Blog Archive

Thursday, July 2, 2009

আমার মেয়েবেলা......



স্কুল পর্ব-
আমার মেয়েবেলা –প্রকৃত বা সুখের মেয়েবেলা বলতে আমার একটা বছরই উজ্জ্বল রূপে মনে আসে। সেই নাকতলা আনন্দ আশ্রমে ক্লাস ফোরের দিনগুলির কথা।
দিদা-দাদু-কাকা-কাকিদের যৌথ পরিবারে মানুষ হচ্ছিলাম। পাপাকে তখন কাছে পেতাম না। এখন বুঝি তখন পাপা আবার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। সে সময় আমার হোষ্টেলে ভর্তির ব্যবস্তা হয়। পিসি, দিদা ও পাপা হোষ্টেলে দিতে যায়। হোষ্টেলে ভর্তির জন্য প্রথমে প্রাইমারী স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলাম। চান্সও পেলাম। হোষ্টেলে ভর্তি হয়ে গেলাম। সে সময় আমিই হোষ্টেলে সবচেয়ে ছোট ছিলাম। আমার উপরে অপর্ণাদি ও শেলীদিকে পেলাম। অপর্ণাদি আমার জীবনের ধ্রুবতারা। দেখতে সুন্দর কিন্তু কদম ছাঁট চুল। মানে ন্যাড়া হয়েছিল হয়ত-তখন কচি২ চুল উঠছে। অপর্ণাদি নাটকে অভিনয় করতে ভালবাসত। বিশেষ করে কমেডি। জহর-ভানুর ক্যারিকেচারও করত। হাসির নাটকের বই পড়ে আবার সকলকে নিয়ে তা মঞ্চস্থ করার প্ল্যানও করত। শেলীদি একটু আদুরে ছিল, একটূ বকুনি খেলেই কাঁদত। চাঁপা দেখতে, ছোট২ চোখ, কোঁকড়ান মাথা ভর্তি চুল। একটু চুপচাপ ধরনের। অপর্ণাদির আড়ালেই থাকত। অপর্ণাদি যা বলত তাই করত। ওরা প্রাইমারীতে ক্লাস ফাইভে পড়ত। এদের কথা আমার হোষ্টেল-পর্বে বলব।
প্রাইমারী স্কুল ক্লাস ফাইভ পর্যন্তই ছিল। ক্লাস ফাইভ কেবল মেয়েদের। ফোর অবধি কোএড ছিল। ফোরের ক্লাস টিচার ছিলেন শান্তিদি। উনি আমাদের অঙ্ক নিতেন। ৫০এর উপর বয়স, বেশ রাগী, সব চুল সাদা আর বয়েস্‌কাট, চোখে গোল চশমা, ধপ্‌ধপে সাদা শাড়ি। সোজা হাঁটতেন। একবার স্কুলে ওনার ছেলে ও তার বৌ গাড়ি করে দেখা করতে আসে। শান্তিদিকে প্রচন্ড ভয় পেতাম। ক্লাসে একটা বেঞ্চের দু’দিকে দু’জন মেয়ে বা ছেলে আর মাঝে একজন ছেলে বা মেয়ে বসতো। প্রতি সপ্তাহে বেঞ্চ চেঞ্জ হত। অর্থাৎ ১ম বেঞ্চের স্টুডেন্ট লাস্ট বেঞ্চে ২য় বেঞ্চের স্টুডেন্ট ১ম বেঞ্চের চলে আসত। ফলে সকলেই দিদিমণির চোখের সামনে থাকত। বড়দি ছিলেন বাসন্তিদি(যত দূর মনে হয়)- পরে রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পান। ইনি ইতিহাস পড়াতেন। পড়া না পারলে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। তবে আমায় খুব ভালবাসতেন। শান্ত ছিলাম বলে হতে পারে, আবার পাপা ওনাকে বড়২ হরলিক্সের শিশিতে খাঁটি মধু পাঠাত-সে কারনেও হতে পারে। আমি বরাবর মাঝারি ধরনের স্টুডেন্ট ছিলাম। এবার স্টুডেন্টদের বর্ণনাও দিই। কারণ ছবির মত সব আমার মনে আসছে। শান্তিদি রোল কল করতেন (যত দুর মনে পড়ছে লিখছি)-সৌমেন, দেবশংকর, সুপ্রদীপ, সুব্রত, অশোক, প্রদীপ, অরূপ, রাজু বারুই, রাজু দেবনাথ, অম্বর, দীপঙ্কর, অমিতাভ, গৌতম, সঞ্জয় দত্ত, মধুশ্রী, মধুমিতা, পিংকি ঘোষ, পিংকি সিং, সোনালি সরকেল, সোমা বাগ, সুমনা, ভাষ্যতী, পাপিয়া, উমা, রুবি, সীমা(১), সীমা(২), শিপ্রা, চৈতালী, পম্পা, ঝুমুর, মহাশ্বেতা, ফাল্গুনী, পিয়ালী, সঞ্চিতা, শ্রাবণী, মনিষা......।
১ম হত সৌমেন। ওর ভাই ছিল রাণা। সে নিচু ক্লাসে পড়ত। টিফিনে দাদার কাছে আসত। সেবার হাফিয়ারলির আগে আমবাগানে ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল। রাজু বারুই-খেলায় পটু, পড়াশুনায় ভাল নয়। ও ব্যাট করছিল গাছের ডাল দিয়ে, সৌমেন বোধ হয় কাগজের বল নিয়ে দৌড়ে আসছিল, রাজু ওদিকে ব্যাটটা খালি মাটিতে ঠুকছে, শেষে একটা ডালের ছোট্ট টুকরো ছিটকে সৌমেনের চোখে লাগল। সঙ্গে২ ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল, এরপর অনেক দিন ও আর স্কুলে আসত না, শেষে যখন এলো, কালো চশমা পড়ে থাকত।
২য় হত দেবশংকর। ও এবার ১ম হয়ে গেল। দেবশংকরকে দেখতে বেশ ভাল ছিল। শান্তিদি ওকে খুব পছন্দ করতেন। আমাদের গল্পের ক্লাস হত। দেবশংকর এই ক্লাসে এগিয়ে-পিছিয়ে ডিটেক্টিভ গল্প বলত। মনে আছে, ঘড়িতে টিক্‌ টিক্‌ করে শব্দ হচ্ছে-এরকম একটা মূহুর্ত পুর ক্লাস খুব নিস্তব্ধ ভাবে রুদ্ধশ্বাসে উপভোগ করতাম। আমিও গল্প বলতাম। সিন্ডারেলা, স্নোহোয়াইট...যথারীতি গল্প শেষ হতনা, আর ঘন্টা পরে যেত। তবু টিফিনে বন্ধুরা আমার পেছনে ঘুরত শেষ শোনার জন্য। তা, দেবশংকর ভাল ছবি ও আঁকত। আমি অনেকদিন পর্যন্ত যানতাম না। আমি তখন খুব ছবি আঁকতাম। সবাই প্রশংসাও করত। শেষে আঁকার প্রতিযোগীতায় শান্তিদি দেবশংকরদের নিয়ে চলে গেলেন। ওরা প্রাইজ ও আনে। পুর প্রাইমারী স্কুলে এই ছেলেটি বিশেষ জনপ্রিয় হয়। একবার অপর্ণাদি ‘ক্ষীরের পুতুল’ নাটকটা স্কুলে করল। নিজে বাদর সাজল, হোষ্টেলের শর্মিষ্ঠাদি রাজকন্যা। শেষে রাজপুত্রের জন্য আসল ছেলে দরকার তখন দেবশংকর পাঠটা করবে ঠিক হল। এদিকে শর্মিষ্ঠাদি হোষ্টেলে সারাদিন ঐ অল্প একটু আভিনয় বার২ দেখিয়ে২ মাথা খারাপ করছে। আমার খুব রাগ হত। শেষে কোন কারণে দেবশংকর অভিনয় করেনি, হোষ্টেলের ইন্দ্রানীদি ওটা করে। এতে আমি খুব সন্তুষ্ট হই। এখন ভাবলে হাসি পায়।
সে সময় যারা র্যা ঙ্ক করত তারা ক্লাসে ভাল স্টুডেন্ট আর যারা এমনি পাশ করছে তারা বাজে। মেয়েদের মধ্যেও এমন ভাগ ছিল, আমি অবশ্যই শেষ দলের। আমাদের সাথে ভাল মেয়েরা তেমন মিশত না। ওরা একটু অহংকারী ছিল। আমরাও তা মেনে নিতাম। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে অমন ভাগ ছিল না। দেবশংকরের সাথে ক্লাসের সব বাজে ছেলেদের খুব বন্ধুত্ব ছিল। গৌতম নামে একটা বোকা-হাবা ধরনের ছেলে ছিল। একবার টিফিনে আমার চুল টেনে ধরল। সে সময় আমি চুল নিয়ে ভিষণ প্যাক খাচ্ছি। বাড়িতে যখন থাকতাম, স্কুলে ছুটি পরলেই দিদা আমাকে আর আমার খুড়তুতো বোনকে নিয়ে আমাদের মন্দিরের পাশে যে নাপিত বসে তার কাছে চুল কাটতে নিয়ে যেত। আমরা হাতে টুপি নিয়ে যেতাম। দুজনে ন্যাড়া হয়ে টুপি মাথায় ফিরতাম। হোষ্টেলে আসার পর আমি এর প্রতিবাদ করলাম, তো দিদা কানের নিচ থেকে চুল কেটে পাঠালো, যাতে চুল বেশি না বারে। কিন্তু তাও স্কুলে রক্ষা পেলাম না। ফলে গৌতমের উপর ভয়ানক রেগে তাড়া করলাম মারবো বলে। ও দৌড়াতে২ হাইস্কুলের সামনে বকুলতলায় চলে গেল। ওখানে দেবশংকররা টিফিন করছিল। গৌতম ওকে গিয়ে ধরল, ওরা সবাই দেবশংকরকে ‘গুরু’ বলত। এবার দেবশংকর বলল গৌতমকে ছেরে ওকে ধরতে হবে। এবার ওর পিছু নিলাম। ও পাই২ করে দৌড়াচ্ছে, পেছনে আমি। আমাদের পেছনে আমাকে ওস্‌কাচ্ছে আমার বন্ধুরা-শিপ্রা, সোমা। আর ওর সাথে ওর ছায়া প্রদীপ। প্রদীপটা প্রতি ক্লাসে ২বার করে পড়ত। গাছে উঠে পা উপরে মাথা নিচে করে হাত ছেড়ে ঝুলত। আমরা ওকে হনুমান বলতাম। তো, আমরা দৌড়াতে২ আমাদের প্রাইমারী স্কুলের কাছে আসতেই টিফিন শেষের ঘন্টা পরে গেল। সে সপ্তাহে দেবশংকর পেছন বেঞ্চে বসে। আমি সামনের বেঞ্চের উল্টো দিকে। অফ্‌ পিরিয়ডে শিপ্রা বলল দেবশংকরকে ছুঁয়ে দিতে তাহলেই আমি জিতে যাব। কিন্তু প্রদীপের জন্য হল না।
ক্লাসে ভাল ছেলে আরো ছিল-সুপ্রদীপ, সুব্রত। সুপ্রদীপ কেমন আলাদা২ থাকত। ওর বোন ও ওর মত দেখতে ছিল। নিচু ক্লাসে পড়ত। খুব ফর্সা, মোটাসোটা, মিষ্টি মত। এখন মনে হয় সুপ্রদীপ খুব গম্ভীর বিজ্ঞানী বা ডাক্তার গোছের কিছু হবে। সুপ্রদীপকে আমার ভাললাগত না। কারণ মনে আছে একবার পাপা বন্ধুদের উপহার দেবার জন্য অনেক ছোট২ ডাইরী দেয়। সবাই নিয়েছিল শুধু সুপ্রদীপ নেয়নি। এটা আমার ভাল লাগেনি। পরে ফাইভে উঠলে একবার দীপঙ্কর স্কুলে কোন কারনে আসে আর আমার সাথে দেখা হলে সেই ডায়রীটাও দেখায়।
সুব্রতও র্যা ঙ্ক করত। খুব লম্বা ছিল। আমি বরাবর খুব ছোটখাট, ফলে সুব্রতকে আমার তালগাছ মনে হত। ও একবার একটা বাবুই পাখির বাসা ক্লাসে আনে। সেটা অনেক দিন আমাদের রুমে সাজান ছিল।
ক্লাসে বেশ ডাকাবুকো কিছু মেয়েও ছিল। প্রথমেই মনে পরে উমার কথা। বেশ ফর্সা, লম্বা, মোটাসোটা। মনে আছে ওর মুখে একটা বড় আঁচিল ছিল। উমা ছারাও ছিল, শ্রাবণী, এ একটু তোতলা ছিল। সোমা বাগ, সবাই আমাকে আর ওকে বাঘ-সিংহ বলত। সোমা বেশ সুন্দর দেখতে ছিল। এছাড়া, পিংকি সিং ও সে বছর আমার সাথেই ভর্তি হয়। ভাষ্যতীও আমাদের সাথে আসে। মেয়েদের মধ্যে ১ম হত মধুশ্রী। খুব গম্ভীর! মোটা হাই পাওয়ারের চশমা চোখে, কারো সাথে মিশত না। আমার তখন বিখ্যাত আঁকা ছিল ২-৩টে ‘M’এর মত পাহাড়, তাদের মাঝে অর্ধেক সূর্য উদিত হচ্ছে, আকাশে অনেক ‘V’এর মত পাখি উড়ছে, পাহাড় থেকে সরু নদী নেমে এসে মোটা হয়েছে, পাশে একটা কুঁড়ে ঘর, চারপাশে কিছু বড় গাছ- এই সব। সবাই প্রশংসা করত, নিজেকে বড় আর্টিষ্ট মনে হত। তবু মধুশ্রীও আমাকে ফেলে কমপিটিসনে চলে যায়।
এখন শারীর শিক্ষার ক্লাস হয় ঠিকই তবে আমাদের বাংলা মিডিয়ম স্কুলে তখন খুব ব্রতচারী হত। ‘চল কোদাল চালাই/ফুলের বাগান বানাই’ ইত্যাদি। ক্লাস টেস্টে হেড দল তৈরি করত। ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ভাবে পরীক্ষা হত। শান্তিদি প্রায় সব সময় দেবশংকরকে হেড করতেন। দড়ি ধরে টানাটানির একটা খেলাছিল। মেয়েদের দুটো দল হল। দড়ির দুদিকের সামনে নেত্রী থাকবে। এক দলের নেত্রী হল মধুশ্রী। অন্য দলের নেত্রী দেবশংকর আমায় করল। এদিকে মধুশ্রী আমার চেয়ে বেশ লম্বা। নেত্রী হওয়াতে আমার খুব ভাল লাগল। কিন্তু আফশোস আমাদের দল শেষ পর্যন্ত হারে।
আমাদের অফ্‌ পিরিয়ডে যাতে গন্ডগোল না হয় তাই হেড যারা কথা বলত তাদের নাম বোর্ডে লিখে রাখত। পরে শান্তিদি তাদের শাস্তি দিতেন। তবে যে নাম লিখবে সেও যদি বানান ভুল লেখে তবে তাকেও শাস্তি পেতে হত। শাস্তি ছিল বেঞ্চে মাথা ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। যখন দেবশংকর বা অন্য কেউ হেড হয়েছে তখন আমার নাম কখনও বোর্ডে ওঠেনি। এর কারণ অবশ্যই আমার নামের বানান। আমিও মাঝে২ ভুল করতাম। কারণ ১মে ‘দী’, তার উপর ২য়তো নিতায় ‘ন্ব’ করতে হত। অনেকেই ভুল করে ফেলত। ফলে আমি মনের আনন্দে কথা বলতাম। অম্বর নামে একটা ছেলে হেড হয়ে ১ম আমায় কথা বলার জন্য শাস্তি খাওয়ায়। ও আমার খাতা নিয়ে গিয়ে বোর্ডে নাম তোলে।
টিফিনে আমরা হস্টেলের মেয়েরা পাশেই হোস্টেলে চলে যেতেম। ফোরে আমিই শুধু ছিলাম। টিফিন খাবার পরও বেশ খানিকটা সময় থাকত। আমাদের হোস্টেল, ৩টে স্কুল, হোম নিয়ে আনন্দ আশ্রমের বিশাল এলাকা ছিল। বড় স্কুলের সামনে বড়২ অনেক বকুলগাছ ছিল, আমরা বকুলতলা বলতাম। এরকম আমবাগান, কলাবাগান-সব ছিল। আমরা ছোটরা আমবাগানেই বেশি খেলতাম। আমরা মেয়েরা একটা খেলা খেলতাম। দু’দলে ভাগ হয়ে যেতাম। সবাই সবার কোমর জড়িয়ে ধরতাম। অনেকটা সাঁওতাল নাচের মত। তারপর এক পা এগিয়ে আর এক পা পিছিয়ে সুর করে দু’দল ছড়া কাটতাম-
“১ম দলঃ ইলারিং বিলারিং সৈ লো!
২য় দলঃ কিসের খবর আইলো!
১ম দলঃ রাজামশাই একটি বালিকা চাইলো।
২য় দলঃ কোন বালিকা চাইলো।
১ম দলঃ (২য় দলের কোন মেয়ের নাম করে)-বালিকা চাইল।
২য় দলঃ কিসে করে নিয়ে যাবে?
১ম দলঃ পালকি/রথ/ঘোড়া-(যে কোন একটা)করে নিয়ে যাবে।।”
শেষে ঐ মেয়েটি ১ম দলে চলে যেত। এভাবে খেলা চলত।
এছাড়া, খুব কিৎ কিৎ খেলা হত। হোষ্টেলেও এটা খুব খেলা হত। শর্মিষ্ঠাদি কিৎ কিৎ চ্যাম্পিয়ন ছিল। শুয়ে২ ঘুমের ঘোরেও ও কিৎ কিৎ খেলত। স্কুলে আমাদের চ্যাম্পিয়ান ছিল-পাপিয়া। মনে আছে পাপিয়া আমার চেয়েও উচ্চতায় ছোট ছিল। একবার ওর মাঝের দাঁত পড়ে গিয়ে ফোগ্‌লা হয়ে যায়। দেখতে খুব দুষ্টু আর মিষ্টি ছিল। আমি আবার কোন খেলাতেই তেমন পাকা ছিলাম না। আর ও চ্যাম্পিয়ান হয়েও সব সময় আমাকেই ওর জুটি হিসাবে নিত। আমরা ছোট২ চোট্টামিও করতাম। ও আমায় খুব ভালবাসত। ক্লাস ফাইভে ও অন্য স্কুলে চলে যায়। তবু সরস্বতী পূজোয় শাড়ি পরে আমার সাথে দেখা করতে আসে।
এভাবে আমার ভীষণ সুন্দর ক্লাস ফোর শেষ হয়ে যায়। ভেবেছিলাম সরকারী বই জমা দেবার সময় আবার সবার সাথে দেখা হবে। কিন্তু সবাই যখন এলো, আমি তখন ছুটি কাটাচ্ছি জলপাইগুড়িতে।

Monday, June 29, 2009

ছোট্ট একটি ঘাস ফুলের কথা

আমি একটা ছোট্ট ঘাস ফুল। আমায় দেখতে কেমন? তা আমি কি ভাবে বলি! তবে আমি ছোট্ট-এই ট্টুকুনি। আমার বন্ধুরা – তোমরা চেননা তাদের! তারা হল – সূর্যশিশির, দুর্ব্বা, শেয়ালকাঁটা- এরা বলে, আমায় দেখতে খুব মিষ্টি। হবেও বা! আমি কি জানি! আমার মা আমায় খুব ভালবাসে। সব সময় আগলে রাখে ঐ দুষ্টু মানুষের ছেলে, গরু, ছাগলের হাত থেকে। ওদের দেখলে আমার ভীষণ ভয় করে। এই বুঝি মারিয়ে দেয় বা চিবিয়ে খায়। তবে আমি খুব সুখী। এই বসন্তে আমার জন্ম। প্রথমেতো ক’দিন কুড়ি ছিলাম, সে সময় কি উত্তেজনা! পৃথিবীটা কেমন? ঘাস কি? মানুষ, গরু, ছাগল-এরা কারা? কত মনে প্রশ্ন! হাওয়া জিনিষটাই বা কেমন? কি সুন্দর বাতাস গায়ে লাগে, তাই কি হাওয়া! তাকে দেখতে কেমন? মনে তখন কত প্রশ্ন সব সময় জাগছে! এখন আমি অ-নে-ক জানি। জানি যে হাওয়াই আমাদের বন্ধু। মাটির তলায় জল থাকে। শিকড় দিয়ে মা তা টেনে আনে পাতায়, তারপর সেখানে হাওয়া থেকে প্রাণ বায়ু নিয়ে রান্না হয়। সেই খাওয়ার খেয়ে আমরা সকলে বাচিঁ। সূর্য আমাদের দেবতা। তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকান যায় না। তিনি যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ শান্তি ও স্বস্তি। তখন আমরা সব বন্ধুরা গল্প করতে২, হাসতে২, একে অপরের গায়ে ঢলে ঢলে পরি। কত যে আমাদের কথা থাকে, সে তোমাদের বলে শেষ করতে পারব না। ওই দেখনা একটা মানুষের ছানা কেমন হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে -দেখে তো আমাদের পেটে খিল ধরে যাবার জোগার! ওরা না ভারি দুষ্টু! শুধু২ আমাদের নখ দিয়ে ছেড়ে। আমি তো তখন খুব ভয়ে থাকি। সেদিন তো একজন কলমিকে টেনে ছিড়ল! কলমি কত কাঁদল, ওর মার কি চিৎকার! আমাদের মারাও কাঁদল। আমি, সূর্যশিশির তো ভয়ে নীল হয়ে গেছি। উফঃ কি কষ্ট করেই না কলমিকে ওরা মারল! মানুষ এমনিই নিষ্ঠুর। তবে আমাদের মধ্যে শিয়ালকাঁটা খুব ওস্তাদ। ওকে সবাই সমঝে চলে। সকলে বলতে আবার তোমরা আমাকে বুঝ না! এই যে শিয়ালকাঁটাটিকে দেখছ! ওতো আমায় খুব তোয়াজ করে। কত মিষ্টি২ কথা বলে! আমায় একটুও বকে না। যদিও আমি ওর থেকে একটু দূরে দুরেই থাকি। মা বলেছে তো, তাই। ওর গায়ে যে বড়২ কাঁটা! এমনিতে ও খুব ভাল। কিন্তু কি করি? ওর কাঁটা যে সাংঘাতিক, ছুলেই এক্কেবারে অক্কা! যান তো, এজন্য ওর মনে খুব দুঃখ। আমরা বন্ধুরা যখন হাসাহাসি করি, তখন ও-ও আমাদের সঙ্গে থাকে, কিন্তু ও নিজেই একটু দূরে২ থাকে। ও জানে ওর সংস্পর্ষে আমাদের আঘাত লাগবে। আমি তো ওকে বোঝাই! এর জন্য দুঃখ কর কেন? এটা তো তোমার আত্মরক্ষার উপায়! আমাদের দেখ সকলে দুঃখ দেয়, তবু তুমি আমাদের সর্দার। তোমাকে দুষ্টুরা ভয় পায়।
সূর্যশিশির আছে না! ওর সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব। কিন্তু কি হয়! ও বড় নোংরা। কি করে যান! লুকিয়ে২ মাংস খায়। আমি যদিও ঠিক জানিনা কি ভাবে তা ও জোগার করে। তবে একদিন দেখি কি, ভোরের দিকে খুব মুখ নারছে। ওই মানুষদের পান চেবানোর মত। আমি জিজ্ঞেস করি-‘কি খাস, ভাই!’ ওতো প্রথমে খুব হকচকিয়ে গেছে। কিছুতেই বলে না! খালি কথা ঘোরায়! খুব ঢঙি কিনা! ঢঙ খুব জানে! সে যাক্‌ গে, তারপর কি হল শোন। মাকে গিয়েতো কথাটা বললাম। মা বললে –‘চুপ চুপ, ও সব ঘেন্নার কথা বলিস নে, আমরা উদ্ভিদ জাত! আমাদের কি মাংস সরাসরি খেতে আছে! কিন্তু পাশে দেখ, সূর্যশিশিরদের! কেমন মশা, মাছি গপ্‌ গপ্‌ করে ধরে আর গেলে! মাগো ঘেন্নায় মরে যাই! দিলিতো মেজাজটা সকালেই খারাপ করে!’ আমি তো মার রাগ দেখে দূরে সরে আসি। সে দিন তো আমি সূর্যশিশিরের সাথে কথাই বলিনি! শেষে বিকেলে শিশিরের সে কি কান্না! তখন কি আর ভাব না করে পারি! আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
ওদিকে দেখনা, দুব্বাদের অবস্থা। ওনা খুব নিরিহ। সব সময় ভয়ে২ থাকে। যা আমরা বলি তাই শোনে। আমাদের মধ্যে ওদের দুঃখ-কষ্টই সবচেয়ে বেশি। ওই বড়২ গরু-ছাগলরা নাকি দুব্বা খেতে খুব ভালবাসে। দুব্বাদের নাকি ওরা আচারের মত খায়। ভেবে দেখ, কি রুচি! মানুষরাও কম নাকি! ওরা হচ্ছে সবচেয়ে পাজি। ঘ্যাঁচ২ করে দুব্বাদের ছিঁড়বে আর ডলে২ কাটা-ছেড়ায় লাগাবে, এতে নাকি ওদের রোগ সারবে।
আমার আরেক নতুন বন্ধু হয়েছে। নাম শুনবে? খুব মজার নাম –পাথরকুঁচি। হিঃ হিঃ, ভাবছ পাথর কুঁচো২ হয়ে আমাদের সঙ্গে ভাব করছে! তা নয়, তা নয়। পাথরকুঁচি এক রকম মাথা-মোটা গাছ। মানে, মাথা-মোটা তোমাদের লুকিয়ে২ বললাম। আসলে ওদের পাতাগুলো ভিষণ মোটা২। ঐ হেংলু গরুগুলোও খাবে না। তবে ছাগলদের কথা বলা যায় না। ওরা কেমন যেন! পেট মোটা, কালো২, আবার সব কেমন চ্যাটাস্‌-চ্যাটাস্‌ করে খায়। তা, পাথরকুঁচিদের কথা বলছিলাম। মা বলে অনেক দিন আগে একটা লোক নাকি এখানে ওদের ফেলে যায়। সে ছিল আজকের পাথরকুঁচির বাবার বাবা। সে তখন খুব অসুস্থ। মায়েরা সব আত্মীয়েরা মিলে তাকে বাঁচায়। তা, পাথরকুঁচিরা খুব কৃতজ্ঞ। ওরা সব সময় সে দিনের কথা স্মরণ করে। ওরা আগে নিজেদের একা, বিদেশি মনে করত। এখনতো আমি পাথরকুঁচি ফুলদের খুব ভালবাসি। ওরানা, একটা ডালে অনেকে এক সাথে ফোটে। ঐ লম্বা-সরু একটা ডাল, তাতে কত ফুল! একটা, দুটো, তিনটে......কুড়িটা পর্যন্ত ফোটে! কি সুন্দর ঘন্টার মত দেখতে! রঙটাও খুব সুন্দর। কেমন কমলা-লাল। সূর্য ডুব্বার সময় আকাশের রঙ যেমন হয়।
দেখ! একজনের কথা বলতে তো ভুলেই যাচ্ছি -লজ্জাবতী- চেহারাটা ভারী মিষ্টি! আমার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। ও কিন্তু ভীষণ লজ্জা পায়! একেবারে কনে বৌ-এর মত। একটু ছুঁলেই লজ্জা-সরমে ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। আবার দেখ কান্ড, তার কাছে সহজে কাউকে ঘেঁসতেও দেয় না। শরীরে ইয়া বড়২ কাঁটা লাগিয়ে রাখে।
এরা ছাড়াও এই বসন্তে আমার অনেক বড়২ ফুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। দোপাটি, বেলি, নয়নতারা-আরো কত! বেলির গায়ে কি সুন্দর গন্ধ! আমি আরো অনেক-কে চিনি। গোলাপ, পদ্ম, চন্দ্রমল্লিকা, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, গ্যাদা- আরো অনেক। এরা যদিও আমার চেয়ে অনেক বড়, অনেক সুন্দরী। গোলাপের নাকি খুব অহংকার! সুন্দরী বলে, তার গায়েও নাকি আত্মরক্ষার জন্য অনেক কাঁটা আছে। তবে যাই বল, মার মুখে শুনেছি, পদ্ম হল ফুলের রাণী! যেমন রূপ, তেমনি মিষ্টি গুণ! খুব খারাপ পরিবেশে, প্রচন্ড কষ্টে সে বড় হয়েছে। তার ব্যবহারও নাকি খুব মোলায়েম। স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী তার উপর অধিষ্ঠান করেন। পদ্মের কি সৌভাগ্য! গন্ধরাজ তার গন্ধের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু দেখতে নাকি তেমন কিছু নয়! আমি রজনীগন্ধাকে দেখেছি। কেমন সুন্দর ছিম্‌ছাম চেহারা। গন্ধটাও বেশ হালকা আর স্নিগ্ধ। চন্দ্রমল্লিকারো নাকি ভারি বাহার। এরা ছাড়াও কত সুন্দর২ ফুল আছে এই পৃথিবীতে। এত ফুল একসঙ্গে, এক জায়গায়, সবাই মিলে যদি ফুটি-কি ভালই না লাগবে! তাই না? আমার তেমনি খুব ইচ্ছে হয়।
আমি মার কাছে আরো শুনেছি, অন্য অনেক জায়গায় নাকি কাঁটা গাছেও সুন্দর২ ফুল ফোটে। তাদের ভারি কষ্ট। সেখানে নাকি জলের ভারি অভাব। চারদিকে খালি বালি আর বালি। বালি কি তা’তাড়ি গরম হয়! আহাঃ ওদের না জানি কত কষ্ট করতে হয়! বালি যদিও রাতে আবার ঠান্ডা হয়ে যায়। তবু মাটি সব চেয়ে সুখের। মাটিতে আমার মত ফুল ছাড়াও আরো অনেকে থাকে। আমি দেখি লম্বা২ সব প্রাণী কি সুন্দর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। ওদের নাকি কেঁচো বলে। ইস্‌, আমিও যদি ওদের মত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারতাম, তবে কি মজাই না হত! প্রথমেই যেতাম ঐ দুরের দীঘিটায়। সেখানে নাকি জলটা টল্‌টল্‌ করে। ঐ ভোরে আমার গায়ে যেমন হিমের ফোঁটাটা হিরের মত জ্বল-জ্বল করে, তেমনি। ভাবা যায়! সেখানে নাকি এ রকম লক্ষ২, কোটি২ হিমের ফোঁটারা থাকে। হিমের ফোঁটা এত ঠান্ডা! ভোরে ওর স্পর্ষে আমার মন এত পবিত্র, এত কোমল হয়ে যায়, কি বলব! ওই দিঘীতে তেমন হিমের ফোঁটারা বাস করে!
দিঘী দেখে তারপর যেতাম বনে। সেখানে অনেক উঁচু২ গাছ আছে। উঁচু গাছ বলতে এখানে ঐ আম গাছটাই আছে। ও কেমন যেন, দাদু-দাদু, খুব গম্ভীর! বনের গাছ নাকি ওর চেয়েও উঁচু! শুনেছি তারা এ-ত-ও বড় যে আকাশকেই ঢেকে দেয়! ব্যাপারটা তোমরা ভাব! এই সুন্দর নীল আকাশ! তাকে নাকি মাথা তুলে দেখাই যাবে না! আহাঃ তারা বোধ হয় আকাশকেও ছুঁতে পারে। তার সাথে কি কথাও বলে? আমিও বলি, তবে মনে মনে। আকাশ কত উঁচুতে, সে কি আমার কথা কিছু শোনে, বোঝে! তবে আমার একজন বন্ধু হয়েছে। সে ঐ উঁচু আকাশে উড়ে যায়। দেখতে আমার ভীষণ ভাললাগে। কে বলতো? তার নাম –প্রজাপতি। আমি ওর মাধ্যমে কত খবর আকাশের কাছে পাঠাই! ঐ হাল্‌কা মেঘগূলোও নাকি প্রজাপতিকে ছুঁয়ে যায়। ভাব একবার! যদিও এজন্য ওকে অনেক উঁচুতে উঠতে হয়। একবার আমার অনুরোধে ও ঐ উপরে উঠে গেল। শেষ পর্যন্ত তো আমি দেখতেই পেলাম না! ছোট হতে২ একদম হাপিস্‌! তারপর? তারপর কি হল – সে কি দেখি! প্রজাপতি ডিগবাজি খেতে২ নিচে নামছে। নেমেই মার পায়ের কাছে থুপ্‌ করে পড়ল। কি হাপাচ্ছে! দেখে তো আমি ভয়ই পেয়ে গেছিলাম! সব শুনে মা আমাকে কি বক্‌লে! তারপর পাতা থেকে টুপ্‌ করে একফোঁটা জল প্রজাপতির মুখে দিল। তখন সে শান্ত হল। আমার জন্য দেখত কি কষ্টটাই না তাকে পেতে হল! আমার খুব লজ্জাও হচ্ছিল, দুঃখও হচ্ছিল। তারপর শোন না, সুস্থ হয়ে প্রজাপতি কি বলল! বলল যে আকাশ মেঘকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে সে আমায় ভালবাসে, আমাদের সকলকে সে ভালবাসে। তাই না তার বুকে সূর্য ওঠে! মেঘ ভাসে! বৃষ্টি হয়! ঐ বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে দিয়েই আমরা আকাশের ভালবাসা উপলব্ধি করি। আমাকে মা, আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, প্রজাপতি, শিয়ালকাঁটা, সব ফুলেরা – সকলে খুব ভালবাসে। আমিও সক্কলকে খুব ভালবাসি। ভিষণ ভালবাসি এই পৃথিবীকে। এখান থেকে যেতে চাই না। তবু যানি একদিন চলে যাব। সকলে এরা কাঁদবে। মা কাঁদবে। কিন্তু এও জানি আবার আমি ফিরে আসব। এই মায়ের কোলে, এই ভাবেই। আবার তোমাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হবে। তখন হয়তো ঐ গরু, ছাগলছানা- সকলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হবে। তারাও আমায় ভালবাসবে! মানুষের সাথেও ভাব হবে। তারাও আমায় আদর করবে! তাই না! তোমরা কি বল!

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers