Blog Archive

Wednesday, September 29, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ২৮


দেবযানীর বিবাহঃ

এভাবে দেবযানী নানা আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন। দৈত্যরাজ নন্দিনী শর্মিষ্ঠা তাকে সেবা করতে লাগলেন।

আবার একদিন সহস্র দাসীসহ দেবযানী চৈত্রবনে বেড়াতে গেলেন। তিনি কিশলয়–শয্যায় শয়না, দৈত্য-রাজকন্যা শর্মিষ্ঠা তার পদ সেবায় রত।

দৈবের লিখন ঠিক সে সময় পুনরায় যযাতি সেখানে উপস্থিত হলেন।
তিনি দেবযানীর ও শর্মিষ্ঠার পরিচয় জানতে চাইলেন। দেবযানী পরিচয় দিলেন।

রাজা অবাক হলেন এমন সর্বাঙ্গসুন্দরী অসুররাজকন্যা কি করে দাসী হলেন।
দেবযানী বলেন -সবই দৈবের বিধানে ঘটে, এর দাসীত্বও সেই কারণে ঘটেছে।
দেবযানী আরো বলেন –রাজন, পূর্বে তুমি অন্ধকূপ থেকে আমাকেই হাত ধরে উদ্ধার করেছিলে। এখন আমার হাত গ্রহণ কর–আমায় বিবাহ কর।

রাজা জানান দেবযানী ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ গুরু শুক্রাচার্যের কন্যা, তিনি ক্ষত্রিয়-সে কারণে দেবযানীর যোগ্য নন।

দেবযানী বলেন –কোন ভয় নেই, আমি স্বেচ্ছায় তোমার কাছে ধরা দিচ্ছি।
তবু যযাতি শুক্রাচার্যের ভয়ে ভীত হন। জানান গুরু শুক্র যদি অনুমতি দেন তবেই এ বিবাহ সম্ভব।

দেবযানী পিতাকে সব কথা জানালেন। শুক্রাচার্য নিজে যযাতির কাছে উপস্থিত হলেন।

ব্রাহ্মণকন্যাকে বিবাহ করলে পাপ হবে কি না তা জানতে চান যযাতি।
শুক্র বলেন –ব্রাহ্মণকন্যা অপর তিন শ্রেণীর জননী তুল্য।
তবু যযাতি এ বিবাহ করুক। কাচের শাপে দেবযানীর স্ববর্ণে বিবাহ হতে পারে না। তপোবলে তিনি যযাতির সব দোষ খন্ডন করবেন।

এরপর তিনি যযাতির সাথের কন্যা দেবযানীর বিবাহ দেন এবং সাবধান করেন দৈত্য-কন্যা দাসী শর্মিষ্ঠাকে যেন শয়নের সময় কখনও ডাকা না হয়। দৈত্যরাজ শর্মিষ্ঠাসহ সহস্র দাসীর জন্য অশোকবনে রাজা বসতি স্থাপন করেন।

দেবযানী হলেন রাজার প্রধান পাটেশ্বরী। দেবযানী আনন্দে রাজার সাথে অবস্থান করলেন। দশমাস পর দ্বিতীয় চন্দ্রসম তাদের পুত্র হল। নাম রাখা হল যদু।

এ সময় দৈবের নির্দেশে দৈত্যকন্যা শর্মিষ্ঠা ঋতুমতী হলেন। ঋতুস্নান করে কন্যা চিন্তিত হলেন। ভাবলেন, নিজের দোষে তিনি স্বামীহীনা হলেন। দাসীরূপে পুত্রহীনা হয়ে তার যৌবন বৃথা গেল!

এসব ভাবতে ভাবতে তিনি ঠিক করলেন দেবযানী তার ঈশ্বরী, দেবযানীর ঈশ্বর যযাতি। সুতরাং যযাতি তারও অধিকারী।



যযাতি ছিলেন সংসারে সত্যব্রত নামে বিখ্যাত।

সে সময় রাজা সে বনে একা ভ্রমণ করতে এলেন। শর্মিষ্ঠা তার সামনে উপস্থিত হয়ে প্রার্থণা করলেন তাকে কাম ভাবে গ্রহণ না করে ধর্ম রক্ষার্থে তার ঋতুরক্ষা করুন, রাজন।

রাজা বলেন বিবাহের সময় তিনি গুরু শুক্রকে কথা দিয়েছেন শয়নকালে কখনও শর্মিষ্ঠাকে গ্রহণ করবেন না।

শর্মিষ্ঠা বলেন –রাজা, ধর্ম মতে আমি তোমারই। তোমার স্ত্রী আমার সখী এবং ঈশ্বরীও বটে! তাই তুমিই আমার অধিকারী।

শর্মিষ্ঠা যযাতির কাছে ধর্ম রক্ষার্থে সন্তান ভিক্ষা করেন।
রাজাও বলেন –আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে যা চাইবে তাকে তাই দেব। এই বলে তিনি শর্মিষ্ঠাকে গ্রহণ করলেন। কেউ একথা যানতে পারল না। তিনি আপন আলয়ে ফিরে গেলেন।

দশমাস দশদিন পর শর্মিষ্ঠার হস্ত-পদে চক্র শোভিত অপূর্ব পুত্র জন্মাল। সকলে সে কথা আলোচনা করতে লাগল। দেবযানী সে কথা শুনে তাকে দেখতে বনে এলেন এবং কামে মত্ত হয়ে সতীধর্ম নষ্ট করায় শর্মিষ্ঠাকে গাল দিলেন।

শর্মিষ্ঠা বলেন দৈবের লিখনে তার ঋতুকালে এক অপরূপ ঋষি বনে উপস্থিত হন এবং ধর্ম রক্ষার্থে তাকে গ্রহণ করেন। দেবযানী ঋষির পরিচয় যানতে চান। শর্মিষ্ঠা বলেন তার সূর্যের মত তেজ দেখে সাহস হয়নি পরিচয় জানবার।

দেবযানী বলেন –সখি, তুমি পূণ্যবতী। ঋষির বরেই তোমার চন্দ্রের মত পুত্র হল।

এই বলে দেবযানী অন্তঃপুরে ফিরে গেলেন। এর কিছুদিন পর দেবযানীর দ্বিতীয় পুত্র হল। নাম রাখা হল তুর্বসু। এভাবে দেবযানীর দুই পুত্র হল-যদু ও তুর্বসু।

অন্যদিকে শর্মিষ্ঠার গর্ভে রাজার তিনটি পুত্র জন্মাল। তারা হলেন-দ্রুহ্যু, অনু ও সর্ব কনিষ্ঠ সর্ব গুণাধার পুরু। রাজার কুমাররা এভাবে বড় হতে থাকেন। দেবযানী জানেন তারা ঋষির কুমার।
..........................................

Wednesday, September 22, 2010

কথাচ্ছলে মহাভারত - ২৭


বৃষপর্ব্ব-কন্যা শর্মিষ্ঠার দাসীত্বের বিবরণঃ

জন্মেজয় যোড়হাতে পুনরায় কি হল জিজ্ঞাসা করলেন।

মুনি বলেন –কচের দুঃখ দেবযানীর মনে থেকে গেল।

তিনি একদিন বৃষপর্ব্বপুরে স্নান করতে গেলেন।

বৃষপর্বরাজার কন্যা শর্মিষ্ঠাও দাসীদের সাথে সেখানে স্নান করতে এলেন।

চৈত্ররথ নামে বনে এক সরোবর ছিল। সেখানেই সকলে জলক্রীড়া করছিলেন। সকলে আপনার বস্ত্র পাড়ে রেখে জলে নামেন।

এমন সময় খরতর বায়ু বয়। সকলের বস্ত্র একত্র হয়ে যায়।
দৈত্য কন্যা শর্মিষ্ঠা সকলের আগে উঠে ভুল বশত দেবযানীর বস্ত্র পরিধান করেন।

দেবযানী দেখে ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন -শুদ্র কন্যা হয়ে শর্মিষ্ঠার এত অহংকার! যে সে ব্রাহ্মণ কন্যার বস্ত্র পরে!

দেবযানীর বাক্যে শর্মিষ্ঠাও কুপিতা হয়ে বলেন -সত্যি, তাদের মধ্যে অনেক অন্তর! কারণ তার পিতার অন্ন গ্রহণ করেন দেবযানীর পিতা, তার পিতার সদা স্তুতি গান দেবযানীর পিতা।

এসব কথা বলতে বলতে রাগে শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে কূপে ফেলে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

দেবযানী বাঁচল কি মরল কেউ তা দেখল না।

সেই বনেই ভাগ্যের ফেরে সে সময় যযাতি মৃগয়া করছিলেন।
যযাতির সৈন্যরা তৃষ্ণার্ত হয়ে জলের সন্ধানে বেড়িয়ে কূপে সুন্দরীকে পড়ে থাকতে দেখে রাজাকে সে কথা জানায়।

যযাতি এসে দেখেন এক অতি পুরাতন কূপ তৃণে আচ্ছন্ন, সেখানে চন্দ্রের সমান এক কন্যা পড়ে আছেন। তিনি কন্যার পরিচয় জানতে চান।

দেবযানী বলেন –সব পরিচয় দেব, আগে হাত বাড়িয়ে তোল। আমি শুক্রাচার্যের কন্যা।

রাজা ভয় পান। একে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শুক্রের কন্যা, তায় যুবতী।

দেবযানী আশ্বস্ত করলেন নারীকে অন্ধকূপ থেকে বাঁচালে রাজার কোন পাপ হবে না।

যযাতি কন্যার ডান হাত ধরে তাকে কূপ থেকে উদ্ধার করলেন। পরে নিজ দেশে ফিরে গেলেন।

সে সময় ঘূর্ণিকা দাসীকে দেখে দেবযানী কেঁদে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে পিতাকে বলে পাঠান তিনি কোন মুখে পিতৃগৃহে যাবেন।

ঘূর্ণিকার মুখে শর্মিষ্ঠার দেবযানীকে কূপে ফেলার ঘটনা শুনে শুক্র বিষণ্ণ হন এবং প্রাণপ্রিয় কন্যাকে দেখতে যান।

গিয়ে দেখেন কন্যা বনের ভিতর হেঁট মুখে বসে কাঁদছেন। তিনি কন্যাকে শান্তনা দিতে থাকেন। দেবযানী শর্মিষ্ঠার সকল কথা পিতাকে যানান।

শুক্র দেবযানীকে ক্রোধ দমন করতে বলেন।
তিনি বলেন –ক্রোধে মানুষ ভ্রষ্ট হয়, যে ক্রোধকে দমন করতে পারে সেই প্রকৃত সর্ব ধর্মে ধার্মিক।

তবু দেবযানীর মন থেকে কষ্ট দুর হয় না। শর্মিষ্ঠার অপমান তাকে পীড়িত করে।
বলেন –পিতা আমি ওসব কথা জানি, কিন্তু পন্ডিতেরা বলেন নীচ লোকের কাছে অপমানিত হওয়ার চেয়ে মরণ ভাল। অস্ত্রাঘাতে যে ক্ষত হয় তা সারে, কিন্তু বাক্ক্ষত সারে না।

কন্যার কথা শুনে শুক্র বৃষপর্ব রাজার সামনে উপস্থিত হয়ে জানালেন তিনি রাজ্য ত্যাগ করতে চান।
ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বৃহস্পতির নন্দন কচকে তারা মিথ্যা হত্যার চেষ্টা করেছে। তার কন্যা শর্মিষ্ঠা দেবযানীকে মারবার জন্য অন্ধকূপে ফেলেছে।
নারীবধ, ব্রাহ্মবধ যারা করে তারা পাপী। তাদের কাছে থাকলে তারও পাপ হবে।

দৈত্যরাজ শুক্রের পায়ে এসে পড়লেন। তাকে অনুনয় করতে লাগলেন, শুক্র যেন তাদের ত্যাগ না করেন। সকল পাপের জন্য তিনি ক্ষমা চাইলেন।

শুক্র বলেন –আমার আদরের কন্যা দেবযানীকে যদি তুষ্ট করতে পার তবেই আমি এস্থানে থাকব।

রাজা যোড়হাতে দেবযানীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।
দেবযানী কোন কথা শুনতে নারাজ। তিনি শর্মিষ্ঠাকে দাসীরূপে চান।

রাজা অন্তপুরে দাসী পাঠান কন্যা শর্মিষ্ঠাকে আনার জন্য। কুল রক্ষার্থে, স্বজাতীর কল্যাণার্থে শর্মিষ্ঠা চতুরদোলায় চেপে পিতার সামনে উপস্থিত হলেন।

বৃষপর্ব বলেন দৈবের লিখন তাই শর্মিষ্ঠাকে দেবযানীর দাসী হতে হবে।
শর্মিষ্ঠা বলেন –পিতা আপনার আজ্ঞায় এবং নিজ কর্ম দোষে আমি দাসী হলাম।

দেবযানী বলেন –তুমি রাজকন্যা! তোমার পিতার স্তুতি আমার পিতা করেন। তুমি কি ভাবে আমার দাসী হবে!

এই ব্যঙ্গে শর্মিষ্ঠা বলেন –জ্ঞাতির কুশল আর পিতার বচন রাখতেই আমি দাসী হলাম। এতে আমার এতটুকু লজ্জা নেই।

এভাবে শুক্র কন্যা দেবযানীকে আপন গৃহে নিয়ে গেলেন। এবং শর্মিষ্ঠাও তার দাসীরূপে সে গৃহে অবস্থান করতে লাগলেন।

..........................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers