Blog Archive

Tuesday, September 21, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ২৬


কচ ও দেবযানীর পরস্পর অভিশাপঃ
কিছুদিন পর দেবযানী কচকে দেবপূজার জন্য ফুল আনতে বললেন। ফুল আনতে গিয়ে কচ পুনরায় দৈত্যদের হাতে পড়লেন।


এবার তাকে টুকরো টুকরো করে ঘৃতে ভাজা হল। তারা বিচার করল অন্য কেউ এ মাংস ভক্ষণ করলে তার নিস্তার নেই। কারণ শুক্রের মন্ত্রে কচ বাঁচবে কিন্তু ভক্ষকের প্রাণটি যাবে। শেষ পর্যন্ত সে মাংস সুরাসহ শুক্রকেই খাইয়ে দিল।

এদিকে দেবযানী পুনরায় পিতার কাছে কচের পুষ্প আনতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার কথা জানালেন। তিনি আশঙ্কা করলেন দৈত্যরা পুনরায় কচকে হত্যা করেছে।


শুক্রাচার্য কন্যাকে বোঝালেন মৃত জনের জন্য বিলাপ কর না। ব্রহ্মা, ইন্দ্র, চন্দ্র, সূর্য-এদের মৃত্যু হলে তারাও আর বাঁচবে না। দেবযানী বৃথাই মৃত কচের জন্য ক্রন্দন করছেন।
কিন্তু দেবযানী কচকে না দেখতে পেলে মৃত্যুবরণ করবেন জানালেন। কন্যার কথায় শুক্র চিন্তিত হলেন।


ধ্যানে বসে দেখলেন কচ তারই উদরে। তিনি কচকে কি ভাবে তার উদরে গেলেন জানতে চাইলেন। কচ সকল কথা জানালেন। শুক্র চিন্তিত হলেন। কারণ কচকে বাঁচালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবার কচকে না বাঁচালে তার দ্বারা ব্রাহ্মণ হত্যা হয়।

শেষে শুক্র কচকে বললেন –বৃহস্পতি পুত্র, তুমি সিদ্ধিলাভ করেছ, দেবযানী তোমাকে স্নেহ করে। যদি তুমি কচরূপী ইন্দ্র না হও তবে আমার সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ কর। বৎস, তুমি পুত্ররূপে আমার উদর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিও, গুরুর নিকট বিদ্যা লাভ করে তোমার যেন ধর্মবুদ্ধি হয়।

তিনি কচকে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিক্ষা দিচ্ছেন। কারণ কচ বাঁচলে তার মৃত্যু হবে। কচ পরে সেই মন্ত্রবলে গুরুকে বাঁচাবেন। এভাবে শুক্রের গর্ভে বসে কচ মন্ত্র অধ্যয়ন করলেন। শেষে শুক্র নিজের উদর চিরে শিষ্যকে মন্ত্রের বলে বাঁচালেন এবং নিজ়ে মৃত্যুবরণ করলেন। পরে কচ মন্ত্রের সাহায্যে গুরুকে প্রাণদান করলেন।


প্রাণ পেয়ে শুক্র সুরার উপর রেগে গিয়ে শাপ দিলেন –ব্রাহ্মণ হয়ে যে সুরা পান বা সুরার ঘ্রাণ নেবে সে অধার্মিক ও ব্রহ্মঘাতী হবে। তার ব্রহ্মতেজ নষ্ট হবে। ইহলোকে সে অপূজিত হবে এবং মরলে নরকে যাবে।
পরে শুক্র দৈত্যদের ডেকে বললেন তার শিষ্যকে কেউ হিংসা করবে না-এ বাক্য না শুনলে তার অশেষ দুঃখ আছে।


কচকে তিনি আশির্বাদ করলেন নির্ভয়ে যেখানে খুশি বিচরণ করতে পারবেন। এভাবে শুক্রের কাছে কচ সকল বিদ্যা অধ্যয়ন করলেন। শেষে দেবযানীর কাছে এসে প্রার্থনা করলেন নিজের দেশে যাওয়ার অনুমতি দিতে।


দেবযানী বিষণ্ণ হলেন। কচকে ডেকে তাকে বিবাহ করতে অনুরোধ করলেন। কচ একথায় বিস্মিত হলেন। কারণ গুরুকন্যা তার কাছে ভগিনীর সমান।

দেবযানী বললেন –তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। তাছাড়া আমার জন্যই তুমি বার বার মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছো। এখন আমায় এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়।


কচ চিন্তিত হলেন। তিনি দেবযানীকে বোঝাতে চাইলেন।
বললেন –দেবযানী, প্রসন্ন হও, তুমি আমার কাছে গুরুরও অধিক। তোমার যেখানে উৎপত্তি, শুক্রাচার্যের সেই দেহের মধ্যে আমিও বাস করেছি। ধর্মত তুমি আমার ভগিনী। অতএব আর ওরূপ কথা বলো না। তোমাদের গৃহে আমি সুখে বাস করেছি, এখন যাবার অনুমতি দাও, আশীর্বাদ করো, সাবধানে আমার গুরুদেবের সেবা করো।

একথা শুনে দেবযানী ক্রোধিত হলেন। তিনি অভিশাপ দিলেন, নারী হয়ে তিনি বারবার অনুরোধ করলেন কচ তাও কথা রাখলেন না। তাই তার পিতার কাছ থেকে কচ যত বিদ্যা শিখেছেন সব নিষ্ফল হবে।
দেবযানীর বাক্যে কচ ব্যাথিত হলেন। বললেন, বিনা অপরাধে তাকে দেবযানী এত বড় অভিশাপ দিলেন। কামে উত্তেজিত হয়ে তিনি কচকে অভিশাপ দিলেন। তাই তাকেও শাপ নিতে হবে।

কচ দেবযানীকে অভিশাপ দিলেন ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শুক্রের কন্যা হয়ে তাকে ক্ষত্রিয়ের স্ত্রী হতে হবে। দেবযানীর শাপও তার লাগবে। কচ প্রত্যক্ষ ভাবে কোন বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারবেন না। তবে তার শিষ্যরা ফলদায়ী হবেন।

এই বলে কচ ইন্দ্রের নগরে উপস্থিত হলেন। কচকে দেখে দেবতারা আনন্দিত হলেন। তার কাছ থেকে দেবযানীর সকল কথা শুনলেন।
নিশঙ্ক হয়ে দেবতারা আবার যুদ্ধে উপনীত হলেন। দেব-দানবের সে যুদ্ধের বর্ণনা অবর্ণনীয়।
..........................................

Friday, September 17, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত – ২৫

চন্দ্রবংশের বিবরণঃ
চন্দ্র

জন্মেজয় মুনিকে জিজ্ঞাসা করলেন –চন্দ্রবংশে ভরতের জন্ম। চন্দ্রের দ্বারা কি ভাবে বংশ স্থাপন হল, সে কাহিনী শোনান।

মুনি বলেন –শুন, সোম বংশের কাহিনী।

মরীচি ব্রহ্মার পুত্র নামে বিখ্যাত।

কশ্যপ নামে তার পুত্রও জগৎ খ্যাত।

এই কশ্যপ ও স্ত্রী অদিতির(যিনি দক্ষের কন্যা) বিবস্বান(সূর্য) নামে পুত্র হয়।
সূর্যের পুত্র হলেন বৈবস্বত। ইনি সপ্তম মনু নামে পরিচিত।

এনার কন্যা ইলা। ইলার বিবাহ হয় চন্দ্রের পুত্র বুধের সাথে।

এদের সন্তান হলেন পুরুরবা। অষ্টাদশ দ্বীপের তিনি নরপতি হন। পুরুরবা উর্বশীর সাথে অবস্থান করেন।

তাদের পুত্র হলেন আয়ু।

আয়ুর পুত্র নহুষ। স্বর্গের রাজা ইন্দ্র যেন এলেন।

যযাতি হলেন নহুষের পুত্র। যযাতির গুণ অপার। শুক্রের শাপে তার শরীর জরাগ্রস্থ হল। পুত্রকে জরা দান করে তিনি বহুদিন রাজ্য শাসন করেন।
………………………………
শুক্র স্থানে কচের বিদ্যা শিক্ষাঃ

জন্মেজয় প্রশ্ন করলেন –যযাতি কোন দোষে শুক্রাচার্যের কাছে অভিশাপ পেলেন! কেনই বা ভৃগুর পুত্র যযাতিকে জরাগ্রস্থ করলেন!

মুনি এবার সে ঘটনার বর্ণনা শুরু করলেন।

দেবাসুরের সব সময় মহাযুদ্ধ লেগেই থাকত। তখন তারা আলোচনা করে নিজেদের মনমত পুরোহিত নিয়োগ করে।

দেবতাদের পুরোহিত হলেন বৃহস্পতি। অন্যদিকে দানবদের ভার্গব তথা ভৃগুপুত্র শুক্রাচার্য।

যুদ্ধে যত দৈত্যবধ হয় শুক্রের মন্ত্রে সকলে বেঁচে ওঠে। শুক্রাচার্যের সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে দানবদের যত মৃত্যু হয় তত তারা বেঁচে ওঠে।
এদিকে দেবতারা যুদ্ধে নিহত হলে অঙ্গিরা পুত্র বৃহস্পতি তাদের বাঁচাতে পারেন না।

দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য

শুক্রের ক্ষমতায় দেবতারা চিন্তিত হলেন।

কচ নামে বৃহস্পতির এক পুত্র ছিল। সকলে তাকে শুক্রের কাছে সেই গুপ্তমন্ত্র শিখতে পাঠালেন।

বললেন –তুমি অসুররাজ বৃষপর্বার কাছে যাও, সেখানে শুক্রাচার্যকে পাবে। শুক্রের প্রিয়কন্যা দেবযানীকে যদি সন্তুষ্ট করতে পার তবে নিশ্চয় মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করবে।

বৃষপর্বপুরে শুক্রের বাস। শিষ্য হয়ে কচ সেখানে উপস্থিত হলেন।
শুক্রাচার্যের তাঁর সুন্দরী কন্যা দেবযানীকে অসম্ভব স্নেহ করতেন।

কচ শুক্রের কাছে নিজের পরিচয় দিলেন। অঙ্গিরার পৌত্র তথা বৃহস্পতির পুত্ররূপে।

তার প্রতি খুশি হয়ে শুক্রাচার্য তাকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করলেন। তাকে সকল বিদ্যাপাঠ দিতে লাগলেন।

কচ নানা রূপে গুরুর সেবা করতে থাকেন এবং দেবযানীকেও তুষ্ট করতে থাকেন। কচ দেবযানীর সামনে হাতযোড় করে থেকেন, তিনি যা চান তাই সঙ্গে সঙ্গে করেন। নৃত্য, গীত, বাদ্যে সব সময় তাকে মনোরঞ্জন করেন। তার আজ্ঞার্থে পাশে পাশে থাকেন। এভাবে পঞ্চশত বৎসর অতিক্রান্ত হল।


কচ ও দেবযানী

কচ শুক্রের গাভীদের দেখাশোনা করতেন। গরুদের নিয়ে প্রতিদিন বনে যান।

একদিন দৈত্যেরা তাকে দেখতে পেল। সকলে যানে সে দেবতাদের পুরোহিত বৃহস্পতির পুত্র এবং মায়া করে এসেছে সঞ্জীবনী মন্ত্র শিখতে। তাই সকলে তাকে ধরে তীক্ষ্ণ খড়্গে খন্ড খন্ড করে বাঘকে সে মাংস খাওয়াল। এভাবে কচকে মেরে দৈত্যেরা ফিরে গেল।



দিন শেষ হল, গাভীরা গৃহে ফিরল কিন্তু কচ আর এল না। দেবযানী চিন্তিত হলেন। তিনি পিতার কাছে কেঁদে কচকে বাঘ, সিংহ বা দৈত্যেরা মেরেছে-অভিযোগ জানালেন। কচকে ছাড়া তিনি যে বাঁচতে পারবেন না, তাও জানালেন।

শুক্র কন্যাকে কাঁদতে বারণ করলেন এবং ‘এসো কচ’ বলে তিনবার ডাকতেই সঞ্জীবনী মন্ত্রের প্রভাবে কচ শুক্রের সামনে এসে উপস্থিত হলেন।

তাকে দেখে দেবযানী আনন্দিত হলেন এবং তিনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন জানতে চাইলেন। কচ জানালেন দৈত্যেরা তাকে মেরে ফেলে এবং গুরু তাকে পুনরায় প্রাণদান করেন। দেবযানী পিতাকে দিয়ে কচের গাভী রক্ষণবেক্ষণের কার্য বন্ধ করালেন।
……………………………………

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers