Blog Archive

Saturday, March 11, 2017

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৪০

[পূর্বকথা - যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন ....... মুনিরা হোম যজ্ঞের আয়োজন শুরু করেন......দেবগণকে নিমন্ত্রণ করতে অর্জ্জুন যাত্রা করেন ....দ্রুপদ ও অন্যান্য গণ্যমান্য রাজারা আসতে লাগলেন... কৃষ্ণদর্শনে লঙ্কার রাজা বিভীষণ উপস্থিত হলেন....কৃষ্ণের শত অনুরোধেও রাজাজ্ঞা বিনা দক্ষিণ ও পূর্ব দ্বার দিয়ে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হল না... ভীমের সাজাপ্রাপ্ত কিছু রাজাকে কৃষ্ণ প্রাণদান করেন ] 



[সবাইকে দোলের শুভেচ্ছা :) ]

উত্তর ও পশ্চিম দ্বারে বিভীষণের অপমানঃ 

পথে যেতে যেতে কৃষ্ণ বিভীষণকে বলেন –হে বিভীষণ, আপনি তো বহু রাজা দেখেছেন, অনেকের কথা শুনেছেন। কিন্তু এমন সম্পদ কারো আছে জেনেছেন! আমাকেও যার দ্বারীরা বাঁধা দিচ্ছে! এদের প্রভুভক্তি দেখে আমি মুগ্ধ। 
ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির মহারাজের জন্য তিন ভুবনের লোক একত্র হয়েছে। ইন্দ্র আদি দেবতারা তাকে কর প্রদান করছেন। 

বিভীষণ বলেন –হে দেব, এতে অবাক হওয়ার কি আছে! এর চেয়েও বড় বড় রাজসূয় অনেক হয়েছে। মহারাজ হরিশচন্দ্র যে রাজসূয় করেন তাও বিশাল ছিল। সপ্ত দ্বীপবাসী মানুষ একত্র হয়েছিল। আরো যারা এ যজ্ঞ করেন অনেকেই ইন্দ্র আদি দেবতাদের জয় করে যজ্ঞে আমন্ত্রণ জানান। 
তবে এই পাণ্ডবদের কীর্তি কিছু বিশেষ হচ্ছে কারণ আপনি হৃষীকেশ এদের বিশেষ স্নেহ করেন। ব্রহ্মা আদি দেবতারা আপনাকে ধ্যান করেন আর এখানে আপনি দ্বারে দ্বারে ভ্রমণ করছেন দেখে আমি আশ্চর্য হচ্ছি। 
আপনার চরিত্র আমি সামান্য সেবক কি বুঝতে পারি! একদিন আপনিই বলিকে দূর করে নহুষ[একবার ইন্দ্র ব্রহ্মহত্যা অভিশাপে সমুদ্রের মধ্যে বসবাস করছিলেন। এই সময়ে রাজা নহুষকে স্বর্গের রাজা করা হয়। নহুষ ইন্দ্রের পত্নী শচীকে অধিকার করার চেষ্টা করেন।... পরে অগস্ত্যের অভিশাপে সর্প হন। অভিশাপগ্রস্থ নহুষ, অগস্ত্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, অগস্ত্য বলেন,— যুধিষ্ঠিরের স্পর্শে সে শাপ মুক্ত হবে।]কে ইন্দ্রত্ব দান করেন। আমরা আপনার সামনে অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। আপনি কাকে কি দান করেন আমাদের বোধের অগম্য। 
ইন্দ্রাদি দেবতাদের আমি দেবতা বলে মানি না। আপনার পদে যার ভক্তি সেই আমার কাছে মহান। ভক্তির দ্বারা পাণ্ডবরা আপনাকে বশ করেছে বুঝতে পারছি। সে কারণে এই দ্বারীদের আপনি ক্ষমা করছেন। 
কিন্তু কি কারণে জগন্নাথ আপনার এত ভ্রমণ! কি বা এর প্রয়োজন! দৈব বলে এই দ্বারীরা আজ আমায় পথ দিচ্ছে না, আমারও আর ভিতরে প্রবেশের প্রয়োজন নেই। আপনাকে দেখেই আমার মনোকামনা পূর্ণ হয়েছে। এবার আজ্ঞা দিন প্রভু নিজ রাজ্যে ফিরে যাই। 

বিভীষণের কথা শুনে চক্রধর কৃষ্ণ বলেন –হে লঙ্কেশ্বর আপনাকে আমি আর কি বলব। সর্বধর্ম জ্ঞানী পন্ডিত আপনি। আপনার কিন্তু একথা বলা উচিত হল না। যিনি আপনাকে নিমন্ত্রণ জানালেন তার সাথে দেখা নাকরেই ফিরে যাওয়া কি উচিত! আপনাকে এখানে সবাই আমার সাথে দেখছে। পরে যুধিষ্ঠির আমায় আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমিই বা তাকে কি উত্তর দেব! সবাই বলবে আপনি আমার সাথেই দেখা করতে এসেছেন, এতে আমার অসম্মান। এই কি আপনি চান! আমার কথা ভেবেই না হয় একটু রাজদর্শন করে যান। 

এভাবে কথা বলতে বলতে তারা উত্তর দুয়ারে উপস্থিত হলেন। সেখানে কাম(প্রদ্যুম্ন)পুত্র অনিরুদ্ধ কৃষ্ণের পৌত্র পাহারায় ছিলেন। তিনি গোবিন্দকে দেখে প্রণাম জানালেন। 

শ্রীকৃষ্ণ বলেন – ইনি রাক্ষস ঈশ্বর বিভীষণ। ধর্মরাজের সাথে এনার সাক্ষাৎ করাতে নিয়ে যাচ্ছি। 

অনিরুদ্ধ জোড়হাতে বলেন –হে দেব, একটু অপেক্ষা করুন, এখনই মাদ্রীপুত্রেরা আসবেন। তাদের মাধ্যমে রাজাজ্ঞা নিয়ে এনাকে প্রবেশ করাবেন। 

গোবিন্দ বলেন –তুমি এনাকে চিনতে পারছ না। এনাকে একটুও অপেক্ষা করান উচিত হবে না। ইনি রাবণের সহোদর, লঙ্কার অধিপতি। এই রাক্ষসরাজ স্বয়ং ব্রহ্মার নাতি। 

একথা শুনে অনিরুদ্ধ হেসে বলেন – সব জেনেও প্রভু এমন কথা কেন বলছেন! দেখুন কত দেবতা ও রাজারা এই দ্বারে কতদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। 
প্রাগ্‌দেশের রাজা ভগদত্ত নয় কোটি রথ, সঙ্গে কোটি মত্ত গজ ও বিশ সহস্র রাজাদের সাথে ঐরাবত সমান হাতির পিঠে নানা রত্ন নিয়ে বহুদিন দ্বারে বারিত হয়েছেন। 
বাহ্লীক, বৃহন্ত, সুদেব, কুন্তল, সিংহরাজ সুশর্মা, রোহিত, বৃহন্নল, কামদেব, কামেশ্বর রাজা কামসিন্ধু, ত্রিগর্ত, দ্বিরদর্শীর মহারাজ সিন্ধু-এদের সবার সাথে পাঁচশ রাজারা ত্রিশ কোটি মত্ত হাতি, ত্রিশ কোটি রথ নিয়ে প্রবেশ অনুমতির অপেক্ষায় আছেন। 
এই দ্বার দিয়ে বিনা অনুমতিতে বিহঙ্গেরও(পাখি) প্রবেশানুমতি নেই। দেখুন এই মহারথী রাজারা নানা রত্ন দানের উদ্দ্যেশে ধৈর্য্য ধরে কেমন দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন। 
ব্রহ্মার অনেক পুত্র ও পৌত্র এসেছেন তাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। 
এছাড়াও ইন্দ্র, চন্দ্র, জলেশ, দিনকর, ব্রহ্ম ঋষি, দেব ঋষিও বিস্তর এভাবেই প্রবেশ করছেন। 
চিত্ররথ, গন্ধর্ব, তুম্বুরু, হাহা, হূহূ, বিশ্বাবসু, আরো বহু বিদ্যাধররা, যক্ষরাজ-আরো কতজনের যে নাম নিই! সবাইকেই দু-একদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাজাজ্ঞায় মাত্র দু-একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করতে পেরেছেন। 
এখন ভেবে দেখুব বিনা অনুমতিতে এনাকে প্রবেশ করালে আমি রাজদ্রোহী হয়ে যাব। আমাদের উপরে আছেন মহাবীর ভীমসেন। তিনি অতি ক্রোধী, কাউকে ক্ষমা করেন না। এবার আমার অবস্থা বুঝে দেখুন, দেব! কিভাবে বিনা আজ্ঞায় এনাকে আমি পথ ছারি! 

এত শুনে কৃষ্ণ পৌত্রের অনেক নিন্দা করে পশ্চিম দুয়ারের দিকে চললেন। 
দুঃখ করে গোবিন্দ বলেন –দেখলেন রাজা বিভীষণ অনিরুদ্ধ আমার পৌত্র হয়েও সম্মান রাখল না। যদিও তাকেও দোষ দিতে পারি না। ইন্দ্র, যমও ভীমের প্রতাপকে ভয় পান। রেগে গেলে ভীম অল্প দোষেও দন্ড দেবে। অন্যায় শোনা মাত্র এদের দন্ড দিতে পারে। চলুন পশ্চিম দ্বারে দুর্যোধন আছে। সে আমায় দেখে অবশ্যই আপনার জন্য পথ ছেড়ে দেবে। 
আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে, রাজন! যখনই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিররাজার সাথে দেখা হবে তখন অবশ্যই ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানাবেন। নৃপতি আজ্ঞা দিলে তবেই উঠবেন। 

বিভীষণ জোড়হাতে বলেন –প্রভু, আমার কথা আমি আগেই নিবেদন করেছি। আমার সম্পূর্ণ দেহ আপনার কাছে বিক্রীত। আপনার পদ ছাড়া আর কারো কাছে এই মাথা নোয়াতে পারব না। 

এত শুনে চিন্তিত কৃষ্ণ মনে মনে ভাবেন-বিভীষণকে ডেকে দেখছি বিপদ এনেছি। সভায় সে যদি রাজাকে দণ্ডবত না করে তবে যে ধর্মপুত্রের অপমান হবে। তারপর আবার ভাবলেন-কে কি ভাববে চিন্তা করে লাভ নেই। ব্রাহ্মাদি দেবতারা আমায় ধ্যান করেন। আমি এখানে যজ্ঞেশ্বর সবাই তা জানেন। ব্রহ্মাদি অনেকেই অনেক যজ্ঞ করেছেন কিন্তু কোন যজ্ঞই এযজ্ঞের উপরে নয়। 

এসব চিন্তা করতে করতে কৃষ্ণ বিভীষণকে নিয়ে পশ্চিমদ্বারে দুর্যোধনের স্থানে উপস্থিত হলেন। দুর্যোধনের উপর সকল ভান্ডারের ভার যেমন ছিল, তেমনি পশ্চিম দ্বারটিও তার অধিকারে। এই পশ্চিম দ্বারে যেন কনক, রজত, মুক্তা, প্রবালের পাহাড় গড়ে উঠেছে। অমূল্য কীটজ বস্ত্র, লোমজ বস্ত্র, কস্তূরী, হস্তী দশনের(দাঁত) পর্বত। চারদিক থেকে অনবরত সামগ্রী এসে চলেছে, যেন আষাঢ শ্রাবণের বর্ষণ শুরু হয়েছে। 
দরিদ্র, ভিক্ষুক, দ্বিজ, ভট্ট আদি যত এসেছে সকলকে বিদুর অবিরাম দান করে চলেছেন। যতই দান হচ্ছে তার দ্বিগুণ বন্যার জলের মত সামগ্রী জড় হচ্ছে। একেকজন যে কত করে দান নিচ্ছে কেউ তার হিসেব রাখার নেই। এভাবে বহুদানে পৃথিবী অদরিদ্রা হয়ে উঠেছেন। নিরানব্বই ভাই সহ নিজের পরিবার নিয়ে দুর্যোধন পশ্চিম দুয়ারে অবস্থান করছে। 

গোবিন্দকে দেখে দুর্যোধন বলে –হে নারায়ণ, কি কারণে এখানে আসা হল বলুন। 

গোবিন্দ বলেন –ইনি লঙ্কার ঈশ্বর-বিভীষণ মহারাজ। এনাকে তোমার কিঙ্কররা ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। 

দুর্যোধন বলে –তাদের কোন দোষ নেই। ভীমের আক্রোশকে সবাই ভয় পায়। হে কৃষ্ণ দেখুন, পশ্চিমদ্বারে কত রাজারা অপেক্ষায় আছেন। শিরসি দেশের রোহিত রাজা সঙ্গে আরো শত নৃপদের নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। এদের সাথে পাঁচ কোটি হাতি, দশ কোটি রথ আছে। এদের সৈন্যরা দশ ক্রোশ পথ জুড়ে অবস্থান করছে। নানা যানে বিবিধ রত্ন নিয়ে এরা এই দ্বারে বারিত হয়ে আছে। 
মালবরাজ শিবি, পুষ্করের রাজা এদের সাথেও পাঁচশ নৃপ আছে। এক কোটি রথ ও গজ। আর কত যে অশ্ব সাথে এসেছে কে তার খোঁজ রাখে। নানাবর্ণের ধনরত্ন নিয়ে এরা দু তিন মাস ধরে এই দ্বারেই অপেক্ষা করছে। 
দ্বারপালরাজ আর বৃন্দারক রাজা, প্রতিবিন্ধ্য নরপতি অমরকন্টক-এদের সাথেও পাঁচশ রাজা এসেছে অসংখ্য গজ বাজী নিয়ে। এদের রাজ্যের চার জাতের প্রজারাও হাজির হয়েছে নানা কর নিয়ে। এরা সকলে এখনও দ্বারে অপেক্ষা করছে। 
চাঁচররাজ চিত্রসেন রাজা ত্রিশ কোটি রথ ও ত্রিশ কোটি কুঞ্জর(হাতি), নানা রত্ন নিয়ে দেখ সবার পিছনে চোরের মত দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। 
এছাড়া আপনার পিতা বসুদেবও যদুবীরদের নিয়ে অপেক্ষমান। 
মদ্রের শল্যরাজ রাজার মাতুল দুদিন দ্বারে থেকে মাদ্রীপুত্র আজ্ঞা নিয়ে এই ভিতরে নিয়ে গেছে। 
এসেই এঁনাকে ভেতরে নিয়ে যেতে চান, কিন্তু আজ্ঞা বিনা আমরা ছাড়ি কিভাবে! এখনই মাদ্রীর পুত্রেরা আসবে, একটু অপেক্ষা করুন, নারায়ণ। 

এই বলে দুর্যোধন সিংহাসন ছেড়ে কৃষ্ণকে বসার আসন দিল। দুই সিংহাসনে দুজন বসলেন। কে বুঝবে জগন্নাথের চমৎকার! অখিল ব্রহ্মান্ড যার মায়ায় মোহিত তিনি আজ অপেক্ষায়। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ধন্য যে তিনি শুভক্ষণে জন্মেছিলেন বলে আপন গুণে এই প্রভুকে বশ করেন। তিনি প্রভুকে পাওয়ার জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন, কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এমন যজ্ঞব্রত অনেকেই করে। তবে সকলেই কিছু পেতে চায়-বৈভব, কুবেরের ধন প্রভৃতি। কিন্তু ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন সকলের উর্দ্ধে। তিনি কেবল জগন্নাথকে পাওয়ার আশায় অনেক কষ্ট সাধন করেন। তার এই প্রচেষ্টায় পৃথিবীর প্রাণীরা ধন্য হল। গোহত্যা, স্ত্রী হত্যা ইত্যাদি নারকীয় পাপ কর্ম করে যে অনুতপ্ত হয়ে কৃষ্ণকে ডাকে এবং তার দর্শন পায় সেই স্বর্গে যেতে পারে। জন্ম জন্ম কাশী ও নানা তীর্থে সেবা করে, তপ্ত ক্লেশে যজ্ঞ ব্রত করে পঞ্চ মহাপাতকী যদি শ্রীকৃষ্ণের মুখদর্শন করে তবেই পাপ শরীর আর থাকে না। এই শ্রীমুখ যে নয়নে না দেখে সংসারে বাস করে তার নরযোনি বৃথা। সেই শ্রীমুখকে এই ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজা জগন্নাথ রূপে সেবা করেন। এই জগন্নাথ মুখপদ্ম যে দর্শন করে ও জগন্নাথ নাম স্মরণ করে পৃথিবীতে তার জীবন সফল। কাশীরাম তার চরণে প্রণাম জানান।
......................................

Sunday, February 26, 2017

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১৩৯

[পূর্বকথা - যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন ....... মুনিরা হোম যজ্ঞের আয়োজন শুরু করেন......দেবগণকে নিমন্ত্রণ করতে অর্জ্জুন যাত্রা করেন ...বাসুকি নাগকে নিমন্ত্রণে পাতালে পার্থ যাত্রা করেন......দ্রুপদ ও অন্যান্য গণ্যমান্য রাজারা আসতে লাগলেন... কৃষ্ণদর্শনে লঙ্কার রাজা বিভীষণ উপস্থিত হলেন....কৃষ্ণের শত অনুরোধেও রাজাজ্ঞা বিনা দক্ষিণ ও পূর্ব দ্বার দিয়ে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হল না... ] 



শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক চারিজন রাজার প্রাণদানঃ 

বিভীষণকে নিয়ে গদাধর কৃষ্ণ যখন যাচ্ছিলেন তখন পথে দেখেন ভীমের কিছু অনুচর চারজন রাজাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। 

মাধব কৃষ্ণ তাদের ডেকে বলেন –তোমরা কারা! এই চারজনকে এভাবে বেঁধে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ! এরা কি অপরাধ করেছে! 

দূতরা বলে –আমরা ভীমের কিঙ্কর। এই চারজন দুষ্ট কর্ম করে অপরাধী। এই দুজন শ্বেত ও লোহিত মণ্ডলের রাজা। এদের দেশ সমুদ্রের তীরে। পার্থ এদের জয় করে সঙ্গে আনেন। এখন এরা কাউকে কিছু না জানিয়ে দেশে পালাচ্ছিল। অর্ধপথ থেকে এদের ধরে আনা হয়েছে। আর এই দুজন দুই দরিদ্র ব্রাহ্মণকে উপহাস করে অত্যাচার করছিল। তাই চারজনকে বেঁধে নিয়ে চলেছি। ভীম এদের শূলে দিতে বলেছেন। 

কৃষ্ণ বলেন –ঠিক আছে এদের পরে নিয়ে যেও, এখন এরা আমার সাথে থাকুন। ভীমসেন কোথায়! তার কাছে আমায় নিয়ে চল। 

দূতরা কৃষ্ণকে বৃকোদরের কাছে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। কিছুদুরে ভীমকে দেখা গেল এক লক্ষ রথীদের নিয়ে চারদিক ঘুরে তদারকি করছেন। 

ভীমের সামনে এসে কৃষ্ণ বলেন –হে ভীম, এই চারজন রাজাকে মুক্তি দাও। যজ্ঞের জন্য নিমন্ত্রণ করে এনে এখন শূলে দেওয়া ঠিক হবে না। হে বীর, এত বড় যজ্ঞস্থলে ভাল মন্দ দু ধরনের মানুষই আসবে। এই সামান্য ঘটনাগুলি ক্ষমা না করলে কাজে বড়ই বিঘ্ন ঘটবে। 

বৃকোদর বলেন –হে দেবকীনন্দন, দোষ অনুসারে দুর্জনকে শাস্তি না দিলে অন্যেরাও তাদের পথ অনুসরণ করবে। আর এদের ক্ষমা করে কি সুবিধা হবে শুনি! দুষ্টজনকে ক্ষমা করতে পারব না। এরা কখনই পাপ কাজ থেকে বিরত হতে পারবে না। এসব দুষ্ট পাপীদের নিজের তেজ না দেখালে এরাও অবজ্ঞা করতে শুরু করবে, তাতেই বিপদ বাড়বে। এদেরতো চিনতামও না, এরাই তেজ দেখিয়ে অশান্তি শুরু করেছে। এদের ক্ষমা নেই। 

কৃষ্ণ কমললোচন অনুরোধ করে বলেন –শুন শুন ভীমসেন! তোমাদের জন্যই তিনলোক আজ এক হয়েছে। এখন একটু শান্ত হয়ে ভাব। এই যজ্ঞের জন্য এক লক্ষেরও বেশি রাজারা আজ এখানে উপস্থিত। এর মধ্যে কে ভাল, কে মন্দ জানা সম্ভব নয়। এখন সবাই যদি এই ঘটনা নিয়ে দ্বন্ধ শুরু করে তখন কি করবে! তখন তো আরো সাঙ্ঘাতিক অবস্থা হবে! নৃপরা রেগে যজ্ঞ পণ্ড করতে পারে। পৃথিবীর সবাই তোমার বিরুদ্ধে যাবে। কত জনকে তুমি শাস্তি দেবে! পার্থও এখন পাতালে থেকে গেল। তোমাকেই তো এখন সবদিক দেখতে হবে! 

কৃষ্ণের কথা শুনে ভীম বলেন –হে দেব দামোদর, এতো আপনার যোগ্য কথা নয়! আপনি যে এক লক্ষ নৃপের কথা বলছেন তাদের তো দেখে এলাম। বাঘের চোখে অজাযূথের(ছাগলের দল) যেমন লাগে, আমারও তাদের তেমন লাগল। এরা যদি এক যোটও হয় মুহূর্তে আমি এদের পরাজিত করতে পারি। মানুষ কেন তিনলোক এক হয়ে গেলেও আমি একেশ্বর হয়ে তাদের সাথে লড়তে পারি। আর হে দেব আপনি যাদের পক্ষে তাদের ত্রিভুবনে কে পরাজিত করতে পারে! 

গোবিন্দ বলেন –হে ভীম, তোমার পক্ষে সব সম্ভব আমি জানি। তোমার বিরোধ কেইবা করছে! এদের না হয় আমার অনুরোধেই এখন ছেড়ে দাও। এরপর কেউ অন্যায় করলে অবশ্যই দন্ড দেওয়া হবে। 
এই বলে তিনি নিজেই চারজনকে মুক্ত করলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত লহরী, কাশীরাম কহেন ইহা শুনলে সহজে উদ্ধার হয় সংসার তরী।

......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers