Blog Archive

Monday, February 3, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৫১



ভীমের বিষপানঃ 

মুনি বলেন, অন্তপুরে কুন্তীদেবী পঞ্চপান্ডবদের নিয়ে বাস করলেন। 
কৌরব–পান্ডব মিলে পঞ্চোত্তর শত ভাই। তারা বেদ-শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। বালকদের যত ক্রীড়া সংসারে আছে সব তারা মহানন্দে খেলেন। 
ক্রীড়ারসে শ্রেষ্ঠ হন এই পঞ্চ সহোদর। তাদের মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠ হলেন বৃকোদর ভীম। মহাবলবন্ত ভীম যেন যম। তার মত শক্তিশালী আর কোন ভাই নয়। পবনের মত দৌড়ায়, সিংহের মত হাঁক ছাড়ে, হাতির মত আস্ফালন করে, মেঘের মত ডাকে। যে দিক দিয়ে ভীম বেগে ধায় দশ-বিশ জন তার ভুজাস্ফালনে মাটিতে গড়াগড়ি যায়। ক্রোধে সবাই তাকে একসাথে চেপে ধরে। অবহেলায় বৃকোদর শরীর ঝাঁকায়। ফলে কিছু মাটিতে পড়ে অচেতন হয়ে পরে, কিছুর পিঠে, গায়ে, নাকে রক্ত ঝরে। ভীম দু’হাতে সবাইকে ধরে চক্রাকারে ঘোরায় আর বালকরা পরিত্রাহি চিৎকার করে প্রাণের ভয়ে। মৃতকল্প প্রায় হলে ভীম তাকে ছারে। 
জলের মধ্যে বালকরা খেললে ভীম একবারে দশজনকে ধরে জলের ভিতর ডুবে দুই কোলে চেপে ধরে, দুর্বল করে তবেই ছাড়ে। এসব কারণে কেউ ভীমের কাছে যায় না। ভীমকে জলে দেখলে সবাই তীরে অবস্থান করে। 

ফলের সন্ধানে সবাই গাছে উঠলে, ভীম নিচে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে গাছে আঘাত করে। তার চরণের ঘায়ে বৃক্ষ থরথর্‌ করে কাঁপে, ফলের সাথে ভাইরাও টুপ্‌টাপ্‌ ঝরে পরে। এভাবে দেখা যায় বালককালেই ভীম মহাপরাক্রম। তার কাছে তাই কোন বালক যায় না, তাকে যম সম ভয় পায়। ভীমের মনে কোনও হিংসে ছিল না, তবু সে বালকসুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কৌরবদের অপ্রিয় হল। 


দুর্যোধন এসব দেখে খুব চিন্তিত হল। বালক বয়সেই ভীম এত পরাক্রমী, বয়স বারলে এ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ভীম তার জন্য মঙ্গলময় নয়-এসব ভেবে দুর্যোধন বিচার করতে বসলো মুক্তির উপায়। ভীমকে মারতে পারলেই সব তার হাতে। বাকি চার ভাইকে বন্ধি করে রাখলেই হবে। তবেই সে নিষ্কন্টক হয়ে রাজ্য শাসন করতে পারবে। যে বয়সে মানুষ হিংসা অহঙ্কার বোঝে না, সে কালেই দুর্যোধন এসব চিন্তা করতে থাকে।

বিচার বিবেচনা করে দুর্যোধন অনুচরদের ডেকে গঙ্গাতীরে প্রমাণকোটি-যেখানে গহনকানন সেই বিচিত্রস্থলে উদকক্রীড়ন নামে এক আবাস নির্মাণের নির্দেশ দেয়। সুন্দর ঘর স্থানে স্থানে নির্মাণ করে তাতে চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় রথে পুরে সকল গৃহের মধ্যে পূর্ণ করতে নির্দেশ দেয়। আজ্ঞামাত্র অনুচররা নির্দেশ পালন করে। তারপর দুর্যোধন সকল ভ্রাতাদের ডেকে বলে আজ গঙ্গাজলে সবাই চল জলক্রীড়া করতে যাই। খাদ্য বস্তুরও অভাব নেই, সবই মজুত। শুনে যুধিষ্ঠিরও রাজি হয়। এভাবে পঞ্চোত্তর শতভাই একত্র হয়ে রথ, গজ, অশ্বযানে আরোহন করে। প্রমাণকোটিতে দুর্যোধন সকলকে নিয়ে চললো। অতি মনোহর বিচিত্র কানন –প্রমাণকোটি। সকলে সেখানে আহারে বসলো। নানান খাদ্যসামগ্রী দেখে বালকরা আনন্দিত হলো। একে অপরকে আনন্দে খাওয়াতে লাগলো। 
এসময় ক্রূর দুর্যোধন দুষ্ট কালকূট বিষ খাবারের সাথে মিশিয়ে ভীমকে খাইয়ে দিল। কেউ কিছু বুঝতে পারলো না। দুর্যোধন অতি আনন্দিত হল। ভীম মহানন্দে অনেক আহার করলো। খাওয়ার পর সবাই আনন্দে জলক্রীড়া করতে নামলো। গঙ্গায় নেমে সবাই আনন্দে একে অপরকে জলে ফেলতে থাকে। 
এদিকে জলের ভিতর ভীম ক্রমে হীনবল হয়ে পরে। ক্রীড়ায় শ্রান্ত বালকদল পুনরায় প্রমাণকোটিতে ফিরে আসে। দিব্যবস্ত্র, অলঙ্কারাদি পরিধান করে, আহার গ্রহণ করে সকলে রত্নময় পালঙ্কে শয়ন করল। 

এদিকে বিষে জারিত ভীম অচেতন হয়ে পরল। সবাই নিদ্রা গেলেও দুর্যোধন জেগেছিল। অচেতন ভীমকে দুর্যোধন দ্রুত বেঁধে ফেললো। হাত-পা বেঁধে তাকে গঙ্গায় ফেলে দিল। 
.....................................

Saturday, January 4, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৫০

হস্তিনাপুরে পঞ্চপান্ডবঃ

রাজা পান্ডু ও রানী মাদ্রীর প্রাণত্যাগের কথা শুনে শতশৃঙ্গবাসীরা সকলে সে স্থানে এলেন। 
ঋষিরা মিলে বিচার করে দেখলেন পান্ডু তাঁর পুত্রদের সাথে আশ্রমে বাস করতেন, কিন্তু এখন রাজা প্রাণত্যাগ করায় কুন্তীসহ পাঁচপুত্র অনাথ। এ অবস্থায় তাদের অরণ্যে রাখা শোভন নয়। বিচার করে তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করাই উচিত ঠিক হল। মৃতদেহ চারজন বহন করল। ঋষিরা কুন্তী ও পাঁচপুত্রকে নিয়ে হস্তিনানগরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। 

নগরে প্রবেশ করতেই রাজ অন্তপুরে সকল সংবাদ গেল। ভীষ্ম, সোমদত্ত, বাহ্লীক বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র সকলে সভায় বসলেন। সত্যবতীসহ বধূ গান্ধারী এবং অন্যান্য পুরনারীরাও অন্তপুরে আলোচনায় বসলেন। ঋষিদের শ্রদ্ধার সঙ্গে আসন দেওয়া হল। তারা শতশৃঙ্গপর্বতে পান্ডুর ব্রহ্মচর্য্য পালনের কাহিনী শোনালেন। দেবতার বরে তার পাঁচপুত্রের জন্ম, কালের পরিহাসে তাঁর মৃত্যু উপস্থিত হল- সব শোনালেন। মদ্র কন্যা অতি ধন্য তাই তিনি সহমৃতা হলেন। 
এসময় যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোল, ভীমের পনের, অর্জুনের চোদ্দ এবং নকুল-সহদেবের তের। এখন পান্ডু ও মাদ্রী বিনা কুন্তী ও পাঁচটি নাবালক সন্তান অসহায়। তাদের ঋষিরা স্বস্থানে রেখে নিজ দেশে গমন করলেন।

 

সকল কাহিনী শ্রবণ করে সকলে হাহাকার করে উঠলেন। সত্যবতী, ভীষ্ম, বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র সকলে পান্ডুর মৃত্যুতে রোদন করতে লাগলেন। নগরের লোক বিলাপ করে ক্রন্দন করে, বাল-বৃদ্ধ-তরুনী সকলে শোক করে। ক্রন্দনের শব্দ যেন গগনভেদ করে। হস্তিনানগরে মহাকোলাহল সৃষ্টি হয়। ধৃতরাষ্ট্র শেষে বিদুরকে ডেকে গঙ্গাতীরে দুই শব দগ্ধ করার নির্দেশ দেন। চতুর্দোলায় বিভিন্ন উপাচারে সাজিয়ে ক্ষত্রিয়রা শব নিয়ে চলেন। শবের উপর ছাতা ধরা হল, চামর দোলান হল। অগুরু চন্দনকাঠ, কলসি কলসি ঘি থরে থরে আনা হল। ব্রাহ্মণদের মন্ত্রের সাথে সাথে অগ্নি জ্বলে উঠল। পাঁচপুত্র ক্ষত্রিয় বিধানানুসারে পিন্ডদান করল। ত্রয়োদশ দিবসে অগ্নি-শান্তি দান হল। স্বর্ণ, ভূমি এবং গরু দান করা হল। কাঞ্চন রত্ন ও বিধি অনুসারে দান করা হল। 


.......................................
সত্যবতীর প্রাণত্যাগঃ

কিছুকাল পর একদিন বেদব্যাস মুনি হস্তিনানগরে এলেন। একান্তে মার পাশে বসে মুনি জননী সত্যবতীকে বললেন, মা কর্মকাল গেল, এবার পাপ উপস্থিত হবে। তোমার বংশে বড় দুরাচার হবে। সবাই কপট হবে হিংসা-অহঙ্কারে। এদের পাপের ফল সবাই ভোগ করবে। পৃথিবী শস্য হারাবে, মেঘে অল্প জল হবে। জ্ঞানীদের ধর্ম লুপ্ত হবে। নিজের লোকেদেরই সবাই হিংসা করবে। ধৃতরাষ্ট্রের কাপট্যে কুলক্ষয় হবে। ধর্মকে ত্যাগ করে সকলে অধর্মকে আশ্রয় করবে। 

সে কারণে মুনি মাতাকে বলেন কুলক্ষণ এবং কুলক্ষয় নিজের চোখে না দেখে মাতা তার সাথে সংসার ত্যাগ করে তপোবনে তপস্যা করতে চলুন। এত বলে ব্যাসমুনি অন্তর্দ্ধান হলেন। 
 

পুত্রের বচন শুনে সত্যবতী চিন্তিত হলেন। দুই বধূ অম্বিকা ও অম্বালিকাকে ডেকে মুনি যা বলেছেন সব জানালেন। তিনি অম্বিকাকে বলেন তোমার পুত্র দুর্নীতি করবে, কপট হবে এবং দুষ্কর্মে নিযুক্ত হবে। তার জন্য কুলক্ষয় হবে। সে কারণে সত্যবতী তপোবনে চলে যাচ্ছেন। 

বধূরাও সব শুনে মাতার সাথে যাওয়া সঠিক বিবেচনা করলেন। 
ভীষ্মকে ডেকে সত্যবতী সব কিছু জানালেন। অন্তঃপুরে যত বৃদ্ধানারীরা ছিলেন সকলে সত্যবতীর সঙ্গে তপোবনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। 
তপোবনে ফলমূল আহার করে সত্যবতী তপস্যায় নিযুক্ত হলেন এবং যোগবলে সবাই প্রাণত্যাগ করলেন।
.....................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers