Blog Archive

Tuesday, February 10, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৭৫

[পূর্বকথা –পাণ্ডবরা দেবল ঋষির কনিষ্ঠ ভাই ধৌম্যকে পৌরোহিত্যে বরণ করে নিলেন এবং পাঞ্চালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সেখানে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের আয়োজন চলছে। দ্রুপদের আমন্ত্রণে সকল দেশের রাজারা যেমন এলেন, দেবতারাও উপস্থিত হলেন...] 

দ্রৌপদীর সভায় আগমনঃ 
 

পাঞ্চালরাজ্যে অনেকদিন ধরে নৃত্য, গীত ও ধনরত্নদান চলতে লাগলো। তারপর ষোড়শদিন এক লক্ষ রাজা যখন সভায় বসলেন তখন রাজা দ্রুপদ ধাত্রীদের আজ্ঞা দিলেন দ্রৌপদীকে সাজিয়ে সভায় আনার জন্য। রাজার আজ্ঞা পেয়ে ধাত্রীরা নানা অলঙ্কারে দ্রৌপদীকে সাজালো। নানা পুষ্পে তাকে সাজান হল যেন ষোড়শকলায় ব্রাহ্মণ ও রাজাদের মন জয় করতে পারেন। দ্রৌপদীর পুরোহিত মন্ত্রধ্বনি পড়তে লাগলেন। যজ্ঞ ও পূজা করে তিনি সভার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সভার মাঝে যখন দ্রৌপদী উপস্থিত হলেন, তাকে দেখে রাজারা যেন মূর্ছিত হল। সকলের অন্তরের কামাগ্নি প্রজ্বলিত হল, সকলে অচেতন হলেন। সকলে পুতুলের মত স্থির হয়ে বসে, কেউ কেউ সেখানেই ঢলে পরল, কেউবা অজ্ঞান হয়ে গড়াগড়ি দিল। কেউবা সচেতন হয়ে আর মাথা তুলে চাইতে পারে না। কেউ কেউ আবার নিজের গুণকীর্তন শুরু করে দিল। সকলে মনে মনে ভাবে ধন্য এ জীবন যাকে দেখলাম এই রূপে। এখন কোন রাজা এ কন্যার অন্তরের রাজা হন –তাই দেখার। 
.................................... 

দ্রৌপদীর রূপ-বর্ণনাঃ 
 

দ্রৌপদী - পূর্ণচন্দ্রের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, বিকশিত পদ্মের মত মুখ, গজমতি(হাতির মাথার মুক্তা-প্রবাদ) অলঙ্কারে ভূষিতা, তিলফুলের মত নাসা- দেখে মুনির মনও সুখি হয়। চোখদুটি এমন সুন্দর যে দেখে মাছ ও হরিণ দুইই লজ্জায় বনে পালায়। এমন সুচারু ভুরুলতা দেখে মদনের শরধনুও ব্যাথা পায়। পলার মত রক্তবর্ণের ঠোঁট, কপালটিও নবোদিত সূর্যের মত আরক্ত। মাথায় ঘন কালো মেঘপুঞ্জের(কাদম্বিনী) মত কেশ, মধ্যে স্থির বিদ্যুতের(সৌদামিনী) রেখার মত সিঁথিটি। (চাঁচর)কুঞ্চিত কেশ কপালে এসে পরেছে। বিদ্যুতের মত কানের স্বর্ণ কুন্ডলদুটি চাঁদের মত সুন্দর মুখের আড়ালে ঝিলিক মারছে। স্তনদুটি দেখলে লজ্জায় ডালিমও হৃদয় ফেটে পড়ে যাবে। কন্ঠ দেখে শঙ্খও অগাধ সমুদ্রের মাঝে প্রবেশ করবে। পদ্মের নালের মত সুন্দর দুটি বাহু সর্পকে লজ্জায় বিলে প্রবেশ করাবে। কোমর বা কটি এত সরু যে হস্তি তা দেখে লজ্জায় বনে পালাবে। করতল কোকনদের(লালপদ্ম) মত কোমল ও সুন্দর। নখগুলি যেন চন্দ্রকে ধারণ করেছে। সেই হাতে সোনার কঙ্কণ সব সময় ঝন্‌ঝন্‌ করে বাজছে। চরনের নুপুরদুটি যেন হংস। সুন্দর কোমরটিও সোনার অলঙ্কারে জরানো। কদলীবৃক্ষের মত সুপুষ্ট ও সুন্দর উরু দেখে হাতিরও নিন্দা হবে। পেটটি ছোট ও হরিণের মত টানটান, নীতম্ব যেন যুগল ক্ষিতি(পৃথিবী)। নীলবর্ণের সুকোমল নির্মল শরীরটি যেন পদ্মে গঠিত। অলঙ্কারের ভারে কোমল সুন্দর দেহটি যেন একটু নত, যা দেখে চিত্ত মোহিত হয়। পদ্মের মত মুখশ্রী, পদ্মের মতই নয়ন যুগল, পদ্মকেও লাঞ্ছিত করে এত সুন্দর দুটি গাল। পদ্মেরডাটির মত দুই বাহু, তাকে যেন সুন্দর মিষ্টি পদ্মের গন্ধ ঘিরে আছে যা যোজন দুরেও ছরিয়ে যাচ্ছে এবং মৌমাছিরা সেই গন্ধে বিভোর হয়ে চারদিকে ঘুরে বেরাচ্ছে। কুরুকুল ধ্বংসের জন্যই লক্ষ্মীর অংশে এই কমলে সৃজিতা নারীর জন্ম। কাশীনাথ যিনি কমলাকান্তের পুত্র তিনিও সেই লক্ষ্মীদেবীকে প্রণাম জানান। 
.................................... 

রাজাদিগের লক্ষ্যভেদে উদ্যোগঃ 
 

দ্রৌপদীর রূপ দেখে রাজারা মোহিত হলেন। দ্রৌপদী সভার মাঝে এলে সকলে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। হুড়াহুড়ি করে সবাই আগে লক্ষ্য বিদ্ধ করতে চায়। বন্ধুদের মধ্যেও বিবাদ শুরু হল। সকলে ধনুককে ঘিরে দাঁড়িয়ে পরল। 
তখন ক্ষত্রিয়কুলের মহাতেজা রাজচক্রবর্তী মগধরাজ জরাসন্ধ ধনুক ঝাঁকিয়ে তুললেন এবং গুণ পরানোর জন্য ধনুক নোয়াতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ধনুকে বেশি ভর দিয়ে ফেলায় ধনুক তাকে বহু দূরে আছড়ে ফেললে রাজা মূর্ছা গেলেন। 
তখন দুর্যোধন দম্ভ করে এগিয়ে এসে ধনুক ধরে হাঁটু মুড়ে বসে গুণ পরাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই ধনুককে নোয়াতে পারলেন না। তিনি আরো বল প্রয়োগ করতে লাগলেন। মুখে রক্ত উঠে এল, শরীর কাঁপতে লাগলো। শেষে ধনুকের আঘাতে ভূপতিত হলেন। 
তখন মৎসরাজ বিরাট এসে বহু কষ্টে ঠেলাঠেলি করে ধনুকটি নিলেন। কিন্তু তিনি তা তুলতেও পারলেন না, আবার ছাড়তেও পারছিলেন না। 
তা দেখে হেসে সুশর্মা যিনি ত্রিগর্তদেশের রাজা ধনুক কেড়ে নিয়ে বলেন –সুন্দরী কন্যা দেখে বৃদ্ধ বয়সে কি লজ্জার মাথা খেলেন, রাজন! লক্ষ্যবেঁধার ছলে সমাজ হাসালেন। ধনুক তোলার শক্তি নেই, আবার লক্ষ্য বেঁধার ইচ্ছা! এই মূর্খ মৎসরাজকে সকলে ধর। এত বলে তিনি দ্রুত ধনুক হাতে তুলে নিলেন। 
তা দেখে বীর কীচক, যিনি বিরাটরাজার সেনাপতি ও শ্যালক, রাগে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে ত্রিগর্তরাজ সুশর্মাকে ঠেলে ফেলে চাপড় মেরে ধনুক কেড়ে নিলেন। পায়ে চেপে ধরে ধনুকে গুণ দিতে চাইলেন। কিন্তু ধনুকের ধাক্কায় বহুদুর পরে মৃতপ্রায় হলেন। 
এভাবে মত্ত হস্তীর বলধারী পরাক্রমী দশ সহস্র বীর কেউই ধনুকে গুণ পরাতে সক্ষম হলেন না। 
চেদিরাজ শিশুপালও(কৃষ্ণের পিসতুতোভাই, দমঘোষের পুত্র) সভার মাঝে বড়ই লজ্জিত হলেন। প্রাণপণে তিনি ধনুক নোয়াতে চেষ্টা করলেন। দেহ অবস হয়ে এলো কিন্তু ধনুক হেললো না। ধনুকের হুল চিবুকে লেগে তিনি বহুদুরে রাজাদের মধ্যে উল্টে পরলেন। মুকুট ভেঙে গেল, শরীর অবশ, মৃতপ্রায় রাজা হতভম্ব হয়ে রইলেন। 
তারপর একে একে অন্য রাজারা-বিদর্ভের রাজপুত্র রুক্মী, প্রাগ্‌জ্যোতিষের রাজা ভগদত্ত, মদ্ররাজ[বর্তমানে হিমালয়ের উত্তরাঞ্চল, জম্বুকাশ্মীরের অংশ] শল্য, রাজপুতানার শাল্ব, বাহ্লীক, কলিঙ্গ, কাশ্ম, চন্দ্রসেন, মদ্রসেন, পৌরব, সত্যসেন, সুষেণ, রোহিত প্রমুখ বলবন্ত, কুলবন্ত ক্ষত্রিয় প্রধানরা সবাই একে একে ধনুক নোয়াতে বিফল হলেন। সকলে প্রাণপণে দুর্জয় মহাধনু তোলার চেষ্টা করলেন কিন্তু গুণ কেউই পরাতে পারলেন না। ধনুক একদিকে রাজারা অন্যদিকে গড়াগড়ি যান। মাথা থেকে মুকুট গড়িয়ে পড়ে, গলায় মনিমুক্তার হার ছিঁড়ে গড়াগড়ি খায়। কারো হাত ভাঙ্গে, কারো বা ঘাড়, কাঁধ, নাক। কারো বা মুখ ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠে আসে। কেউ বা হাহাকার করে ভূমিতে পরে। 

বড় বড় রাজাদের এমন অপমানিত হতে দেখে অন্যেরা আর এগোতে সাহস পেল না। শুরুতে কে প্রথমে যাবেন তাঁর প্রতিযোগীতা হচ্ছিল, এখন লজ্জায় কেউ মুখ দেখাতে পারলেন না। অনেকে উঠে সভায় বসলেন বটে কিন্তু লজ্জায় অধোমুখে ধনুকের দিকে পিছন ফিরে রইলেন। সকল ক্ষত্রিয় রাজারা বুঝে গেলেন এ অজেয় ধনুক, কারো পক্ষে লক্ষ্যভেদ সম্ভব নয়। 

সব রাজারা যখন হার মেনে নিলেন তখন পাঞ্চালরাজ করযোড়ে বললেন- শুনুন, রাজনরা! স্বয়ম্বর করে আমি নিজেই লজ্জা পেলাম। যাদের নিমন্ত্রণ করে আনলাম সেই রাজারা প্রাণপাত করেও কার্য্যসিদ্ধি করতে পারলেন না। 
সকলে বলেন – রাজা! আপনাকে আমরাও বুঝতে পারলাম না। এমন ধনুক আমরা কেউ কখনও দেখিনি। এর আগেও আমরা অনেক স্থানে লক্ষ্যভেদ করে কন্যা গ্রহণ করেছি। কিন্তু এমন ধনুক কোথাও দেখি নি। ধনুকের আঘাতে রাজারা মুর্ছা গেল, লক্ষ্যভেদ তো দুরের কথা, কেউ তাতে গুণও পরাতে পারলাম না! আমাদের সকলকে বিড়ম্বিত করতেই আপনি এমন চাতুরী করেছেন। অনেক ধনুক দেখা হয়েছে কিন্তু একি! এমন ধনুক কেউ দেখেনি, এমন ধনুকের কথাও কেউ শোনেনি। কিছুকাল পূর্বেও মদ্ররাজ বৃহদসেনা তাঁর কন্যা লক্ষণার স্বয়ম্বর করেন। যোজন উঁচুতে রাধাচক্র বসান। তাতেও কেউ কেউ গুণ পরায়। শেষে বাসুদেব কৃষ্ণ লক্ষ্যভেদ করে লক্ষণাকে লাভ করেন। রাজা ভগদত্ত তাঁর কন্যা ভানুমতীর বিবাহও এভাবেই দেন। সেই ধনুকও এ ধনুকের সমান প্রায়। কিন্তু সে ধনুতেও গুণ দেওয়া গেছিল। কর্ণ লক্ষ্যভেদ করে কন্যাকে দুর্যোধনের হাতে দেন। 

জন্মেজয় আবার মুনিকে জিজ্ঞেস করলেন – মুনি, কর্ণ কি ভাবে লক্ষ্যভেদ করলেন সে সম্পর্কে বলুন। ভানুমতীর স্বয়ম্বরের কাহিনীও শুনতে ইচ্ছে করছে। কোন্‌ কোন্‌ রাজারা সেখানে গিয়েছিলেন। 

মহাভারতের কথা অমৃত লহরী, কাশীরাম কহেন এবং যা শুনলে সংসার সমুদ্র সহজে পার হওয়া যায়। 
.................................... 

Saturday, January 31, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ৭৪

[পূর্বকথা –গন্ধর্ব অর্জুনকে বিভিন্ন কাহিনীর মধ্য দিয়ে বোঝালেন তাদেরও একজন পুরোহিত প্রয়োজন সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য......তারই কথা মত পাণ্ডবরা দেবল ঋষির কনিষ্ঠ ভাই ধৌম্যকে পৌরোহিত্যে বরণ করে নিলেন এবং পাঞ্চালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

দ্রৌপদীর স্ব্য়ম্বরঃ- 
 

পাঞ্চাল নগরে পঞ্চপান্ডব এক কুম্ভকারের গৃহে অতিথিরূপে আশ্রয় নিলেন। তারা ব্রাহ্মণের বেশে থাকেন ও ভিক্ষা করেন। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। 

এদিকে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ কন্যার স্বয়ম্বরের অদ্ভূত আয়োজন করতে থাকেন। যখন দ্রৌপদী সুন্দরীর জন্ম হল অগ্নি থেকে তখনই দ্রুপদ ঠিক করে ফেলেছিলেন এই কন্যার যোগ্য বর হবেন বীর ধনঞ্জয় অর্জুন। কিন্তু জতুগৃহে পঞ্চপান্ডবের মৃত্যুর সংবাদ পেলে দ্রুপদ তা বিশ্বাস করেন নি। তিনি বহুদেশে পঞ্চপান্ডবদের খোঁজার জন্য দূত পাঠান। কিন্তু কোন খবর না পেলে চিন্তিত হন। শেষে অনেক চিন্তা করে এমন এক ধনুক তৈরী করান যা কেউ কখনও দেখে নি। তিনি শূণ্যে একটি যন্ত্র স্থাপন করে তার উপরে লক্ষ্য বস্তুটি রাখলেন। পঞ্চশরসহ সেই ধনুকটি সভায় রাখলেন। 
এই ধনুঃশরে ঐ যন্ত্র রন্ধ্রপথ দিয়ে যে লক্ষ্যভেদ করবে তার সাথেই কন্যার বিবাহ হবে- রাজা এমন ঘোষণা করলেন। 
সেই মত সর্বত্র রাজাদের নিমন্ত্রণ করা হল। সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সকল রাজ্যের রাজারা আমন্ত্রণ পেয়ে সসৈন্য পাঞ্চালে উপস্থিত হলেন। এত রথ, অশ্ব, পদাতিক এল যে গুণে শেষ করা যায় না। চারদিকে বিবিধ বাজনা বাজতে থাকে, মহা কোলাহল। জল, স্থল, পর্বত, কানন, নদ, নদী পেরিয়ে-দশদিক থেকে সকলে পাঞ্চাল রাজ্যে আসতে থাকে। ধ্বজা, ছাতা, পতাকায় আকাশ ঢেকে গেল। চারদিকে এত মানুষের কলরব যে কিছুই শোনা যায় না। নগরের ঈশান ভাগে অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব দিকে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ এক বিচিত্র মনোহর সভা রচনা করলেন। চারদিকে সুপরিসর মঞ্চ রচিত হল। বিবিধ বসন, মণি, রত্ন দিয়ে তাদের মুড়ে দেওয়া হল। কৈলাস শিখরের মত সুন্দর সুসজ্জিত রাজাদের ঘর তৈরী করা হল। সোনা, রূপা, মণি, মুক্তা, প্রবাল দিয়ে মঞ্চ বেষ্টিত করে যেন সুবর্ণের জাল তৈরী হল। গুবাক(সুপারী) ও কলাগাছ স্থানে স্থানে মঙ্গলসূচক রূপে স্থাপিত হল। উপর নীচ কেটে তাদের সমান করা হল। চারদিকে চন্দন ছড়িয়ে ধুলো নাশ করা হল। সুগন্ধি কুসুম গন্ধে ভ্রমররাও মত্ত হয়ে উঠল। মঞ্চের স্থানে স্থানে বিচিত্র সিংহাসন রাখা হল। বিচিত্র উত্তম শয্যা, বিচিত্র বসন, চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় যা লিখে শেষ করা যায় না। বহুদিন ধরে এসব ধিরে ধিরে সঞ্চয় করা হয়েছিল। আমন্ত্রিত রাজারা মঞ্চের উপর তাদের যথাযোগ্য স্থানে বসলেন। এ যেন আরেক ইন্দ্রের সভা বসল অমর ভুবনে। রাজাদের নানা চিত্র-বিচিত্র বিবিধ বিভূষণ। কানে তাদের কুন্ডল, গলায় মণিমুক্তার হার। মাথায় মুকুট, অঙ্গে নানা অলঙ্কার। সকলেই রূপবন্ত, কুলবন্ত, বলে মহাবলীয়ান, সর্বশাস্ত্রে বিশারদ, সর্ব গুণশালী। এত রাজা এলেন যে সকলের বর্ণনা সম্ভব নয়। সকলে চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে উপস্থিত। 
ধৃতরাষ্ট্রের একশত কুমার সহ দুর্যোধন, দুঃশাসন, ভীষ্ম, দ্রোণ, দ্রোণী অশ্বত্থামা, কর্ণ, কৃপ, সোমদত্ত(বাহ্লীকরাজপুত্র, সম্পর্কে ধৃতরাষ্ট্রের কাকা) কুরুবীররা কোটি কোটি রথ, অশ্ব, পদাতিক নিয়ে এল। এছাড়া- জরাসন্ধ, জয়সেন, শল্য, শল্ব, সুবল পুত্র শকুনি-যিনি গান্ধার(বর্তমান সিন্ধপ্রদেশ, রাওলপিন্ড) রাজপুত্র ও মহাবীর, অংশুমান, চেদিপাল, পশুপাল, শ্বেতশঙ্খ, বিরাট, প্রতিভূতি, পুন্ডরীক, রুক্মাঙ্গদ, রুক্মরথ, রুক্মী, শতভাই কলিঙ্গ, বৃন্দ, অনুবৃন্দ, চিত্রসেন, জয়দ্রুথ, নীলধ্বজ, শ্রীবৎস রাজা সত্রাজিত, চিত্র, উপচিত্র, দূর্বানন্দ, বৃহক্ষত্র, উলূক, জলসন্ধ, ভগদত্ত, চক্রসেন, শূরসেন, চিত্রাঙ্গদ, শুভাঙ্গদ, শিরসিবাহন, ভূরিশ্রবা, সুশর্মা, বাহ্লীক প্রমূখ আরো অনেক বীর এলেন ও যথাযোগ্য স্থানে বসে সভা আলোকিত করলেন। 

 
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর শুনে ইন্দ্রও উপস্থিত হলেন দেখতে। তাঁর সাথে দেবলোকের যম, কুবের, বরুণ, হুতাশন-অগ্নি সহ তেত্রিশকোটি দেবতা, গন্ধর্ব, চারণ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, ঋষি, অপ্সর, অপ্সরীরা উপস্থিত হলেন। নৃত্য-গীত-বাদ্যে সভা যেন স্বর্গপুরীতে পরিণত হল। স্বয়ং জগন্নাথ গরুড়ারোহণে উপস্থিত হলেন। পান্ডব বিবাহের জন্যেই তাঁর এই আগমন। তাঁর সাথে এলেন তাঁর আত্মীয়েরা-কামদেব(কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর পুত্র) , গদ(যাদববীর), শাম্ব(কৃষ্ণ ও জাম্ববতীর পুত্র), চারুদেষ্ণ, সাত্যকি(যাদববীর), সারণ(কৃষ্ণের বৈমাত্রের ভাই, সুভদ্রার সহোদর), বিদুরথ, কৃতবর্মা, উদ্ধব, অক্রুর(কৃষ্ণের সখা), পৃথুঝিল্লী, পিন্ডারক, শঙ্কু, উশীনর। 
খগপতি গরুড়ের সাহায্যে নারায়ণ শূণ্যেই অবস্থান করলেন। নারায়ণ বিষ্ণু স্বয়ং শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন। পাঞ্চজন্য (পঞ্চজন-নামক দৈত্যের অস্থি দ্বারা নির্মিত) শঙ্খনাদে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল পূর্ণ হল। পৃথিবীর সকল বাদ্যের শব্দ যেন লুকালো। যত সভ্যরা সভায় বসেছিলেন গোবিন্দকে(কৃষ্ণ) আসতে দেখে সম্ভ্রমে উঠে দাড়ালেন। 
 

ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, সত্যসেন, সত্রাজিত, শল্য, ভূরিশ্রবা, ক্রথ, কৌশিক- সকলে যুক্তকরে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালেন। দুষ্ট রাজারা তা দেখে হাসল। শিশুপাল, শাল্ব, দন্তবক্র, জরাসন্ধ প্রমুখ দুষ্টচক্র। তারা বলে – কাকে সবাই এত ভক্তিভরে প্রণাম করলে দেবতা কি পশুত্ব ত্যাগ করে কাম জাগ্রত করবে! 
হাততালি দিয়ে শিশুপাল বলে – সবার থেকে ভাল শঙ্খ বাজায় গোপাল। দ্রুপদ তাঁকে বাদ্যকরদের নিয়ে বাজনা বাজাবার জন্যই বরণ করে নিয়ে এসেছেন। 
জরাসন্ধ বলে- ভীষ্ম, তুমিতো জানতাম জ্ঞানবান। তোমার মত জ্ঞানী ব্যক্তি এমন অজ্ঞান হলেন কি করে! সবার মাঝে তুমি কি কান্ড করলে! গোপপুত্রকে কি কখনও ক্ষত্রিয়ের প্রণাম করা সাজে! নন্দগোপের গৃহে এ চিরকাল থেকেছে। গোপেদের অন্নে প্রতিপালিত হয়ে গরুর পাল চরিয়েছে। সর্বজ্ঞ হিসেবে তুমি ভারতখ্যাত, ভীষ্ম! সব জেনে তুমি এমন কান্ড করলে! 

ভীষ্ম বলেন- ওসব বুঝি না। আমি পুরাতন বৃদ্ধ জ্ঞানী মানুষদের মুখে শুনে এসেছি গোপালের চরিত্র বেদের অগোচর। তিনলোকে কে তাঁর সম্পর্কে বলতে পারে! তিনি তাঁর এক লোমকূপে ব্রহ্মান্ড ধারণ করতে পারেন। সেই প্রভূই এই গোপাল অবতাঁর। মায়াভরে মনুষ্যদেহ ধারণ করে এলেন। তাঁর লীলায় পৃথিবীবাসী ধন্য হল। এঁনার নাভি কমল থেকেই স্রষ্টা ব্রহ্মার সৃজন হয়েছিল। এঁনার ললাট বা কপাল থেকে বিধাতার জন্ম, চক্ষু থেকে সূর্যের। এঁনার মনেতে জন্মালেন চন্দ্র, নিশ্বাসে পবন। ব্রহ্মান্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট থেকে শ্রেষ্ঠ মহীপাল সবার মধ্যেই মায়ারূপে এই গোপালের অবস্থান। হর্তা-কর্তা বিধাতা যিনি তিনিও গোপালের চরণ বন্দনা করেন। পঞ্চমুখে সর্বক্ষণ মহেশ্বর শিব এঁনাকেই প্রণাম জানান। চারি মুন্ডে বিধাতা ব্রহ্মা, সহস্র মুন্ডে শেষনাগ যাকে প্রণাম জানান তাদের কাছে আমি তো সামান্য মনুষ্য মাত্র! হে রাজন, অজ্ঞান হয়ে তুমি এমন কথা বললে। 

ভীষ্মের কথা শুনে বৃহদ্রথের পুত্র তথা মগধরাজ জরাসন্ধ হেসে বলে- ভ্রান্তির বশে তুমি এসব বলছো। যখন এই দুষ্ট আমার জামাতা কংসকে হত্যা করল, কৈ তখন তো এসবের নিদর্শন পেলাম না! এতো তখন আমার ভয়ে মথুরা ত্যাগ করে সিন্ধুতীরে গেল। এ যদি দেব নারায়ণ হন, তবে ভীষ্ম বল কেন আমার ভয়ে পালাল। 

ভীষ্ম বলেন – সে সব কথা আমার জানা আছে। না জেনে আমি কিছুই বলি না। তবে শোন সকল কথা। পূর্বে ছিলে তুমি দৈত্য বিপ্রচিত্তি। কৃষ্ণের হাতে মরলে দিব্যগতি পেতে, তাই তিনি তোমায় মারলেন না। বলরাম না জেনে মারতে চাইলেন। আকাশবাণী শুনে তিনি আর তোমায় প্রাণে মারলেন না। তাঁর কাছে আঠারোবার হেরে যুদ্ধ ত্যাগ করলে। 
এত শুনে জরাসন্ধ ক্রোধে রক্তচক্ষে ভীষ্মকে দেখতে থাকে। 

ভীষ্মও তাঁর ক্রোধ মুখ দেখে বলেন – কি কারণে এত ক্রোধ তোমার, মগধরাজ! যেখানে কৃষ্ণের নিন্দা হয় সেখানে তিলমাত্র থাকার আমার রুচি নেই। আমি এখনই এস্থান ত্যাগ করছি। হয় নিন্দুককে মারি নয় সেস্থান উপেক্ষা করি। এই বলে তিনি সেখান থেকে অন্যস্থানে চলে যান। 
কাশীদাস বিরচিল শুনে পুণ্যবান। 

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers