Blog Archive

Monday, December 14, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১১৫

[পূর্বকথা - কৃষ্ণের কথা মত অর্জুন সরস্বতীর তীর থেকে সুভদ্রাকে হরণ করলেন...যদুবীররা ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করল ... সুভদ্রা অর্জুনের সারথি হলেন...যদুবীররা পরাস্ত হতে লাগল ..... এ সংবাদ বলরাম শুনে কৃষ্ণের উপর অভিমান করতে লাগলেন... ] 

বলরামের সহিত শ্রীকৃষ্ণের কথাঃ



দূত পুনরায় জোড়হাতে বলে –হে যদুনাথ, নিঃশব্দ রয়ে গেলেন কেন! আজ্ঞা করুন আমি এখন কি করি! কুমাররা আমায় বার্তার কারণে পাঠালেন! যাদব প্রধান মহাবীর কামদেব যিনি তিনলোকে অব্যর্থ তাঁর ধনুর্গুণ তিলতিল করে কাটা গেছে। একটিও আর অস্ত্র নেই, তূণও শূন্য। শাম্ব, গদ, সারণ প্রমুখ যতবীর যাদবরা আছেন, কারো তনুই অক্ষত নয়। কারো ধ্বজা কাটা গেছে, কারো বা সারথি, কারো রথ নষ্ট হয়েছে-সে এখন পদাতি। কারো অস্ত্র, ধনুর্গুণ কিচ্ছু নেই। সবাইকে একা অর্জুন জয় করেছেন। এখন আপনারা অস্ত্র, রথ, অশ্ব সব পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। আপনি চলুন বা দেবকীপুত্র কৃষ্ণ চলুক সব স্বচক্ষে দেখে আসবেন। কুমারদের পক্ষে অর্জুনকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। অর্জুনও স্নেহ করে কুমারদের প্রাণে মারেন নি। তাই প্রভু, তারা এখনও পরান নিয়ে বেঁচে আছেন। 

গোবিন্দ বলেন –আমি অর্জুনকে চিনি। তাকে পরাজিত করার মত পৃথিবীতে কাউকে দেখি না। আজ এমনকি ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ, পঞ্চাননও পার্থকে জিততে পারবেন না। কুমাররা তাঁর কাছে শিশু , তারা আর কি করবে! তুমি সত্যই বলেছ পার্থ তাদের প্রাণে মারবেন না। তাঁর সাথে যুদ্ধ করা উচিত নয়। সে তো অন্যায় কিছু করেন নি! শাস্ত্র মতে ক্ষত্রিয়ধর্মে বলপ্রয়োগ করে বিবাহের প্রশংসা আছে, যেখানে কন্যার সম্মতি আছে। ধনঞ্জয়ের দোষ দেখি না। 
আমাদের ভগিনীর কাজটাও দেখুন। অর্জুনে যদি তাঁর মন না থাকত, তবে সে অশ্ব চালাত কেন! তবে ধনঞ্জয় কি আপনার মহিমা জানেন না! আপনি এখনই গিয়ে তাঁর গরিমা খর্ব করতে পারেন। তবে পার্থকে জীবন্ত ধরা সম্ভব নয়। অনেক চেষ্টা করে তাকে প্রাণে মারতে হবে। পার্থকে হত্যা করলে সুভদ্রাও প্রাণ ত্যাগ করবে। বলুন দেবতা তাতে কি কর্ম সাধন হবে! 
এমন অবস্থায় আমার মত যদি সবাই আজ্ঞা দেন তো জানাই। আপনার প্রিয়ম্বদ কেউ অর্জুনের কাছে যাক। প্রিয় বাক্যে কুন্তীকুমারকে তুষ্ট করে ফিরিয়ে আনুন। এখনই তাকে এনে ভদ্রাকে তাঁর হাতে সমর্পণ করুন। এতে সবার মঙ্গল হবে। লোকসমাজে সম্মান থাকবে। আমার মনে আর কিছুই আসছে না। 

কৃষ্ণের এত কথা শুনে হলধর বলরাম ক্রোধ সংবরণ করে বলেন –আমাকে আর জিজ্ঞেস করছ কেন! তোমার মন যা চাইছে তাই কর। তোমার মনে যা আছে তাই হবে। তোমার অন্যথা আর কে করতে পারে। তখন যদি তোমার কথা মেনে নিতাম, তাহলে এখন আর আমায় এমন লজ্জায় পরতে হত না। 

এরপর বলরাম সাত্যকিকে ডেকে বলেন –আপনি এখনই আমার প্রতিনিধি হয়ে অর্জুনের কাছে গিয়ে তাকে মধুর বচনে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনুন। 
এই বলে সাত্যকিকে রথে চড়িয়ে যুদ্ধ স্থলে পাঠালেন। 

আদি পর্ব মহাভারতের বিচিত্র উপাখ্যান, কাশীরাম দাস কহেন, সাধুজন সদা করেন পান।
......................................

Sunday, December 6, 2015

কথাচ্ছলে মহাভারত - ১১৪

[পূর্বকথা - কৃষ্ণের কথা মত অর্জুন সরস্বতীর তীর থেকে সুভদ্রাকে হরণ করলেন...যদুবীররা ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করল ... সুভদ্রা অর্জুনের সারথি হলেন...যদুবীররা পরাস্ত হতে লাগল .. ] 

বলরামের নিকট অর্জ্জুনের রণজয় সংবাদঃ



বলরাম যখন সসৈন্যে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন, তখন দূত এসে তাকে প্রণাম জানাল। 
সে উর্দ্ধশ্বাসে কাঁদতে কাঁদতে সব কথা বলে –হে প্রভু! আর অর্জুনের হাত থেকে আমাদের রক্ষা নেই। তাঁর উপর সুভদ্রা রথ চালাচ্ছেন। তারা কখনও মেঘে লুকায়, কখনওবা শূন্য মাঝে। খঞ্জন পাখির মত যেন নাচ করছে। সৈন্যদের মধ্যে দিয়ে ঘন ঘন ফণির মত চলে। সৈন্যদের ঘন ঘন প্রদক্ষিণ করে, যেমন মৎস জলে চরে। ডানদিকে, বামদিকে রথ বায়ুবেগে ছুটে, কখনও মাটিতে কখনওবা সূর্যমণ্ডলে ওঠে। 
সৈন্যদের সাথে অর্জুন যুদ্ধ করলেও, সে যে কোথায় কেউ বুঝতেই পারছে না। নানাবর্ণে ধনঞ্জয় অস্ত্র বর্ষণ করছেন। অগ্নি অস্ত্রে কোথাও দাবানল দেখা দিল। কোনখানে সৈন্য মাঝে বায়ু অস্ত্র মারছেন। কোথাও বা ভুজঙ্গ(সর্প) অস্ত্র মারলেন। কোনখানে জল-বৃষ্টি-শীতে তনু কাঁপে। কোথাওবা শর জালে ভানু(সূর্য) ঢেকে দেন। অর্জুনই সবাইকে মেরে যাচ্ছেন। কেউ তাঁকে ছুঁতেও পারছে না। কত যে সৈন্য মরছে, তা কেউ বলতে পারবে না। 
তাঁর এই যুদ্ধ দেখে সকলেই চমৎকৃত। সকল কুমাররা মিলে আমায় দূত করে বার্তা পাঠাল। 

মুষলী(বলরাম) দূতে বলেন –সত্য করে বল। অর্জুন এমন তুরগ রথ কোথায় পেল! 

দূত বলে –হে যাদবেন্দ্র(বলরাম), বলতে ভয় হয়। গোবিন্দের রথ, সুগ্রীবাদি ঘোড়া [কৃষ্ণের রথের চারটি ঘোড়া। শৈব্য-গায়ের রং সবুজাভ হরিতাভ, সুগ্রীব-স্বর্ণাভ তুষারসদ বর্ণ, মেঘপুষ্প-নীলাভ নবীন জলধরের মত এবং বলাহক-ভস্মবর্ণ] দেখলাম। 
সারথি দারুককে দেখলাম বাঁধা অবস্থায় রথে বসে আছেন। 
সুভদ্রাকে দেখলাম সারথি হয়ে রথ চালাচ্ছেন। 

দূত মুখে এত কথা শুনে বলরাম মাটিতে মাথা হেঁট করে বসে পরলেন। অভিমানে তাঁর চোখ দিয়ে জল বইতে থাকল। তাঁর অঙ্গের কস্তূরী গন্ধে চারদিক আমোদিত হয়ে উঠল। সর্বাঙ্গ বয়ে তাঁর কালঘাম বইতে থাকে। 
যদুবীরদের দিকে তাকিয়ে বলরাম বলেন –গোবিন্দ দেখছি আমায় অপমান করছে। নিজের সারথি ও ঘোড়া সহ রথ অর্জুনকে দিল। অর্জুনের কি শক্তি যে এমন কাজ করতে পারে! না বুঝে আমি অর্জুনকে দোষি মনে করেছিলাম। আমার সামনে মিথ্যে কথা বলল! এখন আমার সামনে আসবে কিভাবে তাই ভাবছে।
দুর্যোধনকে বিবাহ কারণে ডেকে পাঠালাম। অধিবাস অনুষ্ঠানের জন্য ব্রাহ্মণরা বসে আছেন! 

এতসব বলে বলরাম অধোমুখে বসে রইলেন। সেই সময় নবঘনশ্যাম কৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত হলেন। ভূমিতে পরে বলরামকে প্রণাম করলেন। ক্রোধে বলরাম তাঁর দিকে তাকালেন না। 

গোবিন্দ বলেন –হে স্বামী(প্রভু), রাগ কেন করছেন! আপনার পদতলে আমি কোন অপরাধ করলাম! 

উগ্রসেন(বলরাম) বলেন –তুমি বড়ই কুকর্ম করেছ। তুমি পার্থকে ভদ্রা হরণ করতে বলেছ। সে কারণেই নিজের রথ, সারথি ও তুরঙ্গ(ঘোড়া) দিয়েছ। তোমাকে দোষ দেব না তো আর কাকে দোষ দেব! 

গোবিন্দ বলেন –সবাই জানেন সেই রথে পার্থ ভ্রমণ করতেন। আমি কি ভাবে জানব সে ভদ্রা হরণ করবে! নরমায়া বুঝতে আমি পারি না। প্রভু অকারণে আমার উপর আক্রোশ করছেন। সুভদ্রা যদি নিজেই রথ চালাতে চান, দারুকের তাতে কি দোষ! 
হে দূত সত্য করে বল দারুক সে রথে কি করছিল! 

দূত বলে –দারুক নিজের বশে নেই। পার্থ তাকে বেঁধে রেখেছেন। 

শ্রীকৃষ্ণ বলেন –যাদবরা সকলে শুনুন আমার কথা অনুভব করুন। 

আদিপর্ব মহাভারতের বিচিত্র উপাখ্যান, কাশীরাম দাস কহেন, শুনেন পুণ্যবান।
......................................

Run To You - Live at Slane Castle, Ireland.mp3

Followers