Blog Archive

Wednesday, March 16, 2011

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৩৪

অষ্টবসুর জন্ম–বিবরণঃ

হস্তিনানগরের রাজা শান্তনু, তার গুণে পৃথিবী পূর্ণ।
ধার্মিক, মহাধনুর্দ্ধর রাজা বনে মৃগয়া(শিকার) করতে যান।
একদিন একা ভ্রমণ করছেন গঙ্গার তীরে, হঠাৎ সেখানে দেবী গঙ্গা উপস্থিত হলেন। পদ্মের কেশরের মত বর্ণ, শ্বেতবস্ত্র পরিধানে, অপরূপ লাবণ্য-দেখে শান্তনু আশ্চর্য হলেন।
তিনি কন্যার কাছে গিয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলেন।
তার রূপে রাজা মুগ্ধ। তিনি তাকে তার নারী হতে অনুরোধ করলেন।

কন্যা বলেন –রাজা, আমি তোমার স্ত্রী হবো, কেবল একটি নিবেদন। আমার কোন কাজে তুমি বাধা দেবে না, নিষেধও করবে না। যেদিন তুমি এর বিরোধীতা করবে, সেদিনই আমি তোমায় ত্যাগ করবো।
রাজা সকল শর্ত মেনে নিলেন। এভাবে শান্তনু ও গঙ্গার বিবাহ হল।
রাজা দিব্যরত্ন ভূষণে স্ত্রীকে সাজালেন। সর্বদা তাকে তুষিলেন। এভাবে মহাসুখে শান্তনু গঙ্গার সাথে অবস্থান করলেন।

ধিরে ধিরে অষ্টবসু শান্তনুর গৃহে পূর্ণশশীরূপে জন্ম নিতে লাগল। পুত্রের রূপ দেখে শান্তনু খুশি হলেন। নানা দান, যজ্ঞ করলেন।
এদিকে গঙ্গা পুত্র নিয়ে জলে ভাসিয়ে আসেন। দেখে শান্তনু কষ্ট পান। এভাবে এক এক করে পুত্র জন্মায় এবং গঙ্গা সকলকে ভাসিয়ে দেন। পূর্ব সত্যের ভয়ে রাজা গঙ্গাকে কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু প্রতি মুহুর্তে তিনি পুত্রশোকে জ্বলতে থাকেন। এভাবে সাত পুত্র জন্ম নেয় এবং গঙ্গায় ভেসে যায়। পুত্রশোকে শান্তনু গুমড়ে ওঠেন। শেষে আবার তার পুত্র জন্মায়। এই অষ্টম পুত্রকে নিয়ে গঙ্গা জলে নামেন।


ক্রুদ্ধ হয়ে শান্তনু গঙ্গাকে বলেন –কে তুমি মায়াবী! কোথা থেকে এলে! তোমার মত নিন্দিতা পৃথিবীতে দেখা যায় না, যে নিজ গর্ভের সন্তানকে নিজে হত্যা করে। কিভাবে তুমি নিজের সন্তানদের হত্যা করো, হে পাষানী!
এতো বলে নিজপুত্রকে কোলে তুলে নিলেন।

গঙ্গা বলেন –রাজা, পুত্র বাঞ্ছা করলে! তুমি আর আমায় চাও না। এই পুত্রটিকে তুমি যত্ন করে পালন করো। এবার আমি তোমায় নিজ পরিচয় দেবো।
আমি জাহ্নবী। তিনলোক আমায় পূজা করে। আমার গর্ভে যে পুত্রগুলি জন্মাল তারা সব অষ্টবসু। বশিষ্টের শাপে তারা কাতর হয়ে আমায় প্রার্থনা করেন। আমি তাদের অঙ্গীকারে সম্মত হই এবং সে কারণে তোমার স্ত্রী হই।

রাজা বলেন -পূর্বের কথা বলো। কি কারণে বসুদের বশিষ্ট শাপ দিলেন।
জলাধিপতি বরুণ

গঙ্গা বলেন –বরুণের পুত্র বশিষ্ট মুনি। হিমালয় পর্বতে তার তপোবন। নানা ফলফুলে তার বন শোভিত। দক্ষ-কন্যা সুরভি তার গৃহিনী। কামধেনু তাদের কন্যা।
বশিষ্ট মুনি
একদিন অষ্টবসুরা(ভব, ধ্রুব, সোম, বিষ্ণু, অনিল, অনল, প্রত্যুষ ও প্রভব-এরা দক্ষের কন্যা বসুর পুত্র)তাদের স্ত্রীদের সাথে সেই বনে উপস্থিত হলেন। তারা মুনির তপোবনে স্ত্রীদের সাথে ভ্রমণ করছিলেন।

প্রভব বা দিব্যবসুর স্ত্রী কামধেনুকে দেখে মুগ্ধ হলেন। স্বামীকে এই গাভীটি সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
কামধেনু

দিব্যবসু বলেন এটি মুনি বশিষ্টের গাভী। এর অনেক গুণ। এর একপলা দুধও যদি নরলোক পায় তবে তা পান করে দশ সহস্র বছর বাঁচা যায় এবং চির যৌবন প্রাপ্ত হয়।
স্বামীর কথায় স্ত্রী বলেন তার নরলোকে সখী উশীনর-কন্যা জিতবতীর জন্য তিনি কামধেনুর দুগ্ধ চান।

স্ত্রীর বশ হয়ে বসু গাভীটি নিয়ে নিজ গৃহে যান।

এ সময় বশিষ্ট আশ্রমে ফিরে এসে গাভী দেখতে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হন। অনেক খুঁজেও যখন পেলেন না, তখন চিন্তিত হয়ে ধ্যানে বসে জানতে পারেন অষ্টবসুর গৃহে তার গাভী হরণ করে নিয়ে গেছে।
ক্রোধে বশিষ্ট শাপ দেন তারা মনুষ্যলোকে জন্মাবেন। বসুরা এই শাপের কথা শুনে মুনিকে স্তব করতে থাকেন।

মুনি বলেন –আমার বাক্য খন্ডন হবে না। প্রতি বছর একজন করে মুক্তি পাবে। তবে যে গাভীটি চুরি করেছে সেই দিব্যবসু পৃথিবীতে থেকে যাবে। সে ধার্মিক, সর্বশাস্ত্রবিশারদ, পিতার প্রিয়কারী এবং স্ত্রীসম্ভোগত্যাগী হবে। পরে যদিও মুক্তি পাবে।

এরপর গঙ্গা বলেন -মুনির শাপে কাতর বসুরা আমাকে স্তব করল এবং প্রার্থনা করল জন্ম মাত্র যেন তাদের ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তবেই তারা মুক্তি পাবে। সে কারণেই আমার মর্তে তোমার স্ত্রী রূপে আগমন।

রাজা, এই পুত্র অবতার। তবে মায়ের বিহনে পুত্র দুঃখ পাবে তাই এই পুত্র আমার সাথে এখন যাবে। পুত্র সুশিক্ষিত ও যৌবনপ্রাপ্ত হলে আবার তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যাবো।
এত বলে গঙ্গা পুত্রকে নিয়ে অন্তর্ধান হলেন।
রাজা শান্তনু স্ত্রী ও পুত্র শোকে কাঁদতে কাঁদতে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।
..........................................

Wednesday, February 16, 2011

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৩৩

মহাভিষ রাজার প্রতি ব্রহ্মার অভিশাপ এবং শান্তনুর উৎপত্তিঃ
ব্রহ্মা

জন্মেজয় বলেন –মুনি খুব সংক্ষেপে সমস্ত বর্ণনা করলেন।
তিনি শুনে অবাক হলেন ত্রৈলোক্যপাবনী গঙ্গা বিষ্ণু অংশে যার জন্ম, তিনি শান্তনুর স্ত্রী হলেন কি রূপে!

মুনি বলেন –তবে শোন সকল কথা।

মহাভিষ নামে ইক্ষাকুবংশীয় এক রাজা ছিলেন। তিনি ইন্দ্রের সম্মতিতে সহস্রবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। দেবতা, ব্রাহ্মণ, দরিদ্র সকলকে তিনি তুষলেন। তার দানে পৃথিবী পূর্ণ হল।

যজ্ঞের পূণ্যফলে তিনি ব্রহ্মলোকে গেলেন। ব্রহ্মার সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তিনি সেখানে বহুকাল অবস্থান করলেন।

একদিন রাজা দেখেন ব্রহ্মা ধ্যানে বসে আছেন এবং মুনিরা তাকে ঘিরে আছেন। ব্রহ্মার সভায় দক্ষাদি, প্রজাপতি, ইন্দ্র সবাই আসেন। দেব-ঋষি-মুনিরা নিত্য সেবা করছেন।
সভা আলো করে মুনিরা বসে আছেন এবং ব্রহ্মা যেন সেখানের মহারাজ। সে স্থানে মহাভিষও ছিলেন।



এ সময় গঙ্গাদেবী সেখানে ব্রহ্মার কাছে সাক্ষাৎ করতে এলেন। হঠাৎ প্রচন্ড বায়ু বইতে শুরু করল। বাতাসে দেবী গঙ্গার বসন উড়ে গেল। তা দেখে সকলে মাথা নিচু করে নিলেন।

কিন্তু গঙ্গার অপূর্ব দেহসৌষ্টব দেখে মহারাজ মহাভিষ মুগ্ধ হলেন এবং নিশ্চল নয়নে তাকে দেখতে থাকলেন। মহাভিষ রাজাও অতি রূপবান ছিলেন, গঙ্গাদেবীও তাকে দেখতে লাগলেন।

দু’জনকে মহামতি প্রজাপতি অবলোকন করেন এবং বলেন –আমার লোকে এসে রাজা অনীতি করলেন।

ব্রহ্মলোকে এসে তুমি মনুষ্য আচরণ করায় পুনরায় মর্তে জন্ম গ্রহণ কর। পুনরায় নিজ পূণ্যবলে তুমি এখানে আসবে।

সোমবংশে জন্মগ্রহণের আজ্ঞা পেয়ে চিন্তিত মহাভিষ মর্তে পতিত হলেন এবং সোমবংশের রাজা প্রতীপের গৃহে জন্মগ্রহণ করলেন।

গঙ্গাও ব্রহ্মাকে প্রণাম করে ফিরলেন। পথে তার সাথে অষ্টবসুর দেখা হল। তারা বিরস বদনে ফিরছিলেন। গঙ্গা তাদের দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।

তারা জানালেন বশিষ্টের অভিশাপে তাদের পৃথিবীতে জন্মাতে হবে-এই ভেবে তারা দুঃখিত। তারা আনন্দিত হলেন গঙ্গাকে দেখে। কারণ গঙ্গাই পাপীদের উদ্ধার করেন। তারাও গঙ্গাকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করলেন। গঙ্গা আশ্বাস দিলেন তিনি তাদের জন্য যথাসাধ্য করবেন। তারাই বলুন তিনি কি করতে পারেন।

অষ্টবসুরা অনুরোধ করলেন গঙ্গা মনুষ্যলোকে রাজরাণী হয়ে যান এবং তাদের সবাইকে গর্ভে ধারণ করুন। আরেকটি নিবেদন, তাদের জন্মমাত্র যেন গঙ্গা তাদের ভাসিয়ে দেন।


বসুদের কথায় গঙ্গা সম্মত হলেন। বসুরাও আনন্দিত হলেন।

কুরুবংশের ধার্মীক মহাতেজা রাজা ছিলেন প্রতীপ। তার প্রথম সন্তান দেবাপি অল্পবয়সে সন্ন্যাসী হলে তিনি দুঃখীত হন এবং গঙ্গাজলে প্রবীণ বয়সে তপ, জপ, ব্রত ও বেদ অধ্যয়ন করতে থাকেন।


বৃদ্ধ বয়সেও রাজার মদনের মত রূপ। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে গঙ্গা জল থেকে উঠে এসে রাজার ডান কোলে বসলেন। গঙ্গার রূপেরও শেষ নেই। যেন দ্বিতীয় চন্দ্রের কিরণ। দেখে কৌরবকুমার বিস্মিত হলেন।

রাজা বলেন –কি তব ইচ্ছা কন্যা আমায় বল।

গঙ্গা বলেন –তুমি কুরু শ্রেষ্ঠ। তোমায় আমি ভজনা করছি তুমি আমার পতি হও। স্ত্রী হয়ে পুরুষে যে নারী ভজনা করে, পুরুষ না ভজনা করলে পাপকারী হয়।

রাজা বলেন –আমি পরের স্ত্রীকে ভজনা করতে পারি না। পরের স্ত্রীকে কামনা করলে নরকে যেতে হয়।

গঙ্গা বলেন –আমি পরের স্ত্রী নই। আমি দেবকন্যা। তুমি আমায় কামনা করো।

রাজা বলেন –কন্যা এমন বাক্য বোল না। দক্ষিণ উরুতে তুমি এসে বসেছ, যেখানে পুত্র, কন্যা আর পুত্রবধূর স্থান। তাই তুমি আমার পুত্রবধূ হবে। পুরুষের বাম উরু স্ত্রীর আসন। ডান উরুতে বসেছ তাই তুমি কন্যা স্থানীয়া।
তিনি অন্যায় কর্ম করতে পারবেন না।

গঙ্গা বলেন –মহারাজ তুমি ধর্ম অবতার। তোমার বচনে আমি সম্মত হলাম। তোমার পুত্রকেই আমি বরণ করবো।
তবে আমারও কিছু অনুরোধ আছে। আমার প্রিয় কাজে কেউ বাধা দেবে না।

তবেই তিনি তার পুত্রকে গ্রহণ করবেন, এই বলে গঙ্গা অন্তর্ধান হলেন।
কন্যার বচনে রাজা প্রীত হলেন এবং স্ত্রীকে নিয়ে ব্রতাচার শুরু করলেন। দশমাস দশদিন পর রাজীব লোচন, চন্দ্রের মত মুখ, শান্তশীল পুত্র জন্মাল। নাম রাখা হল শান্তনু। তার ছোট ভ্রাতা হলেন বাহ্লীক। দিনে দিনে দুই ভ্রাতা বড় হন।


শান্তনু যখন যুবক তখন প্রতীক তাকে রাজনীতি, ধর্ম শিক্ষা দিলেন।
এবং একদিন তাকে ডেকে বললেন –আমার কথায় বিস্মিত হয়ো না। একদিন এক কন্যা আমার কাছে এলে আমি তাকে পুত্রবধূ করার অঙ্গীকার করি। পরিচয়ে যানি তিনি দেবকন্যা। তিনি যদি পুনর্বার তোমার কাছে আসেন তাকে তুমি গ্রহণ করো। তাকে কখনো তার কর্মে বাধা দিও না।

পিতার বাক্যে পুত্র সম্মত হলেন। শান্তনুকে রাজ্য দিয়ে রাজা বনে গেলেন।
..........................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers