণের অন্যতম) অস্ত্র নিয়ে গান্ডীবে যুড়ে সেই অস্ত্রে ক্ষিতিকে ধারণ করলেন। 

তা দেখে সকল নাগেরা ধন্য ধন্য করল। তখন শেষনাগ সকল নাগদের নিয়ে দ্রুত যজ্ঞস্থলের দিকে যাত্রা করলেন। 
বাসুকি, আনিল, তক্ষক, কৌরব্য, নহুষ, কর্কট, ধৃতরাষ্ট্র, জরদ্গব, কোপন, কালীয়, ত্রিকপূর্ণ, ধনঞ্জয়, অজ্যক, উগ্রক, নীল, শঙ্খমুখ, শঙ্খপিন্ড, বক্রদন্ত, কলিচূড়, পিঙ্গচক্ষু আরো শত শত দুষ্ট রুষ্ট সর্প তাদের পুত্র-পৌত্র নিয়ে চলল। 
লক্ষ লক্ষ সাপ দেখে সকলে অশক্য(অসাধ্য) মানল। কারো পাঁচ, কারো সাত মাথা, কারো বা ছয়-সাতশত, কেউবা সহস্র মস্তক, কারো আকার পর্বতের মত। এভাবে ফণিরাজ সপরিবারে চললেন। 

এদিকে সুরেন্দ্রালয়ে দেবতাদের সমাজও সেজে উঠল। দেবরাজ ইন্দ্র ঐরাবতে আরোহণ করলেন। বজ্র তার হাতের শোভা বাড়ায়। মাতলি(ইন্দ্রের সারথি) মাথার উপর ছত্র ধরেন। অষ্টবসু, নবগ্রহ, অশ্বিনীকুমার, দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, ঊনপঞ্চাশ বায়ু, সাতাশ হুতাশন-যজ্ঞ, যন্ত্র, পুরোধা, দক্ষিণা, দন্ড, ক্ষণ, যোগ, তিথি, করণ নিয়ে, নক্ষত্র, রাশিগণ, চারি মেঘ, বিদ্যুৎ, সঙ্গে সৈন্যসামন্ত, গন্ধর্ব, কিন্নর, সকল অপ্সর, অপ্সরী, দেবঋষি ব্রহ্মা সঙ্গে বিস্তর ঋষিদের নিয়ে চললেন। 
বশিষ্ঠ, পৌলস্ত্য, ভৃগু, পুলহ, অঙ্গিরা, পরাশর, ক্রতু, দক্ষ, লোমশ, সুধীরা, অসিত, দেবল, কুন্ড, শুক, সনাতন, মার্কণ্ড, ধ্রূব, জয়ন্ত, কোপন প্রমুখ যত ঋষিরা ইন্দ্রপ্রস্থে থাকতেন তারা লাখে লাখে দলে দলে ইন্দ্রের সাথে যজ্ঞস্থলে চললেন। 

পুষ্পরথে ধনের ঈশ্বর কুবের চড়লেন। তার সাথে চলল যক্ষ, গন্ধর্ব, কিন্নর, চিত্ররথ, তুম্বুরু, অঙ্গিরা, বিশ্বাবসু, মহেন্দ্র, মাতঙ্গ, ফলকর্ণ, ফলোদক, চিত্রক, লোত্রক প্রমুখ কতশত গুহ্যক(কুবেরের যক্ষ অনুচর) যে চলল বলে শেষ করা যায় না। 
ঘৃতাচী, উর্বশী, চিত্রা, রম্ভা, চিত্রসেনী, চারুনেত্রা, মিশ্রকেশী, বুদ্বুদা, মোহিনী, চিত্ররেখা, অলম্বুষা, সুরভি, সমাচী, পোনিকা, কদম্বা, অর্মা, শূদ্রা, রুচি, শুচি-লক্ষ লক্ষ বিদ্যাধরীরাও নৃত্য গীত করতে করতে আহ্লাদে কুবেরের সাথে চলল। 

যজ্ঞ দেখতে সব মহীধর পর্বতরাও চলল-হিমাদ্রি, কৈলাস, শ্বেত, নীল গিরিবর, কালগিরি, হেমকূট, মন্দর, মৈনাক, চিত্রগিরি, রামগিরি, গোবর্দ্ধন শাখ, চিত্রকূট, বিন্ধ্য, গন্ধমাদন, সুবল, ঋষ্যশৃঙ্গ, শতশৃঙ্গ, মহেন্দ্র, ধবল, রৈবতক, মুনিশিল গিরি, কামগিরি, খন্ডগিরি, নীলগিরি-এমন লক্ষ লক্ষ গিরিরা দেবরূপ ধরে যক্ষরাজের সঙ্গে যজ্ঞ দেখতে চলল। 

বরুণদেব নিজের অমাত্যদের সঙ্গে চললেন। সপ্ত সিন্ধু ও যত সরিৎ(নদী) মূর্তিমন্ত হলেন-গঙ্গা, সরস্বতী, শোণ, সূর্যকন্যা যমুনা-তাপ্তী, চিত্রপালা, প্রেতা, বৈতরণী, পুণ্যযুতা, চন্দ্রভাগা, গোদাবরী, সরযূ, লোহিতা, দেবনদী, মহানদী, মদাশ্বী, সবিতা, ভৈরবী, ভারবীনদী, ভদ্রা, বসুমতী, মেঘবতী, গোমতী, সৌবতী, নর্মদা, অজয়, ব্রাহ্মী, ব্রহ্মপুত্র, কংস, তমুল, কমল–বিষ কোলামুখ বংশ, গন্ডকী, ফল্গু, সিন্ধু, করতোয়া, স্বর্ণরেখা, পদ্মাবতী, শত লোকত্রয়া, ঝুমঝুমি, কালিন্দী, দামোদর, গিরিপুরী, সিন্ধুকা, কাবেরী-প্রমুখ অনেক নদনদী, সরোবর, বাপী(দীঘি), হ্রদ, তড়াগাদি দেহ ধারণ করে বরুনের সাথে যজ্ঞ দেখতে চলল। 

মহিষ বাহনে চড়ে প্রেত মহীপতি যম চললেন। পিতৃগণ, দূতগণ দন্ড মৃত্যুপাশ নিয়ে আকাশ যুড়ে আসতে লাগল। 

এভাবে দ্বাপর যুগে অদ্ভূত যজ্ঞ শুরু হল। এমন আগে কখনও অবনীতে(পৃথিবী) হয়নি। কত যে রাজারা এলেন লিখে শেষ করা যায় না। যযাতি, নহুষ, রঘু, মান্ধাতা, দিলীপ, সগর, ভগীরথ, দশরথ, কৃতবীর্য, কার্তবীর্য, ভরত, সুরথ প্রমুখ অনেক চন্দ্র ও সূর্যবংশীয় রাজারা অংশগ্রহণ করলেন। 
এর আগেও অনেকে রাজসূয় অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছেন। তারা যে দেবতার আরাধনা করতেন তাকেই নিয়ে আসতেন। কিন্তু এই যজ্ঞে সকলের আমন্ত্রণ। 

মহেশ এলেন পার্বতীকে সঙ্গে নিয়ে। তারা অলক্ষ্যে থেকে সকল দিক লক্ষ্য রাখেন। শিবের দক্ষিণ হাতে ত্রিশূল, শির শোভে জটা ভারে। দাড়ি চরণ স্পর্শে, বাম করে তাল। সদাশিব যতদুর যজ্ঞস্থল সেই অঞ্চলের সবার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। পার্বতী অন্নদারূপে যজ্ঞস্থানে সকলকে ছায়ারূপে থেকে তোষণ করেন। যার যা মনোবাঞ্ছা তাই যোগাতে থাকেন। 

অশ্ব আরোহণ করে খর-করবাল(খড়্গ/তরবারি) হাতে ঊনকোটি দৈত্য নিয়ে আসে ক্ষেত্রপাল। ময়দানব শতকোটি দৈত্য নিয়ে আসেন। বিনতা-তনয় গরুড় ছয়পুত্র নিয়ে এলেন। 

এভাবে দেব, দৈত্য, নাগ-সবাই যজ্ঞে অংশগ্রহণ করলেন। 

স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা হংসে আরোহণ করে এলেন। অন্তরীক্ষে থেকেই চতুর্মুখ ব্রহ্মা যজ্ঞ দেখলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহেন, শুনেন পুণ্যবান।
......................................

Monday, December 26, 2016

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩৫

[পূর্বকথা - পাণ্ডবরা রাজসূয় যজ্ঞ করে পিতাকে রাজা হরিশচন্দ্রের মত ইন্দ্রের স্বর্গে স্থান করে দিতে চায় ......অর্জুন, ভীম নকুল ও সহদেব সে কারণে দ্বিগ্বিজয় যাত্রা করেন......চারদিকে ধন্য ধন্য ধ্বনি উচ্চারিত হয় ......যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে যজ্ঞের আয়োজন করেন ....... চারদিকে দূতদের আমন্ত্রণের জন্য পাঠান শুরু হল...... মুনিরা হোম যজ্ঞের আয়োজন শুরু করেন......] 



দেবগণকে নিমন্ত্রণ করিতে অর্জ্জুনের যাত্রাঃ 

জন্মেজয় বৈশম্পায়ন মুনিকে বলেন –হে মুনিবর, কে কোন দিক থেকে এলো শুনলাম। কত সৈন্য নিয়ে এল এবং পিতামহ যুধিষ্ঠিরকে কে কি ভেট দিলেন সব শুনলাম। কিন্তু পার্থ কিভাবে দেবতাদের নিমন্ত্রণ করতে গেলেন-তা জানতে ইচ্ছে হয়। দেব পশুপতিও কি এসেছিলেন! সব কথা বিস্তারিত বলে মনের ধন্দ ভাঙ্গুন। পিতামহদের কথা আমায় মকরন্দের(পুষ্পমধু) মত টানে। 

মুনি বলেন –হে নরপতি, তবে কিছু প্রধান প্রধান কথা শুনুন। 
কপিধ্বজ আরোহণ করে পার্থ পবন বেগে অশ্ব ছোটালেন। পর্বতে যত রাজা ছিল সকলকে নিমন্ত্রণ করে তিনি কৈলাস পর্বতে গেলেন। কুবেরের সাথে দেখা করে সকল কথা বললেন –ধর্মপুত্র সকলের আশীর্বাদ নিয়ে রাজসূয় যজ্ঞ করতে চান। 

কুবের বলেন –আমি আপনার আমন্ত্রণ স্বীকার করলাম। আমি নিজের সঙ্গীদের নিয়ে যজ্ঞে অবশ্যই অংশগ্রহণ করব। 

কুবেরের কথায় প্রীত হয়ে অর্জুন কৃতাজ্ঞলি করে পুনরায় বলেন –দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে আমন্ত্রণ করতে যেতে চাই। কোন পথে যাব, সঙ্গে যদি কোন জ্ঞাতজনকে দেন-খুবই কৃতজ্ঞ হই। 

কুবের তখন গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনকে ডেকে বলেন –আপনি অর্জুনকে পথ দেখিয়ে সুরপতি ইন্দ্রের স্থানে নিয়ে যান। 

আজ্ঞা পেয়ে চিত্রসেন কপিধ্বজ রথের সারথি হয়ে অর্জুনকে নিয়ে রওনা হলেন। 

কিছুদুর গিয়ে হরের ভবন দেখে পার্থ জানতে চান –এটি কার পুরী! 

চিত্রসেন বলেন –এখানে ত্রিপুরারি(ত্রিপুর অসুর হন্তা-শিব) বাস করেন। যজ্ঞের জন্য আপনি ত্রিলোচন শিবকে নিমন্ত্রণ করুন। সর্ব কার্যসিদ্ধি হবে হরের আগমনে। 

এত শুনে ধনঞ্জয় রথ থেকে নেমে হরগৌরীর সামনে এসে অনেক স্তুতি করেন। 

হর খুশি হয়ে বলেন – বর প্রার্থনা করুন। 

অর্জুন বলেন –ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করতে চান। সেখানে যদি আপনারা উপস্থিত হন-আমরা কৃতার্থ হই। 
হর-পার্বতী হেসে সম্মতি দেন। 

হর বলেন –আমি অবশ্যই যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে তা নির্বিঘ্নে যাতে হয় তা দেখব। 

পার্বতী বলেন –যজ্ঞপুরী গিয়ে ত্রিভুবনের সকলকে আমার প্রসাদে সুখী করব। আমি সংসারে অন্নপূর্ণা নামে খ্যাত। আমার নাম নিয়ে সূপকাররা অল্প দ্রব্যেই সুতৃপ্ত করবে বহুজনকে। সকল কিছু অক্ষয় অব্যয় হবে, অমৃত সমান। যার যাতে মন প্রীত হয় তাই আমি উপস্থিত করব। 

হর পার্বতীর বর পেয়ে ধনঞ্জয় তাদের প্রণাম করে আনন্দ মনে চিত্রসেনের সাথে ইন্দ্রের ভবনে চললেন। পবন রথে চিত্রসেন ক্ষণিকেই ইন্দ্রের সামনে উপস্থিত হলেন। দেবরাজকে পার্থ ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করেন। 

ইন্দ্র পার্থকে উঠিয়ে আলিঙ্গন করে নিজ কোলে বসিয়ে বলেন –হে তাত(প্রিয়), কি কাজে এখানে এলে! 

অর্জুন বলেন –হে দেব, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের কারণে আপনার কাছে পাঠালেন। সেই যজ্ঞে অধিষ্ঠান করে আপনি ও স্বর্গের সব সুর সিদ্ধ মুনিরা আমাদের ধন্য করুন। 

ইন্দ্র বলেন –রাজসূয় যজ্ঞের কথা শুনেই যাব স্থির করেছি। তুমি না আসলেও আমি অবশ্যই যেতাম। এই দেখ আমরা দেবতারা সকলে সেখানে যাওয়ার জন্য সুসজ্জিত হচ্ছি। চার মেঘ, অষ্ট হস্তী, সকল পবন নেওয়া হয়েছে। স্বর্গের সকল দ্রব্য যা পৃথিবীতে দুর্লভ সে সব সাজিয়ে নিচ্ছি সব তোমাদের যজ্ঞের কারণ। আমি এই যজ্ঞেরস্থানে রওনা দিচ্ছি। তুমি নিশ্চিন্ত মনে অন্যদের নিমন্ত্রণ করতে যাও। 

ইন্দ্রের মুখের কথা শুনে আনন্দিত মনে পার্থ তাকে প্রণাম জানিয়ে অন্যদিকে গমন করলেন। 

পৃথিবীর দক্ষিণে সূর্যের পুত্র যমের ভবন। সেখানেই চিত্রসেন পবন বেগে রথ চালালেন। মুহূর্তে তারা প্রেতপতির ভবনে উপস্থিত হলেন। 

অর্জুন যমালয়ে যমদেবকে প্রণাম করলে যমরাজ আশীর্বাদ করে বলেন –হে ইন্দ্রপুত্র অর্জুন! কি কারণে আপনার আগমন! আমি আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন। 

অর্জুন বলেন –হে দেব, রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছেন রাজা যুধিষ্ঠির। আপনি সেখানে আপনার সকল সাথীদের নিয়ে উপস্থিত হলে তিনি খুবই খুশি হবেন। 
যমরাজ শমন তার আমন্ত্রণ স্বীকার করলেন। 
পার্থ পুনরায় জোড়হাতে বলেন –হে রাজন, নারদ মুনি আপনার সভার কথা আমাদের বলেছিলেন। মর্তে যারা মারা যান তারা আপনার ভবনে স্থান পান শুনেছি। এখানে আমাদের পিতা পান্ডূর মনোবাঞ্ছা মেনেই এই রাজসূয় আরম্ভ হচ্ছে। কিন্তু এখানে তো আমার পিতা পিতামহদের দেখছি না, তারা কোথায় আছেন, যদি বলেন ধন্য হই। 

হেসে যম বলেন –মৃতজনদের তুমি দেখবে কি করে! জীবন্ত মানুষ ও মৃত মানুষের দেখা হওয়া কখনও সম্ভব নয়। 
শুনে পাণ্ডূপুত্র বিস্ময়াপন্ন হলেন। যমের কাছ থেকে মেলানি নিয়ে তিনি বরুণালয়ে চললেন। 

পশ্চিম দিকে জলপতির আলয়। সেখানে পৌছে বরুণকে যজ্ঞের বিবরণ দিয়ে তার পুরীর সকলকে আমন্ত্রণ জানান। 
বরুণ বলেন –যজ্ঞে আমার সব অনুচরদের নিয়ে অবশ্যই যাব। তবে দৈত্য দানবদেরও যদি নিয়ে যেতে বলেন তবে তাদের গিয়ে নিমন্ত্রণ যানাতে হবে। 

বরুণের কথা শুনে ধনঞ্জয় ময়দানবরাজের কাছে গেলেন। ময়কে পার্থ সকল কথা জানালেন। পূর্বে ময়দানবের উপকারের কথা স্বীকার করে তাকে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর জোড়হাতে পার্থ বলেন –হে বন্ধু, এখানে যত দৈত্যদানব আছেন সকলকে নিয়ে আমাদের রাজসূয় যজ্ঞে উপস্থিত হলে আমরা ধন্য হব। 

শুনে ময়দানব বলেন –বন্ধু, নিশ্চিন্তে আপনি অন্য কাজে যেতে পারেন। আমি অবশ্যই আমার সকল অনুচরকে নিয়ে যজ্ঞে উপস্থিত হব। 

শুনে অর্জুন ময়কে আলিঙ্গন করে পৃথিবীর দক্ষিণে লঙ্কাপুরে বিভীষণকে নিমন্ত্রণ করতে গেলেন। পার্থ রথ চালিয়ে লঙ্কাপুরে উপস্থিত হয়ে অবাক হলেন। ইন্দ্র-যমপুরীর সমান সুন্দর নির্মাণ এই রাক্ষসদের লঙ্কাপুরী। পুরী ঘুরে পার্থ খুশি হলেন। আনন্দ মনে রাজা বিভীষণের কাছে গেলেন। সিংহাসনে বসে রাক্ষস-ঈশ্বর বিভীষণ। ইন্দ্রপুত্র পার্থ তাকে প্রণাম করেন। 

বিভীষণ বলেন –আপনি কে! 

অর্জুন তখন নিজ পরিচয় দিয়ে বলেন –যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ করছেন। যদুবীর শ্রীকৃষ্ণ আপনাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। 

অর্জুনের মুখে সব কথা শুনে হৃষ্ট মনে তাকে আলিঙ্গন করে বসিয়ে বিভীষণ বলেন –অবশ্যই আপনাদের এই যজ্ঞ দেখতে যাব। আমার সৌভাগ্য আমি নারায়ণের সাক্ষাৎ করতে পারব। আপনার কথা মত পুরীর সকলকে সঙ্গে নিয়ে যাব। আপনি নিজ কাজে নিশ্চিন্ত মনে যান। 

বিভীষণকে নিমন্ত্রণ করে অর্জুন নিজ রাজ্য ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন। 
অন্যান্য রাজাদের নিমন্ত্রণ করতে অন্য দূতরা গেল। শোনামাত্র রাজারা সকলে আসল। 
দূত বাক্য অবহেলা করে যে আসল না অর্জুন তাদের বন্দি করে আনলেন। 

সভাপর্ব সুধারস রাজসূয় কথায়, কাশীরাম দাস কহেন সুধাসিন্ধু গাঁথায়।
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers