Blog Archive

Sunday, September 7, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৬৪

পান্ডবগনের একচক্রা নগরে বাস: 

একচক্রা নগরে ব্রাহ্মণের গৃহে মাকে নিয়ে পান্ডবরা অজ্ঞাতবাসে রইলেন। নগরে সারাদিন ভিক্ষে করে রাতে ঘরে আনতেন। কুন্তী তাই রান্না করে অর্ধেক ভীমকে খেতে দিয়ে বাকি পাঁচজনে ভাগ করে খেতেন। যদিও তাতেও ভীমের তৃপ্তি হত না। এভাবে বহু কষ্টে তারা সেখানে বাস করতে লাগলেন। 

একদিন ভীম ঘরে রয়ে গেলেন, বাকি চারভাই ভিক্ষা করতে বেরলেন। হঠাৎ ব্রাহ্মণের গৃহে বিকট শব্দ হল ও ব্রাহ্মণ-বাহ্মণী বিলাপ করতে লাগল। 
কুন্তীদেবী তাদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ভীমকে ডাকলেন। বললেন - এতদিন এই গরিব ব্রাহ্মণের আশ্রয়ে গোপনে বাস করছি। আজ এনার ঘোর বিপদ, অবশ্যই একে রক্ষা করতে হবে। উপকারী জনের যে সাহায্য না করে তার সংসারে অপযশ হয়, পরলোকেও পাপ হয়। 

ভীম বলেন – মা! ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস কর কি তার কষ্ট, সাধ্য অনুসারে তাকে রক্ষা করব। 

ভীমের আশ্বাস পেয়ে কুন্তী ব্যগ্র ভাবে ব্রাহ্মণের কাছে ছুটে গেলেন। 
তিনি গিয়ে দেখেন বিলাপ করে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীকে বলছে- এই জন্যই তোমায় আগেই বলেছিলাম যে দেশে রাক্ষসের উপদ্রপ সেখানে বাস করে কাজ নেই। পিতামাতার স্নেহে সে কথা তুমি শুনলে না। এখন উচিত শিক্ষা পাও! কি করব ভেবে পাচ্ছি না। কোন বুদ্ধি বার করে এর প্রতীকার কর। তুমি আমার গৃহিনী ও ধর্মপত্নী। তুমিই আমায় সব সুখ ও শান্তি দিয়েছ। তোমার ধর্ম জ্ঞানে আমার বিশ্বাস আছে। আমার বালক পুত্রের জননী তুমি, তোমাকে ছেড়া সে বাঁচবে না। তোমাকে হারালে আমি দুঃখের অরণ্যে নিজেকে হারাব। নিজেকে বাঁচিয়ে তোমাকে যদি রাক্ষসের হাতে দিই তবে সংসারে আমার অপযশ হবে। অপূর্ব সুন্দরী কন্যাকে রাক্ষসের হাতে দিলে কুযশ কাহিনী রটবে। কন্যার জন্ম হলে পিতা আশা করে তাকে সুপাত্রে দান করে স্বর্গ বাস করবে। সেই কন্যাকে রাক্ষসের হাতে দিলে নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারব না। আমি নিজেই রাক্ষসের কাছে চললাম। 
এত বলে ব্রাহ্মণ কাঁদতে কাঁদতে চললেন। 



ব্রাহ্মণী তার পথ আগলে বলেন – তোমরা সুখে বাস কর, আমি রাক্ষসের কাছে যাব। তুমি গেলে পুর পরিবার না খেতে পেয়ে মরব। আমি সহমৃতা হব। পুত্রকন্যা না খেতে পেয়ে মরবে। আমি বাঁচলেও আমি কি ভাবে তাদের পালন করব। তোমাকে ছাড়া আমরা তিনজনেই অনাথ হব। অনাথের বহু কষ্ট। দরিদ্র দেখে অকুলীনজন কন্যাকে চাইবে। পুত্র ভিক্ষারী হবে কিছুদিনেই। কুলধর্ম বেদের বিমুখ হবে। দুর্বল অনাথ দেখে বলবান কামুক দুর্মুখ লোক আমাকে কামনা করবে। তোমাকে ছাড়া আমাদের পদে পদে বহু বিপদ হবে। সে জন্যেই তোমাকে যেতে বারণ করছি। অনেক স্নেহে ভালবাসায় এ সংসার তুমি গড়ে তুলেছ। পুত্রকন্যাও তোমার মত সুন্দর হয়েছে। কন্যাকে সুপাত্রে দান করো। পুত্রকে পড়িও। তুমিও আবার বিবাহ করো। আমি গেলেও আবার তোমার সংসার হবে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া পুর পরিবার নষ্ট হবে। নারীর পরম ধর্ম স্বামীর সেবা করা, বিপদে নিজেকে দান করে স্বামীকে রক্ষা করা, তাতেই সে ইহলোকে যশ পায়, স্বর্গে অক্ষয় হয়। তপ, জপ, যজ্ঞ, ব্রত, নানা প্রকার দানের সমান ফল স্বামীর সেবায় লাভ করা যায়। শাস্ত্রে ও সকল ধর্মে একথাই বলা আছে। তাই রাক্ষসের কাছে আমিই যাব। 

স্ত্রীর কথা শুনে তাকে জড়িয়ে ব্রাহ্মণ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। ব্রাহ্মণীও কাঁদতে লাগল। মা-বাবার অবস্থা দেখে পুত্র-কন্যাও কাঁদতে শুরু করল। 

কন্যা বলে- মা কেঁদো না, তুমি রাক্ষসের কাছে গেলে মা হারা বালকের মৃত্যু হবে, পিন্ডদানের কেউ থাকবে না, কুল বিনষ্ট হবে, তাই মার যাওয়া হবে না। কন্যার জন্ম হলে তাকে ত্যাগ করতেই হবে। বিধির সৃজন কেউ খন্ডন করতে পারবে না। পিতা তুমি আমায় অন্য কাউকেতো দান করতেই, এখন রাক্ষসের হাতেই আমায় দান কর। তোমরা রক্ষা পাবে। আমার মত আরো কন্যা তোমাদের হবে। তাই আমাকেই ত্যাগ কর। পরে আমার পুত্রও আমাকে হয়ত তাড়াবে। এখন আমিই নিশ্চিন্তে যাই। 
কন্যার কথা শুনে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী আরো কাঁদতে লাগলো। 

এত কথা শুনে ছোট্ট ছেলেটি সবার মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে বারণ করল। এক হাতে একটি তৃণ নিয়ে শিশুটি বলে উঠল – তোমরা কেউ রাক্ষসকে ভয় পেও না। এই তৃণ দিয়ে তাকে আমি মারব। তোমরা আমায় রাক্ষস কোথায় দেখিয়ে দাও। 

বালকের কথা শুনে তিনজনে কান্না ভুলে হাসতে লাগল। 
তাদের হাসতে দেখে কুন্তীদেবী এগিয়ে এসে সকাতরে বলেন – কি কারণে তোমরা কাঁদছো? কি ভাবে আমি তা মোচন করতে পারি বল। 
 

ব্রাহ্মণ বলে – মানুষের সাধ্য নেই এ দুঃখ মোচন করার। এই নগরে দুরন্ত বক রাক্ষস বাস করে। সেই এ রাজ্যের প্রভূ, ঈশ্বর। যক্ষ-রক্ষ-ভূত-প্রেত সকলে তাকে ভয় পায়। তার শক্তির কাছে সবাই হেরে গেছে। সে ঠিক করেছে নগরে যত মানুষ আছে একজন করে প্রতিদিন পায়েস-পিঠে-অন্ন রান্না করে রথে ভর্তি করে তার সামনে আনবে সঙ্গে দুটি মহিষও দিতে হবে। সকলকেই সে ভক্ষণ করবে। আজ আমার দায়িত্ব তার কাছে যাওয়ার, যে যেতে অস্বীকার করবে তাকে তার পরিবারের সবার সঙ্গে মেরে খাবে। আজ আমি কাকে পাঠাব। আমার স্ত্রী-পরিবারসহ চারজন। কাকে বলি দেব ভেবে পাচ্ছি না। মানুষ কিনে যে তার কাছে পাঠাব সে সম্পদও আমার নেই। পরিবারের কাউকেই ছারতে মনও চায় না। ঠিক করেছি সবাই মিলেই তার কাছে যাব। যা কপালে আছে দেখা যাবে। 

তার কথা শুনে কুন্তী বলেন – ভয় পেও না। তোমাদের কাউকেই যেতে হবে না। আমার পাঁচপুত্র আছে, তোমার জন্য আমি একটি পুত্রকে দান করব। 

ব্রাহ্মণ বলেন – অদ্ভূত কথা বললেন, দেবী! আপনারা আমার অতিথি। নিজের স্বার্থে অতিথিদের প্রাণ নেব! এমন পাপ কর্ম করতে পারব না। প্রাণ দিয়ে অতিথিকে রক্ষা করতে হয়। ব্রাহ্মণ হত্যা করে কুলের কলঙ্ক হতে চাই না। 
কুন্তী বলেন – আমিও এসব কথা জানি। 
ব্রাহ্মণ বলে- আমায় আর ও কথা বলবেন না। 
কুন্তী বলেন- শুনুন ব্রাহ্মণ আমার পুত্ররা মহা বলধর। তাদের রাক্ষস বধ করতে পারবে না। তারা বিদ্যান, বুদ্ধিমান। তারাই কৌশলে রাক্ষস বধ করবে। 

কুন্তীর কথায় ব্রাহ্মণ অবাক হল এবং আশার আলো দেখল। কুন্তী ব্রাহ্মণকে নিয়ে ভীমের কাছে এলেন। ভীম সব শুনে যেতে রাজি হলেন। ব্রাহ্মণ আনন্দ মনে ঘরে ফিরল। 
......................................

Sunday, August 31, 2014

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৬৩

হিড়িম্ব–রাক্ষস বধঃ 
 

ভীম ও হিড়ম্বা যখন কথোপকথন করছিলেন হিড়ম্ব তাদের দুর থেকে নিরীক্ষণ করল। হিড়িম্বা ভুবনমোহন রূপে বিদ্যু ঝলকে ভীমের বামদিক আলো করে বসে আলাপ করছে। খোপায় তার ফুলের মালা, গলায় মুক্তা-মানিক-প্রবালের মালা দুলছে। পায়ে নূপুর কঙ্কণ, বসন ভূষণ সজ্জায় যেন স্বর্গের বিদ্যাধরী, যৌবনের মোহে নবীন, কথায় প্রিয় সম্ভাষণ দেখে মনে হয় দম্পতী যুগল যেন কথা কয়। 
দেখে হিড়িম্ব ক্রোধে জ্বলতে লাগল। ভগিনীকে ডেকে সে বলে -এই জন্য তোর এত দেরি হচ্ছে! কুলের কলঙ্কিনী তুই, তোর জীবনকে ধিক্কার। হে পাপিনী তুই এক মানুষকে স্বামীরূপে লোভ করছিস! আমার ক্রোধ তুই ভুলে গেলি! আমার আহারে ব্যাঘাত ঘটালি! সেই কারণে আগে তোকে মারব তারপর এদের মেরে আহার করব। এত বলে চোখ লাল করে, দাঁত কড়কড় করতে করতে সে হিড়িম্বাকে মারতে গেল। 
ভীম তা দেখে বলে – রাক্ষস তোর লজ্জা করল না, বোনকে অচেনা পুরুষদের স্থানে পাঠালি। তুই পাঠালি তাই সে এলো ও মদনের শরে আক্রান্ত হয়ে আমাকে কামনা করল। আমার সামনে তুই আমার কামপত্নী, নিজের বোনকে যা খুশি বললি, আবার অহঙ্কার করে মারতে আসছিস! এখনি তোকে যমের দ্বারে পাঠাব। 
বেশি গর্জন করলে মা-ভাইদের ঘুম ভেঙ্গে যাবে ভেবে ভীম রাক্ষসকে দুরে টেনে নিয়ে গেল। 
ভীমের কথা শুনে হিড়িম্ব দুহাত বাড়িয়ে তাকে মারতে এগিয়ে এলো। হেসে কুন্তীপুত্র তাকে একটানে নিজের দিকে টেনে নিলেন। এভাবে রাক্ষস ও ভীমের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হল। ভীম এই যুদ্ধে পরম আনন্দ পাচ্ছিলেন। দেখে মনে হল দুটি হাতি পরস্পরকে শুঁড়ে টেনে মাটিতে ফেলছে। দুই মোষ যেন মাথা ঠুকেঠুকে যুদ্ধ করছে। দুই মত্ত সিংহ যেন দাঁত কড়মড় করে ঘনঘন নিশ্বাস সিংহনাদ দিচ্ছে। মেঘেরা যেন আহ্লাদে গর্জন শুরু করেছে। তাদের আস্ফালনে বৃক্ষ ভেঙ্গে পড়তে লাগল। বন্যপ্রাণীরা পালাতে লাগল। সম্পূর্ণ বন তাদের গর্জনে কাঁপতে লাগল। 
কুন্তী ও চারভাই শব্দে জেগে উঠলেন। কুন্তী পাশে সুন্দরী চিন্তিতা হিড়িম্বাকে বসে থাকতে দেখে অবাক হলেন। আশ্চর্য হয়ে দ্রুত উঠে বসে তিনি হিড়িম্বাকে জিজ্ঞেস করলেন –কে তুমি অপ্সরা, নাগিনী না বনের দেবী! কোথা থেকে এলে! 

হিড়িম্বা কুন্তীকে প্রণাম করে বলে – জাতে আমি রাক্ষসী। এ বনেই আমার বাস। আমার ভাই হিড়িম্ব মহাযোদ্ধা বীর রাক্ষস। আপনাকে ও পাঁচভাইকে ধরে আনার জন্য আমাকে পাঠায়। কিন্তু আপনার পরম সুন্দর পুত্র ভীমকে দেখে আমি তাকে স্বামীরূপে কামনা করি। দেরি দেখে ভাই এখানে চলে আসে এবং আপনার ছেলের সাথে এখন তার যুদ্ধ হচ্ছে। 
হিড়িম্বার মুখে সব শুনে চারভাই যুদ্ধস্থানে উপস্থিত হলেন। ভীম-হিড়িম্বের বর্ণনাতিত সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ হতে দেখলেন। তাদের যুগল পর্বতের মত লাগল। দুজনেই ধুলোয় ধূসর। কুয়াসায় যেন পর্বত আচ্ছাদিত। দুজনেই দুজনকে টানছে। তাদের নিশ্বাস ঝড়ে বৃক্ষ উড়ে গেল। 
সব দেখে যুধিষ্ঠির চেঁচিয়ে বললেন- ভাই রাক্ষসকে ভয় পেয় না। আমরা ঘুমাচ্ছিলাম তাই তোমাদের ঝগড়ার কথা কিছু জানতে পারিনি। এখনি সব ভাই মিলে রাক্ষসকে মারব। 
শুনে দুঃখিত হয়ে ভীম বলেন – কেন আমায় সন্দেহ করছ। এখনি আমি রাক্ষস বিনাশ করব। তোমারা দুরে দাঁড়িয়ে দেখ। বলে হাত বাড়িয়ে হিড়িম্বকে মারতে গেলেন। 
অর্জুন বলেন – রাক্ষসের সাথে অনেক যুদ্ধ করলেন, অনেক পরিশ্রম হল, এখন আপনি বিশ্রাম করুন, আমি এই দুষ্ট নিশাচরের বিনাশ করব।

অর্জুনের কথায় ভীম আরো রেগে গেলেন চুল ধরে হিড়িম্বকে মাটিতে আছড়ে ফেললেন। চড়-চাপড়-ঘুষি-পদাঘাত চলতে লাগল। পাখির মত তাকে শেষ করলেন। মাঝখান থেকে দুইখান করলেন। তারপর ভাইদের দেখালেন। পঞ্চভাই পরষ্পরকে আলিঙ্গন করলেন। চারভাই বৃকোদর ভীমের বহু প্রশংসা করতে লাগলেন। 
অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে ব্যগ্র হয়ে বলেন- ঐ সামনে একটা গ্রাম দেখতে পাচ্ছি এখনি সেখান থেকে কেউ এসে সব দেখে দুর্যোধনকে খবর দেবে, তাই এখানে আমাদের থাকা নিরাপদ নয়, শীঘ্র অন্য স্থানে যাওয়া উচিত। এই সব ভেবে কুন্তী ও পাঁচভাই দ্রুত সেস্থান থেকে গমন করলেন। 

হিড়িম্বা কুন্তীর সাথেই যেতে লাগল। হিড়িম্বাকে দেখে ভীম রেগে গেলেন। চেঁচিয়ে বললেন – রাক্ষসরা সহজেই মায়া করতে পারে। মোহিনীরূপ ধরলেও স্বভাব একই থাকে। সময় গেলে এও আমাদের মারবে। ভায়ের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে, আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সে আমাদের সাথে চলেছে। এক চড়ে তোকেও ভায়ের কাছে পাঠাব। 
এই বলে ভীম হিড়িম্বাকে মারতে এল। 

যুধিষ্ঠির তাকে বাঁধা দিয়ে বলেন- ভীম ধর্মে বলে স্ত্রীজাতিকে বধ করা অন্যায়। তুমি কেন এমন পাপ কাজ করছ! তোমাকে মহা বলবান হিড়িম্ব মারতে পারল না, এর কি শক্তি যে তোমায় সংহার করবে! 
যুধিষ্ঠিরের কথায় ভীম শান্ত হলেন।
হিড়িম্বা কাতর কণ্ঠে কুন্তীকে বলে –কায়মনোবাক্যে আমি সত্য অঙ্গীকার করছি তুমি ছাড়া আমার আর গতি নেই। তোমাকে মিথ্যে বলছি না, তুমিও নারী আমার মনোকষ্ট তুমি বুঝবে। কামবশে অজ্ঞান হয়ে আপন ভাই ও কুল ত্যাগ করে তোমার পুত্রকে ভালবাসলাম। এখন সব হারিয়ে আমি তোমার শরণে এসেছি। শরণাগতের উপর ক্রোধ অনুচিত, আপনি দয়া করে আমার ব্যবস্থা করুন। সব সময় আমি আপনার সেবা করব। সব সঙ্কট থেকে উদ্ধার করব। আপনি ভীমকে আজ্ঞা করুন আমাকে গ্রহণ করার জন্য। না হলে এখনি আপনার সামনে আমি প্রাণত্যাগ করব। কৃতাঞ্জলি করে আমি সবিনয়ে এ অনুরোধ জানাচ্ছি। না হলে অধর্ম অবশ্যই হবে।
 
হিড়িম্বার এত কথা শুনে দয়াময় যুধিষ্ঠির বলেন – হিড়িম্বা মন থেকে সত্য কথা বলছে। কেউ শরণ চাইলে তাকে রক্ষা করতে হয়। ভাই ভীম তুমি হিড়িম্বাকে নিয়ে সুখে বনের ভিতর বিচরণ কর । পরে আবার আমরা দেখা করব। আমার বাক্য লঙ্ঘন করো না। 


ধর্মপুত্রের আজ্ঞা পেয়ে হিড়িম্বা খুশি হল এবং ভীমকে নিয়ে শূণ্যপথে চলে গেল। নানা বনে উপবনে যেখানে খুশি তারা ঘুরে বেড়াতে লাগল মনের আনন্দে। কত নদ-নদী-পাহাড়-পর্বত ঘুরলো, নতুন নতুন সাজে পরস্পরকে আকর্ষণ করে বহুদিন কাটাল। এর কিছু পরেই ঋতুযোগে হিড়িম্বা গর্ভবতী হল। ভয়ঙ্কর মূর্তির এক পুত্র সে জন্ম দিল। জন্মমাত্র পুত্র মহাবীর যুবক হল। তার বিশাল শরীর ঘটের মত মাথা ও খাড়া খাড়া চুল – ভীম তার নাম রাখল ঘটোৎকচ। এই মহা বলবান হিড়িম্বাপুত্রই হবে ইন্দ্রের একাঘ্নী শক্তির আধার। ঘটোৎকচ মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে ভীমকে কৃতাজ্ঞলি সহ দন্ডবৎ করে বলেন – আজ্ঞা করুন আমরা নিজেদের স্থানে যাই। যখনই স্মরণ করবেন অবশ্যই উপস্থিত হব। 

মাতা ও পুত্র ভীমের আজ্ঞা পেয়ে উত্তরদিকে নিজেদের স্থানে যাত্রা করল। ভীম আবার মা ও ভাইদের সাথে মিলিত হলেন। তারা একস্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরতে লাগলেন। কোন স্থানে এক রাত্রের বেশি অবস্থান করলেন না। পরিধানে গাছের ছাল, মাথায় জটার ভার। কোথাও ব্রাহ্মণ কোথাও তপস্বী রূপে তারা থাকতে লাগলেন। পথে লোক দেখলে বনে লুকিয়ে পরতেন। যেখানে কেউ থাকেনা সেখানেই আশ্রয় নিতেন। ত্রিগর্ত, পাঞ্চাল, মৎস্য ও অনেক দেশে বহু কষ্টে ভ্রমণ করে বেরাতে লাগলেন।

হঠাৎ একদিন ব্যাসদেব পান্ডবদের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে কুন্তীদেবী এগিয়ে এসে সবার সাথে ব্যাসকে প্রণাম জানালেন। ব্যাসকে দেখে কুন্তী নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। বহু বিলাপ করতে করতে কাঁদতে লাগলেন। 
বেদব্যাস তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন - আমাকে কি আর বলবে, সবই আমি জানি। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা অধর্ম করল তোমাদের সাথে। তাই আজ তোমাদের বনে বনে ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। তারা যা করেছে সব আমার গোচরে এসেছে সে জন্যই তোমাদের দেখতে এলাম। তিনি পুত্রবধূকে মনস্থির করে দুঃখ করতে বারণ করলেন এবং আশির্বাদ করলেন অচিরেই সব দুঃখ দুর হবে। 
ব্যাস বলেন – তোমার পুত্রদের গুণ তুমি যান না, আমি সব জানি। ধর্মবলে, বাহুবলে সকলকে জয় করবে, সাগরান্ত ভূমন্ডলের সম্পদ হবে। এখন আমি যা বলছি সাবধানে শোন। বহু দুঃখে অনেক বনে ঘুরলে। এখন কাছেই একচক্রা নামে এক নগর আছে। কিছুদিন সেখানে বিশ্রাম কর। গোপনে ছন্মবেশে ছয়জনে বাস কর সেখানে যতদিন না আমি ফিরে আসি। 
এত বলে ব্যাসদেব তাদের নিয়ে একচক্রা নগরে চললেন। সেখানে এক ব্রাহ্মণের গৃহে তাদের থাকার ব্যবস্থা হল। ব্রাহ্মণের ঘরে ছয়জনকে রেখে ব্যাসদেব চলে গেলেন।
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers