Blog Archive

Monday, December 23, 2013

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৪৯

পান্ডুরাজার মৃত্যুঃ 
 
সুখে পুত্রদের নিয়ে পান্ডুরাজা বসবাস করছিলেন। 

এসময় ঋতুরাজ বসন্ত উপস্থিত হলেন। বন বসন্তে শোভিত হল। নানা বৃক্ষ পুষ্পে শোভিত হল-পলাশ, চাঁপা, আম, অশোক, কেশব, পারিভদ্র, কেতকী, করবী প্রভৃতি। আনন্দিত মনে পান্ডু গহন নিকুঞ্জবনে ভ্রমণ করেন। 
কুন্তী পাঁচ পুত্র নিয়ে নিজ স্থানে থাকেন। 
রাজা মাদ্রীকে নিয়ে অরণ্যে প্রবেশ করলেন। 
মাদ্রী যে রাজার সাথে আছেন সে কথা কুন্তী জানতেন না। 

বসন্তকালে যুবতী স্ত্রীকে নিয়ে রাজা বিহারে এলেন - মদন মেতে উঠল। মদনের শরে রাজা অবশ হলেন। ঘন ঘন মাদ্রীর রূপ সৌন্দর্য দর্শণ করতে লাগলেন। 

 

বিকশিত পদ্মের মত মাদ্রীর সুচারু দেহ সৌষ্টব। পদ্মের মত টানা টানা সুন্দর চক্ষু যেন কর্ণকে স্পর্শ করে। ডালিম ফলের মত তার দুই স্তন। বিপুল নিতম্বের ভারে গমন তার মন্থর। সব সময় মধুর কথনে যেন সুধা বর্ষণ করেন। তাকে দেখে পান্ডুর রতিক্ষুধা জাগল। কামে অবশ রাজা মুনির কথা ভুলে গেলেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি রাজা হারালেন। মাদ্রীর সাথে শৃঙ্গার করতে চাইলেন।

মাদ্রী তাকে বাধা দিতে চাইলেন, অতি উচ্চ স্বরে হাহাকার করতে লাগলেন। রাজার আচরণের জন্য মাদ্রী তাকে ভৎসনা করতে থাকেন। মৃগরূপী ঋষির অভিশাপের কথা স্মরণ করালেন। 



কিন্তু কামরসে আচ্ছন্ন পান্ডু মাদ্রীর কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। 
কালের কথা কেউই খন্ডন করতে পারে না, পরম পন্ডিতের বুদ্ধিও কাল সংহার করেন। পান্ডুও সকল কথা বিস্মৃত হলেন। পত্নীর নিষেধ অগ্রাহ্য করে সংযম হারিয়ে তাঁকে সবলে গ্রহণ করলেন। 

ঋষিশাপে মৃত্যু সেথায় উপস্থিত হলেন। পান্ডুরাজাকে শরীর ত্যাগ করতে দেখে মাদ্রী সুন্দরী হাহাকার করে উঠলেন।

এদিকে মাদ্রীসহ পান্ডুকে না দেখতে পেয়ে কুন্তী মনে মনে আতঙ্কিত হলেন। অনেক বেলা হয়ে গেল তবু তারা ফিরছেন না দেখে কুন্তী পুত্রদের নিয়ে তাদের খুঁজতে বেরলেন। 

অনেক দুর যেতে হঠাৎ মাদ্রীর কান্না ও হাহাকার শুনতে পেলেন। দ্রুত সেথায় গিয়ে দেখেন মাদ্রী কাঁদছেন এবং তার কোলে পান্ডু পরে আছেন। হঠাৎ যেন মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ল। কুন্তী জ্ঞান হারালেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি কেঁদে মাদ্রীকে বললেন- কি কাজ করলে মাদ্রী, নিজ দোষে স্বামী হত্যা করলে। চিরকাল এ কারণে তিনি কষ্ট পাবে। 

মাদ্রী কেন একা রাজার সাথে এলেন, কেন তাকে নিবৃত্ত করলেন না, কেন পুত্রদের আনলেন না-তা হলে রাজার মৃত্যু হত না। মদনে মেতে মাদ্রী স্বামীকে হারালেন। মৃগঋষির শাপ ভুলে একা স্বামীর সাথে বনে এসেছেন। কুন্তী রাজাকে সর্বদা সাবধানে রক্ষা করতেন। আজ বিজনস্থানে মাদ্রী রাজাকে লোভিত করলেন। মাদ্রী নিজের সাথে কুন্তীরও পরম সর্বনাশ করলেন। 

মাদ্রী বলেন- দেবী আমি বার বার তাকে বারণ করেছি। তুমি মিথ্যাই আমার নিন্দা করছ। দৈবের লিখন কারো খন্ডাবার সাধ্য নেই, তাই রাজা আমার কথা শুনলেন না এবং মৃত্যু বরণ করলেন। 

কুন্তী বলেন ভাগ্যকে খন্ডন করা যায় না যখন তখন তিনি যা বলেন মাদ্রী তাই শুনুক। মাদ্রী তার থেকে ভাগ্যবতী, কারণ তিনি রাজাকে হৃষ্ট দেখেছেন। তিনি জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী, সে কারণে তিনি সহমৃতা হবেন এবং মাদ্রী পাঁচপুত্রকে পালন করবেন।

মাদ্রী বলেন তিনি রাজাকে না দেখতে পেলে বাঁচবেন না। কুন্তীর সাথে দেখা করার জন্যই তিনি প্রাণত্যাগ করেন নি। তাঁর যৌবনে রাজা এখনও তৃপ্ত হন নি, তার সাথে রমণকালে রাজার মৃত্যু হল, তাই রাজাকে তিনি ত্যাগ করতে পারবেন না। এছাড়া তিনিও রাজার থেকে তৃপ্ত হননি, অতএব তিনিই পতিকে অনুসরণ করবেন।
তার একমাত্র নিবেদন কুন্তী যেন তার দুই সন্তানকেও নিজের সন্তানের মত পালন করেন, কোন ভেদ না রাখেন। পিতা-মাতা বিনা সন্তান অনাথ। কুন্তীই আজ থেকে তাদের পিতা-মাতা-বন্ধু। এই বলে মাদ্রী কুন্তীর কাছে বিদায়ের আজ্ঞা নিয়ে রাজার শবকে নিবিড় ভাবে আলিঙ্গন করে প্রাণত্যাগ করলেন।
 
......................................

Wednesday, November 13, 2013

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৪৮

নকুল ও সহদেবের জন্মঃ 

 

একদিন পান্ডুকে একান্তে দেখে মাদ্রী তার কাছে গিয়ে বললেন – কুরুবংশে সম্প্রতি তিনজন বধূ। ইতিমধ্যে দুজন পুত্রবতী হয়েছেন। শোনা যাচ্ছে গান্ধারীর একশত পুত্র হয়েছে। নিজ চক্ষে দেখছি কুন্তী তিনপুত্রের জননী। আমিই অভাগী তাই এই সুখ থেকে বঞ্চিত হলাম। পান্ডু যদি কুন্তীকে বলেন, তিনি অনুগ্রহ করলে তিনিও মা হতে পারেন। সতীন কুন্তীকে তিনি নিজে ভয়ে বলতে পারেন না, কিন্তু স্বামীর বাক্য কুন্তী অন্যথা করতে পারবেন না। 

মাদ্রীর কথা শুনে পান্ডু বলেন তারও এই কথাই মনে এসেছিল, কিন্তু মাদ্রী কি মনে করেন তাই বলতে পারেন নি। মাদ্রী তার ধর্মপত্নী, তিনি সম্মত থাকলে পান্ডু অবশ্যই কুন্তীকে জানাবেন।

পান্ডু কুন্তীর কাছে গিয়ে একান্তে বলেন-কুলের কল্যাণে ইন্দ্রত্ব পেয়েও ইন্দ্র নিত্য যজ্ঞ করেন। যশের কারণে ও শাস্ত্রানুসারে বেদে-তপে শ্রেষ্ঠ হন ব্রাহ্মণ। তবুও তারা গুরুর সেবা করেন। 

পান্ডু কুন্তীকে বোঝান কুন্তীই মাদ্রীকে উদ্ধার করতে পারেন। মাদ্রীর বংশ রক্ষা পেলে তারও পুত্রকামনা পূর্ণ হয়। 

এত শুনে কুন্তী পান্ডুকে বলেন তার আজ্ঞায় কুন্তী মাদ্রীকে একবার মাত্র মন্ত্রদান করবেন। 

 

মাদ্রীকে ডেকে কুন্তী তার মনের কথা জানান।

মাদ্রি চিন্তা করে দেখেন একবার মন্ত্র পেয়ে অধিক সন্তান তিনি কি ভাবে পেতে পারেন! অনেক ভেবে দেখেন দেবতাদের মধ্যে অশ্বিনীকুমাররা যমজ। তাই তিনি অশ্বিনীকুমার যুগলকে স্মরণ করলেন। মন্ত্রের প্রভাবে তারা মাদ্রীর কাছে এলেন। এভাবে মাদ্রী যমজ সন্তানের মা হলেন। সন্তানদের জন্মের পর আকাশবানী হল- রূপেগুণে তারা শোভা বর্ধন করবেন। 


এভাবে পান্ডুর পাঁচটি পুত্র হল। পর্বতবাসী ঋষিরা এসে তাদের নামকরণ করলেন। জ্যেষ্ঠ হওয়ায় নাম হল ‘যুধিষ্ঠির’।

ভয়ঙ্কর মূর্তির জন্য নাম হল বীর পুত্রের ‘ভীম’।

তৃতীয়জনের নাম রাখা হল ‘অর্জুন’।


মাদ্রীর পুত্রদের নাম হল যথাক্রমে ‘নকুল’ ও ‘সহদেব’। 
 

এভাবে পাঁচপুত্র সিংহের মত বিক্রমের সাথে পর্বতে বাড়তে লাগলেন। শতশৃঙ্গ পর্বত তাদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পান্ডু পঞ্চপুত্রদের দেখে আনন্দিত হন। কুন্তি-মাদ্রীও খুশি হন। তারা তিনজন পঞ্চপুত্রদের ক্ষণের জন্যেও চোখের আড়াল করেননা।

এভাবে পাঁচপুত্রকে তারা যখন পালন করছেন, তখন একদিন পান্ডু কুন্তীকে বললেন –সন্তান সুখের তুল্য সুখ সংসারে আর নেই। সকল সুখ ম্রীয়মান হয় সন্তানসুখ বিনা। রাজ্যবন্ত, ধনবন্ত, বিদ্যাবন্ত জন সন্তান বিনা অকারণ হয়ে পরেন। সন্তানসুখ ইহকালে সুখদায়ী, লোকের মাঝে গৌরবদায়ী এবং পরকালে নিস্তারক, পরমপাপীদেরও উদ্ধারক। 

ধৃতরাষ্ট্র পরম ভাগ্যবান, শোনা যাচ্ছে তার শতপুত্র হয়েছে। সে কারণে পান্ডু কুন্তীকে অনুরোধ করছেন তিনি পুনরায় মাদ্রীকে আর একবার মন্ত্র দিন, আবার পান্ডু সন্তানসুখ পান। 

শুনে কুন্তী জোড়হাতে বলেন, এরূপ আজ্ঞা রাজা যেন না করেন। কারণ, মাদ্রী পরম কপটী। একবার মন্ত্র পেয়ে সে যমজ সন্তান কামনা করেছে। 
মাদ্রীর কারণে কুন্তি ভয় পান। তিনি রাজাকে কৃতাঞ্জলি নিবেদন করেন- মাদ্রীর কারণে তাকে যেন আর কিছু অনুরোধ না করেন। 

কুন্তীর কথা শুনে পান্ডু চুপ করে গেলেন এবং মনে মনে সন্তানবাঞ্ছা ত্যাগ করলেন।

পান্ডবের জন্মকথা অপূর্ব কথন, যারা শুনবে তারাই স্ববাঞ্ছিত ফল পাবে। ব্যাসদেবের বাক্যে কোন সংশয় নেই, সে কথাই পাঁচালী আকারে কাশীরামদাস বলেছেন।

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers